আপনাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর জানতে…ফোন করুন

প্রিয় আশেকে রাসূল (দঃ) ভাই ও বোনেরা
আপনারা সুন্নি আক্বিদা সম্পর্কিত যে কোন প্রশ্ন করে উত্তর পেতে
নিচের নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন।
প্রশ্ন করার সময় রাত 9.00 হতে 11.00 পর্যন্ত।
মোবাইল নাম্বার – 01815229494

আপনাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিবেন
মুফতি মাওলানা আ.স.ম এয়াকুব হোসাইন আলকাদেরী সাহেব
এম.এম,এম.এফ,বি.এ (অনার্স) এম.এ অল ফাষ্ট ক্লাশ

আরবী প্রভাষক
কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা

খতিব
বাইতুর রাসূল (দঃ) জামে মসজিদ
ঢাক-1207

ঐতিহাসিক জশনে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: কোরআন-সুন্নাহর আলোকে পর্যালোচনা

ঐতিহাসিক জশ্নে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: কোরআন-সুন্নাহর আলোকে পর্যালোচনা
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ জালালুদ্দীন আলক্বাদেরী

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমণের দিন কেবল ঈমানদারদের জন্য নয় বরং সৃষ্টি জগতের সকলের জন্য আনন্দের ও রহমতের দিন। এজন্য সারা বিশ্বের মু’মিনগণ অত্যমত্ম ভক্তি ও মর্যাদার সাথে রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করে থাকেন। এটি একটি শরীয়তসম্মত পূণ্যময় আমল, যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা সু-প্রমাণিত।
1. ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচিতি:
ক. ঈদে মিলাদুন্নবী’র পরিচয়
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ শব্দটি যৌগিক শব্দ, যা তিনটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। (১) ঈদ, (২) মিলাদ, (৩) নবী।
প্রথমঃ ঈদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি।
বিশ্ববিখ্যাত অভিধান প্রণেতা ইবনু মনযুর বলেন- العيد كل يوم فيه جمع
অর্থ- ‘সমবেত হবার প্রত্যেক দিনকে ঈদ’ বলা হয়।১
মুফতি আমীমূল ইহসান আলাইহির রাহমাহ বলেন- العيد كل يوم فيه جمع او تذكار لذي فضل
অর্থ ‘কোন মার্যাদাবান ব্যক্তিকে স্মরণের দিন বা সমবেত হবার দিনকে ঈদের দিন বলা হয়।’২
দ্বিতীয়ঃ মিলাদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ: জন্মকাল, জন্মদিন। অর্থে মাওলিদ (مولد) শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় অত্যাধিক।
তৃতীয়ঃ নবী। এখানে নবী বলতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। কারণ, মুসলিম জাতি ও পুরো সৃষ্টিজগত তাঁর আগমনের শোকরিয়া আদায় করে। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ অর্থ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র আগমনের আনন্দ।
খ. ‘মিলাদুন্নবী’ শব্দের প্রচলন:
‘মিলাদুন্নবী’ শব্দের মধ্যে ‘মিলাদ’ শব্দটি কারো জন্ম বা জন্মকাল বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। এ অর্থে শব্দটির ব্যবহার রয়েছে হাদিস শরীফে, অভিধান গ্রন্থে, ইতিহাস গ্রন্থে; এমনকি অনেক কিতাবের নামেও। এটি নতুন কোন শব্দ নয়। এর কয়েকটি ব্যবহার নিম্নে উল্লেখ করা হল।
1. অভিধান গ্রন্থ:
আল্লামা ইবনু মনযুর তাঁর সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরব’ এ লিখেছেন ميلاد الرجل: اسم الوقت الذي ولد فيه
অর্থ- ‘লোকটির মিলাদ, যে সময়ে সে জন্ম গ্রহণ করেছে সে সময়ের নাম।৩
2. হাদিছ গ্রন্থ :
ইমাম তিরমিযী আলাইহির রাহমাহ তাঁর ‘আল জামেউস সহীহ’ গ্রন্থের একটি শিরোনাম দিয়েছেন باب ما جاء في ميلاد النبي
অর্থ- ‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্ম সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়ের অধ্যায়।’৪
হযরত উসমান বিন আফ্ফান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বনী ইয়ামর বিন লাইসের ভাই কুরাছ বিন উশাইমকে জিজ্ঞেস করলেন اأنت اكبر ام رسول الله صلي الله عليه وسلم فقال : رسول الله اكبر مني وانا اقدم منه في الميلاد
অর্থ- ‘আপনি বড়, নাকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? তিনি বললেন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আমার চেয়ে বড়। আর আমি জন্মের মধ্যে তাঁর চেয়ে অগ্রজ।’৫
3. ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থ :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা মদিনা হিজরতকালে ‘সাওর’ গুহায় আশ্রয় নেন। এদিকে কুরাইশরা তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ‘সাওর’ গুহার মুখে পৌছলে তাদের একজন বলল ان عليه العنكبوت قبل ميلاد النبي صلي الله عليه وسلم فانصرفوا অর্থ : ‘হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এর জন্মের পূর্ব থেকে এ গুহামুখে মাকড়শার জাল রয়েছে। অতঃপর তারা চলে গেল।’৬ ইবনু আউন (রহ.) বলেন: قتل عمار وهو ابن احدي وتسعين سنة وكان اقدم في الميلاد من رسول الله صلي الله عليه وسلم অর্থ- ‘হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ৯১ বছর বয়সে শহীদ হন। তিনি জন্মের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র অগ্রজ ছিলেন।’৭ হযরত ইবনু আববাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন وكان بين ميلاد عيسي والنبي عليه الصلاة والسلام خمس مأة سنة وةسع وسةون سنة অর্থ: আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের মাঝখানে ৫৬৯ বছর ব্যবধান ছিল।’৮ আল্লামা ইবনু হাজর আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন فانه ولد بعد ميلاد النبي صلي الله عليه وسلم بمدة অর্থ- ‘তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্মের কিছুকাল পরে জন্ম গ্রহণ করেছেন।৯
