নবী করীম রাউফুর রাহিম নূরে মোজ্জাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম


নবী করীম রাউফুর রাহিম নূরে মোজ্জাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম


খন্দকার মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন

এম এফ, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা

                              

অনাদি ও অনন্ত স্বত্তা আল্লাহ রাববুল আলামীন যখন একা ও অপ্রকাশিত ছিলেন, তখন তাঁর আত্মপ্রকাশের সাধ ও ইচ্ছা জাগরিত হলো। তখন তিনি একক সৃষ্টি হিসাবে নবী করীম রাউফুর রাহিম নূরে মোজ্জাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূর মোবারক পয়দা করলেন। কোরআন ও হাদীস শরীফের আলোকে নবী করীম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরি এর দলিলসমূহ অনুবাদসহ বিজ্ঞ পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি।

 

কোরআন শরীফের আলোকেঃ

আল্লাহ তায়া’লা ইরশাদ করেন-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين-

অর্থঃ নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা নূর এবং স্পষ্ট কিতাব এসেছে।। (সূরা মায়িদা আয়াত- ১৫)

আলোচ্য আয়াতে নূর দ্বারা নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বুঝানো হয়েছে। নিম্নে আরো কয়েকটি প্রসিন্ধ তাফসীরের আলোকে দলিল উপস্থাপন করা হলঃ-

 

v       দলিল নং ১ঃ-

বিশ্ব বিখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) এর বিশ্ব বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ইবনে আববাস এর মধ্যে আছে-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين يعني محمدا صلي الله عليه ؤسلم-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। (তাফসীরে ইবনে আববাস পৃষ্ঠা ৭২)।

 

 

v       দলিল নং ২ঃ-

ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত্-তবারী (রা) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ইবনে জারীর এর মধ্যে বলেন-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين يعني باالنؤر محمدا صلي الله عليه ؤسلم الذي انار الله به الحق واظهربه الاسلام ومحق به الشرك-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন, যে নূর দ্বারা আল্লাহ সত্যকে উজ্জ্বল ও ইসলামকে প্রকাশ করেছেন এবং শিরিককে নিশ্চিহ্ন করেছেন। ( তাফসীরে ইবনে জারীর ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ৮৬, সূরা মায়িদা আয়াত ১৫)।

 

 

v       দলিল নং ৩ঃ-

মুহীউস্সুন্নাহ আল্লামা আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহাম্মদ (রাঃ) (যিনি ‘খাজিন’ নামে পরিচিত) তাফসীরে খাজেনের মধ্যে বলেন-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين يعنى باالنؤر محمدا صلي الله عليه وسلم انما سماه الله نور الانه يهداى بالنور في الظلام-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। আল্লাহ তায়া’লা তাঁর নামকরণ করেছেন নূর, কারণ তাঁর নূরেতে হেদায়ত লাভ করা যায়। যেভাবে অন্ধকারে নূর দ্বারা পথ পাওয়া যায়। (তাফসীরে খাজিন ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪১৭)।

 

v       দলিল নং ৪ঃ-

ইমাম হাফেজ উদ্দীন আবুল বারাকাত আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ আন- নাসাফী (রা) এই আয়াত শরীফ  ( قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين) প্রসঙ্গে বলেন-

والنور محمد عليه والسلام لانه يهتداي به كما سمي سراجا منيرا-

আর নূর হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কেননা তাঁর নূরেতে হেদায়ত লাভ করা যায়, যেমন তাঁকে উজ্জ্বল প্রদীপ বলা হয়েছে। (তাফসীরে মাদারিক ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪১৭)।

 

 

v       দলিল নং ৫ঃ-

ইমামুল মুতাকাল্লেমীন আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী (রা) এই আয়াত শরীফ  ( قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين) প্রসঙ্গে বলেন-

ان المراد بالنور محمد صلي الله عليه و سلم وبالكتاب القران-

অর্থঃ নিশ্চয়ই নূর দ্বারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কিতাব দ্বারা আল কোরআন মজীদকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে কবীর ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৫, সূরা মায়িদা আয়াত ১৫)।

আর যারা বলে যে ‘নূর ও কিতাবে মুবীন’ দ্বারা কুরআন মজীদকেই বুঝানো হয়েছে, ইমাম রাযী (রা) সে সম্পর্কে বলেন-

هذا ضعيف لان العطف يوجب المغايرة بين المعطوف والمعطوف عليه-

এই অভিমত দুর্বল, কারণ আতফ (ব্যাকরণগত সংযোজিত) মা‘তুফ (সংযোজিত) ও মা‘তুফ আলাইহি (যা তার সাথে সংযোজন কারা হয়েছে ) এর মধ্যে ভিন্নতা  প্রমাণ করে। (তাফসীরে কবীর ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৫)।

 

 

v       দলিল নং ৬ঃ-

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রা) বলেনঃ

 

قد جاءكم من الله نور هو نور النبى صلي الله عليه وسلم-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের কাছে নূর এসেছে, তা হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূর মোবারক।

 (তাফসীরে জালালাইন শরীফ পৃষ্ঠা ৯৭)

v        দলিল নং ৭ঃ-

আল্লামা মাহমূদ আলূসী বাগদাদী (রা) বলেন-

  قد جاءكم من الله نور هو نورعظيم هو نور الانوارالنبى المختار صلى الله عليه وسلم الى ذهب قتادة والزجاج-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের কাছে মহান নূর এসেছে । আর তিনি হলেন নূরুল আনোয়ার নবী মোখতার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটাই হযরত কাতাদাহ ও যুজাজের অভিমত। (তাফসীরে রুহুল মাআনী ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ৯৭)।

 

v       দলিল নং ৮ঃ-

আল্লামা ইসমাঈল হক্কী (রা) বলেন-

قيل المراد باالاول هو الرسول صلى الله عليه وسلم وبالثانى القران-

অর্থঃ বলা হয়েছে যে, প্রথমটা অর্থাৎ নূর দ্বারা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বুঝানো হয়েছে এবং দ্বিতীয়টা অর্থাৎ কিতাবে মুবীন দ্বারা কুরআন কে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ২খন্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯)

আর অগ্রসর হয়ে বলেন-

سمى الرسول نورا لان اول شيئ اظهره الحق بنور قدرته من ظلمة العدم كان نور محمد صلي الله عليه و سلم كما قال اول ما خلق الله نورى-

অর্থ: আল্লাহ তায়া‘লা রসূল আকরাম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম রেখেছেন নূর। কেননা আল্লাহ তায়া‘লা তাঁর কুদরতের নূর থেকে সর্বপ্রথম যা প্রকাশ করেছেন তা তো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূর মোবারক। যেমন তিনি ফরমায়েছেন- আল্লাহ তায়া‘লা সর্বপ্রথম আমার নূর মোবারক কে সৃষ্টি করেছেন। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯)।

 

v       দলিল নং ৯ঃ-

ইমাম মুহীউস সুন্নাহ আবু মু‏হাম্মদ আল- হোসাইন আল-ফাররা আল-বাগাভী (রা) বলেন-

قد جاءكم من الله نور يعنى باالنؤر محمدا صلي الله عليه وسلم-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। (তাফসীরে মাআলিমুত তান্যীল, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৩, তাফসীরে খাযিনের পাদ টীকা)

এ ছাড়া আরো অনেক তাফসীর গ্রÖ্রন্থর মধ্যে আছে যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নূরঃ-

সুরা মায়েদা পারা ৬, ১৫ নং আয়াতে  নূরের ব্যাখ্যাঃ-

১। তাফসীরে মারেফুল কোরআন পৃষ্ঠা ৫৪। ২। তাফসীরে আবি সউদ ২য় খন্ড, পৃ- ২৫১, ৩। তাফসীরে রুহুল বয়ান ২য় খন্ড, পৃ- ৩৬৯, ৪। তাফসীরে রুহুল মায়ানী ১ম খন্ড, পৃ- ৩৬০, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ৯৭, ৫। তাফসীরে ইবনে জারীর ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ- ৮৬, ৬। তাফসীরে কবীর ১১তম খন্ড, পৃ- ১৬৩, ৭। তাফসীরে কুরতুবী ৬ষ্ঠ খন্ড পৃ- ১১৮, ৯। তাফসীরে বায়জাভী ১ম খন্ড, পৃ- ৬৪, ১০। তাফসীরে মাজহারী ৩য় খন্ড, পৃ- ৬৮, ১১। তাফসীরে কবীর ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ- ৪৬২, ১২। ছফওয়াতুত তাফাসীর ২য় খন্ড, পৃ- ১৪০, ১৩। তাফসীরে দুররে মানসুর ২য় খন্ড, পৃ- ১৮৭, তাফসীরে নূরুল কোরআন ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ১৬১, তাফসীরে নঈমী ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ২৯৫।

 সূরা তাওবা পারা ১০, ৩২ নং আয়াতে নূরের ব্যাখ্যাঃ-

১। তাফসীরে দুররে মানসুর  ৩ খন্ড, পৃ- ২০১, ২। তাফসীরে কবীর ১৬ম খন্ড, পৃ- ৩৪, ৩। তাফসীরে রুহুল মায়ানী ১৪ম খন্ড, পৃ- ৪৮।

v        সুরা নূর পারা ১৮, আয়াত নং ৩৫ঃ-

১। তাফসীরে ইবনে আববাস ৪র্থ খন্ড, পৃ- ২৪, ২। তাফসীরে রুহুল মায়ানী ১০ম খন্ড, পৃ- ১৬৬।

v        সুরা আহযাব আয়াত নং ৪৬ঃ-

১। তাফসীরে আহকামুল কোরআন লিল ইবনুল আরাবী ৩য় খন্ড, পৃ- ১৫৪৬, ২। তাফসীরে মাওয়ারদী ৪র্থ খন্ড, পৃ- ৪১১।

 

প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শানে না‘ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবেশনকারী অন্যতম সাহাবী হযরত ক‘ব

বিন যোহাইর (রা)তাঁর নিম্নোক্ত কাসিদার মধ্যে প্রিয়নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নূরের নবী বলে সম্বোধন করেছেন।

ان الرسول لنوريستضاء به مهند من سيوف الله مسلول-

অর্থঃ নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূর, যা দ্বারা আলোকিত হওয়া যায়। তিনি আল্লাহর তরবারি সমূহের মাঝে ধারালো উজ্জ্বল তরবারি। (কাসিদা- ই- কা‘ব বিন যোহাইর (রা), মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক আলিম শ্রেণির সিলেবাসের অন্তরভুক্ত আরবী সাহিত্য বইয়ের ১৪৮ পৃষ্ঠা)।

 

হাদীস শরীফের আলোকেঃ

v       দলিল নং ১০ঃ-

عن جابر بن عبد الله رضى الله عنه قال : قلت يا رسول الله بابى انت وامى اخبرنى عن اول شئ خلق الله تعالى قبل الاشياء ؟ قال يا جابر ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نورنبيك من نوره فجعل ذالك النور يدور بالقدرة حيث شاء الله تعالى ولم يكن في ذالك الوقت لوح ولا قلم ولا جنة ولا ملك ولا سماء ولا ارض ولا شمس ولا قمر ولا جن ولا انس – فلما اراد الله تعالى ان يخلق الخلق قسم ذالك النور اربعة اجزاء فخلق من الجزء الاول القلم و من الثاني اللوح ومن الثالث العرش ثم قسم الجزء الربع اربعة اجزاء فخلق من الاول حملة العرش ومن الثانى الكرسى ومن الثالث باقى الملائكة ثم قسم الربع اربع اجزاء فخلق من الاول السماوات ومن الثانى الارضين ومن الثالث الجنة والنار—————————————– الخ-

 অর্থঃ হযরত জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবেদন করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার মা-বাবা আপনার কদম মোবারকে উৎসর্গিত, আপনি দয়া করে বলুন, সকল বস্ত্তর পূর্বে সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়া’লা কোন বস্ত্তটি সৃষ্টি করেছিলেন? নবীজী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়’লা সমস্ত কিছুর পূর্বে তোমার নবীর (তোমার) নূর মোবারক তাঁরই নূর মোবারক হতে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর ওই নূর আল্লাহ তায়’লারই মর্জি মুতাবেক তাঁরই কুদরতি শক্তিতে পরিভ্রমণ করতে লাগল। ওই সময় না ছিল বেহেশ্ত-দোযখ, আর ছিলনা আসমান-যমীন, চন্দ্র-সূর্য, মানব ও দানব। এক পর্যায়ে মহান আল্লাহ যখন সৃষ্টিজগত পয়দা করার মনস্থ করেছিলেন, প্রথমেই ওই নূর মোবারককে চারভাগে বিভক্ত করে প্রথম অংশ দিয়ে কলম, দ্বিতীয় অংশ দিয়ে লওহ, তৃতীয় অংশ দিয়ে আরশ, সৃষ্টি করে চুতুর্থাংশকে পুণরায় চারভাগে বিভক্ত করে প্রথমাংশ দিয়ে আরশবহনকারী ফেরেশতাদের দ্বিতীয় অংশ দ্বারা কুরসী, তৃতীয় অংশ দ্বারা অন্যান্য ফেরেশতাদের সৃষ্টি করে চুতুর্থাংশকে আবারও  চারভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগ দিয়ে সপ্ত আসমান, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে সপ্ত যমীন, তৃতীয় ভাগ দিয়ে বেহেশত-দোযখ এবং পরবর্তী ভাগ দিয়ে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সকল বস্ত্ত সৃষ্টি করে। (আল মাওয়াহিবুল লাদুনিয়া ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৭১)।

 

 

v       দলিল নং ১১ঃ-

عن كعب الخبار رضى الله عنه قال : لما الله ان يخلق المخلوقات بسط الارض وقع السماء وقبض قبصة من نوره و قال لها كونى محمدا فصارت عمودا من نوره فعلا حتى انتهى الى حجب العظمة فسجد و قال فى سجوده الحمد لله فقال الله سبحانه و تعالى لهذا خلقتك و سميتك محمد صلى الله عليه و سلم منك ابدا الخلق و بك اختم الرسل-

অর্থঃ হযরত কাব আহবার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ পাক রাববুল আলামিন যখন সৃষ্টি জগত সৃজন করার ইচ্ছা করলেন তখন মাটিকে সস্প্রসারিত করলেন, আকাশকে উঁচু করলেন এবং আপন নূও হতে এক মুষ্ঠি নূর গ্রহন করলেন। তারপর উক্ত নূরকে নির্দেশ দিলেন‘ তুমি মুহাম্ম্দ হয়ে যাও।’ অতএব সে নূও স্তম্ভের ন্যায় উপরের দিকে উঠতে থাকল এবং মহত্বের পর্দা পর্যন্ত পৈাছে সিজদায় পরে বলল,‘আলহামদুলিল্লাহ্’ তখন আল্লাহ্ পাকের পক্ষ থেকে ইরশাদ হল,এজন্যই তোমাকে সৃষ্টি করেছি আর তোমার নাম মুহাম্ম্দ রেখেছি। তোমার হতেই সৃষ্টি কাজ শুরু করব এবং তোমাতেই রিসালাতের ধারা সমাপ্ত করব ।  (সিরাতুল হালাভিয়া ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫০)।

 

 

v       দলিল নং ১২-

عن عائشة رضي الله عنها قالة : كنة في الشجر ثوبا لرسول الله صلي عليه و سلم فانطفا المصباح و سقطة الابرة من يدي فدخل علي رسول الله صلي الله عليه و سلم فاضاء من نور و جهه فجدة الابرة-

অর্থঃ ‘‘হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাত্রে বাতির আলোতে বসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাপড় মোবারক সেলাই করেছিলাম। এমন সময় প্রদীপটি (কোন কারণে) নিভে গেল এবং আমি সুচটি হারিয়ে ফেললাম। এরপরই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর চেহারা মোবারকের নূরের জ্যোতিতে আমার অন্ধকার ঘর আলোময় হয়ে গেল এবং আমি (ঐ আলোতেই) আমার হারানো সুচটি খুজে পেলাম’’। (ইমাম ইবনে হায়তামী (রাঃ) এর  আন-নে’মাতুল কোবরা আলার আলম গ্রন্থে ৪১ পৃষ্ঠা)।

 

 

v       দলিল নং ১৩-

اخرج ابن ابي عمر العدني فى مسنده عن ابن عباس ان قريشا كانت نورا بين يدي الله تعالى قبل ان يخلق ادم بالفى عام يسبح ذالك النور و تسبح الملائكة بتسيحه فلما خلق الله ادم القي ذالك النور فى صلب قال رسول الله صل اله عليه و سلم فاهبطنى الله الى الارض فى صلب ادم (عليه السلام) و جعلنى فى صلب نوح عليه السلام و ق           ف بى فى صلب ابرهيم عليه السلام ثم لم يزل الله ينقلبى من الصلاب الكريمة و الارحام الطاهؤة حتى اخرجنى من بين ابوى لم يلتقيا على سفاح قط-

 

অর্থঃ  হযরত ইবনে আলী ওমর আল-আদানী স্বীয় মুসনাদে হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত  আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করলেন, তখন তাঁকে তাঁর সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে মর্যাদার তারতম্যটুকুও দেখাতে লাগলেন। তিনি ( আদম আলাইহিস সালাম ) তাদের মধ্যে শেষপ্রান্তে একটা উজ্জ্বল নূর দেখাতে পেলেন। তখন তিনি বললেন,‘‘ হে রব! ইনি কে? ( যাকে সবার মধ্যে প্রজ্জ্বলিত নূর হিসাবে দেখতে পাচ্ছি?) উত্তরে মহান রববুল আলামীন ইরশাদ করলেন,‘‘ ইনি হলেন তোমার পুত্র-সন্তান হযরত আহমদ মুজ্তবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি প্রথম, তিনি শেষ, তিনি হবেন আমার দরবারে প্রথম সুপারিশকারী (ক্বিয়ামতের দিনে)। ( আল-খাসাইসুল কুবরা ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৯)

v       দলিল নং ১৪-

ইমাম হাফেজ  আবুল ফযল ক্বাযী আয়ায (রা) বলেন-

و قد سماه الله تعالى فى و سراجا منيرا فقال تعالي قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين و قال تعالى انا ارسلناك شاهدا و مبشيرا و نذيرا و داعيا الى الله باذنه و سراجا منيرا و قال فى غير هذا الموضع انه كان لاظل لشخصه في شمس و لا قمر لانه كان نورا الذباب كان لا يقع على جسده و لا ثيابه-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়া‘লা কোরআন করীমে তাঁর নাম রেখেছেন নূর ও সিরাজুম্ মুনীর। যেমন তিনি ফরমায়েছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের কাছে নূর ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। আরো ফরমায়াছেন, আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি হাজের ও নাজেররূপে, আল্লাহর অনুমক্রিমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপ (সিরাজুম মুনীর ) রূপে। নিশ্চয়ই তাঁর ছায়া ছিল না. না সূর্য়ালোকে না চন্দ্রালোকে কারণ তিনি ছিলেন নূর। তাঁর শরীল ও পোশাক মোবারকে মাছি বসত না। (শিফা শরীফ ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৪২)।

 

 

v       দলিল নং ১৫-

وعن ابلى هريرة رضى الله عنه ان رسول الله صلى الله عليه و سلم سائل جبريل عليه السلام فقال يا جبريل كم عمرك من السنين فقال يا رسول الله مست اعلم غير ان فى الحجاب الرابع نجما يطلع في سبعين الف سنة مرة رايته اثنين و سبعين الف مرة فقال يا جبريل و عزة ربى جل جلا له انا ذالك الكوب-

অর্থঃ হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন , রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা জিবা্রঈল আলায়হিস সালামকে জিজ্ঞেসা করলেন , ওহে জিব্রাঈল! তোমার বয়স কত? উত্তরে জিব্রাঈল বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো সঠিক জানি না। তবে এতটুকু বলতে পারি ( সৃষ্টি জগত সৃষ্টির পূর্বে) আল্লাহ তায়‘লা নূরানী আযমতের পর্দা সমূহের চতুর্খ পর্দায় একটি নূরানী তারকা সত্তর হাজার বছর পরপর উদিত হত। আমি আমার জীবনে সেই নূরানী তারকা বাহাত্তর হাজার বার উদিত হতে দেখেছি। অতঃপর নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লাম ইরশাদ  করলেন মহান রাববুল আলামীনের ইজ্জতের কসম করে বলছি, সেই অত্যুজ্জ্বল নূরানী তারকা আমিই ছিলাম। (সীরাতে হালাভীয়া পৃষ্ঠা ৪৯, তাফসীরে রুহুল বয়ান পৃষ্ঠা ৫৪৩)।

 

 

v       দলিল নং ১৬-

لم يكن له صلى الله عليه و سلم ظل في شمس و لا قمر لانه كان نورا-

অর্থঃ ‘‘সূর্য চন্দ্রের আলোতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেহ মোবারকের ছায়া পড়তোনা। কেননা, তিনি ছিলেন আপদমস্তক নূর’’।                                                                                          (যুরকানী শরীফ ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ২২০)।

 

এ ছাড়া আরো অনেক হাদীস শরীফ গ্রÖ্রন্থর মধ্যে আছে যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নূর তা নিম্নরূপঃ-

১। মিশকাত শরীফ পৃষ্ঠা ৫১৩, ২৪ এর ১০নং হাশিয়া, ৫১১ এর ৬নং হাশিয়া,   তিরমিজি শরীফ ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৭, মাওয়াহিবে লাদুনিয়া পৃষ্ঠা ৪৫,শরহে সুন্নাহ ১০ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২০৭, মিরকাত ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৪৬,১৬৬,১৯৪। তিরমিজি শরীফ ২য় খন্ড, প- ৩৭, মাজমুওয়ায়ে ফাতাওয়ার ২য় খন্ড, পৃ- ২৮৬, ১৮। নশরুততীব পৃ- ৫, কৃতঃ আশরাফ আলী থানবী, ১৯। এমদাদুছ ছুলূক পৃষ্ঠা  কৃতঃ রশিদ আহমেদ গাংগুহী । ২০। শুকরে নিয়ামত কৃতঃ কাসেম নানুতুবী, গাওহারে সিরাজী পৃষ্ঠা ৬৯, কৃতঃ সিরাজুল ইসলাম।

 

লেখক পরিচিতিঃ এম.এফ. কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া (কামিল) মাদরাসা। বি.এ. অনার্স : ইসলামিক ষ্টাডিজ বিভাগ, সরকারী তিতুমীর কলেজ, ঢাকা। জাতীয় যুব উন্নয়ন থেকে গ্রাজুয়েট ডিপে­ামা ইন সায়ন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (জি.ডি.সি.এস.ই) ডিগ্রি অর্জন, সহ-সভাপতি : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, ঢাকা মহানগর। সেক্রেটারী : ছাত্র সংসদ, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া (কামিল) মাদরাসা। মহাসচিব : আ’লা হযরত কালচারাল ফোরাম, ঢাকা। চেয়ারম্যান : দরসে নিজামী এইড একাডেমী, ঢাকা। সভাপতি : আল মুস্তফা সুন্নী ছাত্র সংসদ, ভৈরব।

 

সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত

 

জামেয়া কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া (কামিল) মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা রাহ্নুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরীকত মুরশিদ-এ বরহক আওলাদে রাসূল গাউসে যমান হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী

 সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্

(রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত

(একটি সংকলন স্মারক)

[পবিত্র ওরশ শরীফ উপলক্ষে প্রকাশিত]

 

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله ولى الصالحين ولا عدوان الا على الظالمين والصلوة والسلام على رحمة للعالمين وعلى اله واصحابه و ائمته المسلمين-

 

যে সব মহান ওলীর বরকতময় জন্ম থেকে ওফাতের পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত সময়ে অসাধারণ বেলায়তী শক্তিই প্রকাশ পেয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরীকত, পীর-ই কামিল, মুর্শিদে বরহক হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:)। মাত্র ৭৭ বছর (১৩৩৬-১৪১৩ হিজরী/১৯১৬-১৯৯৩ইং)-এর বরকতপূর্ণ জীবদ্দশায় তিনি যেসব অবদান রেখে গেছেন তা একমাত্র অসাধারণ বেলায়তী শক্তির অধিকারী ওলী-ই কামিলের পক্ষেই সম্ভব তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

পূর্বাভাস

তিনি ‘মাদারজাত’ ওলী ছিলেন; অর্থাৎ ওলী হয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর দাদাপীর মা’আরিফে-ই লাদুন্নীয়ার প্রস্রবিণ, উলূম-ই-ইলাহিয়্যার ধারক হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রা:) হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর জন্মের পূর্বে একদিন তাঁর প্রধান খলিফা হুযূর ক্বেবলা হযরাতুল আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) এর শাহাদত আঙ্গুলী নিজের পীঠে নিয়ে ঘর্ষণ করতে করতে বললেন- ‘‘ইয়ে পাক চীয্ তুম লে লো!’’ (এ পবিত্র জিনিস তুমি নিয়ে নাও!) এরই ফলশ্রুতিতে ও বরকতে হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) শুভ জন্ম গ্রহণ করেন হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:)-র পবিত্র ঔরসে।

 

শুভ জন্ম

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৪০তম নূরানী বংশধর, হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রা:) পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার শেতালু শরীফের প্রখ্যাত ওলী-ই কামেল হযরাতুল আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্্ সিরিকোটি (রা:)-এর ঔরসে এবং নবী বংশের এক গৌরবময়ী রত্নগর্ভা মহিলা সাইয়্যেদা বেগম (রা:)-এর পবিত্র গর্ভে হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রা:) শুভ জন্ম গ্রহণ করেন।

 

আলে রাসূল আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর বংশগত ধারা

হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৪০তম নূরানী বংশধর। সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন (রা:) তাঁর পূর্ব পুরুষ। হযরত ইমাম হুসাইন (রা:) এর বংশধরগণ যুগে যুগে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েন। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ গীসুদারাজ (রা:) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদের আউস নগরী থেকে আফগানিস্তান সফর করেন এবং তিনি ৪২১ হিজরীতে আফগানিস্তানের কোহ্্-ই সোলাইমানী নামক স্থানে ওফাত ও দাঁফন হন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র মশহুর অলিয়ে কামেল হযরত সৈয়্যদ মাসুদ মাশওয়ানী (রা:) এর বংশধর হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ গফুর শাহ্্ ওরফে আল-মারূফ কাপুর শাহ্্ (রা:) পরবর্তী সময়ে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে পুণরায় আফগানিস্তান ছেড়ে হুজুর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:)’র বর্তমান জন্মস্থান সিরিকোট শরীফের সুউচ্ছ পাহাড় শীর্ষে সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করেন এবং দ্বীন প্রচার শুরু করেন। তাই হযরত গফুর শাহ্্ ওরফে কাপুর শাহ্্ ফাতেহ্ সিরিকোট বা সিরিকোট বিজয়ী হিসেবেও পরিচিত।

(LOCAL GOVT. ACT. 33 REF – 15, HAJARA 1871.)

উল্লেখ্য ফাতেহ্ সিরিকোট সৈয়্যদ গফুর শাহ্্ (রা:)’র একজন খ্যাতনামা বুজুর্গ বংশধর হযরত সৈয়্যদ খানী জামান শাহ্্ (রা:) এবং তাঁরই সুযোগ্য সাহেবজাদা সৈয়্যদ সদর শাহ্্ (রা:) এবং সৈয়্যদ সদর শাহ্্’র সুযোগ্য সাহেবজাদা শাহেনশাহে সিরিকোট গাউছে যামান সৈয়্যদ আহমদ শাহ্্ সিরিকোটী (রা:)।

(হালাতে মাশওয়ানী, পৃষ্ঠা : ১০০, ১০২, ১০৬, ১১৩, ১১৭, ১২১, ১২২, মুহাম্মদী স্টীম প্রেস; লাহোর, পাকিস্থান, ১৯৩১ ইংরেজী)

আর শাহেনশাহে সিরিকোট আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্্ (রা:)-এর সাহেবজাদা ছিলেন আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রা:)।

নিম্নে ওলীয়ে কামেল রাহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরীকত হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রা:)-এর বংশগত শাজরাহ পেশ করা হলঃ

১। হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

২। হযরত ফাতেমাতুজ্জুহরা জাওজায়ে হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৩। হযরত ইমাম হোসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৪। হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৫। হযরত ইমাম বাক্বের (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৬। হযরত ইমাম মুহাম্মদ জাফর সাদেক্ব (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৭। হযরত সৈয়্যদ ইসমাঈল (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৮। হযরত সৈয়্যদ জালাল (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৯। হযরত সৈয়্যদ শাহ্্ ক্বায়েম (কায়েন) রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু

১০। হযরত সৈয়্যদ জাফর (কা’ব) (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১১। হযরত সৈয়্যদ ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১২। হযরত সৈয়্যদ গফ্ফার (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১৩। হযরত সৈয়্যদ গীসুদারাজ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) (৪২১ হি:)

১৪। হযরত সৈয়্যদ মাসুদ মাসওয়ানী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১৫। হযরত সৈয়্যদ তাগাম্মুজ শাহ্্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১৬। হযরত সৈয়্যদ ছুদুর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১৭। হযরত সৈয়্যদ মুছা (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১৮। হযরত সৈয়্যদ মাহ্মুদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

১৯। হযরত সৈয়্যদ আবদুর্ রহীম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২০। হযরত সৈয়্যদ আবদুল গফুর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২১। হযরত সৈয়্যদ আবদুল জালাল (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২২। হযরত সৈয়্যদ আবদুর রউফ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২৩। হযরত সৈয়্যদ আবদুল করিম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২৪। হযরত সৈয়্যদ আবদুল্লাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২৫। হযরত সৈয়্যদ গফুর শাহ্ (আল মারূফ কাপুর শাহ্্) রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

২৬। হযরত সৈয়্যদ নফ্ফাস শাহ্্ বা তাফাহ্হুছ শাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

২৭। হযরত সৈয়্যদ আবী শাহ্্ মুরাদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২৮। হযরত সৈয়্যদ ইউসুফ শাহ্্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

২৯। হযরত সৈয়্যদ হোসাইন শাহ্্ (হোসাইন খিল্) রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু

৩০। হযরত সৈয়্যদ হাজী হাসিম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩১। হযরত সৈয়্যদ আবদুল করীম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩২। হযরত সৈয়্যদ ঈসা (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৩। হযরত সৈয়্যদ ইল্য়াছ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৪। হযরত সৈয়্যদ খোশ্হাল (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৫। হযরত সৈয়্যদ শাহ্্ খাঁন (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৬। হযরত সৈয়্যদ কাজেম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৭। হযরত সৈয়্যদ খানী যামান শাহ্্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৮। হযরত সৈয়্যদ ছদর শাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

৩৯। হযরত মাওলানা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্্ ছিরিকোটি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৪০। হযরত মাওলানা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

 

শৈশবের অলৌকিক পথচলা

কোরআনে কারীমে উল্লিখিত ‘মারাজাল বাহ্রায়ন’ আয়াতাংশটি বহু তাৎপর্যপূর্ণ। সহজ অর্থে, দুই সমুদ্রের মিলনস্থল, যেখানে অতি মূল্যবান মণি-মুক্তার জন্ম উৎস। নবীবংশের মাসওয়ানী স্রোতধারা অধিকন্তু খাজা চৌহরভীর মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়ার প্রস্রবণের সমন্বয় যেখানে সাধিত হয়েছে, সেখানে গাউসে যামান তৈয়্যব শাহ্্ (রা:)-এর মত মাতৃগর্ভের ওলীর জন্মই স্বাভাবিক। এর সাক্ষী পাওয়া যায় তাঁর শৈশবের অলৌকিক আচরণে। জন্মের পর থেকে এরূপ অসংখ্য আচরণের মধ্যে অন্যতম হল :

 

এক.