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি থেকে বুঝা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্ম বুঝানোর জন্য ‘মিলাদুন্নবী’ শব্দটির ব্যবহার সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে অদ্যবধি রয়েছে। এটি এ যুগের নবসৃষ্ট কোন শব্দ নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে যে, ‘মিলাদুন্নবী’ একটি ইদানিং সময়ের শব্দ। তাদের এ মমত্মব্য আদৌ সঠিক নয়। আবার কেউ কেউ ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ ‘জন্ম’ না নিয়ে অন্য অর্থ নেয়ার চেষ্টা করে, যা কোন অভিধান প্রণেতা উল্লেখ করেননি।
গ. ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ পরিচয় :
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বলতে এ ধরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র আগমনে আনন্দিত হওয়া এবং এ অদ্বিতীয় নিয়ামত পাবার কারণে সৎকাজ ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা।
ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন: (ক) কুরআন মাজীদের আলোকে :
1. নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের নির্দেশ : মহান রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআনে তাঁর দেয়া নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন فاذكروني اذكركم واشكروالي ولا تكفرون অর্থ- ‘সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করবে। তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।১০
তাই, আল্লাহর নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপন করা প্রত্যেক মানুষের ওপর কর্তব্য। শোকরিয়া জ্ঞাপনের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে, যা মহান রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন।
নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের পদ্ধতি:
নিয়ামতের স্মরণ:
নিয়ামতের স্মরণ করাও শোকরিয়া জ্ঞাপনের একটি মাধ্যম। নিয়ামতের স্মরণ করার মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপন করা যায়। তাই মহান রাববুল আলামীন ইরশাদ করেছেন يابني اسرائيل اذكروا نعمتي التي انعمت عليكم অর্থ: ‘হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ কর যদ্দারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহিত করেছিলাম’১১ তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেছেন واذكروانعمة الله عليكم অর্থ- তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর।’১২ নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া: নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের আরেকটি মাধ্যম হল নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া, অপরকে জানানো ইত্যাদি।১৩ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন واما بنعمة ربك فحدث অর্থ-‘তুমি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা জানিয়ে দাও।’১৪ অত্র আয়াতে মহান রাববুল আলামীন মানুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা তাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করে।
নিয়ামত চেনা: নিয়ামতকে নিয়ামত হিসেবে চেনাও শোকরিয়া জ্ঞাপনের একটি মাধ্যম। প্রত্যেক নিয়ামত হল আল্লাহু প্রদত্ত। আর এ নিয়ামতের মর্যাদাও চিনতে হবে এবং তদানুযায়ী শোকরিয়া জ্ঞাপন করতে হবে।
ইবাদত বন্দেগী : আল্লাহর নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হল ইবাদত-বন্দেগী। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ছাড়াও অন্যান্য নফল ইবাদত যেমন দান-খয়রাত, অনাথ-গরীবদের খাওয়ানো ইত্যাদি শোকরিয়া জ্ঞাপনের উত্তম মাধ্যম। ফরজ ইবাদত পালনের মাধ্যমে দায়মুক্তি পাওয়া যায়; কিন্তু অধিকতর কৃতজ্ঞ হবার জন্য নফল ইবাদতের বিকল্প নেই।
ঈদ উদযাপন করা : আল্লাহর নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমেও নিয়ামতের শোকরিয়া করা যায়। যেমন- হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন ربنا انزل علينا مائدة من السماء تكون لنا عيدا لاولنا واخرنا واية منك অর্থ- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন; এটি আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হবে ঈদ স্বরূপ এবং আপনার নিকট হতে নিদর্শন।’১৫
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তায়ালার নিকট ফরিয়াদ করেছিলেন, যেন তিনি তাদের জন্য আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন যে, খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হলে তারা সে দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করবেন। মহান রাববুল আলামীন তাদের ওপর সেই নিয়ামত রবিবারে অবতীর্ণ করেছিলেন বিধায়, তারা আজও রবিবারকে ঈদের দিন হিসেবে মেনে থাকে এবং এদিনকে তার ছুটির দিন হিসেবে পালন করে।
কুরআন মাজীদের এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার স্বীকৃতি রয়েছে; কারণ তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ঈদ উদযাপনের স্বাকৃতি দিয়ে তাঁর উক্তি পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন এবং কোন প্রকার নিষেধ করেননি। এটি অবৈধ হলে তিনি অবশ্যই তা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করতেন।
খৃষ্টানদের ওপর খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা রবিবারে অবতীর্ণ হবার কারণে সেদিনকে যদি ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করা যায়, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আগমনের দিনকে কেন ঈদের দিন হিসেবে মানা যাবে না? অথচ তিনিই হলেন সবচেয়ে বড় নিয়ামত। সুতরাং ছোট নিয়ামতের শোকরিয়া স্বরূপ সেই নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করা বৈধ হলে, নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে মানা ও উদযাপন করা বৈধ।
খুশি উদযাপন করা:
আল্লাহ তায়ালার নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হল- নিয়ামতের ওপর খুশি উদযাপন করা। তাই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন قل بفضل الله وبرحمته فبذالك فليفرحوا هو خير مما يجمعون অর্থ- ‘(হে রাসুল!) আপনি বলুন, (সবকিছু) আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তারা (মুসলমানরা) যেন খুশি উদযাপন করে। তারা যা সঞ্চয় করছে তা থেকে এটিই শ্রেষ্ঠতর।’১৬
এ আয়াতে মহান রাববুল আলামীন খুশি উদযাপনের দুটি উপকরণ সাব্যসত্ম করেছেন। একটি হল অনুগৃহ (فضل), আর অপরটি হল (رحمة)। এতদুভয়ের মর্ম কী- এর ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসির বিশারদ আল্স্নামা মাহমুদ আলুসী১৭, ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী,১৮ ইমাম আবু হাইয়ান আনদুলসী১৯ আলাইহিমুর রাহমান স্ব-স্ব তাফসীরে গ্রন্থে তাফসিরকারকদের শিরোমণি হযরত ইব্ন আববাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এখানে (فضل) দ্বারা জ্ঞান এবং (رحمة) দ্বারা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদ্দেশ্য। আল্লামা ইবনু জাওযী (রহ.) বলেন ان فضل الله العلم ورحمته محمد صلي الله عليه وسلم ু رواه الضحاك অর্থ- ‘নিশ্চয় আল্লাহর ‘ফদ্বল’ হল জ্ঞান আর ‘রহমত’ হল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা, যা ইমাম দাহ্হাক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন।২০ আল্লামা তিবরিসী উল্লিখিত আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে বলেন فا فرحوا بفضل الله عليكم ورحمةه لكم بانزال هذا القران وارسال محمد اليكم فانكم ةحصلون بهما نعيما دائما مقيما هو خير لكم من هذه الدنيا الفانية অর্থ- ‘তোমাদের প্রতি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করে এবং কুরআর অবতীর্ণ করে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর যে দয়া ও করুণা করেছেন, তাতে তোমরা খুশি উদযাপন কর। কেননা, উভয়ের (ফদ্বল ও রহমত) মাধ্যমে নিশ্চয় তোমরা চিরস্থায়ী নিয়ামত অর্জন করবে, যা এ নশ্বর প্রথিবী থেকে তোমাদের জন্য অধিকতর শ্রেয়।’২১
ইমাম বাক্বির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়লা আনহু প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত ক্বাতাদাহ্, হযরত মুজাহিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেন যে, (فضل الله) দ্বারা রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্স্নামাকে বুঝানো হয়েছে।২২
উল্লিখিত আয়াতে ‘রহমত’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাকে বুঝানো হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেছেন وما ارسلناك الا رحمة للعالمين ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছে।’২৩
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা মাহমূদ আলূসী আলাইহির রাহমাহ প্রমূখের মতে ‘রহমত’ হল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি নাম। এছাড়াও রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত। এতে কারো দ্বিমত নেই। তাই, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন ولقد من الله علي المؤمنين اذ بعث فيهم رسولا من انفسهم অর্থ- ‘আল্লাহ মুমিনদের ওপর অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন।’২৪
সুতরাং বুঝা গেল যে, রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বিশ্ববাসীর জন্য বড় অনুগ্রহ ও নিয়ামত। এ কারণে আল্লাহু তায়ালা এ বড় অনুগ্রহ তথা রাসূলুল্লাহকে পাবার ওপর খুশি উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহকে পাবার দিন হল ‘মিলাদুন্নবী’ এবং ‘মিলাদুন্নবী’ কে কেন্দ্র করে খুশি উদযাপন করাই হল ‘ঈদ মিলাদুন্নবী’, যা পালন করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন।