ছয়-সাত মাসের শিশু তৈয়্যব শাহ্কে প্রচলিত ঐতিহ্য অনুসারে শিরনী খাওয়ানোর জন্য এসেছিলেন খলীফায়ে শাহ জিলান খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রা:)। তিনি স্বাভাবিক নিয়মে বাচ্চার মুখে শিরনী বা ক্ষির তুলে না দিয়ে বললেন, ‘‘তৈয়্যব তুম নেহী খাতে তো হাম ভী নেহী খায়েঙ্গে’’। সঙ্গে সঙ্গে মাদার্জাত ওলী শিশু তৈয়্যব শাহ্্ (রা:) উত্তপ্ত শিরনীর বাটিতে হাত ঢুকিয়ে নিজে নিজে খাওয়া শুরু করে দিলেন। এ ঘটনা দেখে হতচকিত হয়ে যান উপস্থিত সকলে। যদিও বুঝতে বাকি ছিলনা, এ শিশু অন্য শিশুদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অলৌকিক যোগ্যতা সম্পন্ন।

 

দুই.

দু’বছর বয়সে আম্মাজানের কোলে দুধ পান করার জন্য ছটফট করছিলেন খাজা চৌহরভী (রা:)’র দরবারে। চৌহরভী (রা:) বললেন, ‘‘তৈয়্যব তুম বড়া হো গেয়া, দুধ মাত পিও’’। সাথে সাথে দুগ্ধ পোষ্য শিশু তৈয়্যব শান্ত হয়ে গেলেন এবং সেদিন থেকে আর কোন দিন নিজে দুধ পানের জন্য বিরক্ত করা তো দূরের কথা বরং আম্মাজান চেষ্টা করেও দুধ পান করাতে পারেননি। তিনি বলতেন, ‘‘বাজি নে মানা কিয়া, দুধ নেহী পিউঙ্গা।’’

 

তিন.

চার-পাঁচ বছরের শিশু তৈয়্যব তাঁর আববা শাহা্নশাহে সিরিকোটিকে বললেন, ‘‘বাজ্বী! নামায মে আপ আল্লাহ্ কো দেখতে হ্যাঁয়, মুঝেহ ভী দেখনা হ্যায়’’ এ ছোট্ট বাচ্চার উপলব্ধিতে আল্লাহ্র শোকরিয়া আদায় করে দু’হাত তুলে মুনাজাত করলেন হযরত সিরিকোটি (রা:)।

 

শৈশবে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা তাঁর জন্মগত বেলায়তের সাক্ষী হয়ে আছে, যা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। হযরত সিরিকোটি (রা:) তাঁর এ সাহেবজাদা সম্পর্কে সব সময় বলতেন, ‘‘তৈয়্যব মাদারজাত ওলী হ্যায়, উসকা মকাম বহু উচা হ্যায়।’’ আরো বলতেন, ‘‘একমাত্র গর্ভধারিনী আম্মাজানই তাঁর আধ্যাতিক অবস্থা সম্পর্কে ভাল জানেন।’’

 

শিক্ষা জীবন

তিনি স্বীয় ওয়ালেদে মুহ্তারাম আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) এর সান্নিধ্যে থেকে ১৯২৭ সালে এগার বছর বয়সে কুরআন শরীফ হেফ্জ সমাপ্ত করেন। ইলমে ক্বেরাতেও বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। অতঃপর সুদীর্ঘ ১৬ বৎসর সম্মানিত আববাজানের প্রত্যক্ষ তত্তাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাফসীর, হাদিস, ফিকহ্, উসূল, নাহু, সরফ, মানতিক্ব, আকাঈদ, দর্শন, হিকমত, আরবী, উর্দু, সাহিত্য, তাসাউফ, মারিফত, ত্বরীকত এক কথায় জ্ঞানের বিভিন্ন সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়ে অসাধারণ পান্ডিত্য অর্জন করেন।

 

তাফ্সির ও হাদিসশাস্ত্রের দক্ষতা অর্জন

আল-কুরআনের তত্ত্ব বিশ্লেষণ, তাৎপর্য অনুধাবন, মর্ম উদঘাটন ও অনাবৃত গুপ্ত রহস্যাবলী উন্মোচনের প্রয়াসে তিনি তাফ্সীর ও হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন এবং তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমেদ্বীন প্রখ্যাত তাফসীরকারক ও হাদিসবেত্তা আল্লামা সরদার আহমদ খাঁ লায়লপুরী (রা:) মমতাজুল মোহাদ্দেসীন (লায়লপুর) এর সান্নিধ্যে থেকে তাফসীর ও হাদিস শাস্ত্রে গভীর প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য অর্জন করেন। ২৭/২৮ বছর বয়সে ১৯৪৩/৪৪ এর দিকে সফল কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করেন।

 

অনূসৃত পথ

তিনি ছিলেন ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রকৃত অনুসারী সুন্নী মতাদর্শের একনিষ্ঠ প্রচারক, জন্মগত সিরিকোটি, মাযহাবগত হানাফী, ত্বরীকাগত ক্বাদেরী।

 

স্বভাব-চরিত্র

বাল্যকাল থেকে তিনি ছিলেন নির্মল অনিন্দ সুন্দর অনুপম চরিত্রের অধিকারী। ইসলামী আদর্শে আদর্শবান। তাঁর জীবন ছিল সুন্নাতে রাসূলের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কথা-বার্তা, আচার-আচরণ, চাল-চলন, নৈতিকতা, মানবতা, উদারতা, বদান্যতা, দানশীলতা, আতিথেয়তা, ন্যায়ের পথে দৃঢ়তা, স্থিরতা, পারস্পরিক হৃদ্যতা, সহনশীলতা, সার্বিকভাবে তিনি ছিলেন আদর্শ স্থানীয়, সর্বোপরী সদালাপী, মিষ্টভাষী, মিতব্যয়ী, সত্যবাদী ও ন্যায়ের মূর্তপ্রতীক। অন্যায়, অসত্য, শঠতা, কপটতা, অত্যাচার, পাপাচার, মিথ্যাচার, স্বজনপ্রীতি, তোষামোদ ইত্যাকার অসৎ গুণাবলী ছিল তাঁর নীতি ও স্বভাব বিরুদ্ধ। এক্ষেত্রে নবী-রাসূল, সাহাবা, ওলী ও পূণ্যাত্ম বান্দাগণের পদাঙ্ক অনুসরণ, আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

 

 

বায়আত গ্রহণ

ইল্মে শরীয়তের প্রতিটি শাখায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেও জ্ঞান সাধক পরিতৃপ্ত হননি, ইল্মে ত্বরীকতও মারেফত অর্জনের প্রত্যাশায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। জাহেরী জ্ঞান ও বাতেনী জ্ঞানের পরশে পূর্ণতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হন।

ইল্ম-এ-বাতেন, হামচুঁ মাছক আস্ত

ইল্ম-এ-জাহের, হামচুঁ মাছক শীর

মছক কায়ে বে-শীর গরদদ

কায় বুয়দ বে-পীর পীর!

অর্থাৎ বাতেনী ইলম মাখন সাদৃশ্য জাহেরী ইলম দুগ্ধতুল্য। দুধ ছাড়া মাখন কিরূপে হবে?  আর পীর মোর্শিদ হতে শিক্ষাপ্রাপ্ত না হয়ে কিরূপে পীর হতে পারে? আধ্যাতিক পূর্ণতা সাধনের নিমিত্তে কামিল ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। হুজুর ক্বেবলা (রা:) একজন কামেল পীরের ব্রতী হন। পরিশেষে এ বিচক্ষণ দূরদর্শী সত্যান্বেষী ব্যক্তির কাছে তাঁর ওয়ালেদে মুহ্তারামের সঠিক গুণাবলী স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় এবং বেলায়েতে ওজমার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত আধ্যাতিক সাধক পুরুষ, কুত্বুল আউলিয়া হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:)’র বেলায়ত তাঁর কাছে গোপন থাকেনি। সন্তানের সাধ পূর্ণ হলো। ওয়ালেদে মুহতারামের হাতে বায়আত গ্রহণ করলো।

 

খিলাফত অর্জন

ইল্মে শরীয়ত অর্জনের পাশাপাশি ত্বরীকতের দীক্ষা অর্জন করেন। ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-আয্কার, মোরাকাবা-মোশাহাদা, রিয়াযতের মাধ্যমে সূলূক ও ত্বরীকতের সূধা পানে পরিতৃপ্ত হন।

স্বীয় বুজুর্গ পিতার সাথে ১৯৫৮ সালে ৪২ বছর বয়সে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্থান (বর্তমান বাংলাদেশ) তাশরীফ আনলে চট্টগ্রাম অবস্থানকালে হযরাতে মাশায়েখে কেরামদের ইঙ্গিতে স্বীয় পিতা কর্তৃক সিরিকোট দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন নিযুক্ত হন। এবং কুত্বুল আউলিয়া হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) তাকে ‘খলীফায়ে আজম’ উপাধিতে ভূষিত করে সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার জাঁনশীনরূপে যোগ্যতম স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্বভার অর্পণ করেন। শরীয়ত ও ত্বরীকতের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দানে অর্পিত দায়িত্বাবলী পূর্ণ নিষ্ঠা ও সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন এবং ত্বরীকতের বিভিন্ন স্তর সাফল্যের সাথে অতিক্রম করে বেলায়তে ওজমা ও গাউসে যমানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন।

 

বাংলাদেশে আগমন

এ আধ্যাতিক সাধক যদিও পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তথাপি তাঁর দ্বীন প্রচার, সমাজ সংস্কার ও শরীয়ত ত্বরীকতের বহুবিধ কর্মকান্ড কেবল তার মাতৃভূমি স্বদেশে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের তত্ত্বাবধানে ইসলামের সঠিক রূপরেখা সুন্নী মতাদর্শের প্রচার-প্রসারে জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কষ্টসাধ্য সফরের মাধ্যমে দিশেহারা মানবগোষ্ঠীকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। ১৯৪২ সনে ২৬ বৎসর বয়সে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে শুভাগমন করেন। এ বৎসরই আন্দরকিল্লা শাহী্ জামে মসজিদে খত্মে তারাবীর নামাজে তাঁরই ইমামতিতে বিপুল সংখ্যক মুসল্লীরা খত্মে কুরআন শুনার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তাঁর সূললিত কন্ঠে পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত শুনে মুসল্লিরা পুলকিত ও মুগ্ধ হন। ১৯৫৮ সালে ৪২ বছর বয়সে তাঁর পিতার সাথে চট্টগ্রাম আগমন এবং ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সাহেবের বাসায় অবস্থান করেন। তাঁর ৪৫ বছর বয়সে স্বীয় বুজুর্গ পিতা ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওয়ালেদে মুহ্তারামের ওফাতের পর ১৯৬১ হতে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রত্যেক বছরই বাংলাদেশে (তৎকালীন পাকিস্তান) তাশরীফ এনেছিলেন এবং পরবর্তী ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই এদেশে শুভাগমন করেন। ১৯৮৬ সাল ছিল বাংলাদেশের শেষ সফর। ১৯৮৬ সাল হতে ১৯৯৩ সালের ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত চিঠিপত্র ও টেলিফোনের মাধ্যমে দেশ বিদেশে ভক্ত অনুরক্ত ও তাঁর পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ও সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে শরীয়ত ও তরীক্বতের বৃহত্তম খেদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।

১৯৬১ হতে ১৯৯৩ সাল অর্থাৎ হিজরী ১৩৮০ হতে ১৪১৩ পর্যন্ত সুদীর্ঘ তেত্রিশ বছর ব্যাপী মাযহাব, মিল্লাত, শরীয়ত, ত্বরীকত তথা সুন্নিয়তের সার্বিক খেদমত আঞ্জাম দানে যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, সুন্নিয়তের ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। এদেশে শুভাগমন করে তিনি এ দেশবাসীকে ধন্য করেছেন। এ দেশের মুসলিম জনতাকে সুন্নীয়তের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছেন। অগণিত আলেম-ওলামা, মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, আইনজিবী, বুদ্ধিজিবী, পেশাজিবী, শ্রমজিবী, কৃষিজীবি, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের নর-নারী মুসলিম জনতা তাঁর সান্নিধ্যে এসে সিরাতুল মুস্তাক্বিমের সন্ধান পেয়েছেন। এদেশে সফরকালে অসংখ্য অমুসলিম নর-নারী পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে এসে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি অর্জনের সৌভাগ্য লাভে ধন্য হয়েছেন।

 

দ্বীনের পূনরুজ্জীবনে আল্লামা তৈয়্যব শাহ্্ (রা:)

গাউছে দাওরাঁ খাজা-এ খাজে-গা খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রা:), পেশোয়ায়ে আহলে সুন্নাত সুলতানুল আউলিয়া হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) এবং মহিয়সী আম্মাজান  সৈয়্যদা খাতূনের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই মাতৃগর্ভের ওলী গাউছে যামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রা:) ছিলেন চলতি হিজরি শতাব্দীর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সংস্কারক ব্যক্তিত্ব। একদিকে তাঁর যুগোপযোগী এবং কালোত্তীর্ণ কর্মসূচী, অপরদিকে অসীম আধ্যাতিক ও অলৌকিক শক্তি। সর্বোপরি দ্বীনের জন্য নিরলস শ্রম ও নিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের অসংখ্য মানুষ ইসলামের মূলধারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সঠিক আক্বীদা ও আমল এবং একই সাথে সিলসিলাহ্-এ আলিয়া কাদেরিয়ার মত বিশ্বজনীন এক ত্বরীকার সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পেরেছে। তাঁর মুখের একেকটি বাণী যেন বুলেটের চেয়েও দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল। তাঁর একেকটি নির্দেশনা সর্বস্তরের মুসলমানদের মধ্যে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করত বিধায় তাঁর নির্দেশনায় আজ বাংলাদেশে ‘জশ্নে জুলূস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এক জনপ্রিয় ঐতিহ্যে উপনীত হয়েছে। আজ ঘরে ঘরে চলছে খতমে গাউসিয়া ও মিলাদ শরীফ। দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা। তাঁর নীতি এবং নির্দেশ ছিল, ‘‘কাম করো, দ্বীনকো বাচাঁও, ইসলামকো বাঁচাও, সাচ্চা আলেম তৈয়ার করো’’ (কাজ কর, দ্বীনকে বাঁচাও, ইসলামকে বাঁচাও, সত্যিকারের আলেম বানাও)। তিনি আঞ্জুমান-জামেয়াকে বারবার তাগিদ দিয়েছেন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের প্রতি। চতুর্দশ শতাব্দির মহান মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (রা:)’র সাথে আজ এ দেশবাসীর যে আদর্শিক সম্পর্ক ঘটেছে এর পেছনে সর্বোচ্চ অবদান রয়েছে তাঁরই। দেশের গ্রামে-গঞ্জে তাঁর শুভাগমনে অনুষ্ঠিত মাহফিলগুলোতে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত ছুটে আসতো মানুষ। আর মাহফিল থেকে ফিরে যেত দ্বীনি খিদমতের শপথ নিয়ে এবং সিলসিলাহ্র মুরীদ হয়ে।

তিনি ত্বরীকতের ভাগাভাগি এবং অপরের সমালোচনা করাকে ঘৃণা করতেন প্রচন্ডভাবে-মনেপ্রাণে। তাই সকল ত্বরীকতপন্থীদের নিয়ে দ্বীন তথা সুন্নীয়ত রক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়াও তাঁর মহান খেদমতের কিয়দাংশ হলো-

 

১। দ্বীনি আদর্শ প্রতিষ্ঠা :

প্রকৃত অর্থে শরীয়ত ও ত্বরীকতের সমন্বয়ই সঠিক দ্বীন। কেউ  শুধু শরীয়তের চর্চা করলো অথচ ত্বরীকত তথা আধ্যাত্মিক জগতকে অস্বীকার করল, তবে তিনি দ্বীনের বাহ্যিক অংগেই রঙ লাগিয়েছেন মাত্র। আবার কেউ শুধুমাত্র ত্বরীকত-মা’রেফাত চর্চা করেন অথচ শরীয়ত উপেক্ষা করেন। তিনিও দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংগ বাদ দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ দ্বীন একটি জীবিত দেহ যেখানে শরীয়ত হচ্ছে শরীর এবং রূহ হচ্ছে আধ্যাত্মিক অংগ বা ‘রূহানিয়্যত’। তিনিই প্রকৃত দ্বীনের সেবক যিনি শরীয়ত এবং ত্বরীকত উভয়ের উন্নয়নের সেবায় নিয়োজিত।

আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) ছিলেন প্রিয় নবী সরকারে দো’আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মহান আদর্শ তথা শরীয়ত ও মা’রেফাতের অন্যতম প্রতিনিধি। তাঁর ছোঁয়ায় শরীয়তের বাগান যেমন প্রস্ফুটিত হয়েছে তেমনি বিস্তৃত হয়েছে ত্বরীকতের ময়দান। আবার শরীয়ত এবং ত্বরীকতেরও রয়েছে দু’টি অলংঘনীয় উপাদান। আক্বীদা ও আমল। যার আক্বীদা বিশুদ্ধ নয় তার ঈমান নেই। ফলে তার আমলেরও কোন গুরুত্ব নেই। আবার আক্বীদা শুদ্ধ কিন্তু প্রয়োজনীয় আমল নেই সেও দুর্বল মু’মিন মাত্র।

সুতরাং আক্বীদার ক্ষেত্রে সুন্নী দর্শনের প্রচার-প্রসার এবং সমসাময়িক বাতিল মতবাদ সমূহের খন্ডনই প্রকৃত দ্বীনি খেদ্মত। গাউসে পাক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শও তাই। আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:) ছিলেন এ আদর্শেরই শতাব্দির শ্রেষ্ঠ মহা পুরুষ। তাই আজ এদেশের প্রায় সকল ওলামা-মাশায়েখ এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, সে সময়ে হুজুর ক্বেবলার আগমন না ঘটলে সুন্নী মুসলমানদের অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি প্রেম-ভালবাসাই খোদা প্রাপ্তির পূর্বশর্ত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেমই ঈমানের মূল। এ সত্যটি সহিহ হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। হুজুর ক্বেবলা এ হাদিস শরীফটি প্রায় বলতেন- ‘‘আ’লা লা ঈমানা লিমান লা মুহাববাতা লাহু’’ অর্থাৎ- সাবধান! তাঁর প্রতি যার ভালবাসা নেই তার ঈমানও নেই। তাই আশেকগণ বলেছেন- ‘‘দ্বীনে মা এশকে মুহাম্মদ, হুবেব ঊ ঈমানে মা’’ অর্থাৎ- আমার দ্বীন হলো নবীজির ভালবাসা, আমাদের ঈমান হলো তাঁর প্রতি প্রেম।

আল্লামা রূমী বলেন- ‘‘মগজে কোরঅাঁ রূহে ঈমাঁ জান দ্বীন হাস্ত হুবেব রাহমাতুল্লিল আলামীন’’ অর্থাৎ- কোরআনের মগজ, ঈমানের রূহ এবং দ্বীন ইসলামের প্রাণ হচ্ছে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র প্রেম ভালবাসাই।

হুজুর ক্বেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:)’র সমগ্র জীবনটাই ছিল মানুষকে নবী প্রেমে উজ্জীবিত করার প্রয়াস। আর এ কারণেই তিনি তাঁর প্রতিটি হৃদয়গ্রাহী সারগর্ভ ভাষণে ড: ইকবালের একটি কাসিদা সবসময় উদ্ধৃত করতেন সেটি হল-

‘‘কী মুহাম্মদ সে ওয়াফা তূনে তু হাম তেরে হ্যাঁয়

ইয়ে জাহাঁ চীয হ্যায় কেয়া লওহ ও কলম তেরে হ্যাঁয়।’’

যা নজরুলের ভাষায়-

‘‘আল্লাহকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালবেসে

আরশ কুরসী লওহ কলম না চাইতে পেয়েছে সে।’’

নবী প্রেমিক মুসলমান বানানোর জন্যই হুজুর ক্বেবলা ইসলামী সংস্কৃতিতে না’ত-এ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাপক সংযোজন বিশেষত আ’লা হযরত ইমাম আহমত রেযা খান বেরলভী (রা:) এর সংস্কার সমূহের সংযোজন ঘটিয়েছেন।

 

২। খানক্বাহ্ প্রতিষ্ঠা :

ত্বরীকতের প্রসারের জন্য হুযূর ক্বেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:) ষোলশহর জামেয়ার পাশে সুবিশাল পরিসরে ‘আলমগীর খানক্বাহ শরীফ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে ত্বরীকতের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচ্য। হুযূর ক্বেবলার বর্তমান সুযোগ্য উত্তরসূরী ও প্রধান খলিফা হযরাতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মা:আ:) বাংলাদেশে তাশরীফ আনলে এখানেই অবস্থান করেন এবং শরীয়ত ও ত্বরীকতের বরকতময় কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। আলমগীর খানক্বাহ শরীফ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত হুযূর ক্বেবলার দীর্ঘদিনের বরকত ধন্য বলুয়ারদীঘি পাড়স্থ খানক্বাহ শরীফ, ঢাকার কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন খানক্বাহ শরীফ ও কায়েৎটুলী খানক্বাহ শরীফ এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। এতদ্ব্যতীত দেশ-বিদেশে, যেখানে ত্বরীকায়ে ক্বাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার সাথে সম্পৃক্তরা রয়েছেন- সেখানেই খানক্বাহ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং ত্বরীকত তথা দ্বীন ও মাযহাবের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

 

৩। দ্বীনি শিক্ষায় অবদান :

হুজুর ক্বেবলার দ্বীনি খেদ্মতের যে দিকটি সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য সেটি হল দ্বীনি শিক্ষার প্রসারতা। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে বছরে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য তিনি বাংলাদেশে সফর করতেন। এ অল্প সময়ে এদেশে এতবেশী মাদ্রাসা ও খানক্বাহ্ শরীফ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হওয়া এত সহজ কথা নয়।

আজ বাংলাদেশে হুজুর ক্বেবলার অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার সংখ্যা অর্ধশত-এর অধিক। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের দ্বীনি শিক্ষার ব্যাপক চাহিদা পূরণ করছে নিঃসন্দেহে। বিশেষত এসব প্রতিষ্ঠান সুন্নী মুসলমানদের আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হচ্ছে। শাহেন শাহে সিরিকোট (রা:) এদেশের সুন্নী মতাদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামের ষোলশহরস্থ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তা মূলত হুজুর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর তত্ত্বাবধানেই আজ সুন্নীয়তের প্রাণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হুজুর ক্বেবলা ১৯৬১ সালে এ মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ড থেকে ফাজিল এবং ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে কামিল হাদিস এবং ১৯৮৫ সালে কামিল ফিক্হ’র অনুমোদন নিতে সক্ষম হন। আজ এখানে কামিল তাফ্সির বিভাগও চালু আছে।

হুজুর ক্বেবলা দেখলেন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে সুন্নী মুসলমাদের দ্বীনি শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। তাই ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ঢাকা মুহাম্মদপুরস্থ কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা। বলা বাহুল্য রাজধানীতে এটিই সুন্নীদের দ্বীনি শিক্ষার একমাত্র উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রামের হালিশহরে প্রতিষ্ঠা করেন তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা। এছাড়াও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চৌদ্দগ্রাম, চাঁদপুর, ফেনী, সিলেট, কক্সবাজার, মহেশখালী, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হুজুর ক্বেবলার অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছে অর্ধশত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব মাদ্রাসা হতে শিক্ষা জীবন সমাপ্তকারীরা আজ সমগ্র দেশে এমনকি বহির্বিশ্বে পর্যন্ত শরীয়ত-ত্বরীকতের এক গুরুত্বপূর্ণ খেদ্মত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষত চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া ও কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়ার ছাত্রদের অনেকেই আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারী কলেজসমূহে শিক্ষকতা করছেন। বিশ্বের প্রাচীনতম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মিশরের জামেয়া আল আযহার-এ সরকারের বৃত্তি নিয়ে অত্যন্ত প্রশংসার সাথে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় রত আছেন। সুতরাং এদেশের দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে যে বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে তা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর বিশেষ অবদান।

শুধু বাংলাদেশে নয় স্বদেশে হরিপুর রহ্মানিয়া মাদ্রাসাকে তিনি এক খ্যাতনামা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। এ মাদ্রাসায় বর্তমানে বাংলাদেশের ছাত্ররাও দ্বীনি শিক্ষা হাসিল করছেন। সিরিকোট শরীফ সহ করাচিতে রয়েছে আরো দুটি তৈয়্যেবিয়া মাদ্রাসা সহ অন্যান্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান।

হুজুর ক্বেবলা মায়ানমারের রেঙ্গুণে মাদ্রাসা-এ আলিয়া আহলে সুন্নাত প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার কমিউনিস্ট শাসিত অঞ্চলকেও দ্বীনি শিক্ষার আলোকে আলোকিত করতে প্রয়াস পান।

শুধু তাই নয়, হুজুর ক্বেবলা যখন যে দেশে সফর করতেন সেখানকার অনুসারীদের মাদ্রাসা কায়েমের জন্য নসীহত করতেন। তিনি আজমীর শরীফের খাদেম ও মুরিদানদেরও সেখানে গরীবে নেওয়াজের আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মাদ্রাসা কায়েমের পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে মাদ্রাসার কাজ কতটুকু এগিয়েছে খবরা-খবর নিতেন।

প্রকৃত অর্থেই হুজুর ক্বেবলা আমাদের প্রচলিত ধ্যান-ধারণায় পীর-মূরিদী থেকে স্বতন্ত্র একটি ধারার রূপকার। শাহেন শাহে সিরিকোট (রা:) এবং হুজুর ক্বেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর আদর্শই ছিল স্বীয় মুরিদদের দ্বীনি খেদ্মতে আত্মনিয়োগ করানো। মুরিদানের নিকট থেকে কোন ধরণের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণতো দূরের কথা বরং বলতেন- ‘‘মুঝছে মুহাববত হ্যায় তো মাদ্রাসাকো মুহাববত করো, মুঝেহ্ দেখনা হ্যায় তো মাদ্রাসা কো দেখো দ্বীন কো বাচাও সাচ্ছা আলেম তৈয়ার করো, ইয়ে জামেয়া কিস্তিয়ে নূহ হ্যাঁয়’’ দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে এরূপ নসিহত সত্যিই বিরল।

 

৪। জশনে জুলুস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম:

রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ১২ রবিউল আওয়াল এ দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে তাশরীফ এনেছিলেন। তাই পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুস ১০:৫৮ আল্লাহ পাক বলেন-‘তোমরা আমার নিয়ামত সমূহের শোকরিয়া আদায় কর’ এবং আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্তিতে খুশী উদ্যাপন কর’। এর যথার্থ প্রয়োগের নিমিত্তে সমগ্র সৃষ্ঠির মূল এবং ‘রহমত’ ‘রাহমাতুল্লিল আ‘লামিন’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র শুভাগমনী দিবসকে ঈদ হিসেবে পালনের যুগোপযোগী সর্বোত্তম কর্মসূচি হিসেবে ‘জশনে জুলুছ’ নামক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ধর্মীয় শোভাযাত্রার প্রবর্তন করেন।

১৯৭৪ সাল। পাকিস্তানের সিরিকোট শরীফ থেকে চট্টগ্রাম আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’র কর্মকর্তাদের চিঠি মারফত নির্দেশ দিলেন- ‘‘ ঈদ-এ মিলাদুন্নবী’’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উদ্যাপন উপলক্ষে ‘জশ্নে জুলুছ’ এর আয়োজন করার জন্য। ‘জশনে জুলুছ’ কি এবং কিভাবে পালন করা হবে এ সম্পর্কে সকল রূপরেখা ও প্রয়োজনীয় তথ্যও তিনি নিজেই প্রেরণ করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে বালুয়ার দিঘী পাড়স্থ খানক্বাহ-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া’ হতে আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ সওদাগর আল ক্বাদেরী (রহ:)’র নেতৃতে সেদিন যে ‘জুলুছ’ চট্টগ্রাম শহর প্রদক্ষিণ করে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া ময়দানে বিশাল ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাহফিল করেছিল তা চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশে এক নতুন ঈমানী চমক সৃষ্টি করেছিল। তাই বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরবর্তী পর্যায়ে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে উদ্যাপিত হয় ‘‘জশ্নে জুলুছ ঈদ-এ মিলাদুন্নবী’’ (সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। ১৯৭৬ হতে ১৯৮৬ ইংরেজী পর্যন্ত হুযূর ক্বেবলা নিজেই এ জুলূছের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্্ (মা:জি:) এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রতি বছর এ জুলুছ সর্বস্তরের সুন্নী মুসলমানের সর্ববৃহৎ জমায়েতে পরিণত হয়। এটা এখন বৃহত্তর সুন্নী ঐক্যের প্রতিক। হুযূর ক্বেবলাও বলেছেন-‘‘এ জুলুছ আশেকানে রাসূলের ঐক্যের বুনিয়াদ।’’ এর অনুসরণে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও জশ্নে জুলূছের আয়োজন হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এ জুলুছও কাদেরিয়া ত্বরীকার অনুসারীদের আরেকটি বিশাল জমায়েত।

 

৫। সাংগঠনিক অবদান :

একটি সুসংগঠিত সমমনা গোষ্ঠী যা একদিনে করবে সেখানে বিক্ষিপ্তরা যতবেশি হোক না কেন বছরেও তা করতে পারেনা এটাই আধুনিক বিশ্বে প্রমাণিত হচ্ছে। সুতরাং শরীয়ত-ত্বরীকত তথা দ্বীনের উৎকর্ষ সাধনে সংগঠনের বিকল্প নেই। শাহেনশাহে সিরিকোটি (রা:) ১৯২৫ সালে রেঙ্গুনে আঞ্জুমানে শু’রায়ে রহমানিয়া এবং ১৯৪৫ সালে চট্টগ্রামে আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া প্রতিষ্ঠা করে শরীয়ত ও ত্বরীকত প্রচারের যে সুসংগঠিত ধারার জন্ম দিয়েছিলেন তা হুজুর ক্বেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর হাতে পূর্ণতা লাভ করেছিল। আজ বাংলাদেশে ‘আন্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’ এক বিশ্বস্থ ও নির্ভরযোগ্য দ্বীনি সংস্থা। এ আন্জুমান-এর প্রত্যক্ষ পরিচালনায় রয়েছে ডজন খানেক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান এবং পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় অর্ধশত মাদ্রাসা, খানক্বাহ্ এবং মসজিদ। শরীয়ত-ত্বরীকত অধিকন্তু, দুঃস্থ মানবতার সেবায় আন্জুমান ইতিমধ্যেই যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে।

১৯৮৬ সাল ছিল হুজুর ক্বেবলার এদেশে শেষ সফর। এ বছরই শরীয়ত-ত্বরীকতের কার্যক্রমকে সরাসরি সর্বস্তরের পীরভাইদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বাংলদেশে ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’ এবং পাকিস্তানে মজলিসে গাউসিয়া সিরিকোটিয়া কায়েম করেন। আজ হুজুর ক্বেবলার মাদ্রাসা সমূহ ও শরীয়ত-ত্বরীকতের মাঠকর্মী হিসেবে গাউসিয়া কমিটির সদস্যরা যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এ গাউসিয়া কমিটি বর্তমানে মধ্য প্রাচ্যের সুন্নী মুসলমানদের অন্যতম সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এ সংগঠনের মাধ্যমে মধ্য প্রাচ্যবাসী সেখানে যথেষ্ট দ্বীনি খেদ্মত আঞ্জাম দিচ্ছেন।

 

৬। প্রকাশনা :