দেওবন্দীদের গুরু মৌলভী আশরাফ আলী থানভী সাহেব বলেন যে, ‘‘উল্লেখিত আয়াতে ‘রহমত’ও ‘ফদ্বল’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাকে বুঝানো হয়েছে, যার জন্মের ওপর আল্লাহ তায়ালা খুশি উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তিনি সকল নিয়ামতের মূল। তাই তাঁর আগমনে যতই খুশি উদযাপন করা হোক না কেন তা কমই হবে।’’২৫
এ ছাড়াও উপরিউক্ত আয়াতে ‘রহমত’ শব্দ দ্বারা রাসূলুল্লাহকে খাস বা নির্দিষ্ট অর্থে বুঝানো না হলেও ‘আম’ বা ব্যাপকার্থে তাঁকে বুঝাতে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না। কারণ, তিনি সৃষ্টিজগতের প্রতি আল্লাহর বড় রহমত। আল্লাহর অন্যান্য নিয়ামতের ন্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা যেহেতু একটি নিয়ামত, সেহেতু তাঁর আগমনের ওপর খুশি উদযাপন করা আল্লাহর নির্দেশ পালন মাত্র। আর রাসূলুল্লাহ’র জন্ম উপলক্ষে খুশি উদযাপন করার নামই হল ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’।
অতএব, কুরআনের আয়াত থেকে প্রমাণিত হল যে, রাসূলের জন্ম উপলক্ষে খুশি উদযাপন করা আল্লাহর নির্দেশের অমত্মর্ভূক্ত। খুশি উদযাপনের ক্ষেত্রে সকল বৈধ পন্থা গ্রহণ করা শরিয়ত সম্মত। তাই মুসলমানগণ একত্রিত হয়ে মানুষদের প্রতি আল্লাহর বড় কৃপার কথা তথা রাসূলের আগমনের কথা স্মরণ করে, রাসূলের জীবন-বৃত্তামত্ম বর্ণনা করে, ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে খানা-পিনা খাওয়ানোর ব্যবস্থা এবং দান-সদকা ইত্যাদির ব্যবস্থা করো। মোটকথা, খুশি উদযাপনের বহিঃপ্রকাশ শরিয়ত সম্মত পন্থায় হলে কোন অসুবিধা নেই। ইহা বড় সওয়াব ও ইবাদত।
2. মহান আল্লাহ কর্তৃক মিলাদুন্নবী উদযাপন
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মিলাদুন্নবী উদযাপন বলতে নবীর জন্মকে স্মরণ করা এবং তাঁর জীবন-বৃত্তামত্ম বর্ণনা করা। মহান রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআনে পঁচিশ জন নবী- রাসূলের মধ্যে হযরত আদম, হযরত মূস, হযরত ইয়াহইয়া, হযরত ঈসা ও হযরত মুহাম্মদ আলাইহিমুস সালামের জন্ম-বৃত্তামত্ম বর্ণনা করেছেন। যেমন- হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন وسلام عليه يوم ولد অর্থ- ‘তার প্রতি শামিত্ম যেদিন তিনি [ইয়াহইয়া (আ.)] জন্মলাভ করেছেন।’২৬ এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের জন্মকালের কথা উল্লেখ করেছেন। আর এটার নাম ‘মিলাদুন্নবী’ বা নবরি জন্মকাল। তিনি পবিত্র কুরআনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা সম্পর্কে ইরশাদ করেন لقد جاءكم رسول من انفسكم عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم بالمؤمنين روؤف رحيم অর্থ- ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকেই (বংশ থেকে) তোমাদের নিকট এসেছেন এক রাসূল। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক, তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সেণহশীল, পরম দয়ালু।’২৭
এ আয়াতে মহান আল্লাহ আরবদেরকে স্মরণ করে দিলেন যে, তাদের নিকট তাদের বংশ থেকেই এক মহান রাসূল এসেছেন। এখানে আসার অর্থ হল জন্ম গ্রহণ করা। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্ম তথা ‘মিলাদুন্নবী’র কথা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি অসংখ্য আয়াতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার আগমনের কথা উল্লেখ করেছেন। এভাবে তিনি তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলের জন্ম বৃত্তামত্ম বর্ণনা করেছেন তথা ‘মিলাদুন্নবী’ উদযাপন করেছেন। তাই মুমিনগণও তাদের প্রতি নবী প্রেরণের কথা স্মরণ করেন।
খ. হাদিছ শরিফের আলোকে
ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদযাপন করা হাদিছ শরিফ দ্বারাও প্রমাণিত হয়। রাসূলুল্লাহ নিজেও শোকরিয়া স্বরূপ এ ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করেছেন, ছাগল জবাই করে এবং রোযা রেখে। এ সম্পর্কি কয়েকটি হাদিছ নিম্নে উল্লেখ করা হল।
1. প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাসা রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু বলেন قدم النبي المدينة فرأي اليهود تصوم يوم عاشوراء فقال ما هذا؟ قالوا هذا يوم صالح هذا يوم نجي الله بني اسرائيل من عدوهم فصامه موسي قال فانا احق بموسي منكم فصامه وأمر بصيامه
অর্থ : ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা মদিনা শরীফ আগমন করলেন এবং সেখানে ইয়াহুদিদেরকে আশুরার দিনে রোযা রাখতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- এটা কিসের রোযা? তারা বলল- এটা উত্তম দিন, আর এ দিনেই আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে তাদের শত্রুদের থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এ দিনে রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, তোমাদের চেয়ে মূসা আলাইহিস সালামের আমিই অধিকরতর হক্বদার। অতঃপর তিনি স্বয়ং রোযা রাখলেন এবং তাঁর উম্মতদেরকে এ রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন।২৮
2. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অন্য বর্ণনা করেন هذ اليوم الذي اظفر الله فيه موسي وبني اسرائيل علي فرعون ونحن نصومه تعظيما له فقال رسول الله صلي الله عليه وسلم : نحن اولي بموسي منكم ثم امر بصومه