কোন আদর্শের ধারক-বাহক এবং প্রচারক হিসেবে প্রকাশনার মতো এত স্থায়ী এবং গতিশীল মাধ্যম দ্বিতীয়টি নেই। সংগঠন-সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানও নানা কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। অথচ প্রকাশনার অন্তত একটি কপি হলেও সেই আদর্শের অস্তিত্ব ধরে রেখে দেয়। তাই হুজুর ক্বেবলা (রা:) তাঁর পরিচালিত আন্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়াকে বিভিন্নমুখি প্রকাশনার প্রতি উৎসাহিত করেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৬ সনে হুজুর ক্বেবলার নির্দেশে ‘তরজুমান’-এ আহলে সুন্নাত নামক মাসিক পত্রিকা চালুর সিদ্ধান্ত এবং ১৯৭৭ সাল থেকে প্রকাশনা শুরু হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে পাকিস্তান হতে মজলিসে গাউসিয়া কর্তৃক প্রকাশিত হচ্ছে ‘আন্ওয়ারে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ নামক একটি নিয়মিত প্রকাশনা। খাজা চৌহরভী (রা:)’র নিয়মিত অজিফা সমূহকে হুজুর ক্বেবলা ‘আওরাদুল কাদিরিয়াতুর রহমানিয়া’ নামে সঙ্কলন করে ছাপিয়ে দেন; যা কাদেরিয়া তরীক্বার অনুসারীদের জন্য বিশেষ নেয়ামত। দরুদ শরীফের যে গ্রন্থটি মুসলিম বিশ্বের এক বিস্ময়কর গবেষণার বিষয় বলে গণ্য হচ্ছে সেটি হলো ‘মজমুয়ায়ে ছালাওয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ প্রতি পারা ৪৮ পৃষ্ঠা করে মোট ৩০ পারা বিশিষ্ট এ বিশাল উচ্চাঙ্গের আরবি ভাষায় কিতাবটি লিখেছেন শাহেন শাহে সিরিকোট (রা:)-এর পীর হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রা:)।

যিনি জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক কোনরূপ শিক্ষা গ্রহণ করেননি। শুধুমাত্র এলমে লাদুনীর বাস্তব সাক্ষী এ বিশাল গ্রন্থটি শাহেন শাহে সিরিকোট (রা:)-এর পর হুজুর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, হুজুর ক্বেবলা ১৯৯৩-এ ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত এ ‘মজমুয়ায়ে ছালাওয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ গ্রন্থটির আরবি থেকে উর্দু অনুবাদ নিজ তত্ত্বাবধানে ২২ পারা পর্যন্ত সমাপ্ত করেন, যা পাকিস্তানে বর্তমানে প্রকাশিত হয়েছে। এসব নিয়মিত প্রকাশনা ছাড়াও হুজুর ক্বেবলার নির্দেশে আন্জুমান কর্তৃক সুন্নী মতাদর্শ ভিত্তিক সুন্নী আক্বীদা ও আমল সংক্রান্ত অনেকগুলো পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এবং হুজুর ক্বেবলার আদর্শে উজ্জীবিত আলেম-ওলামা ও লেখকগণ ইতিমধ্যেই শতাধিক রচনা করে ইসলামী সাহিত্যের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করেছেন।

 

৭। মূল্যবান ভাষণ ও তাফসীরুল কোরআন :

লাহোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা ‘নাওয়ায়ে ওয়াক্তের’ জনৈক প্রবন্ধকার হুজুর ক্বেবলাকে ‘সফিনাতুল এলম’ অর্থাৎ- জ্ঞানের জাহাজ বলে মন্তব্য করেছিলেন। বাস্তবিকই এ মন্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছিল হুজুর ক্বেবলার প্রতিদিন বা’দ ফজরের ‘দরসে কোরআন’ মাহফিল থেকে। এ মাহফিলে বাংলাদেশ ও বিদেশের খ্যাতনামা ওলামাগণ বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত হতেন এবং মন্তব্য করতেন যে, হুজুর ক্বেবলার দরস প্রকৃতই এলমে লাদুনীরই বহিঃপ্রকাশ। এমনকি ওলামাগণ হুজুর ক্বেবলার এলম যাঁচাইয়ের জন্য অনেক সময় প্রশ্ন তৈরী করে সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। আর হুজুর ক্বেবলা তাদের জিজ্ঞাসার পূর্বেই দরসে কোরআনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সে প্রশ্নের উত্তর সমূহ দিয়ে দিতেন। ফলে, পরীক্ষা করতে আসা অনেক আলেম তৎক্ষণাৎ হুজুর ক্বেবলার হাতে হাত রেখে মুরিদ হয়ে শরীয়ত-ত্বরীকতের খেদ্মতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। হুজুর ক্বেবলা বাংলাদেশে অবস্থানকালীন প্রতিদিন প্রায় ২/৩টি দ্বীনি জলসায় বক্তব্য রাখতেন। এসব বক্তব্য নিয়মিত পত্রিকাগুলোতে গুরুত্ব সহকারে ছাপানো হতো। আর এসব বক্তব্যে তিনি বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানদের দূরাবস্থার চিত্র তুলে ধরতেন এবং সহিহ্ আক্বিদাকে ধারণ করে বিশ্ব মুসলমানদের এক প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। হুজুর ক্বেবলা তাঁর সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ ভাষণে যেসব বিষয়ে বেশী গুরুত্ব দিতেন তা হল-

১.    হুজুর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি অধিক ভালবাসার মাধ্যমে ঈমান মজবুত।

২.    আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং ভ্রান্ত মতবাদ সমূহের তুলনামূলক পরিচয়।

৩.   মানুষের সমগ্র জীবনে দ্বীনি খেদ্মতের গুরুত্ব।

৪.    সমগ্র বিশ্বব্যাপী দ্বীনি ঐক্য গড়ে তোলা।

 

৮। আজানের পূর্বে সালাত ও সালাম :

আজ অনেক মসজিদে বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশীর ভাগ মসজিদেই আজানের পূর্বে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সালাত-সালাম দেয়া হচ্ছে। যা কিনা এক সময় সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে আরবের সউদী নজদী শাসনের প্রতিরোধে এ সুন্নতটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যা গাউছে যমান আল্লামা তৈয়্যব শাহ্্ (রা:) কর্তৃক এদেশে পুর্ণজীবন লাভ করে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর অনেক দেশে আজানের পূর্বে দরূদ-সালাম সুন্নী মসজিদ বাছাই এর অন্যতম শর্ত হিসেবে গণ্য হয়। ফরজ নামাযের সালাম ফিরানোর পর উচ্চস্বরে ‘আচ্ছালাতু আচ্ছালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ …………… পড়ার রেওয়াজও চালু করেছেন তিনি। যা সাথে সাথে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।

বর্তমানে মিলাদ-ক্বিয়ামের সাথে সাথে ‘মুস্তফা জানে রহমত পেহ্ লাখো সালাম’ এ সালাত-সালাম আ’লা হযরত প্রবর্তিত এবং বাংলাদেশে হুজুর ক্বেবলা কর্তৃকই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হুজুর ক্বেবলা এ সালামটি প্রথমে স্বীয় ত্বরীকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চালু করেন যা পরবর্তীতে সকল সুন্নী মুসলমানরা অনুসরণ করছেন। হুজুর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) যে মুজাদ্দিদ এবং গাউসে যামান ছিলেন তার অন্যতম প্রমাণ হল, হুজুর ক্বেবলা যখন যা চালু করতেন তাই পরবর্তীতে সার্বজনীন রূপ গ্রহণ করেছে।

 

কারামত

হাদীয়ে দ্বীনো মিল্লাত পেশোয়ায়ে আহলে সুন্নাত আল্লামা তৈয়্যব শাহ্্ (রা:)-এর ৭৭ বছরের জিন্দেগী ছিল প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শের এক বাস্তব নমুনা। সুন্নাতে রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তাঁর জীবনের সাধনা, কামালিয়াত ও বেলায়তের সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত এ মহান ওলী সর্বদা নিজেকে চুপাতেন। প্রচার বিমূকতা ও স্বীয় পূর্ণতার গোপনীয়তা সাধনে তিনি ছিলেন বরাবরই তাঁর মহ্তারাম আববাজানের পদাঙ্ক অনুসারী। দেশে বিদেশে অবস্থানকালে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তাঁর থেকে অগনিত কারামাত পরিদৃষ্ট হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে তাঁর থেকে প্রকাশিত কারামত লিখতে বসলে বইয়ের সিরিজ তৈরী হবে। তবুও এ মহান ওলীর কৃপা লাভের প্রত্যাশায় কারামত সমূহের কিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়াস মাত্র।

 

  প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দর্শন লাভ :

কুত্বুল আউলিয়া হযরত সৈয়্যদ আহ্মদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) ছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৩৯তম অধ:স্থন পুরুষ। মাতৃগর্ভের ওলী আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) হলেন তাঁর সুযোগ্য স্থলাভিষিক্ত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী নায়েবে মোস্তফা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) চর্মচক্ষে তাজেদারে মদিনার দর্শন লাভে ধন্য হন। পেশোয়ায়ে আহ্লে সুন্নাত আল্লামা সৈয়্যদ আহ্মদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) তখন চট্টগ্রামে সফররত, মুহ্তারাম আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সাহেবের প্রেস সংলগ্ন বাসায় অবস্থান করছিলেন। হুজুর ক্বেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:) ছিলেন পাকিস্তান সিরিকোট শরীফে। হুজরা শরীফের দরজা খোলা দেখে তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন। হুজরা শরীফে প্রবেশের সাথে সাথে প্রিয় নবী তাজেদারে কায়েনাত হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পেলেন, সরকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জাহেরী যিয়ারত নসীব হল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পবিত্র কুরআনের দু’টি সূরা দ্বারা দু’রাকাত নামাজ পড়তে বললেন, নামাজ শেষে তিনি নূরানী সত্বার দর্শন লাভে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই দফ্তর হতে ওলী আল্লাহ্দের দায়িত্ব বন্ঠন করা হয়। এখন এ গুরু দায়িত্ব হযরত সৈয়্যদ আহ্মদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) এর হাতে ন্যস্ত। এ ঘটনা চট্টগ্রামে অবস্থানরত হযরত সিরিকোটি (রা:)-কে জানাবার নির্দেশ দিলেন, নির্দেশ অনুসারে সিরিকোট শরীফ হতে পত্র প্রেরণ করা হলো। আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের ঠিকানা বরাবর চিঠি হস্তগত হল। দুপুরের খাবার শেষে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব পত্রটি হযরত সিরিকোটি (রা:)-এর হাতে দিলেন। সিরিকোট শরীফের খবরা খবর জানার আগ্রহে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব সহ আরো অনেকেই হুজুর ক্বেবলার দিকে তাকিয়ে আছেন। হুজুর ক্বেবলা পত্র না পড়ে বালিশের নীচে রেখে দিলেন কয়েক ঘন্টা অতিক্রম হয়ে গেল তখনও চিঠি পড়েননি।  আসরের নামাজ শেষে ভক্তবৃন্দদের অনেকেই উপস্থিত ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে বালিশের নীচ থেকে পত্র নেয়ার জন্য বললেন, জনাব বদিউল আলম সাহেবকে পত্র পাঠের নির্দেশ দিলেন। হযরত সিরিকোটি (রা:) বলেন, ইয়ে মুঝে মালুম হ্যায়, খত্ আপকে লিয়ে আয়া, মেরে বা’দ কোন আনে ওয়ালা হ্যায়, সমজানে কেলিয়ে’’ অর্থাৎ এটা আমার জানা ছিল, পত্র আপনাদের জন্য এসেছে, আমার পর কে আসছেন তা বুঝাবার জন্য। এজন্যই কুত্বুল আউলিয়া সৈয়্যদ আহ্মদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) প্রায়শঃ বলতেন, তৈয়্যব কা মক্বাম বহুত উচাঁ হ্যায়, তৈয়্যব মাদারজাত ওলী হ্যায়, মুস্তাকবিল মে সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়া কা কাম তৈয়্যব সম্ভালেগা। তোমহারে লিয়ে এক নওজোয়ান মজবুত পাবন্দে সুন্নাত পীর কি জরুরত হ্যায় আওর ঊয়হ্ তৈয়্যব শাহ্ হ্যায়।

অর্থাৎ, তৈয়্যব শাহ্ এর স্থান বহু ঊর্ধ্বে। তৈয়্যব শাহ্ হচ্ছেন মাতৃগর্ভের ওলী, অদূর ভবিষ্যতে সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার সার্বিক কার্যক্রম তৈয়্যব শাহ্ আঞ্জাম দেবেন। তোমাদের জন্য সুন্নতের অনুসারী একজন শক্ত নওজোয়ান পীরের প্রয়োজন রয়েছে। আর সে পীর হচ্ছেন তৈয়্যব শাহ্। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেগাহে করম ও হযরাতে কেরামের রূহানী ফুয়ূজাতে সমৃদ্ধ আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:) রিয়াজত ও সাধনাগুণে বেলায়তের সুউচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত হন।

গরীব নাওয়াজ (রা:)-এর দর্শন লাভ :

মাতৃগর্ভের ওলী হযরত তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর বয়স তখন ৮ বছর, সুলতানুল হিন্দের যিয়ারতের উদ্দেশ্যে আববাজানের সাথে গেলেন আজমির শরীফে।

নূরানী রওজা শরীফ চত্বরে ৮ বছরের শিশু সন্তান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) রওজা শরীফের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছেন। আববাজান কুত্বুল আউলিয়া হযরত সৈয়্যদ আহ্মদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) মুয়াল্লিমের সাথে আলাপরত এমন সময় এক সুদর্শন নূরানী আকৃতির পুরুষ তাঁর সামনে দন্ডায়মান। শিশু সন্তান তৈয়্যব শাহ্ কে ডেকে পার্শ্বে বসালেন, মনের মাধুরী দিয়ে আদর স্নেহ করলেন, কিছু দোয়া দরুদ পড়ালেন, কিছুক্ষণ পর আববাজান হযরত সৈয়্যদ আহ্মদ শাহ্ সিরিকোটি (রা:) কে এসব ঘটনা খুশিমনে ব্যক্ত করলেন। হযরত সিরিকোটি (রা:) পুত্র মুখে এসব কথা শুনার পর বললেন, বেটা উওই তো খাজা হ্যায়, বৎস! উনিই ছিলেন খাজা গরীব নাওয়াজ। বেলায়তের পরশমণি গরীব নাওয়াজ (রা:)-এর কৃপাদৃষ্টি লাভে ধন্য আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:)-এর জাহেরী ও বাতেনীভাবে রূহানী ফয়ূজাত প্রাপ্ত হয়ে ইনসানে কামেলের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন।

বেয়াদবীর পরিণাম ও ক্ষমা প্রার্থনা :

১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নোয়াখালী বাসী পীর ভাইদের আমন্ত্রণে হুজুর ক্বেবলা নোয়াখালী বেগমগঞ্জ তাশরীফ নেয়ার কর্মসূচি নির্ধারণ হল। নোয়াখালী বেগমগঞ্জ পৌরসভা মাঠে জলসার স্থান নির্ধারণ করা হল। শুরু হলো ব্যাপক প্রস্ত্ততি আলাকসজ্জা তোরণ নির্মাণ সহ আরো অনেক কর্মসূচি। বাতিল পন্থীরাও বসে নাই, মাহ্ফিল পন্ড করা, পথ রোধ করা, তোরণ ভেঙ্গে ফেলা, হামলা চালানো ইত্যাদি পরিকল্পনা পাকাপোক্ত, বাতিল অপশক্তির দূরভিসন্ধির কারণে স্থান পরিবর্তন করে আমানত পুরে জলসার আয়োজন করা হল। আমানত পুর থেকে এক মাইল দূরবর্তী স্থানে তোরণ নির্মাণ করা হল। বাতিল মতাদর্শী দেওবন্দ আক্বীদায় বিশ্বাসী জনৈক ছাত্র নির্মিত তোরণে আবর্জনা নিক্ষেপ সহ ধারালো ছুরি দিয়ে তোরণের কাপড় ছিড়ে ফেলছিল, গাউছে যামানের প্রতি চরম ধৃষ্ঠতা প্রদর্শনের পরিণতি তাকে ভোগ করতে হল। ছেলেটি পাগল হয়ে গেল। ছেলেটির পিতা নোয়াখালী নিবাসী চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, ছেলেটির পিতা-মাতা সহ পরিবারের সকলে বুঝতে পারল হুজুর ক্বেবলার সাথে বেয়াদবীর কারণে ছেলেটির এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে ছেলেটির পিতা তৎকালীন আঞ্জুমান সেক্রেটারী জনাব আলহাজ্ব জাকারিয়া সাহেবকে ঘটনা ব্যক্ত করে এবং অনেক অনুরোধের পর তাঁর বাড়ীতে হুজুর ক্বেবলাকে দাওয়াতের আবেদন করেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে হুজুর ক্বেবলা তাঁর বাড়িতে গমন করেন। হুজুর ক্বেবলার কাছে ছেলের সুস্থতার জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন। হুজুর ক্বেবলা (রা:)-এর দোয়ার বদৌলতে ছেলেটি সুস্থতা ফিরে পায়।

 

ত্রি-তল ভবনের ছাদ থেকে পড়েও অক্ষত :

রাহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরীকত আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা:) চট্টগ্রামে অবস্থানকালে একবার বলুয়ার দিঘীর পাড়স্থ খানকা-এ-কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়ার তিন তলায় এক মাহফিলে ভক্ত মুরিদের মাঝে তক্বরীররত ছিলেন, এমতাবস্থায় খানক্বাহ শরীফের ছাদের উপর আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ সওদাগর আল কাদেরী (রহ:)-এর পুত্র আনিস আহমদ আনিস অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করতেছিলেন। হঠাৎ তার মা দেখতে পান যে, আনিস ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছে, হুজুর ক্বেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (রা:) মুহূর্তের মধ্যে তাকে ধরে ফেললেন এবং নিশ্চিত বিপদের কবল থেকে রক্ষা করলেন, এমনি এক বিপদের মুহূর্তে হুজুর ক্বেবলাকে দেখতে পেয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলে হুজুর ক্বেবলা অদৃশ্য হয়ে যান। আনিসের মা দেখতে পান আনিস সত্যি সত্যিই ত্রিতল ছাদ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। দোতলায় অবস্থানকারী কোন একজন এ বিপজ্জনক দৃশ্য দেখে তিন তলায় হুজুর ক্বেবলার সামনে উপবিষ্ট আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ সওদাগর আল কাদেরী (রহ:) কে গিয়ে এ দু:সংবাদ শুনালেন, শুনামাত্র তিনি অস্থির কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। এদিকে হুজুর ক্বেবলা মৃদু হেসে আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আল কাদেরী সাহেবকে সম্বোধন করে বললেন, ‘ঘাবড়াইয়্যে মত! বাচ্চা গির গিয়া সাচ মগর হযরাতনে পাকড় লিয়া’ অর্থাৎ ভয় করবেন না বাচ্চা পড়ে গেছে সত্য, কিন্তু হযরত ধরে ফেলেছেন। এদিকে অক্ষত অবস্থায় আনিস দৌড়ে ঘরে চলে আসল। এখানে হুজুর ক্বেবলা (রা:) হযরাতে কেরামের কথা বলে স্বীয় সত্বাকে গোপন করেছেন। দেখুন, আল্লাহর ওলীর ক্ষমতার ব্যাপ্তি। এদিকে মজলিসে উপস্থিত, একই সময়ে অন্যস্থানে আল্লাহর বান্দাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। তিন তলার ছাদ থেকে একজন ছেলে পড়ে গেলে তার মৃত্যু অনিবার্য। অথচ শিশু ছেলে আনিসের শরীরে একটু আঘাত পর্যন্ত তাকে স্পর্শ করেনি। সম্পূর্ণরূপে অক্ষত ও সুস্থাবস্থায় দৌঁড়ে ঘরে চলে গেল আনিস। হুজুর ক্বেবলার এ অলৌকিক ক্ষমতা ও বেলায়তের প্রভাব দেখে তার আম্মাজানের আস্তা বিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। হক্কানী আউলিয়ায়ে কেরামগণ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে তাঁর ভক্ত অনুরক্ত মুরীদদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। আল্লাহর বান্দাদের সার্বিক কল্যাণ সাধনই তাদের লক্ষ্য।

 

নিঃসন্তানের সন্তান লাভ :

মোয়াল্লেম আকরাম, দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ হলেন, ১২ বছর অতিক্রম করল। কত স্বপ্ন কত আশা, সংসার সাজাবে, ছেলে সন্তান দুনিয়াতে আসবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পহিরাস, মনে বড় হতাশা, অন্তরে ভীষন বেদনা। কোন সন্তান হচ্ছে না। তাই আসলেন গাউসে যামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রা:)’র দরবারে। বেগম আকরাম এ মহান ওলীর কদমে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল নিজের আরজি পেশ করল, আল্লাহর ওলীর দরবার হতে মুক্তিকামী কোন মানুষ বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসে না। আল্লাহর ওলীর ওসীলায় তাদের মনোবাঞ্চনা পূর্ণ হয়। মনস্কামনা সিদ্ধ হয়। বেগম আকরাম নাছোড় বান্দা হুজুর সমীপে আবেদন করলেন আমাকে সন্তান দিন। আল্লাহর ওলী দোয়া করলেন দোয় মঞ্জুর হল। হুজুর ক্বেবলা বললেন, যাও তোমাকে একজন পুত্র সন্তান দিলাম। এখন বেগম আকরামের পরিবার সুখ শান্তি ও আনন্দে উদ্ভাসিত। মোয়াল্লেম আকরামের মনোবাসনা আল্লাহর প্রিয় বান্দার ওসীলায় পূর্ণ হল। আল্লামা রুমী মসনভী শরীফে বলেন,

গোফতাহ্ না গোফতাহ্ কুনাদ আজ ফতেহ্ বাব

তা আজা নে সিখ্ সুজদ্ নে কাবাব্

অর্থাৎ : আল্লাহর দরজা ওলীদের নিকট খোলা থাকার কারণে তাঁরা লওহে মাহ্ফুজে রক্ষিত বাণীকে পরিবর্তন করতে পারেন। এতে শিখ বা ক্বাবাব কোনটাই জ্বলে না।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, হুজুর ক্বেবলার অপরিসীম দ্বীনি খেদমতের যৎসামান্যই এখানে স্থান পেয়েছে। হুজুর ক্বেবলার একটিই দাবী আমাদের কাছে সেটি হলো দ্বীন রক্ষা কর; ইসলামের কাজে ঝাপিয়ে পড়। আর দ্বীন ইসলামের এ মহান দায়িত্বে নেতৃত্বদানকারী সাচ্ছা আলেম সৃষ্টি কর। প্রকৃতই জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ও জামেয়া কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া সাচ্ছা আলেম সৃষ্টির নির্ভরযোগ্য কারখানা। সাচ্ছা আলেমরা হুজুর ক্বেবলার বৈপ্লবিক সংস্কার ও শরীয়ত ত্বরীকতের প্রচার-প্রসারে যুগোপযোগী কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসুক এটিই সময়ের দাবী। হুজুর ক্বেবলার ইচ্ছাও ছিল তাই। হুজুর ক্বেবলা (রা:)-এর এ ইচ্ছা পূরণ হবে ইন্শা আল্লাহ।

আমিন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন!!

 

তথ্যসূত্রঃ

 

  • মাসিক তুরজুমান।
  • সুন্নীয়তের পঞ্চরত্ন।
  • ইসলামের মহান সংস্কারক গাউসে জামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্্ (রা:)।
  • শাজরা শরীফ, একাদশ সংস্করণ, হি: ১৪১৮/১৯৯৭ খৃী:।
  • রাহমাতুল্লিল আলামীন ‘‘ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্মারক’’।
  • আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ স্মারক গ্রন্থ ২১শে আগষ্ট ১৯৯৪ ইং চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
  • বাগে খলিল ২য় খন্ড।
  • বাগে তৈয়্যবাহ্ ১৪১৬ হিজরী।
  • সিরাজুম মুনীরা -অষ্টম বর্ষ ১ম সংখ্যা ১৪০৮ হিজরী।
  • তত্ত্বাবধানেঃ
  • আল্লামা মুফ্তি হাফেজ কাজী আবদুল আলীম রিজভী (প্রিন্সিপাল)
  • আল্লামা মুফ্তি আবুল কাশেম মুহাম্মদ ফজলুল হক (ভাইস-প্রিন্সিপাল)
  • আল্লামা মুহাম্মদ মুশতাক আহমদ (প্রধান মুহাদ্দিস)
  • আল্লামা মুফ্তি মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান (প্রধান মুফ্তি)
  • আল্লামা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন আল্ আযহারী (মুহাদ্দিস)
  • আল্লামা মুফ্তি মুহাম্মদ আবু ইউসুফ (মুফতি)
  • আল্লামা মুফ্তি হাফেজ মুহাম্মদ মুনিরুজ্জামান আল কাদেরী (আরবী প্রভাষক)
  •  
  • সম্পাদনায়ঃ
  • খন্দকার মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন (কামিল ফিক্হ ১ম বর্ষ)
  •  
  • সম্পাদনা সহযোগীঃ
  • মুহাম্মদ তাওহীদুল ইসলাম, মুহাম্মদ মহিববুল্লাহ সিদ্দীকী, গাজী মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, মুহাম্মদ শাহী্নূর রহমান, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, এম.এ.এ. মামুন,  গাজী জুনাইদ আহমদ।
  • কামিল হাদিস ১ম : মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, মুহাম্মদ জাকারিয়া মাসউদ, মুহাম্মদ নাজমুদ্দৌলা।
  • কামিল ফিকহ ১ম : মুহাম্মদ ফায়জুল আমিন, মুহাম্মদ মোবারক, মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ, মুহাম্মদ আরমান উদ্দীন, মুহাম্মদ নূর উদ্দীন, মুহাম্মদ হাফিজ উদ্দীন, মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, মুহাম্মদ মুনির হোসেন।
  •  
  • প্রকাশকাল:
  • প্রথম প্রকাশ : ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৪, ৫ কার্তিক ১৪২০, ২০ অক্টোবর ২০১৩

 

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানিফা (রা:)

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানিফা (রা:)

খন্দকার মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন

এম এফ, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা

 

 

 

ইমাম আ’যম (রা:) শুভ জন্ম, নাম-উপনাম ও বংশঃ-

আবু হানিফা নোমান ইবনে ছাবেত যওজী। ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে অগ্রজ। মুসলিম সমাজে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক। জন্মকাল নিয়ে তিনটি মত আছে ১. ৬৩ হিজরী ২. ৭০ হিজরী ৩. ৮০ হিজরী। তৃতীয় মতটিই প্রসিদ্ধ। কেনান, ইমাম আ’যম (রা:)-র পৌত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ বলেন, ‘‘আমার দাদা ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন’’।৯/১ বাগদাদে ১৫০ হিজরীতে ওফাত। উপাধী ইমামে আযম। তাঁর নামের শাব্দিক অর্থ পর্যালোনায় দেখা যাবে তাঁর নামে ও কাজে পুরোপুরি মিল । আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রহ:) বলেন, অর্থাৎ ইমাম ঐকমত পোষণ করেন যে, তাঁর নাম নো‘মান। এতে এক গূঢ় রহস্য রয়েছে ১. নো‘মান এমন রক্ত, যা দ্বারা শরীরের কাঠামো প্রতিষ্ঠিতি থাকে। ২. কেউ কেউ বলেন, নো‘মানের অর্থ রুহ। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর মাধ্যমে ফিক্হে ইসলামীর কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ফিকহ শাস্ত্রের দলীলাদি ও বিভিন্ন দুরুহ বিষয়ের সমাধান মূল। ৩. নু’মান অর্থ লাল সুগন্ধিযুক্ত ঘাস বা বেগুনি রঙের নাম। সে হিসাবে ইমাম আবূ হানিফার (রা:) পবিত্র অভ্যাস ভাল এবং তাঁ গুণাবলি পূর্ণতার শীর্ষে পৌছেছে। ৪. নু’মান শব্দটি ‘‘ফু’লান’’ শব্দের ওযনে ‘‘নি’মাত’’ শব্দ থেকে নির্গত হয়েছে। তখন অর্থ হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমাম আ’যম মানুষের উপর এক বড় নিয়ামত।১০/২ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  পারস্যবাসীর এক ভাগ্যবান ব্যক্তির সুসংবাদ দিয়েছেন। সে হাদীসকে ইমাম মুসলিম (রহ:) হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন। সরওয়ারে কায়েনাত হুজুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لو كان الدين عند الثريا به رجل من فارس او قال من ابناء فارس حتى يتناوله-

 -যদি দ্বীন সপ্তর্ষিমন্ডলস্থ সুরাইয়া সেতারার কাছে গচ্ছিত থাকে তখনও পারস্যবাসীর এক ব্যাক্তি তা অর্জন করে নেবে।১/৩

মুহাদ্দিসগণ বলেছেন এ হাদীসটি ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এতে কোনো আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি।

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী শাফেয়ী (রহ:) ‘‘তাবয়ীযূস সহীফা’’ কিতাবে এবং ইমাম ইবনে হাজর মক্কী (রহ:) ‘‘আল খায়রাতুল হিসান’’ এর মধ্যে ইমাম আযম আবূ হানীফার (রা:) ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন।

 

শৈশবকালঃ-

শৈশব কেটেছে বসরার কূফা নগরীতে। তৎকালীন ইসলামী নগর হিসেবে কূফা খ্যাতি কুড়িয়েছিল। এখানে বড় বড় আলেমের মজলিশ বসত। তন্মধ্যে ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণবিদগণ ছিলেন। প্রথমেই তিনি দর্শন শাস্ত্রের পাঠ শেষ করেন। পরবর্তীতে ফিকহ চর্চায় মনোনিবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু, তিনি তাঁর মজলিশে প্রবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা:) এর মূলধারার শিষ্য। ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর ওস্তাদ ছিলেন হযরত হাম্মাদ (রা:)। এবং হযরত হাম্মাদ (রা:) জ্ঞান আহরণ করেছেন হযরত ইব্রাহীম নখয়ী (রা:) থেকে। যিনি ছিলেন হযরত আলকামা (রা:) যোগ্য উত্তরসূরী। ১২০ হিজরীতে হযরত হাম্মাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন হযরত ইমাম আবূ হানীফা (রা:) হযরত ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর নেতৃত্বে ও কতৃত্বেই কূফার বিদ্যাপীঠ পরিচালিত হতে থাকে। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম ‘‘কেয়াসের প্রতিষ্ঠান’’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণ সেখানে হাজির হতে থাকেন। বসরা, মক্কা ও মদীনার আলেমগণ এ থেকে বাদ যাননি। আববাসীয় খলীফা আল মানসূর ক্ষমতায় এলে তাঁর এ বিদ্যাপীঠ বাগদাদে স্থানান্তরিত হয়। ওলামায়ে কেরাম তাঁর সাথে তর্ক-বিতর্ক ও গবেষণা করেন। তারা ইমাম আবূ হানীফা (রা:) থেকে জ্ঞান-পিপাসা নিবারণ করেন। সুবিখ্যাত মুহাদ্দিসদের মধ্যে আমীরুল মুমিনীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (র:), হাফস ইবনে গিয়াস (র:), ভুবন বিখ্যাত ফকীহ আবু ইউসূফ (র:), মুহাম্মদ যুফার (র:) হাসান ইবনে যিয়াদ (র:), খ্যাতিমান বুযূর্গ ও পীর ফুযায়েল ইবনে আয়াজ (র:), দাউদ তাঈ (র:) ছিলেন ইমাম আবূ হানীফা (রা:) -এর মজলিসের মধ্যমনি।

 

শিক্ষা জীবন ঃ-

ইমাম আবূ হানীফা (রাঃ) অসাধারণ মেধা ও স্মৃতি শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর বার কি তের বছর বয়সে সরওয়ায়ে কায়েনাত হায়াতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশিষ্ট খাদেম ও জলিলুল কবদর সাহাবী হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) কুফায় আগমন করলে, তিনি তাঁর দরবারে উপস্থিত হতে থাকেন। তিনি প্রথমে পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করেন। এরপর ইলমে কালামের দিকে মনোনিবেশ করেন। হিজরী ১০০ সালে তিনি হযরত হাম্মাদ (রাঃ) এর শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হন। ঐ বিদ্যালয়ে একাধারে ১০ বছর  লেখা পড়া করেন। তারপর কুফায় তিনি মূহাদ্দিসগণের নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করতেন।

 

জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতাঃ-

ইমাম আবূ হানিফা (রা:) ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় পন্ডিত ছিলেন। ফিকহ শাস্ত্র ছাড়াও ইলমে হাদীস, ইলমে কালাম, ইলমে বালাগাত, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে তাফসীর প্রভৃতি বিষয়ে তিনি গভীর পান্ডিত্য অজর্ন করতেন।

তিনি শিক্ষাদান ও ফতোয়া রচনা কাজে ব্যস্ত থাকতেন।

 