এদিনেই আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং বনি ইসরাঈলকে ফিরাউনের ওপর বিজয় দান করেছেন। আমরা এ দিনের সম্মানার্থে রোযা রাখছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন- ‘‘আমরা তোমাদের চেয়ে মূসা আলাইহিস সালাম’র অধিকতর হক্বদার। তারপর তিনি (মুমিনদেরকে) এ রোযা রাখার নির্দেশ দেন।’২৯
3. হযরত আবু ক্বাতাদাহ আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন إن رسول الله صلي الله عليه وسلم سئل عن صوم يوم الاثنين قال: ذاك يوم ولدت فيه ويوم بعثت او انزل علي فيه
অর্থ- ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাকে সোমবারে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন- সেদিন আমার জন্ম হয়েছে, আমি নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি এবং আমার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।’৩০
উল্লিখিত হাদিছ শরীফ থেকে বুঝা গেল যে, রাসূলুল্লাহ সোমবার রোযা রাখতেন। সাহাবায়ে কেরাম এর কারণ জানতে চাইলে তিনি ইরশাদ করেন যে, সেদিন তাঁর জন্মদিন ও নবুয়ত প্রকাশের দিন। তাঁর ওপর আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করে তিনি প্রতি সোমবার আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে রোযা রাখতেন। তিনি জন্মদিনে আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করতেন। সুতরাং আল্লাহর নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন করা রাসূলুল্লাহর সুন্নাত।
উপরিউক্ত হাদিছসমূহ থেকে প্রমাণিত হল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্ম উপলক্ষে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন করা শুধু বৈধ নয়; বরং অত্যমত্ম সওয়াবের কাজ। এটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর সুন্নাত। কারণ তিনি নিজেও আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে ছাগল জবাই করে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন করেছেন এবং প্রতি সোমবার রোযা রাখতেন।
গ. সাহাবায়ে কিরামের স্বীকৃতি :
১. ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন -من انفق درهما علي قراءة مولد النبي صلي الله عليه وسلم كان رفيقي في الجنة
অর্থ- ‘যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাআ উদযাপনে এক দিরহামও ব্যয় করবে সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।’৩১
2. ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন من عظم مولد النبي صلي لله عليه وسلم فقد احي الاسلام
অর্থ- ‘যে ব্যক্তি ‘মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদযাপনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল, সে যেন ইসলামকে উজ্জীবিত করল।’৩২
3. ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন من انفق درهما علي قراءة مولد النبي صلي الله عليه وسلم فكانما شهد غزوة بدر وحنين
অর্থ- ‘যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী উদযাপনে এক দিরহামও ব্যয় করবে, সে যেন বদর ও হুনাইনে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করল।’৩৩
4. ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন من عظم مولد النبي صلي الله عليه وسلم وكان سببا لقرأته لا يخرج من الدنيا الا بالايمان ويدخل الجنة بغير حساب
অর্থ- ‘যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল; সে যেন মিলাদুন্নবী উদযাপন করল। এ কারণে সে ঈমানের সাথে মৃত্যু বরণ করবে এবং বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে।’৩৪
খোলাফায়ে রাশেদীনের উপরিউক্ত বর্ণন থেকে বুঝা গেল যে, ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করতেন সাহাবায়ে কিরামগণও। তাদের বাণী সমূহ থেকে আরো বুঝা যায় যে, ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন করা অত্যমত্ম সওয়াবের কাজ।
ঘ. সালফে সালেহীনের স্বীকৃতি :
১. প্রথম সারীর তাবেঈ হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন وددت لو كان لي مثل جبل احد ذهبا فانفقته علي قراأة مولد النبي صلي الله عليه وسلم
অর্থ- ‘যদি আমার নিকট উহুদ পর্বতসম স্বর্ণ থাকত, তাহলে আমি তা মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদযাপনে খরচ করতাম।’৩৫
2. তাবেঈ যুগের প্রখ্যাত সূফি এবং মুহাদ্দিছ ইমাম সার্রি সাক্বাত্বী আলাইহির রাহমাহ বলেন من قصد موضعا يقرافيه مولد النبي صلي الله عليه وسلم فقد قصد روضة من رياض الجنة لانه ما قصد ذالك الموضع لا لمحبة الرسول
অর্থ- ‘যে ব্যক্তি কোন স্থানে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদযাপনের ইচ্ছা করল, সে যেন জান্নাতের বাগান সমূহের একটি বাগানে মিলাদুন্নবী উদযাপনের ইচ্ছা করল। কেননা, সে রাসূলুল্লাহর ভালোবাসার কারণেই ঐ স্থানে মিলাদুন্নবী উদযাপনের ইচ্ছা করেছে।’৩৬
উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা গেল যে, ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা তাবেঈ কর্তৃক স্বীকৃত এবং উত্তম তিন যুগের উলামায়ে কিরাম ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপনের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