শিক্ষকবৃন্দঃ-

আমাদের সমাজে লা-মাযহাবীরা বলে যে, ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) মুহাদ্দিস ছিলেন না। অথচ তাঁর হাদীস শাস্ত্রে উস্তাদগণ ছিলেন প্রায় চার হাজার।

 

১. ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস কবীর ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যদের মধ্যকার একটি তর্ক তুলে ধরে লিখেছেন, -(এক সময়) ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যগণ ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম আবূ হানিফা (রা:)-র উপর মর্যাদা দিচ্ছিলেন, আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস হানাফি শাফেয়ীগণকে বলেন, ‘‘তোমরা ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষকগণের গণনা করে বল তা কত’’? তাঁরা তখন গণনা করে বললেন, ‘‘আশিজন’’। তখন হানাফিরা ইমাম আবূ হানিফার ওলামা ও তাবে‘ঈ-শিক্ষক গণনা করলেন, তাঁদের সংখ্যা বের হল ‘‘চার হাজার’’। তখন আবূ আবদুল্লাহ বলেন, ‘‘এটা ইমাম শাফেয়ীসহ অন্যান্য ইমামদের উপর ইমাম আবূ হানিফার সামান্য মর্যাদা’’৬/৪

 

২. ইমাম সাইফুল আয়িম্মা সাবেলী বলেন, ‘‘নিশ্চয় ইমাম আবূ হানিফা চার হাজার তাবে‘ঈ মাশায়েখ থেকে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন’’৭/৫

 

৩. ইমাম ইবনে হাজর মক্কী শাফেয়ী (রহ:) ইমাম আ’যমের মাশায়েখের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ইমাম আবূ হানিফার (রা:) অনেক শিক্ষক ছিলেন। ইমাম আবূ হাফস তাঁদের থেকে চার মাশায়েখের গণনা করেছেন। কেউ বলেন, শুধুমাত্র তাঁর তাবে‘ঈ মাশায়েখের গণনা চার হাজার।৮/৬

 

ছাত্রবৃন্দঃ-

‘‘মু‘জামুল মুসান্নেফীন’’ গ্রন্থে ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর আটশত আশিজন শিষ্য ছিলেন যারা প্রত্যেকই স্বীয় যুগে বিখ্যাত ফকীহ ছিলেন। তাদের মধ্যে কতিপয় শিষ্যগণের নাম উল্লেখ করা হলোঃ-

১. আমর ইবনে মাইমুনা (রহ:), ২. ইমাম যুফার (রহ:), ৩. হামযযাহ ইবনে হাবীব (রহ:), ৪. সূফীকুল শিরমণি দাউদ তায়ী (রহ:), ৫. আফিয়াহ ইবনে ইয়াযদী (রহ:), ৬. মিন্দল ইবনে আলী (রহ:), ৭. ইব্রহীম ইবনে তাহমান (রহ:), ৮. হাববান ইবনে আলী (রহ:), ৯. নূহ ইবনে আবূ মরিয়ম আলজামে (রহ:), ১০. কাসেম ইবনে মায়ান (রহ:), ১১. হাম্মদ ইবনে আবূ হানিফা (রহ:), ১২. আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ:), ১৩. ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবূ যায়েদাহ (রহ:), ১৪. কাযীউল কুযাত ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ:), ১৫. ইমাম শাফেয়ী (রহ:) এর ওস্তাদ ওকী (রহ:), ১৬. আসাদ ইবনে ওমর (রহ:), ১৭. আলী ইবনে মুসাহহার (রহ:), ১৮. ইউসুফ ইবনে খালেদ (রহ:), ১৯. মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানী (রহ:), ২০. ফজল ইবনে গিয়াস (রহ:), ২১. হাফস ইবনে মুষা (রহ:), ২২. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রহ:), ২৩. হাসান ইবনে যিয়াদ (রহ:), ২৪. ইয়াযাদ ইবনে হারুন (রহ:), ২৫. আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হুমাম (রহ:), ২৬. আবূল কাসেম ইবনে নবীল (রহ:), ২৭. ষাঈদ ইবনে আউস (রহ:), ২৮. ফযল ইডবনে ওকী (রহ:) প্রমুখ।

 

কর্ম জীবনঃ-

 

জীবন ধারনের জন্য তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। যৌবনে তিনি বিদ্যা শিক্ষার চেয়ে ব্যবসায়ের প্রতি অধিক অনুরাগী। একদিন ইমাম শাবী (রহ:) বললেন, তোমার মধ্যে প্রতিভা আছে, তুমি আলেমদের সাথে ওঠা-বসা কর। এ উপদেশের পর তিনি বিদ্যানুরাগী এবং জ্ঞান সিন্ধুর অমূল্য রত্ন অজর্ন করেন।

 

চরিত্র ও ইবাদতঃ-

তিনি একজন অসাধারণ প্রতিভাবান অভিজ্ঞ, জ্ঞানী ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাক্বওয়া, পরহেযগারী, আল্লাহর নৈকট্য লাভে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আত্ন-চেতনা, দৃঢ় চিন্তা, ন্যায় পরায়নতা, আল্লাহর যিকিরসহ ইবাদতের প্রতি প্রবল অনুরাগ,প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ ছিলেন। তিনি রাত্রি জাগরণ ও স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ইবাদত করার কারণে লোকে তাঁকে খুঁটি বলে আখ্যায়িত করতো। মক্কী ইবনে ইবরাহীম বলেন,

كان جهاد كله من حياته الى القبر

তাঁর জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবনটাই ছিল জিহাদের।

 

সাহাবায়ে  কিরাম (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত লাভঃ-

ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) চারজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভে ধন্য হন। তাঁরা হলেন, ১. হযরত আনাস বিন মালিক (রা:), ২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবূ আওফা (রা:), ৩. সাহল ইবনে সা‘দ (রা:), ৪. আবূ তোফাইল (রা)।

 

ইমামে আযমের (রা:) এর ব্যাপারে অপপ্রচার :-

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল চিন্তাভাবনা। চলছে ডিজিটালভাবে মাসআলার সমাধান দেয়া। মিডিয়ায় কিছু দাঁড়ি, টুপি, পাঞ্জাবী পরিহিত নামধারী মৌলভী। অবস্থা দেখলে মনে হয় মিডিয়ার হাত-পা ধরে বসে আছে। যার কারণে কিতাব পড়ার সময় তাদের নেই। যারা তাদেরকে টাকা-পয়সা দিয়ে যেভাবে বলতে বলছে তারা সেভাবে সেখানে বলে যাচ্ছে, যার কারণে তাদের বলার সাথে কিতাবের এবারতের কোন মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন বলে একটা তখন আরেকটা। ঠিকমতো কিতাবের নামগুলোও বলতে পারবে না। যে কয়টা কিতাবের নাম উল্লেখ করে তাও কথার ধরনে মনে হয় শুধু কিতাবের নামগুলোই কেবল মুখস্ত। আবার মাঝে মধ্যে অনেককে দেখা যায় যাদের পরনে পেন্ট-শার্ট, মুখে প্রিন্স কাটিং দাঁড়ি কখনো টুপি আছে আবার কখনো টুপি নাই। নামাজ পড়ে নামাজের ধরনে মনে হয় তার নামাজ দেখলে তাকে বড় নামাজী বলবে। তাদেরকে বেশীর ভাগ সময় রাস্তায় দেখা যায় ঘুরে ঘুরে সরলমনা সাধারণ মুসলমানদেরকে গুমরা করার প্রয়াস চালাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদীসের কোন জ্ঞান তাদের কাছে নেই। অথচ কথা-বার্তা শুনলে মনে হয় তারাই মহাজ্ঞানী।

তারা ও মিডিয়ার ঐ নামধারী মৌলভীদের স্লোগান এক -‘‘ইমাম আবূ হানীফা হাদীস জানতেন না। তিনি সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে দুর্বল হাদীস বর্ণনা করতেন।’’ সেই কারণে তারা ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর মাঝহাব বাদ দিয়ে সহীহ হাদীসের উপর আমল করতে শুরু করেছে। এবং তাদের মাযহাবের নাম দিয়েছে ‘‘লা-মাযহাবী’’। বাংলা বুখারী পড়ে ওখানে তারা সহীহ হাদীস পেয়েছে নবীজি رفع اليدين করতেন, তাদের কথা ‘‘বুখারী শরীফে পাঁচটি সহীহ হাদীস আছে নবীজি رفع اليدين করেছেন এখন কার কথা মানব নবীজির কথা না ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর কথা’’। এ নিয়ে তারা কুমড় বেঁধে মাঠে নেমেছে। অথচ তারা যে বুকার স্বর্গে বাস করছে তার সামান্যতম খবরও তাদের নেই। মেইন বুখারী শরীফের মধ্যে আমরা যে পাঁচটি হাদীস শরীফ দেখতে পাই যে নবীজি رفع اليدين করেছেন, সেই বূখারী শরীফের হাদীসগুলোর পাশেই হাশীয়ায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা  –

واجابوا عن حديث الباب ونحوه بانه محمول على انه كان فى ابةدا ء الاسلام ثم نسخ والدليل عليه ان عبدالله بن الزبير رضى الله عنه راى رجلا يرفع يديه فى الصلوة عند الركوع وعند رفع رأسه من الركوع فقال لا تفعل بذلك الشئ فعله رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم تركه ويويد النسخ ما رواه الطحاوى بسند صحيح حدثنا ابن ابى داود قال انا احمد بن عبد الله ابن يونس قال انا ابو بكربن عياش عن حصين عن مجاهد قال صليت خلف ابن عمر فلم يكن يرفع يديه الا فى الةكبيرة الاولى من الصلوة-

অর্থাৎ: তরজুমাতুল বাব ও অন্যান্য জায়গায় বর্ণিত হাদীসের জবাব প্রদান করে ওলামায়ে কেরাম বলেন: উল্লেখিত হাদীস সমূহের উপর ইসলামের প্রথম যুগে আমল করা হত, পরবর্তীতে তার আমল রহিত হয়ে যায়। আমল রহিত হওয়ার দলিল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা:) তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন নামাযে রুকুতে যাওয়ার সময় ও উঠার সময় হাত উত্তোলন করতেছেন এটা দেখে তিনি নামাযী ব্যক্তিকে বললেন তুমি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং উঠার সময় হাত উত্তোলন করিও না, কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিকে এ আমল করলেও পরবর্তীতে তা বর্জন করেন। আর এই আমল রহিত হওয়ার দলীল ইমাম ত্বহাভী (রা:) সহীহ সূত্রে হাদীস বর্ণনা করে বলেন- আমাকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইবনে আবী দাউদ (রা:), তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইউনূস (রা:) হতে, তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত আবু বকর ইবনে আয়াশ (রা:), তিনে বর্ণনা করেছেন হযরত হুসাইন (রা:) হতে, তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত মুজাহিদ (রা:) হতে, তিনি বলেন- আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) এর পিছনে নামাজ আদায় করেছি, তিনি তাকবীরে ঊলা ব্যতীত কোন সময় হাত উত্তোলন (রফয়ে ইয়াদাইন) করেননি।

সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদীস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারনা নেই। ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এতসুন্দর সামাধান দিতে পারেনি এবং উনার প্রদত্ত সমাধান আদৌ পর্যন্ত কেউ খন্ডাতে পারেনি।

 

ইমাম আওযায়ী (রা:) যিনি ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর সমকালীন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা:) কে বলেন-  من هذا المبةدع الذى خرج بالكوفة فيكنى اباحنيفة ‘‘কূফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাতীর পরিচয় কি? যাকে আবূ হানীফা উপনামে ডাকা হয় ’’?

ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) এর প্রাণাধিক শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী (রা:) বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে বলেন কে দিয়েছে এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন ইরাকের জনৈক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী (রা:) বলেন যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো দ্বীনি এলেম শিখ। ইবনে মুবারক বললেন- সেই শায়খের নাম আবূ হানীফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আযমের সাথে ইমাম আওযায়ী (রা:) এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে বলেন-

غبطت الرجل بكثرة علمه ووفورعقله واستغفرالله تعالى لقد كنت فى غلط ظاهر والزم الرجل فانه بخلاف ما بلغنى عنه-

‘‘লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।’’২/৭

লোকমূখে শুনে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সর্ম্পকে সঠিক ধারনা পোষন করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।

ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে যারা কটাক্য করছে। যারা বলতে চায় ইমাম আযম হাদীস জানতেন না। তাদের সকলের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা এক করলে ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর এক ফুটা ঘামের সমান হবে না। অথচ তারা আজ ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সর্ম্পকে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করে।

ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান দেখুন তিনি কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, তিনি সেই ইমাম যিনি মাসআলাসমূহের উসূল বের করতেন। আর সেই উসূলের ভিত্তিতে আনুসঙ্গিক হাজারো মাসআলার উন্মেষ ঘটাতেন। শুধু তাই নয় তিনি এমন ইমাম যিনি ঘটনা ঘটার আগে ঘটিতব্য বিষয়ের সমাধান বের করে রাখতেন।

তিনি বলেন, আমার পূর্বসূরীগণ যে ব্যাপারটাতে খুব একটা আমল দিতেন না। অনেকে এটা পছন্দও করতেন না।  একে মনে করতেন সময়ের অপচয়। অযথা মানুষকে হয়রানীর উপকরণ। হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা:) কে কোন এক ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন ‘‘এমন ঘটনা ঘটেছে কি? তারা যদি বলত, ঘটেনি তখন তিনি বলতেন, ঘটবার আগ পর্যন্ত ব্যাপারটা সম্পর্কে চুপ থাক।’’

ইমামে আযম (রা:) বলেন, আমার মতাদর্শ এক্ষেত্রে ভীন্ন, কেননা, ফকীহগণের কাজই হল ঘটনার আগে ঘটিতব্য বিষয়ের সমাধান যথাসম্ভব বের করে রাখা।৩/৮

 

ইমাম আবূ হানীফা (রা:) কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর চিন্তাভাবনা কত সূক্ষ্ম। আরেকটি ঘটনা দেখুন-

একবার হযরত কাতাদাহ (রা:) কূফায়  এলে ইমাম আবূ হানীফা (রা:) তাকে অভ্যর্থনা জানান। এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, হে আবুল খাত্তাব! সেই মহিলার ব্যাপারে আপনার মত কি যার স্বামী তার থেকে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত আর সে নারী মনে করছে তার স্বামী মারা গেছে। পরে সে বিবাহ বসেছে অন্য কোথাও, ইতোমধ্যে তার প্রথম স্বামী ফিরে এসেছে? এই মহিলার মোহরানাইবা কী হবে?

ইমাম আযম (রা:) বলেন আমি আমার শিষ্যবৃন্দকে বলে রেখেছিলাম এ মাসআলায় তিনি যদি কোন হাদীস পেষ করেন তাহলে মনে করবে তিনি মিথ্যা বলেছেন। পক্ষান্তরে যদি যুক্তির আশ্রয় নেন তাহলে দেখবে ভুল করেছেন। হযরত কাতাদা (রা:) বলেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি?’’ বললাম না, তিনি বললেন যা ঘটেনি সে বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? আমি বললাম মুসিবত আসার আগে ভাগেই আমরা উপায়-উপকরণ বের করে রাখি। কাজেই ওই ঘটনা এসে গেলে আমরা এর প্রতি বিধান করি। হযরত কাতাদা (রা:) আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না।

ইমাম আবূ হানীফা (রা:) বলেন, আল্লাহ পাক রাববুল আলামীনের অসীম কুদরতে যে কোন মাসআলার সূক্ষাতিসূক্ষ্ম সমাধান দেয়ার যোগ্যতা দান করেছেন। যে বা যারা যখনই আমাকে কোন ব্যাপারে আটকাতে কিংবা ঠকাতে চেয়েছেন আল্লাহ পাক তখনই আমাকে উপস্থিত জ্ঞান দান করতেন, যদ্দারা আমি এইসব মাসআলার যথাযথ উত্তর দিয়েছি।

এ কারণেই ইমাম আযম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে দারুল হিজরতের (মদীনার) ইমাম মালেক (রা:) বলেন-

هذا رجل لو اراد أن يتم الدليل على ان هذه السارية من ذهب لاستطاع-

অর্থাৎঃ ‘‘যদি এই লোকটা কাঠের পালঙ্গকে যুক্তি দিয়ে স্বর্ণ বানাতে চান, পারবেন’’।৪/৯

 

আবার কখনও শুনা যায় তারা বলে আবূ হানিফা (রা:) হাদীস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করেন। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা। আসলে এরা এখন যেমন তখনও এদের এজেন্ডা ছিল। যেমন : ইমাম আ’যমের (রা:) প্রসিদ্ধ শিষ্য আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ইমাম আয’ম (রা:) ও ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে সাক্ষাত লাভের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ইমাম আ’যম (রা:) হযরত ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে মদীনা শরীফে সাক্ষাত লাভ করেন। ইমাম আ’যমের উপর অনেক ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি হাদীস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করার অপবাদ দেন, তাই যখন সাক্ষাত হয় তখন ইমাম বাকের (রা:) ইমাম আ’যম আবূ হানীফা (রা:) থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

انت الذى خالفت أحاديث جدي صلى الله عليه وسلم بالقياس؟

-আপনি কি ঐ ব্যক্তি যে অনুমানের উপর আমার নানাার হাদীসের বিরোধীতা করেন?

ইমাম আ’যম (রা:) বলেন, আল্লাহর পানাহ্! আপনি তাশরীফ রাখুন, আমি আপনাকে আরয করি, আপনার ইজ্জত ও হুরমাত আমাদের উপর এত জরুরী, যে রকম আপনার দাদার ইজ্জত রক্ষা সাহাবীদের উপর জরুরী ছিল। তখন ইমাম বাকের (রা:) তাশরীফ রাখলেন ইমাম আ’যমও তাঁর সামনে বসলেন এবং আরয করলেন, আমি আপনার থেকে তিনটি কথা জানতে চাই, আপনি তাঁর সমাধান দেবেন? প্রথম প্রশ্ন হল- ‘‘পুরুষ দুর্বল না মহিলা দুর্বল’’? তিনি বললেন, মহিলা। অতঃপর ইমাম আবূ হানীফা (রা:) জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘মহিলাদের মীরাসে কত অংশ’’? তিনি বললেন, মহিলার অংশ পুরুষের অর্ধেক। এ উত্তর শুনে ইমাম আবূ হানীফা (রা:) বললেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার কথাকে পরিবর্তন করতে চাইতাম তখন পুরুষকে এক অংশ দিতাম ও মহিলাকে ডাবল দিতে বলতাম। কেননা, মহিলা পুরুষের চেয়ে দুর্বল।

অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) দ্বিতীয় প্রশ্ন তুলে ধরলেন, ‘‘নামায উত্তম, না রোযা’’? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, ‘‘নামায’’। তখন আবূ হানীফা (রা:) বলেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার দ্বীনকে পরিবর্তন করতে চাইতাম, মহিলা যখন হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে তখন যুক্তি দিয়ে বলতাম, সে রোজা কাযা করার পরিবর্তে যেন নামায কাযা করে।

অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) তৃতীয় প্রশ্ন করলেন, ‘‘পেশাব বেশী নাপাক, না বীর্য’’? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, ‘‘পেশাব’’। তখন ইমাম আ’যম (রা:) বললেন, -যদি আমি যুক্তি দিয়ে আপনার নানার কথা পরিবর্তন করতে চাইতাম, তখন আমি ফতওয়া দিতাম পেশাব করলে গোসল করতে হবে এবং বীর্য বের হলে অযূ করতে হবে। কেননা পেশাব বীর্য থেকে বেশী নাপাক। কিন্তু আমি আপনার নানার ধর্ম পরিবর্তন করা থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি।

এ কথা শুনা মাত্র ইমাম বাকের (রা:) নিজ আসন থেকে উঠে আবূ হানীফার (রা:) সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং কপালে চুমু খেলেন।৫/১০

এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম আ’যমের কুরআন ও হাদীস অনুধাবন এবং দূরদর্শিতার বিপরীতে বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ উত্তাপন করেছিল যে ইমাম বাকের (রা:)-র মত লোকও তাঁর ব্যাপারে সংকোচ প্রকাশ করেছেন। যখন ইমাম আ’যম বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে দূরদর্শিতা প্রকাশ করলেন তখন ইমাম বাকের (রা:) শুধু নিজ অভিযোগ প্রত্যাহার করেননি; বরং ইমাম আ;যমের জ্ঞানের গভীরতার স্বীকৃতি দিলেন। তার সমর্থনে নিম্নেক্ত র্বণনাও বিদ্যমান।

এক সময় ইমাম আ’যম (রা:) মক্কা মুকাররামায় ইমাম মুহাম্মদ বাকের (রা:)-র নিকট উপস্থিত হলেন তখন তিনি ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) কে দেখে বলেন! আবূ হানিফা! আপনাকে দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতেছি- আপনি আমার নানার মুছে যাওয়া সুন্নাতকে জিবীত করবেন। আপনি প্রত্যেক দঃখীকে সাহায্য করবেন এবং প্রত্যেক বিপদগ্রস্থকে সাড়া দিবেন। বিপদগ্রস্থলোক যখন নিরুপায় হবে তখন আপনার শরণাপন্ন হবে। আপনি পথহারা ব্যক্তিদেরকে পথের দিশা দিবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন। এমনকি আপনি রাস্তায় আল্লাহওয়ালাদের সাথে থাকবেন।১১ 

ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান দেখুন,

একদা তাঁর কতিপয় ছাত্র একটি জটিল মাসয়ালা নিয়ে ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) এর নিকট  আসলেন এবং বললেন হুজুর একটি কুকুর ও একটি বকরি মেলামেশা করার কারণে একটি বাচ্চা প্রসব করল। যার মাথার অংশ কুকুরের মত আর পিছনের অংশ বকরির মত হয়েছে , এমতবস্থায় এই পশুর বিধান কি? ইমাম আবূ হানিফা (রা:) বললেন তোমরা একটি বাটিতে মাংস ও আরেকটি বাটিতে ঘাস নিয়ে আস। এরপর ঐ পশুকে ছেড়ে দাও সে যদি ঘাস খায়, তাহলে মাথার অংশটা বাদ দিয়ে বাকি অংশ খাওয়া জায়েয। আর যদি মাংস খায় তাহলে সম্পূর্নটা খাওয়া না জায়েয। ছাত্ররা বলল হুজুর পুশুটি মাংস খায়, ঘাস খায়, এমতবস্থা এর বিধান কি? ইমাম আবূ হানিফা (রা:) বললেন একটি বেত নিয়ে এসে পশুটিকে প্রহার কর। যদি পশুটি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে তাহলে তা খাওয়া না জায়েয, আর যদি বকরির মত চিৎকার করে তাহলে মাথার অংশটা বাদ দিয়ে বাকি অংশ খাওয়া জায়েয।

মাঝহাব মানতে যাদের সমস্যা বা যারা মাঝহাব মানা লাগবে না বলেন তাদের কাছে জানতে চায় উপরুক্ত মাসআলার সমাধান কোন জায়গা থেকে দিবেন। সুতরাং সহসেই বলা যায় মুজতাহিদগণ ইজতেহাদ করে আমাদেরকে মাসআলার সমাধান দিয়ে গেছেন সেই সমাধানের উপর আমরা আছি। লা-মাঝহাবী সম্প্রদায়রা বুখারী বুখারী বলতে বলতে তাদের ‘‘বুখার’’ ঁজ্বর এসে যায় তারা আবার ইমাম আযম সম্পর্কে মন্তব্য করে অথচ দেখুন, ইমাম বুখারী (রহ:) ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে বলেন -‘‘মুহাদ্দিসগণ তাঁর থেকে বর্ণনা করণে, তাঁর মতামত গ্রহণে ও তাঁর হাদীস গ্রহণ করণে নিশ্চুপ ছিলেন’’।১২

তাই সবশেষে একথাই বলব, যারা বলেন ইমাম আবূ হানিফা (রা:) হাদীস জানতেন না। তাদের এই কথার কোন ভিত্তি নেই। বরং যারা এই সমস্ত কথা বলে তাদের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আযম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান-চিন্তাভাবনা সেখান থেকে শুরু। ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করা এবং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফী মাযহাব অনুসারে নিজের জীবনকে বাস্তবায়ন করাই একজন আলেম ও প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহ বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন।

আমীন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

০১. খতিবে বাগদাদী : তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩২৬।

০২. ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩১।

০৩.  মুসলিম শরীফ : আস সহীহ, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, باب فضل فارس ৪/১৯৭২, হাদিস : ২৫৪৬।

০৪. মুফেক : মানাকিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৩৮, ইবনে বায্যায করদরী : মানাকিবুল ইমাম আ’যম আবী হানিফা, ১/৬৮।

০৫. খাওয়ারেযমী : জামেউল মাসানিদ, ১/৩২।

০৬. ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩৬।

০৭. আস সাহমূল মুসীব ফী তানিবিল খতীব।

০৮. তারীখে বাগদাদ,১৩ খন্ড, ৩৪৮ পৃষ্টা।

০৯. ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা :   ।

১০. মুফেক : মানাকিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/১৬৮, ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৭৬, আবূ যাহারা : আবূ হানীফা, পৃষ্ঠা : ৭১।

১১. করদরী : মানাকিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৩১।

১২. বুখারী : আত তারিখুল কবীর, ৮/৮১।

বিবেকের কাঠগড়ায় বিশ্ব ইজতেমা

সরলপ্রাণ মানুষ যখন কোন বাতিল ও মিথ্যার বাহ্যিক চাকচিক্যপূর্ণ আয়োজনের গোলকধাঁধার আবর্তে সঠিক দিশা খুজে বের করতে হিমশিম খায়, তখন সচেতন সত্যপন্থীদের উপর ওয়াজিব (অপরিহার্য) হয়ে যায় বাতিলের পরিচয় তুলে ধরে সরলপথের দিকে মানুষকে আহবান করা। অন্যথায় একদিকে হাদীসে পাকের নূরানী ভাষায় সত্য বলার ক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বনকারী বোবা শয়তান এর অশুভ পরিণতির উপযোগী হতে হয়, অন্যদিকে যাদের উদ্দেশ্যে ওই সত্যপথ দেখানো হয় তাদেরও ঈমানী দায়িত্ব হয়ে যায় নিজেদের খোদাপ্রদত্ত বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ওই সত্য পথের আহবানে সাড়া দেওয়া।
ঢাকার টঙ্গীতে তাবলীগ জামাত তাদের ইজতেমা (সমাবেশ) এর আয়োজন করে আসছে প্রাথমিক পর্যায়ে সেটা ওই জামাত ও ওই মতবাদীদের মহা সমাবেশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হত। পরবর্তীতে ইসলামী শব্দের ব্যাবহার ও আখেরী মুনাজাত এর আয়োজনের ফলে দেশের অন্যান্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণও তাতে শরীক হতে থাকে। (যদিও ওই জামাতের অন্যতম মুরব্বী চট্রগ্রামের মুফতী ফয়যুল্লাহ সাহেব জামাতবন্ধী হয়ে হাত তুলে মুনাজাত করার ঘোর বিরোধী। তিনি সেটা বিদআত ও নিসিদ্ধ বলে ফতোয়া দেন)। বিদেশ থেকেও কিছু লোক ওই ইজতিমায় শরীক হয় বলে প্রচার করা হয়। বস্তুতঃ ওই মেহমানরা হয়তো একই মতবাদের প্রচারক নতুবা ওই জামাতের প্রচারকদের দ্বারা প্রভাবিত ও আমন্ত্রিত। ব্যাপক প্রচারণা ও ব্যবস্থাপনার কারণে ওই ইজতিমা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। এ সুবাদে তারা সেটাকে এক পর্যায়ে হজ্বের সাথে তুলনা করতে লাগল এবং হজ্বের পর মুসলমানদের বৃহত্তম জমায়েত ইত্যাদি বিশেষণ দিয়ে ব্যাপকতর প্রচারে লিপ্ত হল কিন্তু তা সচেতন মুসলমানদের দৃষ্টি ও শ্রবনকে বিদ্ধ করল। তারা এবং দেশের বিবিন্ন প্রচারমাধ্যমে এ ধরনের অমূলক তুলনার সম্যলোচনা করল। ফলে ২০০৬ সাল থেকে তুলনামুলক বিশেষণ বাদ দিয়ে সেটাকে বলা হয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বৃহত্তম সমাবেশ ও মানবতার মহামিলন ইত্যাদি।
এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে দেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মহামান্য প্রধানগন আপন আপন ক্ষমতায় থাকাকালে তাবলীগ জামাতের আবেদনের ভিত্তিতে টঙ্গীর বিরাট , ভু-খন্ড তাদেরকে প্রদান করেছেন আর উভয় দলই ইসলামের জন্য তাদের অবদানের তালিকায় এদের প্রতি প্রদর্শিত বিরাট বদান্যতাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে থাকে। ক্রমশঃ প্রাত্যেক ক্ষমতাসীন সরকারের আন্তরিকতা আরো ব্যাপক হতে থাকে   তাছাড়া বিটিবি এবং দেশের কিছু পত্র পত্রিকা ইত্যাদির প্রচারণা, সরকারের বিশেষ ব্যবস্তাপনা, মহামান্য রাষ্টপ্রদান ও মাননীয় সরকার প্রধান, সম্মানিত বিরোধী দলীয় প্রদান ও রাজীনৈতিক নেতৃবৃন্দের ওই মুনাজত এ শরীক হওয়া ইত্যাদি কারণে টঙ্গীর জমায়েতের পরিসর ক্রমশঃ বিগত বছরগুলোকেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। অবশ্য, এ সম্পর্কে দেশের প্রচার মাধ্যমগুলোর বদান্যতায় অনেকে বিস্তারিতভাবে চেনেছেন সব মিলিয়ে এখন সেটা তাদের ভাষায় বিশ্ব ইজতিমা।
উল্লেখ্য, প্রায়শঃ তাবলীগ জামাতের জন্মস্তান ভারত থেকে আগত দিল্লীর কেন্দ্রীয় তাবলীগ জামাতের সদস্য ও শীর্ষ মুরব্বী মুনাজাত পরিচালনা করেন অংশগ্রহণকারীরাও একযোগে আ-মীন বলেন। অনেকে কান্নাকাটিও করেন বৈ-কি। এখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে- একদিকে সরকার তো তার দায়িত্ব পালন করেছে আর সরলপ্রাণ মুসলমানরাও অন্তত এক বড় জমায়েতে মুনাজাত করাকে একটি বিরাট ধর্মীয় কাজ মনে করছেন, অন্যদিকে এটা অত্যান্ত  দুঃখের সাতে আশঙ্কাও করা যাচ্ছে যে তাবলীগ জামাতের চতুর্থা ও দেশের মুসলমানদের সরলতা, সর্বপরি সচেতন সুন্নী মুসলমানদের নীরবতা ওই তাবলীগ জামাতের আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্যকে এক গাঢ় আড়ালে দ্রুত ঢাকা দিতে যাচ্ছে কিনা। আর এ আড়ালের সুবাদে তারাও এ দেশকে সহসা ওহাবীরাষ্টে পরিণত করার সুযোগ নিতে যাচ্ছে কিনা তদুপরি, বর্তমানে দমিত ও গা-ঢাকা দেওয়া জঙ্গি খারেজী (জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদ ইত্যাদি) অদুর ভবিষ্যত এক পর্যায়ে গিয়ে আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে যাচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখার সময় এসেছে।
তাই আমি সচেতন সুন্নী ওলামা ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে এ তাবলীগ জামাত ও তাদের মূল উাদ্দেশ্য এবং এ জামাতের এ পর্যন্ত কর্মকান্ডের ফলাফল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করার চেষ্টা করব যাতে ইজতিমার বিশালতা ও মুনাজাত এর আড়ম্বরতায় মুগ্ধ হয়ে এদেশের মুসলমানগন তাদের আসল পরিচয় ভুলে না বসেন। আমি আমার ঈমানী দায়িত্ব টুকু পালন করতে চাই  সেটার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন যারা তাদেরকে নির্বিচারে ইসলামী জামাত মনে করেন বিশেষভাবে তারা এবং সাধারণভাবে অন্যরা।
তাবলীগ জামাতের গোড়ার কথা।
এ কথা সুস্পষ্ট যে ভারতের সাইয়্যিদ আহমদ ব্রেলভী ও মৌলভী ইসমাঈল দেহলবী সৌদিয়া থেকে এ উপমহাদেশে ওহাবী মতবাদ সর্বপ্রথম আমদানি করার পর ভারতে নাদওয়াতুল ওলামা ও দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা ইত্যাদি ওহাবী মতবাদের গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ  দেওবন্দ মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হলেন- মৌং মুহাম্মদ কাসেম নানুতবী। আর মৌং আশরাফ আলী থানভী মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী এবং মৌং খলীল আহমদ আন্বেটবী প্রমুখ ছিলেন এ উপমহাদেশে ওই মতবাদ প্রচারের পুরোধা। এ মৌং আশরাফ আলী থানভী সাহেবের অন্যতম প্রধান শীষ্য ছিলেন মৌং ইলিয়াস সাহেব এ মতবাদ প্রচারের জন্যই তাবলীগ জামাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ জামাত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন যে, তাবলীগ জামাতের কর্মপদ্ধিতি হবে তার নিজের উদ্ভাবিত কিন্তু প্রচারের বিষয়বস্তু ও শিক্ষা হবে তার পরম  শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মৌং আশরাফ আলী থানভীর।
[তাবলীগী জামাআত খত্বরনাক কৃত মাওলানা এরশাদ আল কাদেরী ভারত]
এখন দেখুন মৌং আশরাফ আলী থানবী সাহেবের শিক্ষা কি? তার আক্কিদা ও শিক্ষা হচ্ছে অবিকল সমস্ত দেওবন্দী আলিমদের আক্বীদা ও শিক্ষা। আর এ আক্বীদা ও শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের একমাত্র উদ্দেশ্যেই মৌং ইলয়াস সাহেব কায়েম করেছেন তাবলীগের ছয় উসূল। গোটা তাবলীগ জামাতই এ ছয় উসূল প্রতিষ্ঠা করে বেড়ায়। টঙ্গীর  তথাকথিত বিশ্ব ইজতিমায় ছয় উসূল ও তাদের বাস্তবায়ন নিয়ে চিল্লাবদ্ধ মুসল্লীদের উদ্দেশে হিদায়াতী (নিদ্যেশনামূলক)  বয়ান দেওয়া হয়।
[দৈনিক পূর্বকোণ, ২৯ জানুয়ারী ২০০৬ সংখ্যা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য ওই ছয় উসূলের ইসলামের পঞ্চবুনিয়াদ থেকে নেয়া হয়েছে মাত্র দুটি। যথা- ১. কালেমা ও ২. নাময। আর বাকী ৪ টা হচ্ছে ৩.ইকরামুল মুসলিমীন,৪. তাসীহ-ই নিয়্যাত (উদ্দেশ্য ঠিক করা)।
আর মৌং আশরাফ আলী থানেভীসহ দেওবন্দী দের আক্বীদা ও শিক্ষা হচ্ছে-
১. আল্লাহ মিথ্যা বলতে পারেন।
[ফতোয়া-ই- রশীদিয়া, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯, কৃত মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
২. আল্লাহ আগে জানেন না বান্দা কি কাজ করবে। বান্দা যখন কাজ সম্প্ন করে নেয় তখনই আল্লাহ তা জানতে পারেন।
[তাপসীর-ই- বুলগাতুল হায়রান পৃষ্ঠা ১৫৭-৫৮, কৃত মৌং হুসাইন আলী দেওবন্দী]
৩. শয়তান ও মালাকুল মাওত এর জ্ঞান হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার চেয়ে বেশি।
[বারাহীন-ই ক্বাতিআহ পৃষ্ঠা- ৫১ কৃত খলীল আহমদ আম্বেটভী দেওবন্দী]
৪. আল্লাহর নবীর নিকট নিজের পরিণতি এবং দেয়ালের পিছনের জ্ঞানও নেই।
[বারাহীন-ই ক্বাতি আহ পৃষ্টা ৫১, কৃত খলীল আহমদ আম্বেটভী দেওবন্দী]
৫. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা তেমনি জ্ঞান দান করেছেন যেমন জ্ঞান জানোয়ার পাগর এবং শিশুদের নিকট রয়েছে।
[হিফজুল ঈমান পৃষ্ঠা-৭ কৃত মৌং আশরাফ আলী থানভী দেওবন্দী]
৬. নামাযে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার প্রতি শুধু খেয়াল যাওয়া গরু গাধার খেয়ালে ডুবে যাওয়া অপেক্ষাও মন্দতর।
[সিরাতে মু্স্তাকিম পৃষ্ঠা-৮৬ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
৭. রাহমাতুল্লীল আলামীন (সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার খাস উপাধি নয় নবীজী ছাড়া অন্যন্য বুযুর্গকেও রাহমাতুল্লিল আলামীন বলা যেতে পারে।
[ফতোয়া-ই রশীদিয়া ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা-১২ কৃত মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
৮. খাতামুন্নাবিয়্যিন অর্থ আখেরী বা শেষনবী বুঝে নেওয়া সাধারন লোকদের খেয়াল মাত্র জ্ঞানী লোদের মতে এ  অর্থ বিশুদ্ধ নয়। হুযুর আকরামের যুগের পরও যদি কোন নবী পয়দা হয় তবে হযররত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার শেষ নবী হওয়ার কোন ক্ষতি হবে না।
[তাহযীরুন্নাছ পৃষ্ঠা-৩ ও ২৫৪ কৃত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মৌং কাসেম নানুতবী]
৯. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেওবন্দের আলেমদের সাথে সম্পর্কের সুবাদে উর্দু শিখতে পেরেছেন।
[বারাহীন-ই ক্বাতিয়াহ, পৃষ্ঠা ২৬ কৃত মৌং খলীল আহমদ আম্বেটভী দেওবন্দী]
১০. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার সম্মান শুধু বড় ভাইয়ের মতই করা চাই।
[তাক্বভিয়াতুর ঈমান পৃষ্ঠা-৫৮ কৃত মৌং ঈসমাঈল  দেহলভী ওহাবী]
১১. আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমকক্ষ কোটি কোটি পয়দা করতে পারেন।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা ১৬ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
১২. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মরে মাটিতে মিশে গেছেন।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৫৯ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
১৩. নবী প্রতিটি মিথ্যা থেকে পবিত্র ও মাসুম হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
[তাক্বভিয়াতুল আকাঈদ পৃষ্ঠা ২৫ কৃত মৌং কাসেম নানুতবী]
১৪.নবী রাসূল সবাই অকেজো।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৬২৯ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী]
১৫. নবীর প্রশংসা শুধু মানুষের মতই কারো বরং তা অপেক্ষাও সংক্ষিপ্ত কর।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা ৬১ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
১৬. বড় মাখলুক অর্থাৎ নবী আর ছোট মাখলুক অর্থাৎ অন্যসব বান্দা আল্লাহর শান বা মর্যাদার সামনে চামার অপেক্ষাও নিকৃষ্ট।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা ১৪ কৃত  মৌং ইসমাঈল দেহলবী ওহাবী]
১৭. বড় অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর ছোট অর্থাৎ অন্যসব বান্দা বেখবর ও অজ্ঞ।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৩ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
১৮. নবীকে তাগুত (শয়াতান বলা জায়েয।
[তাফসীর-ই বুলগাতুল হায়রান পৃষ্ঠা-৪৩ কৃত মৌং হুসাইন আলী ওয়াভচরান  ওয়ালা]
১৯. নবীর মর্যাদা উম্মতের মধ্যে গ্রামের চৌধুরী ও জমিদারের মত।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৬১ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
২০. যার নাম মুহাম্মাদ কিংবা আলী তিনি কোন কিছুই করতে পারেন না।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৪১ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
২১. উম্মত বাহ্যিকভাবে আমলের মধ্যে নবী থেকেও বেড়ে যায়।
[তাহযীরুন্নাছ পৃষ্ঠা-৫ কৃত দারুল উলুম  দেওবন্দ মাদরাসা অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মৌং কাসেম নানুতভী]
২২. দেওবন্দী মোল্লা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পুলসেরাত হতে পতিত  হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন।
[তাফসীর-ই বুলগাতুল হায়রান পৃষ্ঠা-৪৩ কৃত মৌং হুসাইন আলী ওয়াভচরান ওয়ালা]
২৩. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আশরাফ আলী রাসুলুল্লাহ আর আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সায়্যিদিনা ওয়া নবীয়্যিনা আশরাফ আলী বলার মধ্যে সান্ত্বনা রয়েছে কোন ক্ষতি নেই।
[রিসালা-ই ইমদাদ পৃষ্ঠা-৩৫ সফর-১৩৩৬ হিজরি সংখ্যা]
২৪. মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করা তেমনি যেমন হিন্দুরা তাদের কানাইয়্যার জন্মদিন পালন করে।
[বারাহীন-ই ক্বাতিয়াহ পৃষ্ঠা-১৪৮ কৃত মৌং খলীল আহমদ আম্বেটভী দেওবন্দী]
২৫. আল্লাহর সামনে সমস্ত নবী ও ওলী একটা নাপাক ফোটা অপেক্ষাও নগণ্য।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৫৬ কৃত মৌং ইসমাঈল  দেহলভী ওহাবী]
২৬. নবীকে নিজের ভাই বলা দুরস্ত।
[বারাহীন-ই ক্বাতিয়াহ পৃষ্ঠা-৫৬ কৃত মৌং খলীল আহমদ আম্বেটভী দেওবন্দী]
২৭. নবী ও ওলীকে আল্লাহর সৃষ্টি ও বান্দা জেনেও উকিল এবং সুপারিশকারী মনে করে এমন মুসলমান সাহায্যের জন্য  আহবানকারী ও নযর নিয়াযকারী মুসলমান আর কাফির আবু জাহল শির্কের মধ্যে সমান ।
[তাক্বভিয়াতুল ঈমান পৃষ্ঠা-৭-২৭ কৃত মৌং ইসমাঈল দেহলভী ওহাবী]
২৮. দরূদ ই তাজ অপছন্দনীয় এবং পাঠ করা নিষেধ।
ফযাইলে দরূদ শরীফ পৃষ্ঠা-৯২ ফাযাইলে আমল তথা তাবলীগী নেসাব থেকে পৃথক্বৃত]
২৯. মীলাদ শরীফ মিরাজ শরীফ ওরস শরীফ খতম শরীফ চেহলামে ফাতিহাখানি এবং ঈসালে সাওয়াব সবই নাজায়েয ভুল প্রথা বিদআত এবং কাফির ও হিন্দুদের প্রথা।
[ফতোয়া-ই রশীদিয়া ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা-৯৩-৯৪, কৃত মৌং রশদি আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
৩০. প্রসিদ্ধ কাক খাওয়া সাওয়াব।
[ফতোয়া-ই রশীদিয়া ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা-১৩০ কৃত মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
৩১. হিন্দুদের হোলী দেওয়ালীর প্রসাদ ইত্যাদি জায়েয।
[ফতোয়া-ই রশীদিয়া ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা-১৩২ কৃত মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
৩২. ভাঙ্গী চামারের ঘরের রুটি ইত্যাদির মধ্যে কোন দোষ নেই যদি পাক হয়।
[ফাতোয়া-ই রশীদিয়া ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ১৩০ কৃত মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
৩৩. হিন্দুদের সুদী টাকায় উপার্জিত অর্থে কূপ বা নফকূপের পানি পান করা জায়েয।
[ফতোয়া-ই রশীদিয়া ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা ১১৩-১১৪ কৃত মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী দেওবন্দী]
নাঊযুবিল্লাহ সুম্মা নাউযু বিল্লাহ মিনহা।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে তাবলীগ জামাতের আক্বীদা ও আমল দেওন্দী ওহাবীদের আক্বীদা ও আমলের সাথে মোটেই বিরোধপূর্ণ নয় বরং এক ও অভিন্ন।
এসব আক্বিদা ও আমলকে তাবলীগ জামাত তা ছয় উসূলের মাধ্যমে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎপর। টঙ্গীর ইজতিমার প্রধান লক্ষ্যও এটাকে আরো ব্যাপক করা।
২০০৬ সালের তাবলীগী ইজতিমার খবরে প্রকাশ ইজতিমা প্যান্ডেলের উত্তর দিকে স্থাপিত তাশকীলের কামরায় নতুন করে বিভিন্ন মেয়াদের চিল্লায় তালিকাভুক্ত মুসল্লীদের স্থান দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত জামাতীদের বিভিন্ন খেত্তা থেকে তাশকীলের কামরায় আনা হয় এবং জামাতবন্দী করা হয়। তালিকাভুক্ত হয়েছেন (২য় দিনে) প্রায় ছয় হাজার। চুড়ান্তভাবে এলাকা ভাগ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব মুসল্লীকে কাকরাইল মসজিদ থেকে জামাতবন্দী করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ও বিদেশে পাঠানো হবে।
[দৈনিক পূর্বকোন,-২৯ জানুয়ারী ২০০৬]
সুতরাং তাবলীগ ও তাদের ইজতিমা সম্পর্কে নিম্বলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি মনযোগ দেওয়া জরুরি মনে করি-
প্রথমতঃ যে কোন আমল ক্ববুল হবার পূর্বশর্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ আক্বীদা। আর এ বিশুদ্ধ আক্বীদা হচ্ছে একমাত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর আক্বাইদ। ভ্রান্ত আক্বাইদ পোষণ করলে কোন আমলই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না।
দ্বিতীয়তঃ ইসলামের একমাত্র সঠিক রূপরেখা হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়েতের সম্পূর্ণ বিপরীত। বস্তুতঃ তাদের আক্বীদা ও আমল ওই খারেজী মতবাদেরই অনুরূপ, যারা পবিত্র হাদিসের ভাষায় ইসলামী নামের ভ্রান্ত ৭২ বহাত্তর দলের মধ্যে সর্বপ্রথম দল। [সিহাহ ও শরহে মাওয়াক্বিফ ইত্যাদি]
তৃতীয়তঃ ওহাবী তাবলীগপন্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ সরকারের অধীনে পরিচালিত বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এর পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেনা তারা অনুসরণ করে  ভারতের দেওবন্দ মাদরাসার পাঠ্যাক্রম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি।[দৈনিক ইনকিলাব এ প্রকাশিত ক্রোড়পত্র]
উল্লেখ্য আহলে হাদীসের ড. গালিব শায়খ আবদুর রহমান সিদ্দীকুর রহমান বাংলাভাই প্রমুখ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত তাদের সংগঠনগুলোর সদস্যরা হয়তো এসব খারেজী মাদরাসায় শিক্ষাপ্রাপ্ত নতুবা তাবলীগপন্থী। (বিটিভিতে প্রচারিত অনুতাপ কারীদের কেউ কেউ স্বীকারও করেছে যে তারা তাবলীগপন্থী)।
তাছাড়া আহলে হাদীস সম্প্রদায়টি মূলতঃ ওহাবীদের একটি অংশ। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে আহলে হাদীসের লোকেরা মাযহাব মানেনা। অন্যান্য আক্বীদা ও আমল প্রায় এক ও অভিন্ন। সুতরাং তাবলীগ জামাতের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে প্রকারান্তরে ওই সব ধর্মের নামে বিশৃঙ্খলাবাদীদের ক্ষমতাবৃদ্ধির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেবার মত নয়।
চতুর্থতঃ এদেশে সুন্নী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ওহাবীরা নয়। কিন্তু এসব ওহাবী ক্বওমী তাবলীগীরা সংখ্যালুঘু সুরভ ঐক্য বাহ্যিক বেশ ভূয়া জামাতবন্দিতা ও সুচতুরতা সর্বোপরি একই মতবাদী বিদেশীদের পৃষ্ঠপোষকতা (যেমন- বর্তমান সৌদিয়া প্রভাবিত আরবীয়রা) এবং অব্যাহত কর্মতৎপরতার মাধ্যমে তাদের অবস্থানকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ের বলে প্রদর্শণ করে আসছে। এরই পরম্পারায় এরা প্রাগ একাত্তরকালীন  সময়ে পাকিস্তানী হানাদারদের ছত্রছায়ায় কোন ভুমিকায় ছিল তা হয়তো দেশবাসী বিভিন্ন কারণে ভুলে যাচ্ছে বিগত জোট সরকারের সাথে অংশীদারিত্বের সুবাদে তারাই সুন্নী মুসলমানদের উপর নানাভাবে আঘাত হানতে আরম্ভ করেছিল বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। হযরত শাহ জালাল  রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মাযারে ওরসে মুনাজাত চলাকালে বোমা মেরে যা ইরীন হত্যা ওই মাযার এবং চট্রগ্রামের হযরত বায়েজীদ বোস্তমী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মাযারের পুকুরে বিষ প্রায়োজ করে মাছ ইত্যাদি হত্যা করা এরই প্রকৃষ্ঠ দৃষ্টান্ত বৈ-কি। (তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পানা সম্পর্কে এখনো জানা যায়নি।
পঞ্চমতঃ তাবলীগী ইজতিমার এ কয়েক বছরের জমায়েতকে তারা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামী জমায়েত বলে চমক লাগাতে চাচ্ছে অথচ পাকিস্তানের মুলতানে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত সুন্নী তাবলীগ দাওয়াহ-ই ইসলামীর জমায়েত এটার চেয়ে বড় বলে জানা গেছে। সে দেশের কোন কোন পত্রিকা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায় প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৪৫ লক্ষাধিক মুসলমানের জমায়েত হয় বলে জানা যায় যদিও পাকিস্তানে সরকার কিংবা খোদ দাওয়াত-ই ইসলামীর (সবুজ পাগড়িধারী সুন্নী তাবলীগ জামায়াত) পক্ষ থেকে সেটার ব্যাপকভাবে প্রচারটুকুও করা হয় না।
ষষ্ঠতঃ বিশ্বের কয়েকটা দেশের নিছক ওহাবী তাবলীগীদের কিছু লোকের উপস্থিতির কারণে এ ইজতিমাকে বিশ্ব ইজতিমা হজ্বতুল্য জমায়েত ইত্যাদি বলার পক্ষে যুক্তি অগ্রহণযোগ্য। দেশ বিদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী খাটি সুন্নী নবী ওলীগণের প্রকৃত আশেক ভক্ত সুন্নী পীর মাশাইখ ও তাদের ভক্ত মুরীদান এবং মাযারভক্ত মুসলমানরা এ তাবলীগ জামাত এবং ওহাবী খারেজীদেরকে তাদের জঘন্য আক্বীদাও কর্মকাণ্ডের কারণে মোটেই পছন্দ করেন না বরং মানুষের ঈমান আক্বীদা এমনকি বিভিন্ন কারণে দেশ ও জাতির শান্তি সমৃদ্ধির পথে হুমকি মনে করেন তা সরেযমীনে তদন্ত বা জরীপ চলালে সুস্পষ্ঠভাবে বুঝা যাবে। তদুপরি একটি সুন্নী মতাদর্শ বিরোধী সম্পদায়ের কর্মকাণ্ডকে ক্রমশঃ দেশের জাতীয় কর্মসূচীতে পরিণত করার মত বদান্যতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদেরকে উৎসাহিত করার ফলে ক্ষমতাসীন সরকার দেশের বৃহত্তম সুন্নী জনগোষ্ঠীর বিগভাজন হচ্ছে কিনা তাও সরকারের ভেবে দেখা দরকার কারণ এ তাবলীগী ওহাবীদের উত্থানকে দেশের সুন্নী মুসলমানগণ এক অশুভ সঙ্কেত বলে মনে করেন এ সঙ্কেত কখনো বাস্তবরূপ ধারণ করলে তা কারো জন্য মঙ্গলময় হবে না বলা যায় বিভিন্ন যুক্তির ভিত্তিতে ওই টঙ্গীতে ইজতিমাস্থলকে সব মুসলমানের জন্য উন্মুক্ত  করে দেওয়ার জন্য কোন  কোন মহল দাবী তুলেছেন বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গঃ উল্লেখ্য যে এভাবে তারা নিজেরদের পকৃত পরিচয় গোপন করতে গিয়ে একতরফাভাবে এমনি প্রচারণ চালিয়ে এসেছে যে এখন তাদের আসল পরিচয় তুলে ধরলে অনেকের নিকট অবিশ্বাস্য মনে হবে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে এমন জামাত ও জামাতের মুরব্বীদের এ ধরনের জঘন্য আক্বীদা থাকতে পারে উদাহরণস্বরূপ তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মৌং ইলয়াসের শিক্ষাগুরু ও অনুকরনীয় বুযুর্গ এবং উপমাহদেশে গাটা ওহাবী সম্প্রদায়ের নিকট বরণীয় ব্যাক্তি তাদের হাকীমুল উম্মত মৌং আশরাফ আলী থানভী সাহেবের কথা ধরুন। ওহাবীরা প্রচার করেছে তিনি বড় বুযুর্গ ব্যাক্তি ছিলেন। তার নামে রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন বহু কিতাব পত্রও তিনি লিখেছেন। কিন্তু যখনই বলা হবে যে তিনি তার লিখিত হিফযুল ঈমান এ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার জ্ঞানকে জানোয়ার পাগল ও শিশুদের জ্ঞানের সাথে তুলনা করে কুফরী করেছেন তাকে আলা হযরত ইমাম শাহ আহমদ রেজা ব্রেলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হেরমাঈন শরীফাঈনের ৩৩ জন আলিম তার এবং আরো কয়েকজন দেওবন্দী আলিমের কুফর প্রমাণিত করে এ ফতোয়া জারী করা সত্ত্বেও তিনি তার কুফরী  বাক্যকে প্রত্যাহার করে ঈমানের পথ অবলম্বন করেননি বরং তার মৃত্যুর পর দেওবন্দী  ওহাবীরাও তার ভুল স্বীকার করেননি তখন হয়তো অনেকে আতকে ওঠবেন আর দেওবন্দী ভাবধারার ওহাবী তাবলীগীরা বলে বেড়াবেন সুন্নীরা তাদের মুরুব্বীকে কাফের বলছেন ইত্যাদি।
এখানে একটি কথা বিশেষভাবে রক্ষণীয় যে ওহাবী তাবলীগী দেওবন্দীরা তাদের মুরব্বীদের কুফরীকেও মেনে নিয়ে তাদের পক্ষে প্রচারণ চালানোর যতই বাহ্যিক চাকচিক্যপূর্ণ আয়োজন করুক না কেন উপমহাদেশের সুন্নী মুসলমানগণ তাদের মিষ্টি কথায় ভুলেনি ভুলবেও না বরং তাদের ও তাদের মুরব্বীদের কুফরী ও গোমরাহীপূর্ণ আক্বীদাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়ে তাওবা পূর্বক আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতাদর্শ অবলম্বন না করা পর্যন্ত তাদের সাথে কোনরূপ আপোস করবেন না করতেও পারেন না। আর এ জন্য কোন বিবেকবান মানুষ সুন্নীদেরকে দায়ীও করবেন না। কারণ ধর্মে বিভ্রান্তি ছাড়ানোর জন্য ওই ওহাবী দেওবন্দীরাই দায়ী সুন্নীগণ এ ক্ষেত্রে তাদের ঈমানী দায়িত্ব পালন করেন মাত্র।
সপ্তমতঃ প্রসঙ্গতঃ সচেতন সুন্নী কর্ণধারবুন্দেন ঈমান দায়িত্ব পালন ও দেওবন্দী ওহাবীদের হটকারিতা প্রসঙ্গে আলোচনা করার প্রয়াস পেলাম। বারতে ওহাবী মতাবাদ প্রচারের প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলভী ইসমাঈল দেলভী মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর বিতর্কিত পুস্তক কিতাবুত তাওহীদ এর ভাবানুবাদ তাক্বভিয়াতুল ঈমান প্রকাশ করে বিশেষতঃ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমকক্ষ থাকা সম্ভব বলে প্রচার করে খাতামুন্নাবিয়্যিন ইত্যাদি গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত আরো কেউ আত্মাপ্রকাশ করাও সম্ভব বলে ফেললো তখন আহরে সুন্নাতের ওলামা-ই কেরাম বিশেষ করে খাতেমুর হুকামা আল্লামা মুহাম্মদ ফযলে হক খায়রবাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাদের ওই ভুল ও ঈমানবিধ্বংসী দৃষ্টিভঙ্গির খণ্ডন করেছেন লিখিত ও মৌখিকভাবে। তবুও না ইসমাঈল দেহলভী তার কথা প্রত্যাহার করেছে,
তাছাড়া মীর্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী ভণ্ড নবূয়্যতের দাবিদার হয়ে মুরতাদ হল। মুসলমানরা একবাক্যে তাকে ধিক্কার দিল। এ দেশের সুন্নীদের সাথে ওহাবীরাও তাকে কাফির-মুরতাদ বলার ক্ষেত্রে সুর মিলানো তারা সেটাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে ক্বাদিয়ানীদের অমুসলমান ষোষণা করার দাবিও করেছে। অথচ ইতোপূর্বে তাদেরই মুরব্বী দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মৌং কাসেম নানুতভী কোরআনী আয়াতের খাতাম শব্দের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পরে কোন নবী আসলে নবীজির শেষনবী হবার মধ্যে অসুবিধা নেই বলে ফতোয়া দিয়ে ওই গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর জন্য পথ খুলে দিয়েছেন। দেওবন্দী মুফতী মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব বলে ফতোয়া দেন। মৌং খলীল আহমদ আম্বেটভী নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জ্ঞানকে পশু শিশু ও পাগলের জ্ঞানের সাথে তুলনা করেছেন। বস্তুতঃ এসব মন্তব্য যে যথাক্রমে আল্লাহ ও তার হাবীবের শানে জঘন্য বেআদবী হবার কারণে নিশ্চিত কুফর তা বিবেকবান মাত্রই বলতে পারে।
ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাদ্দিদে মিল্লাহ শাহ ই বেরেলী ইমাম আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাদের ওই সব মুন্তব্য ও আক্বীদা গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। শতাধিকবিষয়ের বিশারদ সহস্রাধিক গ্রন্থ পুস্তকের রচয়িতা অদ্বিতীয় ফিক্বহাশাস্ত্রবিদ আলা হযরতের দৃষ্টিতেও ওই সব মন্তব্য নিশ্চিত কুফর বলে সাব্যস্ত হলে তিনি প্রত্যেকের নিকট জবাব চিঠি লিখেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন তাদেরকে সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনরূপ  জবাব কিংবা অনুশোচনা পত্যাহারের মনোভাব না পেয়ে বরং হঠকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ১৩২০ হিজরিতে আল মুতামাদ আল-মুন্তাক্বাদ প্রণয়ন করে মীর্যা ক্বাদিয়ানী মৌং কাসেম নানুতভী ,মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী , মৌং খলীল আহমদ আম্বেটভী এবং মৌং আশরাফ আলী থানভীর উপর ওই সব মন্তব্যের ভিত্তিতে কুপরের ফতোয়া আরোপ করলেন। (এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রণীত হয় আল মুতামাদ আল মুস্তানাদ নামে)।
অষ্ঠমতঃ সর্বোপরি টঙ্গীর ইজতিমার সফর করে যাওয়া তাদের মুরব্বীদের ফতোয়া অনুযায়ীও হারাম এবং অবৈধ। কারণ, তাবলীগ জামাত-এর উৎসপুরুষ হলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী। এ ইবনে আব্দুল ওহাবের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুরু হলেন ইবনে তাইমিয়্যাহ। দেওবন্দী আমিরগণও ইবনে তহাইমিয়্যার চিন্তাধারার সমর্থক। ইবনে তাইমিয়্যার মতে, তিন মসজিদ ব্যাতীত অন্য কোথাও এমনকি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বরকতময় যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সপর করা যাবে না। তারই অনুসরণে মৌং আব্দুর রহীম ওহাবী তার সুন্নাত ও বিদআত এর মধ্যে লিখেছেন নবী করিম  এর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবেনা যেতে চাইলে মসজিদে নববীর যিয়ারত বা তাতে নামায পড়ার উদ্দেশ্যেই যেতে হবে। ওহাবীপন্থী যেমন- মি. মওদূদী ওহাবী প্রমুখ খাজা গরীবে নাওয়াজ ও হযরত সালার-ই মাসঊদের মাযারে যাওয়াকে জঘন্য  পাপ বলে ফতোয়া দিয়েছে অথচ নবী করিম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওযা ই পাকের যিয়ারত সম্পর্কে হাদীস শরীফে বহু ফযীলত বর্ণিত হয়েছে পবিত্র  ক্বোরআনে নবীজির দরবারে যাওয়ার মহা উপকার এরশাদ হচ্ছে। বিশ্বের ইমামগণ পর্যন্ত নবীপাক এবং ওলীগণের রওযা ও মাযার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করেছেন। কিন্তু টঙ্গীর উদ্দেশ্যে সফর করার তাতে হাজ্বীদের মত অবস্থান করার এবং তাদের চিল্লাগুলোয় যোগদান করে জামাতবন্দী হয়ে ওহাবিয়্যত প্রচার করার পক্ষে শরীয়তের কোন প্রমাণ তো নেইই বরং উল্টো তাদের মুরব্বীদের ফতোয়া কঠোরভাবে নিষেধই পাওয়া যায়। সহীহ হাদীস শরীফে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন ইয়া কুম-ওয়া-ইয়া-হুম (তোমরা তাদের কাছে যেওনা তাদেরকে তোমাদের কাছে আসতে দিওনা)। অথচ এ ইজতিমা আসলে তাবলীগীরা তো আছেই তাদের সঙ্গে সরলপ্রাণ মুসরমানগণ জরুরি কাজ-কর্ম বাদ দিয়ে ওদিকে ধাবিত হয়। অফিস-আদালত, এমনকি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কাজ-কর্ম পর্যন্ত ব্যাহত হয়। সরকারকে ব্যাস্ত থাকতে হয়, তাদেরকে সামাল দিতে। রেল কর্তৃপক্ষ ঠিকমত ভাড়া পায় কিনা তাও সন্দেহপূর্ণ।
পরিশেষে, কারো নিছক বাহ্যিক অবস্থা দেখে ভুলে না গিয়ে তার মূল ও প্রকৃত অবস্থার খোজ-খবর নিয়ে পা বাড়ানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথায়, মহাক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অনিবার্য। উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হর যে, তাবলীগ জামাত ও তাদের ইজতিমার বাহ্যিকরূপ যা-ই হোক না কেন তাদের মূল হচ্ছে ওহাবী খারেজীর মতবাদ অনুসরণ। তাদের আসার উদ্দেশ্যেই হচ্ছে এ দেশে ওহাবী মতবাদ প্রচার করা। এ মতবাদ সুন্নী মতাদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই তাদের ইজতিমা ও মুনাজাতেরও কোন গুরুত্ব নেই। ইসলামে তাবলীগ বা অমুসলমানদের নিকট ধর্মপ্রচার এবং তালীম বা দ্বীনের বিসয়াদির শিক্ষাদানের গুরুত্ব আছে সুতরাং এ তাবলীগ ও তা‘লীমের প্রসার উভয় জগতের কল্যাণ বয়ে আনবে যদি ইসলামের সঠিক রূপরেখার (সুন্নী মতাদর্শের) প্রচারণা ও শিক্ষা দেওয়া হয়। সুখের বিষয় যে, মাওলানা ইলিয়া আত্ত্বার ক্বাদেরী রেজভী সাহেব দাওয়াত-ই ইসলামী প্রতিষ্ঠা করে মুসরমানদের এ চাহিদা পূরণ করেছেন। সবুজ পাগড়ী তাদের বিশেষ চিহ্ন। সুন্নাতের অনুসরণ তাদের ভূষণ। তাই, এ বিকল্প। আসুন আমরা যেন সবসময় সুন্নী মতাদর্শের উপরই অটল থাকতে পারি। আল্লাহ পাক তাওফ্বীক্ব দিন আ-মী-ন্।