ঙ. উলামায়ে আহনাফের অভিমত :
ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে উলামাযে আহনাফের অভিমত পাওয়া যায়। তা থেকে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল এবং হাদিছ ভাষ্যকার ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী আলাইহির রাহমাহ ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপনের পক্ষে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। নিম্নে এর ক্রিয়দাংশ উল্লেখ করা হল। তিনি বলেন ان الزاهد القدوة المعمر ابا اسحاق ابراهيم بن عبد الرحيم بن جماعة لما كان بالمدينة النبوية علي ساكنها أفضل الصلوة واكمل التحية كان يعمل طعاما في المولد النبي صلي الله عليه وسلم ويطعم الناس …………………………….. وسميته بالمورد الروي في مولد النبي
অর্থ- ‘‘অনুসরণীয় সূফি আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন আব্দর রহীম বিন জামায়াহ্ আলাইহির রাহমাহ যখন মদিনা শরীফে ছিলেন, তখন তিনি মিলাদুন্নবী উদযাপন উপলক্ষে খাবার তৈরী করে মানুষদের খাওয়াতেন আর বলতেন- ‘আমার পক্ষে যদি সম্ভব হতে, তাহলে পুরো মাস জুড়ে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদযাপন করতাম।’ আমি মুল্লা আলী ক্বারী বলছি- আমি যেহেতু (ইবনে জামায়াহর মত সম্পদ ব্যয় করে) যিয়াপত করতে অক্ষম, সেহেতু (ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনে) এ ক’টি পৃষ্ঠা লিখলাম, যাতে এগুলো এমন অপ্রকাশ্য যিয়াফত হয়ে যায়, যা শুধু মাস বা বছর নয়; বরং যুগ যুগ ধরে চলমান থাকবে। আর এর (পৃষ্ঠাগুলোর) নাম রাখলাম ‘আল-মাওরিদুর রবী ফি মাওলিদিন্ নবী।’’৩৭
2. ‘রুহুল বয়ান’ গ্রন্থাকার আল্লামা ইসমাঈল হক্কী আলাইহির রাহমাহ বলেন ومن تعظيمه عمل المولد اذالم يكن فيه منكر قال السيوطي قدس سره يستحب لنا إظهار الشكر لمولده عليه السلام-
অর্থ- ‘শরীয়তে নিষিদ্ধ নয় এমন কাজ দ্বারা মিলাদুন্নবী উদযাপন করা রাসূলুল্লাহকে সম্মান করার নামামত্মর।
ইমাম সুয়ূতী কুদ্দিসা সিররুহ বলেন- মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্য শোকরিয়া জ্ঞাপনের বহিঃপ্রকাশ করা আমাদের জন্য মুসত্মাহাব।’৩৮
3. শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী আলাইহির রাহমাহ বলেন لايزال اهل الاسلام يحتفلون بشهر مولده صلي الله عليه وسل ويعملون الولائم ………………… بقراأة مولده الكريم
মিলাদুন্নবীর মাসে মুসলিমগণ সর্বদা মিলাদ মাহফিল করে আসছেন, খানা পিনার ব্যবস্থা করে থাকেন, আনন্দ প্রকাশ করেন, অধিক নেক আমল করেন এবং মিলাদুন্নবীর গঠনাবলী বর্ণনা করেন।৩৯
4. আল্লামা শাহ্ আব্দুর রহিম মুহাদ্দিছ দেহলভী আলাইহির রাহমাহ বলেন كنت اصنع في ايام المولد طعاما صلة بالنبي صلي الله عليه وسلم ……………. هذا الحمص متبهجا شاشا
অর্থ- ‘মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা উদযাপন উপলক্ষে আমি প্রতি বছর খানা-পিনার ব্যবস্থা করতাম; কিন্তু এক বছর তেমন খানা-পিনার ব্যবস্থা করতে না পেরে কিছু ভাজা চনাবুট মানুষদেরকে দিলাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাকে স্বপ্নে দেখলাম যে, আমার ভাজা চনাবুট তাঁর সামনে আছে এবং তিনি আনন্দিত।’৪০
5. শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী আলাইহির রাহমাহ বলেন-
وكنة قبل ذالك بمكة المعظمة في مولد النبي صلي عليه وسلم في يوم ولادةه والناس يصلون علي النبي صلي الله عليه وسلم ………………… انوار الرحمة
অর্থ- ‘ইতিপূর্বে আমি মিলাদুন্নবী উদযাপনের সময় মক্কা শরীফ ছিলাম। যখন মানুষেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র ওপর দরুদ পাঠ করছিলেন এবং সেসকল ঘটনা বর্ণনা করছিলেন, যা তাঁর বিলাদত শরিফের সময় এবং বিলাদতের পর প্রকাশ পেয়েছিল। অতঃপর আমি দেখতে পেলাম যে, মাহফিলের ওপর তাজাল্লিয়াতের বর্ষণ শুরু হয়েছে। আমি বলছি না যে, এ দৃশ্য শুধু চর্ম চক্ষু দ্বারা দেখেছি। আর এটা বলছি না যে, শুধু অমত্মরের চক্ষু দ্বারা দেখেছি। (অর্থাৎ উভয় চোখ দ্বারাই দেখেছি) আল্লাহ অধিকতর জ্ঞাত সুতরাং যাই হোক না কেন, আমি চিমত্মা করে বুঝতে পেরেছি যে, মূলতঃ নূরের তাজাল্লিয়াত ফেরেশতাদের নূরের তাজাল্লিয়াতের সাথে আল্লাহর রহমতও অবতীর্ণ হচ্ছে।’৪১
6. ‘ইলমুছ ছিগাহ’ গ্রন্থকার মুফতি ইনায়াতুল্লাহ কাকুরবী আলাইহির রাহমাহ বলেন-
‘হারামাইন শরিফাইন এবং অধিকাংশ ইসলামী দেশে রবিউল আউয়াল মাসে মুসলিমরা মিলাদুন্নবী উদযাপন করেন, মুসলমানদেরকে একত্র করে মিলাদ-মাহফিলের ব্যবস্থা করেন, অধিক পরিমাণে দরুদ শরীফ পাঠ করেন এবং খানা-পিনা বা ফিরনীর ব্যবস্থা করেন। মূলতঃ এটি অত্যমত্ম সওয়াবের কাজ এবং এটি রাসূলুল্লাহর ভালবাসা বৃদ্ধির মাধ্যম।’৪২
7. হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী আলাইহির রাহমাহ বলেন- ‘মিলাদ শরীফ’
পালনের ব্যাপারে আমাদের উলমায়ে কিরাম মতবিরোধ করে থাকেন। এতদসত্তেও আলেমগণ তা বৈধতার পক্ষেমত দিয়েছেন। এটি বৈধ হবার পন্থা থাকা সত্তেও তারা কেন এত কঠোরতা প্রদর্শন করে। আমাদের জন্য হারমাইন শরিফের অনুসরণই যথেষ্ট।’৪৩
8. মাওলানা আব্দুল হাই লাকনভী বলেন- ‘যে কোন সময়ে বৈধপন্থায় মিলাদুন্নবী উদযাপন করা সওয়াবের কাজ।’৪৪
তথ্যসূত্র :

01. ইবনু মনযুর, লিসানুল আরব।