সুত্রঃ সুন্নীবার্তা

আঙ্গুলী চুম্বনের প্রমাণ

মুয়ায্যিন আযান দেয়ার সময় যখন ‘আশহাদুআন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ’  اَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللهِ  উচ্চারণ করে, তখন নিজের বৃদ্ধাঙ্গুরীদ্বয় বা শাহাদতের আঙ্গুল চুম্বন করে চুক্ষদ্বয়ে লাগানো মুস্তাহাব এবং এতে দীন-দুনিয়া উভয় জাহানের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অনেক হাদীছ বর্ণিত আছে। সাহাবায়ে কিরাম থেকে এটা প্রমাণিত আছে এবং অধিকাংশ মুসলমান একে মুস্তাহাব মনে করে পালন করেন। ‘প্রসিদ্ধ সালাতে মস্উদী’ কিতাবের দ্বিতীয় খন্ড نماز শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে- “হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি আযানে আমার নাম শুনে স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চোখের উপর রাখে, আমি ওকে কিয়ামতের কাতার সমূহে খোঁজ করবো এবং নিজের পিছে পিছে বেহেশতে নিয়ে যাব।)”
তাফসীরে রূহুল বয়ানে ষষ্ঠ পারার সূরা মায়েদার আয়াত وَاِذَا نَادَيْتُمْ اِلَى الصَّلوةِ الاية এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখিত আছে-
“মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ’ বলার সময় নিজের শাহাদাতের আঙ্গুল সহ বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখে চুমু দেয়ার বিধানটা জঈফ রেওয়াতের সম্মত। কেননা এ বিধানটা মরফু হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। কিন্তু মুহাদ্দিছীন কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে আকর্ষণ সৃষ্টি ও ভীতি সঞ্চারের বেলায় জঈফ হাদীছ অনুযায়ী আমল করা জায়েয।)
ফাত্ওয়ায়ে শামীর প্রথম খন্ড الاذان শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
আযানের প্রথম শাহাদত বলার সময়- صَلَّى اللهُ عَلَيْكَ يَارَسُوْلَ اللهِ (সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) বলা মুস্তাহাব এবং দ্বিতীয় শাহাদত বলার সময়- قُرةُ عَيْنِىْ بِكَ يَارَسُوْلَ اللهِ  (কুর্রাতু আইনী বেকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) বলবেন। অতঃপর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ স্বীয় চোখদ্বয়ের উপর রাখবেন এবং বলবেন- الَلهُمَّ مَتِّعْنِىْ بِالسَّمْعِ وَالْبَصَرِ (আল্লাহুম্মা মত্তায়েনী বিসসময়ে ওয়াল বসরে) এর ফলে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওকে নিজের পিছনে পিছনে বেহেশতে নিয়ে যাবেন। অনুরূপ কনযুল ইবাদ ও কুহস্থানী গ্রন্থে বর্ণিত আছে। ফাত্ওয়ায়ে সূফিয়াতেও তদ্রুপ উল্লেখিত আছে। কিতাবুল ফিরদাউসে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি আযানে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ‘ শুনে স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে, আমি ওকে আমার পিছনে বেহেশতে নিয়ে যাব এবং ওকে বেহেশতের কাতারে অন্তর্ভূক্ত করবো। এর পরিপূর্ণ আলোচনা ‘বাহারুর রায়েক’ এর টীকায় বর্ণিত আছে।
উপরোক্ত ইবারতে ছয়টি কিতাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- শামী, কনযুল ইবাদ, ফাত্ওয়ায়ে সূফিয়া, কিতাবুল ফিরদাউস, কুহস্থানী এবং ‘বাহারুর রায়েক’ এর টীকা। ওই সব কিতাবে একে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। مقاصد حسنه فى الاحاديث الدئره على السنة  নামক  গ্রন্থে ইমাম সাখাবী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন- ইমাম দায়লমী (রহঃ) ‘ফিরদাউস’ কিতাবে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে মুয়াযযিনের কন্ঠ থেকে যখন ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রসুলুল্লাহ‘ শোনা গেল, তখন তিনি (রাঃ) তাই বললেন এবং স্বীয় শাহাদতের আঙ্গুলদ্বয়ের ভিতরের ভাগ চুমু দিলেন এবং চক্ষুদ্বয়ে লাগালেন।  তা’দেখে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান যে ব্যক্তি আমার এই প্রিয়জনের মত করবে, তাঁর জন্য আমার সুপারিশ অপরিহার্য।” এ হাদীছটি অবশ্য বিশুদ্ধ হাদীছের পর্যায়ভুক্ত নয়।
উক্ত মাকাসেদে হাসনা গ্রন্থে আবুল আব্বাসের (রহঃ) রচিত মুজেযাত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে-
হযরত খিযির (আঃ) থেকে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি মুয়াযযিনের কণ্ঠে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ’ শোনে যদি বলে-

مَرْحَيًابِحَبِيْبِىْ وَقُرَّةِ عَيْنِىْ مُحَمَّدِ ابْنِ عَبْدِ اللهِ

(মারাহাবা বে হাবীবী ওয়া কুররাতে আইনী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ) অতঃপর স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে লাগাবে, তাহলে ওর চোখ কখনও পীড়িত হবে না।) উক্ত গ্রন্থে আরোও বর্ণনা করা হয়েছে- হযরত মুহাম্মদ ইবনে বাবা নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে এক সময় জোরে বাতাস প্রবাহিত হয়েছিল। তখন তাঁর চোখে একটি পাথরের কনা পড়েছিল যা বের করতে পারেনি এবং খুবই ব্যথা অনুভব হচ্ছিল।
যখন তিনি মুয়াযযিনের কণ্ঠে আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রসুলুল্লাহ শুনলেন, তখন তিনি উপরোক্ত দুআটি পাঠ করলেন এবং অনায়াসে চোখ থেকে পাথর বের হয়ে গেল। একই ‘মকাসেদে হাসনা’ গ্রন্থে হযরত শামস মুহাম্মদ ইবনে সালেহ মদনী থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি ইমাম আমজদ (মিসরের অধিবাসী পূর্ববর্তী উলামায়ে কিরামের অন্তর্ভূক্ত) কে বলতে শুনেছেন- যে ব্যক্তি আযানে হুযূর (সাল্লাল্লহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর নাম মুবারক শোনে স্বীয় শাহাদাত ও বৃদ্ধাঙ্গুলী একত্রিত করে-

وَقَبَّلَهُمَا وَمَسَحَ بِهِمَا عَيْنَيْهِ لَمْ يَرْ مُدْ اَبَدًا

উভয় আঙ্গুলকে চুম্বন করে চোখে লাগাবে, কখনও তার চক্ষু পীড়িত হবে না। ইরাক- আযমের কতেক মাশায়েখ বলেছেন যে, যিনি এ আমল করবেন, তাঁর চোখ রোগাক্রান্ত হবে না।

وَقَالَ لِىْ كُلّ مِنْهُمَا مُنذُ فَعَلْتُهُ لَمْ تَرْمُدْ عَيْنِىْ

কিতাব রচয়িতা বলেছেন- যখন থেকে আমি এ আমল করেছি আমার চক্ষু পীড়িত হয়নি।
কিছু অগ্রসর হয়ে উক্ত‘মকাসেদে হাসনা’গ্রন্থে আরও বর্ণিত হয়েছে-

وَقَالَ ابْنِ صَالِحٍ وَاَنَا مُنْذُ سَمِعْتُهُ اِسْتَعْمَلْتَهُ فَلَا تَرْمُدْ عَيْنِىْ وَاَرْجُوْا اَنَّ عَافِيَتَهُمَا تَدُوْمُ وَاِنِّىْ اَسْلَمُ مِنَ الْعَمى اِنْشَاءَ اللهُ

হযরত ইবনে সালেহ বলেছেন- যখন আমি এ ব্যাপারে জানলাম, তখন এর উপর আমল করলাম। এরপর থেকে আমার চোখে পীড়িত হয়নি। আমি আশা করি, ইনশাআল্লাহ এ আরাম সব সময় থাকবে এবং অন্ধত্ব মুক্ত থাকবো। উক্ত কিতাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ইমাম হাসন (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ‘ শোনে যদি বলে  এবং

مَرْحَبًا بِحَبِيْبِىْ وَقُرَّةُ عَيْنِىْ مُحَمَّدِ ابْنِ عَبْدِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে লাগাবে এবং বলবে-  لَمْ يَعْمَ وَلَمْ يَرْمَدْ তাহলে কখনও সে অন্ধ হবে না এবং কখনও তার চক্ষু পীড়িত হবে না। মোট কথা হলো ‘মাকাসেদে হাসনা’ গ্রন্থে অনেক ইমাম থেকে এ আমল প্রমাণিত করা হয়েছে। শরহে নেকায়ায় বর্ণিত আছে-
জানা দরকার যে মুস্তাহাব হচ্ছে যিনি দ্বিতীয় শাহাদতের প্রথম শব্দ শোনে বলবেন; صَلَّى اللهُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ (সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ) এবং দ্বিতীয় শব্দ শোনে বলবেন- قُرَّةُ عَيْنِىْ    بِكَ يَارَسُوْلَ اللهِ  (কুর্রাতু আইনি বেকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) এবং নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুক্ষদ্বয়ে রাখবেন, ওকে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের পিছনে পিছনে বেহেশতে নিয়ে যাবেন। অনুরূপ কনযুল ইবাদেও বর্ণিত আছে। মাওলানা জামাল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর মক্কী (কুঃ) স্বীয় ফাত্ওয়ার কিতাবে উল্লেখ করেছেন-

تَقْبِيْلُ الْاِبهَامَيْنِ وَوَضْعُ هُمَا عَلَى الْعَيْنَيْنِ عِنْدَ ذِكْرِ اسْمِه عَلَيهِ السَّلَامُ فِى الْاَذَانِ جَائِر بَلْ مُسْتَحَب صَرَّحَ بِه مَشَائِخِنَا

আযানে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর পবিত্র নাম শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দেয়া এবং চোখে লাগানো জায়েয বরং মুস্তাহাব। আমাদের মাশায়েখে কিরাম এ ব্যাপারে বিশদ বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা মুহাম্মদ তাহির (রাঃ) تكملة مجمع بخار الانوار  গ্রন্থে উপরোক্ত হাদীছকে ‘বিশুদ্ধ নয়’ মন্তব্য করে বলেন-

وَرُوِىَ تَجرِبَة ذَالِكَ عَنْ كَثِيْرِيْنَ

“(কিন্তু এ হাদীছ অনুযায়ী আমলের বর্ণনা অনেক পাওয়া যায়।)”
আরও অনেক ইবারত উদ্ধৃত করা যায়। কিন্তু সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে এটুকুই যথেষ্ট মনে করলাম। হযরত সদরুল আফাযেল আমার মুর্শিদ ও উস্তাদ আলহাজ্ব মাওলানা সৈয়দ নঈম উদ্দীন সাহেব কিবলা মুরাদাবাদী বলেছেন, লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ইনজিল’ গ্রন্থের একটি অনেক পুরানো কপি পাওয়া গেছে, যেটার নাম ‘ইনজিল বারনাবাস’। ইদানীং এটা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত এবং প্রত্যেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর  অধিকাংশ বিধানাবলীর সাথে ইসলামের বিধানাবলীর মিল রয়েছে। এ গ্রন্থের এক জায়গায় লিখা হয়েছে যে হযরত আদম (আঃ) যখন রূহুল কুদ্দুস (নুরে মুস্তাফা) কে দেখার জন্য আরজু করলেন, তখন সেই নুর তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলের নখে চমকানো হলো। তিনি মহব্বতের জোশে উক্ত নখদ্বয়ে চুমু দিলেন এবং চোখে লাগালেন। (রূহুল কুদ্দুসের অর্থ নুরে মুস্তফা কেন করা হল; এর ব্যাখ্যা আমার কিতাব ‘শানে হাবিবুর রহমানে’দেখুন। ওখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ঈসা (আঃ) এর যুগে রূহুল কুদ্দুস নামেই হুযুর (সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মশহুর ছিলেন। হানাফী আলিমগণ ছাড়াও শাফেঈ ও মালেকী মাযহাবের আলিমগণও বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন মুস্তাহাব হওয়া সম্পর্কে একমত। যেমন শাফেঈ মযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব – اعانة الطالبين على حل الفاظ فتح الممعين  এর ২৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আছে-

ثُمَّ يُقَبِّلَ اِبْهَا مَيْهِ وَيَجْعَلُ هُمَا عَلى عَلْنَيْهِ لَمْ يَعْمِ وَلَمْ يَرْمُدْ اَبَدًا

“(অতঃপর নিজের বৃন্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দিয়ে চোখে লাগালে, কখনও অন্ধ হবে না এবং কখনও চক্ষু পীড়া হবে না।)”মালেকী মযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব-

كفاية الطالب الربانى لرسالة ابن ابى زيد القيردانى

এর প্রথম খন্ডের ১৬৯ পৃষ্ঠায় এ প্রসঙ্গে অনেক কিছু বলার পর লিখেছেন-

ثُمَّ يُقَبِّلُ اِبْهَامَيْهِ وَيَجْعَلُ هُمَا عَلى عَيْنَيْهِ لَمْ يَعمِ وَلَمْ يَرْمُدْ اَبَدًا

“(অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দেবে এবং চোখে লাগাবে, তাহলে কখনও অন্ধ হবে না এবং কখনও চক্ষু পীড়া হবে না। এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা শেখ আলী সাঈদী عدوى  নামক কিতাবের ১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

গ্রন্থকার বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বনের সময়ের কথা উল্লেখ করেনি। অবশ্য শেখ আল্লামা মুফাসসির নুরুদ্দীন খুরাসানী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি কতেক লোককে আযানের সময় লক্ষ্য করেছেন যে যখন তারা মুয়ায্যিনের মুখে আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ শুনলেন, তখন নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুলে চুমু দিলেন এবং নখদ্বয়কে চোখের পলকে এবং চোখের কোণায় লাগালেন এবং কান পর্যন্ত বুলিয়ে নিলেন। পত্যেক শাহাদাতের সময় এ রকম একবার একবার করলেন। আমি ওদের একজনকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন আমি বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দিতাম কিন্তু মাঝখানে ছেড়ে  দিয়েছিলাম। তখন আমার চক্ষু রোগ হয়। এর মধ্যে এক রাতে আমি হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি (দঃ) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘আযানের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চোখে লাগানো কেন ছেড়ে দিয়েছ? যদি তুমি চাও, তোমার চোখ পুনরায় ভাল হোক, তাহলে তুমি পুনরায় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চোখে লাগানো আরম্ভ কর’। ঘুম ভাঙ্গার পর আমি পুনরায় এ আমল শুরু করে দিলাম এবং আরোগ্য লাভ করলাম। আজ পর্যন্ত সেই রোগে আর আক্রান্ত হইনি। উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হলো যে, আযান ইত্যাদিতে বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন ও চোখে লাগানো মুস্তাহাব, হযরত আদম (আঃ) সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) ও ইমাম হাসন (রাঃ) এর সুন্নাত। ফকীহ, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ এটা মুস্তাহাব হওয়া সস্পর্কে একমত। শাফীঈ ও মালেকী মযহাবের ইমামগণ এটা মুস্তাহাব হওয়া সস্পর্কে রায় দিয়েছেন। প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক মুসলমান একে মুস্তাহাব মনে করেছেন এবং করছেন। এ আমল নিম্নবর্ণিত ফায়দা গুলো রয়েছেঃ
আমলকারীর চোখ রোগ থেকে মুক্ত থাকবে এবং ইনশাআল্লাহ কখনও অন্ধ হবে না, যে কোন চক্ষু রোগীর জন্য বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বনের আমলটি হচ্ছে উৎকৃষ্ট চিকিৎসা। এটা অনেকবার পরীক্ষিত হয়েছে। এর আমলকারী হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর শাফায়াত লাভ করবে এবং ওকে  কিয়ামতের কাতার থেকে খুঁজে বের করে তাঁর (দঃ) পিছনে বেহেশ্তে প্রবেশ করাবেন।
একে হারাম বলা মূর্খতার পরিচায়ক। যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট  দলীল পাওয়া যাবে না, ততক্ষণ একে নিষেধ করা যাবে না। মুস্তাহাব  প্রমাণের জন্য মুসলমানগণ মুস্তাহাব মনে করাটা যথেষ্ট। কিন্তু হারাম বা মকরূহ প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট দলীলের প্রয়োজন যেমন আমি বিদ্আতের আলোচনা উল্লেখ করেছি।
বিঃ দ্রঃ- আযান সস্পর্কেতো সুস্পষ্ট এবং বিস্তারিত রিওয়ায়েত ও হাদীছ সমূহ মওজুদ আছে, যা ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। তকবীর ও আযানের মত। হাদীছসমূহে তকবীরকে আযান বলা হয়েছে-দু’ আযানের মাঝখানে নামায আছে অর্থাৎ আযান ও তকবীরের মধ্যবর্তী। সুতরাং তকবীরে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ’ বলার সময়ও বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন করা ফলপ্রসূ ও বরকতময়। আযান ও তকবীর ব্যতীতও যদি কেউ হুযূর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর পবিত্র নাম শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দেয়, তাতে কোন ক্ষতি নেই বরং সদুদ্দেশ্যে হলে তাতে ছওয়াব রয়েছে।  বিনা দলীলে কোন কিছু নিষেধ করা যায় না। যেভাবেই হুযূর সাল্লাল্লাহু আল্লাইহে ওয়া সাল্লামের তাযীম করা হবে, ছওয়াব রয়েছে। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

রাসূলকুল সর্দার হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ফযিলত

রাসূলকুল সর্দার হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ফযিলত

মাওলানা মোহাম্মদ আশেক জুনাঈদ

আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসূলগণের মধ্যে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্ত্মফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে মর্যাদা দান করেছেন তাতে তিনি বিশেষ সম্মানের অধিকারী, অতুলনীয়, অদ্বিতীয়। তাঁর মহান সত্তা স্বীয় গুনাবলী ও মর্যাদায় অনন্য। তেমনিভাবে রিসালতের মর্যাদায় তার কোন শরিক নেই। হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ প্রকাশের উৎস। প্রত্যেক নবী ও রাসূল শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রচারক ছিলেন। ঐশী গ্রন্থসমূহ তাঁরই সুসংবাদে পরিপূর্ণ ছিল। তাঁর পবিত্র আগমন না হলে সমস্ত্ম পৃথিবী অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত। জগৎ সৃষ্টির অন্যতম কারণ ছিল তাঁর রিসালতকে আলোকিত করা। যে বা যারা যা কিছু পেয়েছে বা আগমীতে পাবে সবকিছু তাঁরই বদান্যতা। তার দয়া প্রত্যেক যুগের জন্য প্রযোজ্য। তাঁর মাধ্যমেই নবুয়ত ও রিসালাত শেষ হয়েছে। তাঁর পর আর কোন নবী আসবেনা। কোন মানুষ যে কোন উপায়ে নিজেকে নবী দাবী করলে নিশ্চিত সে কাফের। খতমে নবুয়ত (প্রিয় নবীকে শেষ নবী হিসেবে জানা ও শুনা) সর্বসম্মত মাসয়ালা। সারকথা হলো, সৃষ্টিকর্তা হিসেবে যেমন আল্লাহ তায়ালার কোন তুলনা নেই তেমনিভাবে নবী হিসেবে আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন তুলনা নেই। নবী ও উম্মত সকলই আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসাকারী ও ফয়েয ভোগী। আল্লামা বুসীরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন- প্রত্যেক নবী ও রাসূল আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়ার সাগরের এক ফোটা বা দয়ার বর্ষণের এক ফোটা পাওয়ার প্রত্যাশী ছিলেন। সৌন্দর্যে, রুপলাবণ্যের অংশীদার থেকে তিনি পবিত্র। তাঁর সৌন্দর্য্যের মুক্তাটি যেন অবিভাজ্য। তিনি রাসূলগণের সর্দার, শেষ নবী ও মহান রবের মাহবুব। তাঁকে নিজের মত মানুষ মনে করা গোমরাহী ও ধর্মহীনতা। যদিও তিনি মানবীয় গুণে গুনান্বিত। মানবতার যে মর্যাদায় তিনি আসীন তাতে কেউ পৌছাতে পারে নাই। পৌছা সম্ভব ও নয়। তিনি এমন এক সত্তা যার প্রতিটি কর্ম – গতিধারাকে আল্লাহ তায়ালা নিজের দিকে সম্পর্কিত করেছেন। তাঁর পবিত্র জীবন ও মরণ পার্থিব জীবন থেকে অনেক উপরে। যে কোন বিপদগ্রস্থ ব্যক্তি তাঁকে আহবান করলে তিনি তা শুনেন ও সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন।
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
“এবং স্মরণ করুণ! যখন আল্লাহ নবীগণের নিকট থেকে তাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের রাসূল। যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁকে সাহায্য করবে। ইরশাদ করলেন, “তোমরা স্বীকার করলে এবং এ সম্পর্কে আমার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করলে? সবাই আরয করলো, আমরা স্বীকার করলাম।
্থ সহকারী শিক্ষক, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া কামিল মাদরাসা
ইরশাদ করলেন, “তবে (তোমরা) একে অপরের উপর সাক্ষী হয়ে যাও এবং আমি নিজেই তোমাদের সাথে সাক্ষীদের মধ্যে রইলাম। (আল-কুরআন, সূরা আল ইমরান, আয়াত : ৮১)
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাহবুবিয়তের মর্যাদা-
অন্য নবীদেরকে আল্লাহ তায়ালা তাঁদের নাম নিয়ে সম্বোধন করেছেন আর আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামকে সম্বোধন করেছেন নবুয়তের পদমর্যাদা দিয়ে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
    হে নবী আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি। (আল-কুরআন, সূরা আহযাব, আয়াত : ২৩)
    হে রাসূল! আপনার উপর অবতারিত বিষয়গুলো পৌছে দিন। (আল-কুরআন, সূরা মায়েদা, আয়াত : ৬৭)
    হে কম্বল আবৃত নবী। (আল-কুরআন, সূরা ময্‌যাম্মিল, আয়াত : ১)
    হে চাদর আচ্চাদনকারী। (আল-কুরআন, সূরা মুদ্দাসির, আয়াত : ১)
    ইয়াসিন – বিজ্ঞানময় কোরআনের শপথ, আপনি অবশ্যই রাসূলগণের অর্ন্ত্মভূক্ত। (আল-কুরআন, সূরা ইয়াসিন, আয়াত : ১-৩)
আল্লাহ তায়ালা তাঁর রেজামন্দি চান, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর কথা আল্লাহর কথা-
    অচিরেই আপনার রব আপনাকে দেবেন যাতে আপনি খুশি হয়ে যাবেন। (আল-কুরআন, সূরা আদ দোহা, আয়াত : ৫)
    তিনি নিজের ইচ্ছায় বলেন না; কিন্তু তার প্রতি ওহী প্রেরণ করা হয়। (আল-কুরআন, সূরা নাজম, আয়াত : ৩-৪)
    দোহার শপথ, রাতের শপথ যখন অন্ধকার আচ্ছাদিত করে। আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করে নাই বরং আপনাকে শত্রুও করেন নাই। (আল-কুরআন, সূরা আদ দোহা, আয়াত : ১-৩)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর কাজকে নিজের দিকে সম্পর্কিত করেছেন-
    (হে রাসূল) মুষ্টি ভর্তি মাটি যখন আপনি নিক্ষেপ করেছিলেন তা আপনি নিক্ষেপ করেন নাই। মূলত আল্লাহ তায়ালা নিক্ষেপ করেছেন। (আল-কুরআন, সূরা আনফাল, আয়াত : ১৭)
    নিশ্চয়ই যারা আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছেন মূলত তাঁরা আল্লাহর হাতে বাইয়াত গ্রাহণ করেছেন। আল্লাহর পবিত্র হাত তাঁদের হাতের উপর রয়েছে। (আল-কুরআন, সূরা আল-ফাতাহ, আয়াত : ১০)
    হে ঈমাণদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অগ্রবর্তী হইওনা। (আল-কুরআন, সূরা হুজরাত, আয়াত : ১)
    হে ঈমানদারগণ! নিজেদের কন্ঠস্বরকে উঁচু করোনা ঐ অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী) এর কন্ঠস্বরের উপর এবং তাঁর সামনে চিৎকার করে কথা বলো না যেভাবে পরস্পরের মধ্যে একে অপরের সামনে চিৎকার করো, যেন কখনো তোমাদের কার্যসমূহ নিষ্ফল না হয়ে যায়। আর তোমাদের খবরই থাকবেনা। নিশ্চয়ই যারা আপন কন্ঠস্বরকে নিচু রাখে আল্লাহর রাসূলের নিকট, তারা হচ্ছে ঐ সব লোক, যাদের অন্ত্মরকে আল্লাহ তায়ালা খোদাভীরুদের জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য ক্ষমা ও মহা পুরস্কার রয়েছে। (আল-কুরআন, সূরা হুজরাত, আয়াত : ২-৩)
পবিত্র হাদিসের আলোকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের মর্যাদা-
    হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি রসূলগণের উপর নেতৃত্বদানকারী। এতে আমার কোন অহংকার নেই। আমি প্রথম শাফায়াতকারী এবং প্রথমে আমার শাফায়াত কবুল করা হবে।এতে আমার কোন অহংকার নেই। (দারমী : আল-মুসনাদ, ১/৫৮, হাদীস : ৫০)
    উবাই বিন কাব থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন আমি নবীকূলের ইমাম হব। তাঁদের মধ্যে শাফায়াতকারী হব। এতে আমার কোন অহংকার নেই। (তাবরানী : আল-মু’জামুল আওসাত, ১/১৭৫, হাদীস : ১৭৬)
    হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন নবীদের মধ্যে আমার অনুসারী অধিক হবে, সর্বপ্রথম আমি জান্নাতের দরজা নাড়া দিব। (মিশকাতুল মাসাবিহ, পৃষ্ঠা : ৫১৪)
    হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইরশাদ করেন, সকল নবীর উপর পাঁচটি বিষয় আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। আমাকে জাওয়ামেউল কালিম (স্বল্প কথায় অধিক তাৎপর্যপূর্ণ বাক্যে কথা বলার শক্তি) দেয়া হয়েছে। শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। আমার জন্য গনিমতের মাল হালাল করা হয়েছে। সমস্ত্ম জমিনকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রকারী করা হয়েছে। আমি সমস্ত্ম সৃষ্টির নিকট প্রেরিত হয়েছি। আমার উপরই নবুয়তকে শেষ করা হয়েছে। (মুসলিম : আস সহীহ, ৩/১০৯, হাদীস : ৮১২)
    হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমাকে বেতেশতী পোশাক পরানো হবে, অতঃপর আমি আরশের ডানে দাঁড়াব। আমি ছাড়া কোন সৃষ্টি ঐ স্থানে দাড়াতে পারবেনা। (তিরমিযী : আস সুনান, হাদীস : ৩৫৪৪)
হাকিক্বতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামকে উপলব্ধি করা-
    রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি তোমাদের মত নই। আমি আমার রবের সান্নিধ্যে রাত্রি যাপন করি। তিনি আমাকে খাওয়ান ও পরান। আল্লাহর সাথে আমার একটি বিশেষ মুহুর্ত আছে যে মুহুর্তে আমার কাছে কোন সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা যেমন যেতে পারেনা তেমন কোন প্রেরিত নবী ও যেতে পারেনা।
    আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, হে আবু বকর! বাস্ত্মবিক আমাকে আমার রব ব্যতীত কেউ জানেনা।
প্রিয় নবীর দিদারই হচ্ছে আল্লাহর দিদার-
যে আমাকে দেখেছে সে বাস্ত্মবিক আল্লাহ তায়ালাকে দেখেছে।
শাফায়াত এবং কুরআন-
আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থায়ও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন। সেদিন আঁ হযরত পাপীদেরকে শাফায়াত করবেন অথচ অন্য সব নবী-রাসূল সেদিন চিন্ত্মায় ও বিষণ্নতায় থাকবেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়ার সাগরে ঢেউয়ের পর ঢেউ উঠবে। তাঁর শাফায়ত কবুল করা হবে। অনেকেই এই মাসায়ালায় এখনও ভুলের মধ্যে আছে। তার শাফায়াতকে অস্বীকার করছে।
নিম্নে শাফায়াতের প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করা হলঃ-
    পবিত্র কুরআনে আছে-শীঘ্রই আপনার রব আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌছাবে। তাফসীরে বায়জাবীতে এ আয়াতের মাকামে মাহমুদ সম্পর্কে বলা হয়েছে- “নিশ্চয়ই উহা শাফায়াতের মাকাম, কেননা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, উহা এমন স্থান যেখানে আমি আমার উম্মতের জন্য শাফায়াত করব এবং কেননা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মানুষকে অবহিত করা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ স্থানে দাঁড়িয়ে শাফায়াত করার কারণে তারা তাঁর প্রশংসা করবে। ওঠাই হল শাফায়াতের স্থান। (তাফসীরে বায়যাভী, ৩/৪৪৪)
    তারাই শাফায়াতের অধিকারী হবেন যারা দয়াময়ের নিকট অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন। (আল-কুরআন, সূরা মারয়াম, আয়াত : ২৭)
পবিত্র হাদিসের আলোকে শাফায়াত-
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য আমার শাফায়াত। (তিরমিযী : আস সুনান, হাদীস : ২৩৫৯)
হাশর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরণযুগলের নিকট হবে-
    আমার কতগুলো নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ, আমি বিমোচনকারী, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা কুফূরী উৎপাটন করেছেন। আমি হাশরের ব্যবস্থাপক আমার চরণযুগলের নিচে হাশর হবে। (বুখারী হাদীস : ৩২৬৮/মুসলিম হাদীস : ৪৩৪৩)
    হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মানুষের মধ্যে আমার শাফায়াত দ্বারা ঐ ব্যক্তি সৌভাগ্যশীল হবে যে বিশুদ্ধ অন্ত্মর দিয়ে কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়েছেন। (বুখারী হাদীস : ৯৭)
    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত হক, যে উহা বিশ্বাস করবেনা সে শাফায়াতের উপযোগী হবে না। (জামেউস সগীর : ১৫/৩৭১, হাদীস : ৭১৪৯)
    বায্‌যার ও তাবরানী আওসাতের মধ্যে বর্ণনা করেন, আবু নাঈম সহীহ সনদে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন, আমি আমার উম্মতের জন্য শাফায়াত করব। অবশেষে আমার রব আমাকে ডাক দেবেন, হে মুহাম্মদ আপনি কি খুশি হয়েছেন? আমি বলব হে মহান রব! আমি খুশি হয়েছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার পর আমার উম্মত কি আমল করবে তা আমি জানি। তাই আমি তাদের জন্য শাফায়াত গ্রহণ করলাম। (তাবরানী, মুসনাদে বায্‌যার)
রাসূলের খাদেমগণও শাফায়াত করবেন-
    আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাফায়াত দ্বারা সত্তর হাজার মুসলমান যারা সকলই জাহান্নামের উপযোগী বেহেশতে প্রবেশ করবে কোন ধরনের হিসাব ব্যতিত। (আল-মাজালিসাতু ওয়া জওয়াহিরুল ইলম,৫/৩৪৪, হাদীস : ২২১৬)
    কিয়ামতের দিন আহবান করা হবে, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীরা কোথায়? তখন খলিফাদের উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের বলবেন, যাদের তোমরা চাও বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দাও; যাদের চাও রেখে দাও। (আহাদিসে গারার)
ইহা আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণা তিনি যাকে চান তাকে শাফায়াতের অধিকারী করবেন। হুযুর গাউসুল আজমকেও যারা সেদিন আহবান করবে, তিনিও তাদের সেদিন শাফায়াত করবেন।
হায়াতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-
ইতোপূর্বে কিয়ামতের দিন গুনাহগার উম্মতের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত সম্পর্কিত হাদিসের বর্ণনা করা হয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বিদা হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত অবস্থায় যেভাবে উম্মতের সাহায্য করেছেন ওফাত শরীফের পরও ঠিক একইভাবে সাহায্য করছেন। ওফাত শরীফের পূর্বাপর নবীর ক্ষমতার মধ্যে কোন ধরনের পরিবর্তন হয়নি। ওফাত শরীফের পূর্বে যেরূপ ক্ষমতার মালিক ছিলেন ওফাত শরীফের পরও একই ক্ষমতার মালিক। আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে মহানবী অতুলণীয় ও উপমাহীন। ওফাত শরীফের পর ও তিনি এই সম্মাণের অধিকারী হয়েছেন যে, কবর জগতের মধ্যেও তিনি সকলের কথা শুনেন এবং জীবনের যাবতীয় অনুভূতি তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। ইহা মোটেই অবান্ত্মর ও কিয়াস বিরোধী নয়; বরং ইহা আল্লাহ কর্তৃক তাঁর প্রতি বিশেষ অনুকম্পার একটি উজ্জল নিদর্শন।