02. মুফতি আমীমুল ইহসান, কাওয়ায়িদুল ফিকহ।
03. ইবনু মনযুর, প্রাগুক্ত।
04. ইমাম তিরমিযী, আল-জামেউস সহীহ।
05. ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত।
06. ইবনে সাদ, আত তাবকাতুল কুবরা।
07. ইবনে সাদ, প্রাগুক্ত।
08. ইবনু সাদ, প্রাগুক্ত।
09. আল্লামা ইবনু হাজর আসকালানী, ফতহু বারী।
10. আল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত নং-১৫২।
11. আল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত নং-৪৭।
12. আল কুরআন, সূরা আল ইমরান, আয়াত নং-১০৩।
13. আল মাওসূয়াতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়াইতিয়্যাহ।
14. আল কুরআন, সূরা দুহা, আয়াত নং-১১।
15. আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত নং-১১৪।
16. আল কুরআন, সূরা ইউনূস, আয়াত নং-৫৮।
17. আল্লামা আলূসী, রুহুল মায়ানী।
18. ইমাম সূয়তী, আদ্ দুররুল মনছুর।
19. ইমাম আবু হাইয়ান, আল বাহরু মুহীত।
20. ইবনু জাওযী, যাদুল মাসীর।
21. আল্লামা তিবরিসী, মাজমাউল বয়ান।
22. প্রাগুক্ত ।
23. আল কুরআন, সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং-১০৭।
24. প্রাগুক্ত, সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং-১৬৪।
25. মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মিলাদুন্নবী, পৃ. ১৫৪, ১২০, ১২১।
26. আল-কুরআন, সূরা মরিয়ম, আয়াত নং- ১৫।
27. প্রাগুক্ত, সূরা তাওবাহ, আয়াত নং- ১২৮।
28. ইমাম বুখারী আল জামেউস সহীহ।
29. ইমাম বুখারী, প্রাগুক্ত।
30. ইমাম মুসলিম, প্রাগুক্ত।
31. ইমাম ইবনু হাজর হায়তমী, আন-নি’মাতুল কুবরা।
32. প্রাগুক্ত।
33. প্রাগুক্ত।
34. প্রাগুক্ত।
35. প্রাগুক্ত।
36. ইমাম আবু বকর ইবনুস সাইয়িদ দিইয়াতী, প্রাগুক্ত।
37. মুল্লা আলী ক্বারী, আল মাওরিদুর রবী ফি মাওলিদিন নবী।
38. আল্লামা ইসমাঈল হক্কী, রুহুল বয়ান।
39. শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী, মা ছাবাতা বিস্-সুন্নাহ ফি আইয়ামিন সানাহ।
40. শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী, আদ্ দুররুছ ছমীন।
41. শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী, ফয়জুল হারামাইন।
42. মুফতি ইনায়াতুল্লাহ, তাওয়ারিখি হাবীবে ইলাহ।
43. হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, শামায়িলে ইমাদাদিয়্যাহ, পৃ.-৯৫।
44. আব্দুল হাই লাকনভী, ফাতাওয়ায়ে আবদিল হাই, খ. ২য়, পৃ.-২৮৩।

অতুল-অনুপম, শ্রেষ্ঠতম রাসূল: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

অতুল-অনুপম, শ্রেষ্ঠতম রাসূল: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
হাফেজ কাজী আবদুল আলীম রিজভী

রাসূলে করীম রউফুর রহীম আহমদ মুজতবা, মুহাম্মদ মুসত্মফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ রাববুল আলামীনের সর্বপ্রথম ও শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি, ঘনিষ্ঠতম ও নিবিড়তম নৈকট্যের অধিকারী পরম প্রিয়তম হাবীব, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, নবীকুল সরদার, সৃষ্টিকুলের অসিত্মত্ব লাভের উৎস মূল, অসিত্মত্বের জগতে মাখলুকের পূর্ণতা প্রাপ্তি ও স্থায়িত্ব অর্জনের একমাত্র অবলম্বন, মানব কুলের আল্লাহর সন্তুষ্টি, সান্নিধ্য-নৈকট্য-ভালবাসা লাভ ও খোদায়ী অনুগ্রহ- অনুকম্পা,কৃপা-করুণা পাওয়ার নিশ্চিত উছিলা, এক কথায় স্রষ্টা ও সৃষ্টি কুলের মাঝে সকল বিষয়ে যোগসূত্র-মাধ্যম। তিনি সৃজনে-লালনে, পৃথিবী পৃষ্ঠে প্রেরণে, বিশ্বব্যাপী ঈমান-ইসলামের প্রচার-প্রসার ও কায়েমে, মেরাজে আল্লাহর একামত্ম সান্নিধ্যে গমনে ইত্যাদি সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য-আচরণে একক-অদ্বিতীয়, অতুল-অনুপম। তাঁর সমকÿ-সমতুল্য-সমমর্যাদা সম্পন্ন দ্বিতীয় কোন সৃষ্টি ও সত্তাব নেই। স্রষ্টার পরে সৃষ্টিকুল শীর্ষে তিনিই মহিয়ান-গরিয়ান।
– بعد از خدا بزرگ توئ قصہ مختصر (আল্লামা শেখ সা’দী রহমতুল্লাহি আলাইহি)। তাঁর সৃষ্টি সকল সৃষ্টির পূর্বে ও নূরে ইলাহীতে তাঁর অবস্থান আল্লাহর একামত্ম সান্নিধ্যে আরশে আজমে; স্থান-কাল-পাত্র-গোত্র নির্বিশেষে সমগ্র সৃষ্টি জগৎ তাঁর নবুওয়ত-রেসালাতের আওতাভুক্ত। তাঁর প্রচারিত-প্রতিষ্ঠিত দ্বীন ও কুরআন অনমত্মকাল অবধি বিশ্বে বলবৎ ও কার্যকর থাকবে, কখনো রহিত কিংবা অকার্যকর হবার নয়, পৃথিবীর বুকে আবির্ভাবের পূর্বে কিংবা পরবর্তীতে নবী-রাসূল-মুমিন তথা স্রষ্টা ও সৃষ্টিকুলের জবানে একমাত্র তারই শান-মান-গুনগানের চর্চা সর্বÿণ চলমান, এজন্য তিনি মুহাম্মদ (সর্বÿণ সর্বাধিক প্রশংসিত), মহা প্রলয় কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার কালে ÿণিকের জন্য হলেও আল্লাহর স্মরণ-চর্চা বন্ধ হবে, কিন্তু মহান আল্লাহর মহিমান্বিত জবানে তখনও তাঁর প্রিয়তম হাবীবের গুণ-গান চর্চা জারি থাকবে। ময়দানে হাশরে ‘‘মক্বামে মাহমুদ’’ একমাত্র তাঁরই জন্য নির্ধারিত থাকবে।
উপরিউক্ত এসব বৈশিষ্ট্যে তিনি একক-অদ্বিতীয়, উদাহরণ ও দৃষ্টামত্ম বিহীন। এতে তাঁর কোন শরীক-অংশিদার নেই। তিনি বে-মেছাল খালেক আল্লাহর বে-মেছাল মাহবুব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ বিষয়ে নিম্নে কুরআন-হাদিসের আলোকে আলোকপাত করার প্রয়াস পাব। ইনশাআল্লাহ!