পবিত্র কুরআনের আলোকে হায়াতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-
    ‘যাদেরকে আল্লাহর পথে শহীদ করা হয়েছে তাঁদেরকে মৃত বলোনা, বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারছনা। (আল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত : ১৫৪)
    যাদেরকে আল্লাহর পথে শহীদ করা হয়েছে তাদের মৃত বলোনা। তাঁরা তাঁদের রবের নিকট জীবিত। তাঁদেরকে তাঁদের রবের নিকট থেকে রিজিক দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা স্বীয় ফজল দ্বারা তাঁদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তাঁরা আনন্দিত। (আল কুরআন, সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৯-১৭০)
আলোচ্য আয়াতে শহীদের বেলায় বলা হয়েছে যে, তাঁরা মৃত নন; বরং তারা জীবিত। তাঁদের মৃত বলা যাবে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা রিজিক পাচ্ছেন। একথা নিরেট মূর্খও জানে যে, শহীদের মর্যাদা নবীর মর্যাদার চাইতে অনেক কম। শহীদগণ মহানবীর খাদেম ও গোলাম। নবীর কথা শুনে তারা শাহাদাতের মর্যাদা পেয়েছেন। এতে বুঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের পর জীবিত- একথা মেনে নিতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
পবিত্র হাদিসের আলোকে হায়াতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-
    হযরত সাবিত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নবীগণ আলাইহিস সালাম তাদের কবরে জীবিত, নামাজ পড়ছেন। (ইবনে আদী : আল কামেল,২/৩২৭, ওয়াফা শরীফ, বায়হাকী)
    হযরত আউস বিন আউস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয় তোমাদের উত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন। সেদিন আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, ঐ দিন তার ওফাত হয়েছে, সেদিন সিঙ্গায় ফুক দেয়া হবে, সেদিন প্রলয় হবে। সুতরাং উক্ত দিন তোমরা আমার উপর অধিক পরিমাণ দরূদ পড়। তোমাদের দরূদ আমার কাছে উপস্থাপন করা হবে। সাহাবাগণ আরজ করলেন, আমাদের দরূদ আপনার উপর কিভাবে উপস্থাপন করা হবে? অথচ আপনি মাটি হয়ে যাবেন। আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মাটির উপর নবীদের দেহ খাওয়া হারাম করে দিয়েছেন। (আবু দাউদ : আস সুনান, হাদীস : ৮৮৩)
    হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি আমার রওজার পাশে দরূদ পড়বেন, আমি উহা শুনব আর যে দূর থেকে আমার উপর দরূদ পড়বেন উহা আমার কাছে পৌছিয়ে দেয়া হবে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একদল বর্ণনাকারী এ হাদিস বর্ণনা করেন। (ওয়াফা শরীফ : ২/৪০৪)
    হযরত ইবনে মাসউদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, জমিনের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিভ্রমণকারী কতগুলো ফেরেশতা রয়েছেন, আমার উম্মতের সালাম তাঁরা আমার নিকট পৌছে দেন। (নাসায়ী : আস সুনান, হাদীস : ১২৬৫)
    হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জুমার দিন ও রাতে যে ব্যক্তি আমার উপর একশতবার দরূদ পড়বে আল্লাহ তায়ালা তার একশটি হাজত পূরণ করেন। ৭০টি পরকালীন হাজত ও ৩০টি ইহকালীন হাজত। দরূদ শরীফ পৌছানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা একটি ফেরেশতা নিয়োগ দিয়েছেন যিনি দরূদ নিয়ে আমার কবরে প্রবেশ করেন যেভাবে কোন মানুষ হাদিয়া নিয়ে তোমাদের কাছে গমন করে। জীবিত অবস্থায় আমার জ্ঞান যেরূপ ছিল ওফাত লাভের পরও আমার জ্ঞান অনুরূপ থাকবে। (বায়হাকী ও ইস্পাহানী)
    আবদুল্লাহ বিন ওমর আল ওমারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ আলমাকবারী থেকে শুনেছি, তিনি বলেন আমি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শুনেছি তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার ওফাত শরীফের পর যে আমার জিয়ারত করবে সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার জিয়ারত করল। যে ব্যক্তি আমার জিয়ারত করবে কিয়ামতের দিন আমি তার সাক্ষী ও শাফায়াতকারী হব।
    আবু সাঈদ সামাআনী থেকে বর্ণিত, তিনি আলী বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাফন করার তিন দিন পর আমাদের কাছে একজন বেদুঈন আসল। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা শরীফ জড়িয়ে ধরেন, তিনি রওজা শরীফ থেকে মাটি নিয়ে তার মাথায় ঢালতে লাগল। বেদুইন আরজ করে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার কথা আমরা শ্রবণ করেছি, আপনি আল্লাহর বাণী সংরক্ষণ করেছেন, আমরা আপনার থেকে সংরক্ষণ করেছি। আপনার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো- যদি তারা নিজেদের আত্মার উপর জুলুম করে, আপনার কাছে আসে অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমি নিজের উপর জুলুম করেছি, আপনার নিকট এসেছি, যাতে আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। রওজা শরীফ থেকে আওয়াজ আসলো যে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ক্ষমা করেছেন। (ওয়াফা শরীফ)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা এবং ফজিলত লিখে শেষ করা যাবেনা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রত্যেকটা নবী প্রেমিকের মনে সারাক্ষণই নবী প্রেম জাগ্রত থাকে এবং নবীর ভালবাসা নিয়ে কবরে যেতে চাই। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুর আলামিনের কাছে ফরিয়াদ আল্লাহ যেন আমাদের প্রত্যেককে নবী প্রেম দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেন। আমিন ছুম্মা আমিন।

মহানবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এর আপাদমস্ত্মক শরীফ মু’জিযা

মহানবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এর আপাদমস্ত্মক শরীফ মু’জিযা

মাওলানা মুহাম্মদ মুশতাক আহমদ
প্রধান মুহাদ্দিস, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা।

    
উপস্থাপনাঃ
মহান রাব্বুল আলামীন মানবজাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার জন্য যুগে যুগে প্রেরণ করেছেন অসংখ্য নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালাম। তাঁরা আলস্নাহ তায়ালার তরফ থেকে প্রাপ্ত বাণী মানবজাতির নিকট পৌঁছে দিয়েছেন এবং সেমতে জীবন যাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেউ কেউ মেনে নিয়েছেন, আবার অনেকে অমান্য করেছে। শুধু তাই নয়, নবী হওয়ার প্রমাণ হিসেবে তারা নিদর্শন দাবী করেছে। তাদের দাবী প্রমাণের জন্য আলস্নাহ পাক প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে কিছু কিছু অলৌকিক ক্ষমতা তথা মু’জিযা দান করেছিলেন। আলস্নাহ তায়ালার প্রদত্ত ক্ষমতা বলে নবী ও রাসূলগণ মু’জিযা প্রদর্শন করেছেন।
মু’জিযার সংজ্ঞাঃ
মু’জিযার সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে আলস্নামা সা’দ উদ্দীন তাফতাযানী (রঃ) লিখেছেন-
هى امر يظهر بخلاف العادة على يد مدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الاتيان بمثله
অর্থাৎ- “মু’জিযা ঐ অলৌকিক কাজ যা সাধারণত অসম্ভব। যা নবুওয়াত এর দাবীদারের পক্ষ থেকে তাঁর নবুওয়াতের সমর্থনে অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় পেশ করা হয়। আর অস্বীকারকারীরা এধরনের অলৌকিক কাজ প্রকাশ করতে অক্ষম হয়ে যায় সেটাই হল মু’জিযা।” (শরহে আকায়েদে নাসাফী) যেমন, মৃতকে জীবিত করা, আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদকে দিখন্ডিত করা ইত্যাদি। সুতরাং সম্মানিত নবী ও রাসূলগণের সত্যতা প্রমাণের তথা সত্য নবী ও ভন্ড নবীদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের প্রধানতম উপায় হচ্ছে মু’জিযা। কোন অলৌকিক বিষয় কোন নবীর মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা হল মু’জিযা, আর কোন ওলীর মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তাকে কারামত বলা হয়। উলেস্নখ্য মু’জিযা দেখলে নবীর সত্যতা সম্পর্কে এ আস্থা জন্মে যে, যার হাতে এমন অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ পায়, তিনি নিশ্চয় মহা শক্তিমান আলস্নাহর প্রেরিত পুরম্নষ। পক্ষান্ত্মরে কোন মিথ্যা ও ভন্ড লোক নবুওয়াতের দাবী করলে সে মু’জিযা দেখাতে পারে না। আলস্নাহ তায়ালা মিথ্যুকদেরকে মু’জিযা দান করেন না। উলেস্নখ্য কোন বেদুইনের হাতে দু-একটি অস্বাভাবিক ঘটনা প্রকাশ পেলে সেটাকে বলা হয় ইসতেদ্‌রাজ। নবুওয়াতের সূচনা হয় হযরত আদম আলাইহিস সালাম হতে। এ

ধারাবাহিকতায় নবুওয়াতের পরিসমাপ্তি ঘটে আমাদের আক্বা ও মওলা হযরত মুহাম্মদ সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এর মাধ্যমে। তিনি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর হেদায়তের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে মহান আলস্নাহ নিজেই বলেন-
وما أرسلناك الا كافة للناس بشيرا ونذيرا
অর্থাৎ- “আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি।” (সুরা- সাবা-২৮) অপর এক আয়াতে আলস্নাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- وما أرسلناك الا رحمة للعالمين
অর্থাৎ- “আমি আপনাকে বিশ্ব জাহানের রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি।” (সুরা-আম্বিয়া-১০৭)
অনূরূপ এক হাদীসে নবীকরীম সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম ইরশাদ করেছেন- “সকল নবীর উপর আলস্নাহ আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” সুতরাং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে আমাদের নবীকরীম সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নামকে অন্য নবীগণের তুলনায় অনেক বেশী মু’জিযা দান করা হয়েছে। বস্তুত মহানবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এর মু’জিযা হল সমুদ্রের তরঙ্গমালার ন্যায়। উলামায়ে কেরাম বলেন- নবীকরীম সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এর মু’জিযা অসংখ্য। কোন কোন বুযুর্গ বলেন- হুযুর সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এক হাজার মু’জিযা দান করা হয়েছে। আবার কোন কোন উলামায়ে কেরাম বলেন- পবিত্র কুরআন ছাড়া মহানবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নামকে তিন হাজার মু’জিযা দান করা হয়েছে। তাফসীরে নাঈমীতে উলেস্ন্যখ আছে, ছয় হাজার মু’জিযার বর্ণনা হাদীসে পাকে এসেছে। রাসূল সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এর শ্রেষ্ঠ মু’জিযা হল আল-কুরআন। তৎকালীন আরবরা অলংকারপূর্ণ কবিতার ছন্দ ও গদ্য সাহিত্য রচনায় খুবই পারদর্শী ছিল। তাঁদের এই পারদর্শিতা পবিত্র কুরআনের ফাসাহত ও বালাগাতপূর্ণ ভাষা, সুসজ্জিত বিন্যাস, শব্দ চয়ন, বর্ণনাভঙ্গি ও মুহকাম আয়াতসমূহের তুলনায় ম্স্নান হয়ে গিয়েছিল। পবিত্র কুরআনের মুকাবিলায় এসব কবি সাহিত্যিকগণ একটি সূরা এমনকি আয়াত রচনায়ও সক্ষম হয়নি। পবিত্র কুরআনের বাণী শুনে তাদের অনেকেই বলেছিল, এটি কোন মানুষ বা জ্বীনের কথা নয়। পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াত মু’জিযা। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হবার পরও তাতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন না হওয়া, পাঠকের আনন্দ লাভ, শ্রম্নতার আগ্রহ অবশিষ্ট থাকা বরং বারবার তিলাওয়াতের ফলে নতুন করে স্বাদ সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি কুরআনের মু’জিযা।
প্রত্যেক নবী ও রাসূল থেকে কোন না কোন মু’জিযা সংঘটিত হয়েছে। তবে তাঁদের মু’জিযাগুলো ছিল তাঁদের পবিত্র সত্তা ব্যতীত কতেক অস্বাভাবিক ও আশ্বর্যজনক অলৌকিক বিষয়, যেগুলো প্রদর্শন করে তাঁদের নবুওয়াতের প্রমাণ আপন উম্মতগণের সম্মুখে পেশ করেছেন। যেমন- হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে আলস্নাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ولقد أرسلنا موسى باياتنا الخ
অর্থাৎ- “আমি হযরত মূসা (আঃ) কে কিছু মু’জিযা দিয়ে প্রেরণ করেছি।” অর্থাৎ লাঠি, উজ্জ্বল হাত, সাগরে রাস্ত্মা বের করা, পাথরে লাঠির আঘাত করে পানি বের করা ইত্যাদি মু’জিযা নিয়ে তিনি দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছিলেন। অনুরূপ হযরত ঈসা (আঃ) মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা, জন্মান্ধকে দৃষ্টি দান এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময় করা ইত্যাদি মু’জিযা নিয়ে এ পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। এভাবে পূর্ববর্তী সমস্ত্ম নবী ও রাসূলগণ মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে কতিপয় মু’জিযা নিয়ে এ দুনিয়ায় পদার্পন করেছিলেন। যেগুলো প্রদর্শন করে দুনিয়াবাসীদের নিকট তাঁদের নবুওয়াতকে প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের আক্বা ও মওলা হযরত মুহাম্মদ মুস্ত্মফা সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম নবুওয়াতের প্রমাণ স্বরূপ শুধুমাত্র কতিপয় মু’জিযা নিয়ে এ পৃথিবীতে তাশরীফ আনেননি, বরং তিনি আপাদমস্ত্মক গোটা সত্তা মুবারক আপন নবুওয়াতের দলীল তথা মু’জিযা হিসেবে এ ধরার বুকে তাশরীফ আনয়ন করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ ফরমান- يا أيها الناس قد جاءكم برهان من ربكم وأنزلنا إليكم نورا مبينا
অর্থাৎ- “হে মানবকুল! নিশ্চয় তোমাদের নিকট আলস্নাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি উজ্জ্বল আলো (নূর) অবতীর্ণ করেছি। (সূরা নিসা-১৭৫)
আলোচ্য আয়াত শরীফে যে বুরহান (সুস্পষ্ট প্রমাণ) আগমনের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। ঐ অকাট্য প্রমাণ হচ্ছেন মহান রাব্বুল আলামীনের প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্রতম সত্তা। (তাফসীরে জালালাইন, ৯৩পৃঃ) বুরহানের আভিধানিক অর্থ দলীল। দলীল ও মু’জিযা সমার্থক শব্দ। সুতরাং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্তা মুবারক আপন রবের দলীল এবং তাঁরই পক্ষ থেকে মু’জিযা। হুযুরের অন্যান্য মু’জিযার কথা উল্লেখ না করলেও এ কথা নিশ্চতভাবে বলতে হয় যে, হুযুরে আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং মু’জিযা। হুযুরের চেহারা মুবারক, রসনা মুবারক, চোখ মুবারক, কান মুবারক, নাক মুবারক, চুল মুবারক, থু থু মুবারক, দন্ত্ম মুবারক, হাত মুবারক, কদম মুবারক, শরীর মুবারক সবই মু’জিযার আধার। এ কারণে অমুসলিমও সরকারে দো আলম নূরে মুজাসসাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারায়ে আনওয়ার দেখে মুসলমান হয়ে যেত।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারকের মু’জিযাঃ- আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারক রূপ, সৌন্দর্য, শোভা ও পূর্ণতার বিকাশস্থল। তিনি হলেন সৌন্দর্যের পূর্ণরূপ। হযরত ইউসূফ (আঃ) এর রূপ নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রূপের একটি আলোকবিম্ব মাত্র এবং সমগ্র দুনিয়ার রূপবান ও সুন্দর ব্যক্তিরা হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রূপের একটি ঝলক মাত্র। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, হুযুর সরওয়ারে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুবারক সত্তায় যদি আল্লাহর ওহী, মু’জিযাসমূহ এবং নবুওয়াতের অপরাপর প্রমাণাদির প্রভাব ও বিকাশ নাও হত তবে তাঁর চেহারা মুবারকই নবুওয়াতের দলীল হিসেবে যথেষ্ট ছিল। (যুরকানী আলাল মাত্তয়াহিব চতুর্থ খন্ড ৭২ পৃঃ)
হযরত সাইয়্যেদেনা আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) যিনি ইহুদীদের মধ্যে একজন বিখ্যাত আলেম ছিলেন। তিনি বলেন “যখন বিশ্বকুল সরদার রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারায় তাশরীফ আনলেন তখন আমি হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার জন্য তাঁর পবিত্র দরবারে আসলাম-
فلما تبينت وجهه عرفت أن وجهه ليس بوجه كذاب فكان اول ما قال يا أيها الناس أفشوا السلام وأطعموا الطعام وصلوا الأرحام وصلوا بلليل والناس نيام تدخلوا الجنة بسلام
অর্থাৎঃ- “অতঃপর যখন আমি হুযুরে আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারক দেখলাম, তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর চেহারায়ে আতহার কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না। তিনি সর্বপ্রথম ইরশাদ করেছিলেন, হে লোকেরা তোমরা সালামকে খুব প্রসার কর, ক্ষুধার্তদেরকে খাদ্য দান কর, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখ এবং রাতের বেলায় নামায পড় যখন লোকেরা নিদ্রারত থাকে, তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী, ইবনে মাঝাহ ও দারিমীর বরাতে মিশকাত ১৬৮ পৃঃ)
অনুরূপ হযরত আবু রামাসা তামীমী (রাঃ) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখা মাত্রই তাৎক্ষনিকভাবে হুযূরের নবুওয়াতকে সত্য বলে মেনে নিয়ে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন “আমি নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র দরবারে হাযির হলাম, আমার সাথে আমার এক পুত্রও ছিল।
فلما رأيته قلت هذا نبى الله
অর্থাৎ- “আমি যখন উনাকে দেখলাম, তখনই বলে ফেললাম, ইনি আল্লাহর নবী।” (শিফা শরীফ ১ম খন্ড ১৫৮ পৃঃ, জাওয়াহিরুল বিহার ১ম খন্ড ৫৫ পৃঃ)
দেখুন, হযরত আবু রামাসা তামীমী (রাঃ) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর না কোন মু’জিযা দেখেছেন না কুরআন ও হাদীসের কোন বাণী শুনেছেন। কেবল হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন, আর দেখামাত্রই বলে উঠেছেন, “ইনি অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার সত্য নবী”। এটা হচ্ছে হুযুর করীমের পবিত্র সত্তারই মু’জিযা। অনুরূপ হযরত জামি’ ইবনে শাদ্দাদ বলেন- আমাকে তারিক নামের একজন লোক বলল, আমি মদীনা তৈয়্যেবায় নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম, তখন আমি হুযুরকে চিনতাম না, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- هل معكم شى تبيعونه
অর্থাৎ- “তোমাদের নিকট বিক্রয় করার কিছু আছে কি?” আমরা বললাম, এ উট বিক্রি করতে চাই। তিনি দাম জানতে চাইলেন। আমরা মূল্য (এত ওয়াসাক খেজুর) বললাম। তিনি ঐ মূল্য মুঞ্জুর করলেন এবং উটের লাগাম ধরে চলে গেলেন। আমরা দেখতে দেখতেই তিনি শহরের অভ্যন্ত্মরে ঢুকে পড়লেন। আমরা পরস্পর বললাম, আমাদের কাজটি ভাল হয়নি। একজন অপরিচিত ব্যক্তি যার সাথে আমাদের জানা-শোনা নেই, দাম উসূল না করেই তাঁকে উট দিয়ে দিলাম। আমাদের সঙ্গে এক বৃদ্ধা মহিলাও ছিল। তিনি বললেন, তোমরা কোন চিন্ত্মা করোনা। তোমাদের উটের মূল্যের আমি যামিন রয়েছি। কারণ- رأيت وجه رجل مثل القمر ليلة البدر
অর্থাৎঃ- “আমি এমন এক পুরুষের চেহারা দেখেছি যা পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মত চমকাচ্ছিল।” তিনি কখনো আমাদের সাথে প্রতারণা করতে পারেন না। যখন সকাল হল তখন ঠিকই এক ব্যক্তি খেজুর নিয়ে আমাদের কাছে আসলেন। আর খেজুরগুলো দিয়ে বললেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এই খেজুরগুলো দিয়ে তোমাদের নিকট প্রেরণ করেছেন। এ খেজুরগুলো ওজন করে তোমাদের প্রাপ্য পূর্ণ করে নাও। অতঃপর আমরা খেজুরগুলো মেপে দেখলাম, আর সঠিক ওজনের পেলাম। (শিফা শরীফ ১৫৯ পৃঃ জাওয়াহিরুল বিহার ১ম খন্ড ৫৫ পৃঃ) এ থেকে মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় সুস্পষ্ট হল যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারায়ে আনওয়ার সর্বোচ্চ মু’জিযা।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাত মুবারকের মুজিযাঃ- হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাত মুবারকের অগণিত মু’জিযা রয়েছে। তন্মধ্যে আঙ্গুল মুবারকের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়া এবং পুনরায় ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র আবার তা মিলিত হয়ে যাওয়া অন্যতম। এ মু’জিযার দিকে ইঙ্গিত করে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে, اقتربت الساعة وانشق القمر
অর্থাৎঃ- “কিমায়ত নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়েছে।” (সূরা-ক্বামার-১)
এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে- মক্কার কাফেরদের নেতা আবু জাহেল ইয়ামেনের শাসক হাবীব ইবনে মালেকের নিকট খবর পাঠাল- “তোমার ধর্ম (পৌত্তলিকতা) নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, শীঘ্রই মক্কা আস।” এ সংবাদ পাওয়া মাত্র হাবীব মক্কায় এসে হাযির। আবু জাহেল তার সামনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মন্ধে কয়েকটি ভূল কথা বর্ণনা করল। এতে আবু জাহেলের ইচ্ছা ছিল- যেহেতু হাবীব ইয়ামেনির উপর মক্কা বাসীর যথেষ্ট আস্থা রয়েছে, সেহেতু হাবীব তাদের বুঝিয়ে বলে দেবেন, যেন তারা ইসলাম গ্রহণ না করে। কিন্তু হাবীব ইয়ামেনি বললেন- যতক্ষন পর্যন্ত্ম উভয়পক্ষ মুখো-মুখি হবেন না, ততক্ষন পর্যন্ত্ম কোন মিমাংসা সম্ভবপর নয়। আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাও শুনে নিতে চাই। সুতরাং তিনি রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এ বলে সংবাদ প্রেরণ করলেন, “আমি সুদূর ইয়ামেন থেকে এসেছি, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে একান্ত্ম আগ্রহী।” সরওয়ারে কায়েনাত রসূলে মুয়াজ্জম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্দীক আকবার হযরত আবু বকর (রাঃ) কে সাথে নিয়ে তাঁর নিকট তাশরীফ আনলেন। হুযুর তাশরীফ আনার সাথে সাথে গোটা মজলিসের উপর ভয় ছেয়ে গেল। কেউ টু শব্দটুকু করার সাহস পেল না। শেষ পর্যন্ত্ম দু’জাহানের বাদশাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, “তোমরা কি জিজ্ঞেস করতে চাও, করতে পার।” হাবীব ইবনে মালেক আরয করলেন- হুযুর আপনি নবুওয়াত দাবী করছেন, নবুওয়াতের জন্য তো মু’জিযা দরকার। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, “তোমরা যে মু’জিযাই চাও দেখানো হবে।” হুযুর আমি তো আসমানের মু’জিযা চাই। (কারণ জ্ঞানী হাবীব জানতেন যে, আসমানে কোন যাদু চলে না, তাই আসমানে যে অলৌকিক ঘটনা দেখাবেন সেটাই মু’জিযা হবে। আর তাতে প্রমাণিত হবে তিনি সত্য নবী।) আর আমি জানতে চাই আমার মনে কোন আরযু বিরাজ করছে? (কারণ হাবীব এটাও জানতেন যে, মনের কথা জানাও হুযুরের মু’জিযা হবে।) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সেখানে তাশরীফ নিয়ে গেলেন তখন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ আলোকিত ছিল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন হাত মুবারকের দ্বারা ইশারা করলেন। ইঙ্গিত পাওয়া মাত্রই চাঁদ দিখন্ডিত হয়ে গেল। আর দু টুকরোই আকাশ হতে পাড়ারের দুদিকে ঢলে পড়ল। কবি বলেন- تیری مرضی پا گیا سورج پھیرا الٹے قدم – تیری انگلی اٹھ گئی مہ کا کلیجہ چیر گیا
অর্থাৎঃ- “(হে আল্লার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনার মর্জি সম্পর্কে জানতে পেরে ডুবন্ত্ম সূর্য পুনরায় ফিরে এল। আপনার আঙ্গুলের ইঙ্গিত আকাশের দিকে উঠার সাথে সাথে চাঁদের কলিজা দিখন্ডিত হয়ে গেল।” উল্লেখ্য যে, হুযুরের ইঙ্গিত পেয়ে চাঁদ আবার আপন স্থানে ফিরে এল। এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমালেন- “হে হাবীব ইবনে মালেক! তোমার মনের অব্যক্ত আরযুটিও শুনে নাও, তোমার একটি কন্যা সন্ত্মান আছে, যার হাত পা অবস। তুমি চাচ্ছ যে, সে সুস্থ হয়ে যাক, যাও সে সুস্থ হয়ে গিয়েছে।” এ কথা শুনতেই হাবীব ইবনে মালেকের মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কালেমা শরীফ উচ্চারিত হয়ে গেল। হাবীব যখন ইয়ামেনে ফিরে এসে ঘরে গেলেন তখন রাত ছিল। দরজায় শব্দ করলেন, তখন ঐ শয্যাশায়ী প্রতিবন্ধী কন্যা পায়ে হেঁটে এসে দরজা খুলে দিল। আর পিতাকে দেখামাত্র পড়তে লাগল- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” হাবীব বললেন, বেটী! তুমি এ কালিমা কোথা হতে শুনলে? তখন সে বলতে লাগল- “আমি স্বপ্নে একজন চাঁদের মত ব্যক্তিকে দেখলাম তিনি বলেছিলেন, বেটী! তোমার পিতা তো মক্কা মুর্কা‌রমায় কালিমা পড়ে নিয়েছে, তুমি এখানে পড়ে নাও। তাহলে তুমি এক্ষুনি সুস্থ হয়ে যাবে।” আমি পরদিন ভোরে উঠলাম, তখন কালিমা আমার মুখে জারি ছিল। আর আমার হাত পাও সুস্থ ছিল। (শরহে ক্বাসীদা-ই বুরদাহ, আল্লামা খরপূতী ১৩৪ পৃঃ)। অনুরূপভাবে প্রায় তেরটি স্থানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বরকতময় আঙ্গুল সমূহ থেকে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হয়েছিল। তন্বধ্যে একটি ঘটনা বর্ণনার প্রয়াস নেব। হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, হুদায়বিয়ায় সাহাবায়ে কেরাম পিপাসার তিব্রতায় অত্যন্ত্ম চিন্ত্মিত হয়ে পড়লেন। তখন নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখে একপাত্র পানি ছিল। উহা হতে তিনি অযু করলে সামান্য পানি বাকি রইল। সাহাবায়ে কেরাম নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমীপে আরয করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সম্মুখস্থ পাত্রের মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ পানি রয়েছে তা ব্যতীত আমাদের কাছে আর কোন পানি নেই। যা আমরা পান করব এবং অযু করব।
فوضع النبى صل الله على وسلم يده فى الركوة فجعل الماء يفور بين اصابعه كأمثال العيون قال فشربنا وتوضأنا قيل لجابر كم كنتم؟ قال لوكنا مائة ألف لكفانا كنا خمس عشرة مائة(بخارى شيرف)
অর্থাৎঃ- “অতঃপর নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পবিত্র হাত ঐ পাত্রে রাখলেন। সাথে সাথে তার বরকতময় আঙ্গুলগুলো থেকে ঝরনাধারার মত পানি প্রবাহিত হতে লাগল। আমরা সকলে বিপুল পরিমাণে পানি পান করে আত্মতৃপ্তিবোধ করলাম এবং অযু করলাম। হযরত জাবের (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হল- আপনারা কতজন লোক পানি পান করেছেন এবং অযু করেছেন। তিনি বললেন যদি আমরা একলক্ষও হতাম তাহলেও ঐ পানি আমাদের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু সে সময় আমরা ছিলাম দেড়হাজার জন।” (বুখারী শরীফ প্রথম খন্ড ৫০৫ পৃঃ ২য় খন্ড ৫৯৮ পৃঃ) এ প্রসঙ্গে আ’লা হযরত শাহ আহমদ রেযা খান (রঃ) কতই না সুন্দর বলেছেন-
نورکے چشمے لہرائیں دریا بہیں – انگلیوں کی کرامت پہ لاکھو ں سلام
অর্থাৎঃ- “নূরের ঝর্ণা সমূহে ঢেউ তুলে নদী প্রবাহিত করেছে, আঙ্গুল সমূহের অলৌকিক শক্তির প্রতি লাখো সালাম।” পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আঃ) এর একটি প্রসিদ্ধ মু’জিযা উল্লেখিত হয়েছে যে, যখন তিনি আল্লাহর হুকুমে স্বীয় আসা (লাঠি) দ্বারা পাথরের উপর আঘাত করলেন তখন পাথর হতে বারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয়ে গেলে। অবশ্যই এটি একটি অনেক বড় মু’জিযা। কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে চিন্ত্মা করা হলে এ কথা প্রতিভাত হয় যে, আঙ্গুল মুবারক থেকে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হওয়া যতটুকু অস্বাভাবিক ও আশ্চ্যর্যজনক, লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করে ঝর্ণা প্রবাহিত করা ততটুকু অসম্ভব এবং অস্বাভাবিক নয়। কারণ পাথরের মধ্য থেকে পানি প্রবাহিত হওয়া সম্ভব। যেমন, পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وإن من الحجارة لما يتفجر منه اﻷنهار وإن منها لما يشقق فيخرج منه الماء
অর্থাৎ- “কিছু পাথর এমনও আছে যা থেকে ঝর্ণা প্রবাহিত হয়। আর কিছু পাথর এমনও আছে যা বিদীর্ণ হয়, অতঃপর তা থেকে পানি নির্গত হয়।” (সুরা- বাক্বারা-৭৪) কিন্তু মানুষের আঙ্গুলের মধ্য থেকে কখনও পানি বের হয়না, সুতরাং এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, মূসা (আঃ) এর মু’জিযার চেয়ে আমাদের নবীর মু’জিযা অতুলনীয় ও অদ্ভুত শানের অধিকারী।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরণ মুবারকের মু’জিযাঃ- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরণ মুবারক সর্বাপেক্ষা সুন্দরতম ছিল। তাঁর চরণ মুবারকের অনেক মু’জিযা রয়েছে। হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র পদদ্বয় যখন পাথরের উপর পড়ত তখন পাথর নরম হয়ে যেত। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) ও আবু উমামা (রাঃ) বলেন-
إنه صلى الله عليه وسلم كان إذا مشى على الصخر غاصت قدماه فيه
অর্থাৎ- “যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরের উপর চলতেন তখন এতে তাঁর পা মুবারকের চিহ্ন বসে যেত।” অর্থাৎ তাঁর পায়ের নীচে তা নরম হয়ে যেত। (বায়হাকী, ইবনে আসাকির, যুরকানি ৪র্থ খন্ড ১৯৭ পৃঃ) হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) বলেন- বিশ্বকুল সরদার হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তাঁর চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ‘যুলমাজায’ নামক স্থানে ছিলেন। এ স্থানটি আরফা থেকে তিন মাইল দুরুত্বে অবস্থিত। এখানে প্রত্যেক বৎসর মেলা বসত। রাসূলের চাচা আবু তালিব পিপাসী হয়ে পড়েন। তখন-
قال للنبى صلى الله عليه وسلم عطشت وليس عندى ماء فنزل النبى صلى الله عليه وسلم وضرب بقدمه اﻷرض فخرج الماء فقال إشرب
অর্থাৎঃ- “তিনি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন- হে ভাতিজা! আমি পিপাসার্ত এবং আমার কাছে কোন পানি নেই। এটা শুনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং তার পা মুবারক যমীনে মারলেন। অতপর যমীন থেকে পানি বের হতে লাগল। তিনি ফরমালেন, হে চাচা! পানি পান করুন।” (ইবনে সা’দ, ইবনে আসাকির, শিফা শরীফ, যুরকানী ৫ম খন্ড ১৭০ পৃঃ) এ ছিল পা মুবারকের মু’জিযা যে, যমীন পা মুবারকের ইঙ্গিত বুঝে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছে। আবু তালিব বলেন, আমি পরিতৃপ্ত হয়ে পানি পান করলাম। যখন আমার পান শেষ হয়, তিনি ঐ স্থানে (যেখান থেকে পানি বের হচ্ছিল) তাঁর পা মুবারক রেখে চাপ দিলেন, তখন পানি বন্ধ হয়ে যায়। (ইবনে আসাকির, ইবনে সা’দ) হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হযরত আবু বকর, হযরত ওমর ও হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে সাথে নিয়ে উহুদ পর্বতে আরোহন করলেন। তখন ঐ পর্বত কাঁপতে লাগল-
فضربه النبى صلى الله عليه وسلم برجله وقال أثبت فإنما عليك نبى وصديق وشهيدان (بخارى شريف)
অর্থাৎঃ- “নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ পাহাড়ের উপর পদাঘাত করলেন এবং ফরমালেন, থেমে যা, কারণ তোমার উপর রয়েছেন একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দু’জন শহীদ।” (বুখারী শরীফ ১ম খন্ড ৫১৯,৫২১,৫২৩ পৃঃ) এ প্রসঙ্গে আ’লা হযরত শাহ আহমদ রেযা খান (রঃ) চমৎকার মন্ত্মব্য করেছেন-
ایک ٹھوکر سے احد کا زلزلہ جاتا رہا – رکھتی ہیں کتنا وقار اللہ اکبر ایڑیاں
অর্থাৎঃ- “এক পদাঘাতে উহুদের কম্পন চলে যায়, আল্লাহু আকবার। কতই গাম্ভীর্য্যময় ক্ষমতার অধীকারী হয় পায়ের গোড়াল্লিয়।”
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখ মুবারকের মু’জিযাঃ- প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টির বিবরণ দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল করীমে এভাবে উল্লেখ করেছেন- مازاغ البصر وما طغى
অর্থাৎঃ- “মে’রাজ রজনীতে তাঁর চক্ষু (দৃষ্টি) আল্লাহর নিদর্শনাবলী অবলোকনে বিভ্রম ও লক্ষ্যচ্যুত হয়নি।” (সুরা-নজম-১৭) নবীজীর চোখের মু’জিযা সম্পর্কে স্বয়ং তিনি ইরশাদ করেছেন-
إنى لأنظر ٳلى ما ورائى كما أنظر ٳلى ما بين يدى
অর্থাৎঃ- “নিশ্চয়ই আমি আমার পিছনেও সেরূপ দেখি, যেরূপ আমার সম্মুখে দেখি।” (দালায়িলুন নবুওয়াহ-আবু নাঈম, খাসায়েসে কুবরা ১ম খন্ড ৬১ পৃঃ)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন-
إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال هل ترون قبلتى ههنا فوالله ما يخفى على ركوعكم ولاخشوعكم إنى لأراكم من وراء ظهرى (بخارى شريف)
অর্থাৎঃ- “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা কি আমার মুখ কিবলার দিকেই দেখছ? আল্লাহর কসম! আমার কাছে না তোমাদের রুকু লুকায়িত, আর না তোমাদের একাগ্রতা ও নম্রতা। নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতেও দেখি।” (বুখারী ১ম খন্ড ৫৯ পৃঃ) উল্লেখ্য যে, খুশূ’ (خشوع) অন্ত্মরের ভয় ও বিনয়ের এক অবস্থার নাম, যা চোখে দেখা যাওয়ার বিষয় নয়। কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ত্মরের গোপন অবস্থাদিও দৃষ্টিগোচর করে ফেলেন। তিনি আলো ও অন্ধকার উভয় অবস্থায় সমান দেখতে পান। যেমন- হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন-
كان رسول الله صلى الله صلى عليه وسلم يرى فى الظلماء كما يرى فى الضوء
অর্থাৎঃ- “হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনি ভাবে আলোতে দেখতে পান, তেমনিই অন্ধকারেও দেখতে পান।” (খাসায়েসে কুবরা ১ম খন্ড ৬১ পৃঃ) নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় বসে শতসহস্র মাইল দূরে সংঘটিত ঘটনাবলি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। এ বিষয়ে অনেক বর্ণনা হাদীসে পাকে এসেছে। তন্মধ্যে একটি হল- মূতার যুদ্ধে নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ বিন হারেসার হাতে যুদ্ধের পতাকা প্রদান করে সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন এবং অন্যান্য মুজাহিদীনদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ করলেন- যদি যায়েদ বিন হারেসা (রাঃ) শাহাদত বরণ করেন তাহলে হযরত জাফর (রাঃ) সেনাপতি হবেন। আর যদি তিনিও শহীদ হন তাহলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আর যদি তিনিও শাহাদতের মর্যাদা লাভ করেন, তাহলে মুজাহিদীনগণ অন্য কাউকে সেনাপতি নির্বাচন করবেন। অতঃপর যখন উক্ত সৈন্যবাহিনী মুতার যমীনে পদার্পন করলেন এবং যুদ্ধ শুরু হল, তখন রহমতে আলম নূরে মুজাসসাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায়ে মুনওয়ারা থেকে উক্ত যুদ্ধের চিত্র পর্যবেক্ষন করছেন। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সাহাবাদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ করলেন, যুদ্ধের পতাকা যায়েদ বিন হারেসা (রাঃ) হাতে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। অতঃপর নবীজী বললেন, এখন যুদ্ধের পতাকা হযরত জাফর (রাঃ) উত্তোলন করলেন। কিন্তু তিনিও শাহাদত বরণ করলেন। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন এখন আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) এর হাতে ইসলামের পতাকা আসছে। কিন্তু তিনিও শাহাদতের সুরা পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সর্বশেষ আল্লাহর একটি তরবারি (খালেদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)) যুদ্ধের পতাকা হাতে নিলেন। আর সুস্পষ্ট বিজয় ছিনিয়ে আনলেন। রাহমাতুল্লিল আলামীন মূতার মাঠে সংঘটিত যুদ্ধের অবস্থাদি সাহাবাদের শুনাচ্ছেন। যেই মূতা মদীনায়ে তৈয়্যেবা থেকে একমাস বা তারও অধিক দুরুত্ব পথে অবস্থিত। আর এ অবস্থায় রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নয়ন যুগল অশ্রম্নসিক্ত হয়ে মুক্তা ঝরাচ্ছিল। (বুখারী ১ম খন্ড ১৬৭ পৃঃ) সুতরাং প্রমানিত হয়ে গেল, নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শতসহস্র মাইল দূরে সংঘটিত ঘটনাবলি মদীনায় বসে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। শুধু তাই নয়, বরং সমগ্র দুনিয়া এবং তাতে কিয়ামত পর্যন্ত্ম যা হবার রয়েছে সব ঘটনাবলি তিনি তাঁর দৃষ্টি দ্বারা দেখে ফেলেছেন। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ফারুক (রাঃ) বলেন-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ٳن الله قد رفع لى الدنيا فأنا أنظر ٳليها وٳلى ما هو كائن فيها ٳلى يوم القيامة كأنما أنظر ٳلى كفى هذه
অর্থাৎঃ- “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য দুনিয়ার পর্দা সমূহ তুলে দিয়েছেন। অতঃপর আমি দুনিয়া এবং তাতে কিয়ামত পর্যন্ত্ম যা সংঘটিত হবে সব বিষয়কে এভাবে দেখছি, যেভাবে এই আমার হাতের তালুকে দেখছি।” (যুরকানী আলাল মাওয়াহিব) এতে সুস্পষ্ট প্রমানিত হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় বসে সমগ্র দুনিয়াকে হাতের তালুর মত দেখেছেন। শুধু দুনিয়া নয়, বরং মসজিদে নববীর মিহরাবে দাঁড়িয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেহেশত ও দোযখ দেখেছেন। নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টি দিয়ে ফরশ থেকে আরশ পর্যন্ত্ম সমগ্র খোদায়ী এমনকি স্বয়ং ‘লা ইলাহা ইল্লাহকে’ দেখেছেন।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্ণ মুবারকের মুজিযাঃ- আল্লাহ তায়ালা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দৃষ্টি শক্তির ন্যায় শ্রবণ শক্তিতেও সর্বোচ্চ পর্যায়ের মু’জিযা দান করেছেন। তিনি নিকটবর্তী ও দুরবর্তী আওয়াজ সমান শুনতেন। যেমন, আ’লা হযরত চমৎকার বলেছেন-
دور و نزدیک کے سننے والے وہ کان – کان لعل کرامت پہ لاکھوں سلام
অর্থাৎঃ- “সেই কর্ণ মুবারক দুরে ও নিকটে সমান ভাবে শ্রবণকারী। সেই মুক্তাময় কর্ণের অলৌকিক শক্তির প্রতি লাখো সালাম।” সরকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই ইরশাদ করেছেন- ٳنى أرى ما لا ترون وأسمع ما لا تسمعون
অর্থাৎঃ- “আমি তা দেখি, যা তোমরা দেখ না এবং আমি তা শুনি যা তোমরা শুনতে পাও না।” (তিরমিযী, ইবনে মাঝাহ, খাসায়েসে কুবরা ১ম খন্ড ৬৭ পৃষ্ঠা) উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মূনা (রাঃ) বলেন, একরাত্রে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হুজরায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি যথারীতি তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য উঠলেন এবং অযু করার জন্য গমন করলেন। অতঃপর আমি শুনতে পেলাম যে, তিনি অযু খানায় তিনবার “লাব্বাইক” (আমি তোমার কাছে উপস্থিত) এবং তিনবার “নুসিরতা” (তোমাকে সাহায্য করা হল) ফরমায়েছেন। যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অযু করে বের হলেন তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি শুনতে পেলাম- আপনি অযু খানায় তিনবার ‘লাব্বাইকা’ এবং তিনবার ‘নুসিরতা’ বলেছেন। যেন আপনি কোন মানুষের সাথে কথা বলছিলেন। আপনার কাছে আমি ব্যতীত কেউ ছিল কি? তখন নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমালেন- ইতি রাজেয, আমার কাছে ফরিয়াদ করছে। উল্লেখ্য যে, তখন রাজেয ছিল মক্কায়, আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মদীনায়। কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ফরিয়াদ শুনেছেন এবং তাকে সাহায্য করেছেন। আল্লামা যুরকানী উক্ত হাদীসের ব্যখ্যায় বলেন-
لا بعد فى سماعه صلى الله عليه وسلم من مسيرة ثلاث فقد كان يسمع أطيط السماء
অর্থাৎঃ- “হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন মাসের দুরুত্বের পথে একজন ফরিয়াদির ফরিয়াদ শুনা তো অসম্ভব নয়। কারণ তিনি যমীনে বসে আসমানের চড় চড় শব্দও শুনে থাকেন।” বরং আরশের নীচে চন্দ্রের সিজদাবনত হওয়ার আওয়াজ পর্যন্ত্মও শুনছিলেন। আর দালায়েলুন খায়রাত শরীফে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- أسمع صلٰوة أهل محبتى وأعرفهم
অর্থাৎঃ- “আমি আমার মুহাব্বত সম্পন্ন লোকদের দরূদ স্বয়ং শুনি এবং তাদেরকে চিনি।” (দলায়েলুল খয়রাত)
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দন্ত্ম মুবারকের মু’জিযাঃ- হুযুর রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দন্ত্ম মুবারক প্রশস্ত্ম, উজ্জ্বল ও দিপ্তিমান ছিল। যখন তিনি কথা বলতেন তখন তাঁর দন্ত্ম সমূহ থেকে আলো বের হত। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন-
إن النبى صلى الله عليه وسلم إذا ضحك يتلألؤ فى الجدر لم أرمثله قبله ولا بعده
অর্থাৎ- “নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাসতেন তখন দন্ত্ম সমূহ থেকে নূরের কিরণ বের হত, যা থেকে দেওয়াল সমূহ আলোকিত হয়ে উঠত। আর আমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মত তার পূর্বে ও পরে কাউকে দেখিনি। (তিরমিযী) পৃথিবীতে অনেক সুন্দর ও চমৎকার দাঁত বিশিষ্ট মানুষের আর্বিভাব হয়েছে। কিন্তু কারো দন্ত্মে এ ধরনের চমক দেখা যায়নি যে, মৃদু হাসির সময় দাঁতের কিরণ থেকে অন্ধকার রাত্রিতে দেওয়াল সমূহ আলোকিত হয়ে উঠেছে। এটা শুধুমাত্র হুযুর সরওয়ারে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দন্ত্ম সমূহের সৌন্দর্য যা মু’জিযা ছাড়া আর কিছুই নয়।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীর মুবারকের মু’জিযাঃ- হুযুর আনওয়ার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র শরীর মুবারক ছিল নূরানী। আর শরীর মুবারকের প্রতিটি অংশই মু’জিযার আধার। তবে নবীজীর নূরানী শরীরের বিশেষ মু’জিযা ছিল যে, কখনো নবীজীর শরীরে মাছি বসত না। বরং হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, শুধু শরীর মুবারক নয়, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পোষাক মুবারকেও কখনো মাছি বসেনি। পৃথিবীর কোন শক্তি মাছিকে শরীর থেকে তাড়াতে পারে না। কিন্তু রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীর মুবারকের মু’জিযা হল, মাছিও তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বকে বুঝতে পেরে তাঁর প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শন করে কখনো তাঁর শরীর মুবারকে বসেনি। এভাবে নবীজীর শরীর মুবারকের বিশেষ মু’জিযা হল- তার শরীর মুবারকের ছায়া ছিল না। যেমন হযরত যাকওয়ান (রাঃ) বলেন-
لم يكن يٰرى له ظل لا فى الشمس ولا فى القمر
অর্থাৎঃ- “নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছায়া দেখা যেত না। না সূর্যের আলোতে, আর না চন্দ্রের কিরণে।” (হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন, যুরকানী আলাল মাওয়াহিব) অনুরূপভাবে শরীর মুবারকের মু’জিযা সমূহের মধ্য হতে আরেকটি মু’জিযা হল- নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীর মুবারক থেকে নির্গত ঘাম অত্যন্ত্ম সুগন্ধিময়। হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন একবার সরকারে দো জাহান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুপুর বেলায় আমাদের ঘরে আরাম করছিলেন। তখন হযরত উম্মে সুলাইম (রাঃ) একটি শিশির মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নূরানী বদন মুবারকের নির্গত ঘাম এর বিন্দুগুলো জমা করতেছিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ রকম করতে দেখে ফরমালেন- হে উম্মে সুলাইম এ কি করছ? তিনি আরয করলেন- এটা হল আপনার ঘাম, যা আমরা আতরের সাথে মিশিয়ে নিব। আর এটা তো সমস্ত্ম আতর এবং সুগন্ধি অপেক্ষা অধিক সুবাসিত। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি বিশ্বকুল সরদার হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে আরয করল- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে নিজ কন্যা বিবাহ দিতে হবে। অথচ আমার কাছে কোন সুগন্ধি নেই। আপনি কিছু সুগন্ধি দান করুন। তিনি ফরমালেন- আগামীকাল খোলা মুখ বিশিষ্ট একটি শিশি নিয়ে আসবে। দ্বিতীয় দিন লোকটি একটি শিশি নিয়ে এল। হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উভয় বাহু থেকে শিশিতে ঘাম ঢালতে লাগলেন। এমনকি তা ভরে যায়। অতঃপর ইরশাদ করলেন, এটা নিয়ে যাও। আর তোমার কন্যাকে বলবে যেন এ থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করে। فكانت إذا تطيبت به يشم اهل المدينة رائحة ذٰلك الطيب فسموا بيت المطيبين
অর্থাৎ- “যখন উক্ত মহিলা নবীজীর ঘাম মুবারক সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করত, তখন সমস্ত্ম মদীনা বাসীর কাছে তার সুগন্ধি পৌঁছে যেত। এমনকি তাঁরা ঐ ঘরকে “বায়তুল মুতায়্যেবীন” (সুবাসিতদের ঘর) নামে আখ্যায়িত করল।” (আবু ইয়ালা, তাবরানী, যুরকানী, খাসায়েসে কুবরা)।
পরি শেষে বলা যায়, দুনিয়াতে যখনই মহান আল্লাহ তায়ালা কোন নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন তখনই তাঁদেরকে নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ স্বরূপ কতিপয় পৃথক মু’জিযা দান করেছিলেন। যেগুলোর মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের উম্মতের নিকট আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁদের নবুওয়াত ও রিসালাত এর সত্যতার প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের আক্বা ও মওলা হুযুর রহমতে আলম নূরে মুজাসসাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন এ দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন, তখন রব্বুল আলামীন তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ স্বরূপ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আপাদমস্ত্মক পবিত্র সত্তা মুবারককেই মু’জিযা বানিয়ে পাঠিয়েছেন। সুতরাং- মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্তা মুবারকের অস্ত্মিত্বই মু’জিযার একটি জগত। তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ মুবারক মু’জিযার এক একটি বিশাল ভান্ডার। আলোচ্য প্রবন্ধে উক্ত ভান্ডার সমূহের মধ্য হতে কতিপয় মু’জিযার বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়েছে। কেননা নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র সত্তা মুবারক থেকে এত অপরীসিম মু’জিযা প্রকাশিত হয়েছে যা গণনা করে হিসাব করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে প্রিয় নবীজীর শান-মান বুঝার ও উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

হযরত মুহাম্মদ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
আক্কাছ মিঞা

মোহাম্মদ নামে গুনাহ, মাফ হয় এত,
গুনাগারে গুনাহ ভবে, করতে পারে কত।
ঐ নামে যে এত বরকত, যদি মানুষ বুঝিত,
অন্য ধর্ম ত্যাগ করিয়া, সব মুসলমান হইত।
স্রষ্টায়ে সৃষ্টি করিয়াছে যত,
তুলনা নাহি মিলে মোহাম্মদের মত।
জাতি নূরের জ্যোতি নবী, সর্বাজ্ঞে সৃজিত,
মানব রুপে এই জগতে, হয়েছে প্রকাশিত।
যার উপরে দুরূদ আল্লাহ, পড়ে অবিরত,
দিবানিশি একটু সময়, নাহি যে বিরত।
আশেক হয়ে খুদেখোদা, করিতেছে হিত,
এমন কেহ আছে আর, করতে বিপরীত।
মোম্ম্মদকে কি একমাত্র, আল্লার আছে জ্ঞাত,
সেই ভেদ বুঝা কঠিন, চিন্তা করে শত।
লক্ষ লক্ষ নবী রাসুল, হয়ছে যারা গত,
মোহাম্মদের দোহাই দিয়ে, বিপদ উদ্দার হত।
মহানবীর প্রেমিক যারা, নাই ভয় ভীত,
ইহকালে পরকালে হয়ছে তারা কৃত।
ধন্য আমরা নবীর উম্মত, আল্লাহ আছে রত,
শুকরিয়া গাহি মোরা, শির করিয়া নত।

কাদেরিয়ার তরে
হাফেজ মোঃ আবুল কাশেম (ইমন)
আলিম ১ম বর্ষ

কাদেরিয়ারই ছাত্র মোরা
পড়ব কিতাব শত,
থাকব মোরা কাদেরিয়াতে
বিপদ আসুক যত।
আমরা হবো কাদেরিয়ারই
শত গোলাপ ফুল,
মোদের দেখে শিক্ষা নেবে
লক্ষ মানব কূল।
আমরা হবো আল্লাহর অলী
তৈয়্যব শাহ্‌ এর মতো,
ভাগবে সবাই মোদের দেখে
আছে বাতিল যত।
আমরা হবো ত্যৈয়ব শাহ এর মতো
লক্ষ সৈন্য দল,
কাদেরিয়ারই ঝান্ডা নিয়ে
সামনে সবাই চল।
আমরা হবো শ্রেষ্ঠ আলেম
সাজে আমজাদের,
রুখতে এলে ভেঙ্গে দিব
গর্দান ওহাবী মওদুদীদের।
ঞযব
মোঃ আবু তালহা সাগর
ইবতেদায়ী ৪র্থ শ্রেণী

নদী, সাগর, দ্বীপপুঞ্জ
জাহাজাদি গিরিপুঞ্জ
জাতি, ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ
কোর্ট, সিনেট, সংবাদপত্র
দিন, তারিখ ও মাসের নাম
পেশা আর খ্যাতদাম
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা
আরো যত বিশ্বধরা
পৃথিবীতে একটি আছে যত
তার পূর্বে ঞযব বসে শাস্ত্রবিধিমত।

অধম গুনাহগার
নুরুদ্দীন
আলিম ১ম বর্ষ

গোনাহগার আমি তুমি বিশ্বস্বামী
তোমার হাবীব যিনি,
তাঁরই নূরে গড়া, এ বিশ্বধরা
বিশ্ববাসী তাঁরে চিনি।
তিনি ছিলেন অনুপম, কেহ নাই তাঁরি সম
হাদীস প্রমাণ করে।
তাঁরই নূরে ধরা হল পাগল পারা
কোরআন বলে মধুর সুরে।
আল্লাহ বলেন তাই, কোরআনে মোরা পাই
দরূদ পড় তাঁর শানে,
তাতে মধু ভরা, প্রেমে বিশ্বআত্মহারা
মালাইকা আল্লাহ পড়েন প্রতিটিক্ষণে।
আমি অধম, গোনাহগার, নবী মোরে করো পার
আছি তোমারি পথ চাহি
রেখেছি চিত্তদ্বার খুলে, তুমি আসবে বলে
তাই তোমারই শান গাহি।

শীত এসেছে
মোঃ আবদুল কাদের জিলানী
দাখিল ৭ম শ্রেণী

শীত এসেছে শীত এসেছে,
খুব মজা হবে
সকাল বেলা পিঠা খেতে
ভিড় জমাবে বসে
হরেক রকম পিঠা পুলির
কত আয়োজন।
তাই দেখে মন ভরে যায়
ছোট্ট শিশুর মন।দুধপুলি আর ভাপা পিঠায়
মিষ্টি সুবাস গন্ধ
ছোট বড় ছেলে-মেয়ে
সকলের পছন্দ।

নাশিব গর্দান
মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ আশরাফী
আলিম ১ম বর্ষ

আমিত দুর্জয় মত্ত্ব সাগরিকা,
নাশি অরুদ্ধতেলি অহমিকা।
দস্তে আছে মম স্বাধীকার ডংকা,
মম হৃদে নাই বাতিলের শংকা।
আছে দস্তে মম তরবারি নাঙ্গা
বাতিলের খুনে করে নেব রাঙ্গা।
বাতিলের রক্তে বয়ে দেব গঙ্গা,
করে দেব জাঁহা খুনে খুনে রাঙ্গা।
সত্যের আদালত যাবে না লংঙ্গা,
তবে বাজবে আবার যুদ্ধ ডমকা।
মম হস্তে আছে তিক্ষ্ন অসি নাঙ্গা,
নাশিব গর্দান যদি কর দাঙ্গা।

সমাজ সেবক
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
দাখিল অষ্টম শ্রেণী

আব্বু কাছে নিয়ে বলে
খোকা তুই ডাক্তার হবি
আম্মু বলে খোকা আমার
হবে বাংলার কবি।
দাদা দাদু বলে আমায়
তুই হবি ইঞ্জিনিয়ার
ভেবে আমি কুল পাইনা
আশা রাখব কার।
একেক জনের একেক আশা
হবে কারটা পূরন
আমার ইচ্ছা সমাজ সেবক
করব সেবা আমরন।

মদীনা শরীফে যাওয়া
মোহাম্মদ আরমান হুসাইন
ফাযিল প্রথম বর্ষ

কাবা ঘরের যাত্রী
যিনি ওহে ভাগ্যবান,
ধন্য তোমার এ জীবন
হলে প্রভুর মেহমান।
ধন্য তুমি দু নয়নে
দেখবে কাবা ঘর,
যে কা’বাতে গাঁথা আছে
মুমিনের অন্ত্মর।
আসবে কখন সেই শুভ দিন
সে প্রতাশার মাস,
১২ রবিউল আউয়াল এলেন
নবী এ ধরায় দুকুল রাজ।
প্রভু তোমার দরবারে আমি।

মা
মুহাম্মদ মোক্তার আহমদ মজুমদার

চাঁদের মতো মুখটি মায়ের
মুখে চাঁদের হাসি
মায়ের হাতে জাদুর পরশ
পুষ্পরাশি রাশি।
মা তোমায় ভালোবাসি।
মায়ের হাতে কাচের চুড়ি
রিনিক-ঝিনিক বাজে
মাঝে আমার সবচেয়ে আপন
এই পৃথিবীর মাঝে।
মা,যে আমার হিরে মানিক
মা যে চোখের মনি
মা যে আমার হৃদয় জুড়ে
ভালোবাসার খনি।
মায়ের হাসি হৃদয়ের মাঝে
বাজায় সুখের বাঁশি
সুখে দুখে মায়ের কাছে
তাইতো ছুটে আসি।
মা তোমায় ভালোবাসি।
মা হলো বেহেশত
দু:খ দিলে শেষ
মায়ের মন খুশি রাখলে
পাবে দোয়া বেশ।

শ্রীকোটের ফুল

মোহাম্মদ আরমান হুসাইন
ফাযিল প্রথম বর্ষ

কোন ফুলের উপমা তুমি
ভেবে না পায় কুল,
তুমি শ্রী কুটেরই ফুল
তৈয়ব শাহ্‌ আমার
আওলাদে রাসূল
হুজুর কেবলার আগমনে
প্রাণেতে সাড়া জাগে,
আমি আশায় থাকি কিভাবে
দেখবো সবার আগে,
মুর্শিদ কেবলা তাহের শাহ্‌
আওলাদে রাসূল
মুর্শিদ আমার হুজুর কেবলা
তিনি যে কত মহান,
তাহার কাছে বায়াত হয়ে
আমরা যে ভাগ্যবান।
নূর নবীজির প্রিয় তুমি
আওলাদে রাসূল

মদীনা শরীফে যাওয়া

মদীনা শরীফে যাওয়া
মোহাম্মদ আরমান হুসাইন
ফাযিল প্রথম বর্ষ

কাবা ঘরের যাত্রী
যিনি ওহে ভাগ্যবান,
ধন্য তোমার এ জীবন
হলে প্রভুর মেহমান।
ধন্য তুমি দু নয়নে
দেখবে কাবা ঘর,
যে কা’বাতে গাঁথা আছে
মুমিনের অন্ত্মর।
আসবে কখন সেই শুভ দিন
সে প্রতাশার মাস,
১২ রবিউল আউয়াল এলেন
নবী এ ধরায় দুকুল রাজ।
প্রভু তোমার দরবারেআমি
একটি আশা রেখে যায়,
জীবনে একবার হলেও
নিবেন নবীজির রওজায়”

আল-কুরআনের আলো

আল-কুরআনের আলো

بسم الله الرحمن الرحيم
قُلْنَا يانَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلاَمًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ -وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْنَاهُمُ الأَْخْسَرِينَ

অনুবাদ : আমি বললাম, হে আগুন! ইবরাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। এবং তারা (নমরুদ এবং তার সম্প্রদায়) তাঁর (ইবরাহীমের) ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করল। তখন আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করে দিলাম। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং – ৬৯,৭০)
উক্ত আয়াতদ্বয়ের আলোকে আমার জীবনের বাস্ত্মব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি :
আল্লাহ তা’য়ালা উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য কুরআনুল কারীম নাযিল করে বিরাট অনুগ্রহ করেছেন, যা আমাদের জন্য অনেক বড় নেয়ামত। যা আল্লাহর সঙ্গে বান্দার নির্ভূল সেতু বন্ধন, মুক্তির একমাত্র পাথেয়, মণিমুক্তার ভান্ডার, অন্ত্মরের কালিমা দূরিকরণের, রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার বিস্ময়কর মহৌষধ। আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার মাধ্যম, সঠিক পথ প্রদর্শক, হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী, পরিপূর্ণ একটি জীবন-বিধান। যার ফাযায়েল অসংখ্য, এবং তিলাওয়াতের প্রতিদান ও সওয়াব অপরিসীম। সুতরাং উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ের আলোকে আমার বাস্ত্মব জীবনে যা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি তা হল, আমি কঠিন কঠিন সমস্যায় পড়ে, জটিল রোগে আক্রান্ত্ম হয়ে, বড় ধরণের মুসিবতের সম্মুখীন হয়ে পবিত্র কুরআনের স্মরণাপন্ন হই এবং উক্ত সমস্যা ও রোগ-বালাই থেকে উত্তরণের পথ খোঁজতে থাকি। অত:পর খোঁজতে খোঁজতে উক্ত আয়াতদ্বয়ের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে। তখন দেখতে পাই যে, নমরুদ ও তার সম্প্রদায় যখন হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করল, এমনকি শেষ পর্যন্ত্ম উনাকে জ্বলন্ত্ম আগুনে নিক্ষেপ করল। তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে অনুগ্রহ করে বিপদ থেকে এভাবেই রক্ষা করলেন যে, আগুনকে নির্দেশ দিলেন- তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল হয়ে যাও। শুধু শীতল নয়, বরং নিরাপদ, শান্ত্মিময় ও আরামদায়ক হিসেবে শীতল হয়ে যাও। আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন- যারা ইবরাহীম (আ:) এর ক্ষতি সাধন করতে চেয়েছিল তাদেরকেই আমি সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করে দিলাম। কারণ, তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। ইবরাহীম (আ:) এর আগুন নিভে গিয়ে ফুলবাগীচায় পরিণত হল। সুতরাং আমার অনুভূতি ও আশা এই যে, আল্লাহ পাক যেভাবে তাঁর বান্দা হযরত ইবরাহীম (আ:) কে কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা করলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদেরকে ধ্বংস করলেন। অনুরূপভাবে আমাদেরকেও আল্লাহ তা’য়ালা কঠিন বিপদ থেকে মুক্ত করবেন, রোগ থেকে নিরাময় দান করবেন। তাই আমি উক্ত দু’টি আয়াতের আমল করতে থাকি। আর আল্লাহর দরবারে দু’আ ও ফরিয়াদ করতে থাকি। অবশেষে আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণী আমার উপর হয়েছে যে, আল্লাহ তা’য়ালা কঠিন বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন এবং রোগ থেকে নিরাময় দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ্‌। এভাবে প্রত্যেক সমস্যার ফলপ্রসূ সমাধান পবিত্র কুরআনে রয়েছে।
অতএব আমার পীর ভাই-বোন ও ছাত্র ভাইদের প্রতি অনুরোধ, আসুন আমরা পবিত্র কুরআনকে চর্চা করি এবং অন্ত্মর দিয়ে ভালবাসি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে কুরআনের সংযোগ করি। আমাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান পবিত্র কুরআনের মধ্যে দেখি এবং খোঁজি। আর ছড়িয়ে থাকা মণিমুক্তাগুলো আহ্‌রণ করি। মহান আল্লাহ বড় দয়াবান ও মেহেরবান। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন! আমীন।