পবিত্র কুরআনে করীমে এরশাদ হয়েছে-
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّيْنَ لَمَآ آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ
অর্থ: ‘‘এবং (স্মরণ করুন) যখন আল্লাহ নবীগণের নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমাত প্রদান করবো, অত:পর আগমন করবেন তোমাদের নিকট (আজীমুশ্বান) রাসূল (অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যিনি তোমাদের কিতাব গুলোর সত্যায়ন করবেন তখন তোমারা (অর্থাৎ সকল নবী-রাসূল) অবশ্যই অবশ্যই তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করবে এবং (দ্বীনের প্রচার-প্রসারে) তাঁকে সাহায্য করবে’’। (৮১ নং আয়াত, সূরা আলে ইমরান)
উদ্ধৃত আয়াতের তাফসীরে বিশ্ববরেণ্য তাফসীর শাস্ত্র বিশারদ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জরীর তাবারী (রহ:) ইমাম সুবকী ইমাম ইবনে কাছীর এবং তাফসীরে কাশ্বাফের পার্শব টীকাকার মুফতী সৈয়্যদ আমীমুল ইহসান (রহ:) সহ প্রায় সকল মুফাচ্ছেরীনে কেরাম রহমাতুল্লাহি আলায়হিম, আমিরুল মুমেনীন মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং মুফাচ্ছির কুল সরদার সাইয়্যেদুনা ইবনে আববাছ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা হতে নিম্নোক্ত হাদীছে পাক বর্ণনা করেছেন-
لّمْ يَبْعَثِ اللهُ نَبِيًّا مِنْ اَدَمَ فَمَنْ بَعْدَهُ اِلَّا اَخَذَ عَلَيْهِ الْعَهْدُ فِىْ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَئِنْ بُعِثَ وَهُوَ حَىٌّ لَيُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَينْصُرُنَّهُ وَيَأخُذُ الْعَهْدَ بِذَالِكَ عَلَى قَوْمِهِ-
অর্থাৎ- মহান আল্লাহ সাইয়্যেদুনা আদম (আ:) থেকে শুরু করে শেষ পর্যমত্ম যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন প্রত্যেক নবীর কাছ থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তাঁদের জীবদ্দশায় যদি নবীকুল সরদার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হন, তবে অবশ্যই তিনি যেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ঈমান আনয়ন করেন এবং তাঁকে সর্বোত ভাবে সাহায্য করেন। এবং নবীগণ যেন তাঁদের উম্মতগণ থেকেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। (সুবহানাল্লাহ)
উপরিউক্ত আয়াতে কুরআন ও তার তাফসীর সম্বলিত হাদীসে পাকের আলোকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলে পাক ছাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী-রাসূলগণের সরদার-শিরোমনি শুধু নন বরং তিনি নবীগণের নবী। আর সকল নবী-রাসূল তাঁর মদদগার-সাহায্যকারী। মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন আলমে আরওয়াহে সকল নবী-রাসূলগণের নিকট থেকে সম্মিলিতভাবে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করার পর পুনরায় প্রত্যেক নবী-রাসূলকে পৃথক পৃথক ভাবে প্রেরণের সময় আবারও এ অঙ্গীকার গ্রহণ এবং তাঁদের মাধ্যমে উম্মতগণ হতে আখেরী নবীর উপর ঈমান আনয়ন সম্পর্কিত অঙ্গীকার গ্রহণ করে সমগ্র সৃষ্টির সম্মুর্খে রাসূলে পাক ছাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একক-অদ্বিতীয়, অতুল-অনুপম মর্যাদা-মহিমা, শ্রেষ্ঠত্ব-মহত্ত্বকে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যাতে কেউ কখনো আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের মতো বলে কিংবা দাবী করে বেঈমান না হয়। (নাউযুবিল্লাহ)
ছহীহ হাদীছে নববী শরীফে রহমতে আলম নূরে মুজাস্সাম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারংবার উম্মতকে সম্মোধন করে সতর্ক করেছেন যে, আমি নবী তোমাদের কারো মত নই। তোমাদের মধ্যে আমার ন্যায় কেউ নেই। যেমন এরশাদ হয়েছে-
عَنْ اَنَسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِى صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا تُوَاصِلُوْا، قَالُوْا اِنَّكَ تُوَاصِلُ- قَالَ لَسْتُ كَاَحَدٍ مِنْكُمْ قَالَ اِنِّىْ اُطْعِمُ وَاُسْقِىْ اَوْ اِنِّىْ اُبِيْتُ اُطْعِمُ وَاُسْقِىْ-
অর্থাৎ- ছাহবীয়ে রাসূল সাইয়্যেদুনা আনাছ বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- তোমরা ছাওমে বেছাল রেখোনা। (ছাওমে বেছাল হলো একদিনের রোজাকে সূর্যাসেত্মর সময় ইফতার-পানাহার না করে অন্য দিনের রোজার সাথে যুক্ত করে দেয়া) ছাহাবায়ে কেরাম অরজ করলেন- ওহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তো ছাওমে বেছাল রাখেন। জবাবে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন- আমি তোমাদের কারো মত নই। আমাকে অব্যশই (আল্লাহর পক্ষ থেকে) পানাহার করানো হয়। অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ, অবশ্যই রাত্রি যাপনের সময় আমায় (আল্লাহ তরফ হতে) পানাহার করানো হয়। (ছহীহ বুখারী শরীফ)
عَنْ عَبْدِ اللهِ ابْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ عَنِ الْوِصَالِ، قَالُوْا اِنَّكَ تُوَاصِلُ- قَالَ: اِنِّىْ لَسْتُ مِثْلَكُمْ اِنِّىْ اُطْعِمُ وَاُسْقِىْ-
অর্থাৎ- সাইয়্যেদুনা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন- রাসূলে খোদা আশরাফে আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাওমে বেছাল থেকে নিষেধ করেছেন। ছাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন- ওহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তো বেছাল রাখেন। উত্তরে নবীজী এরশাদ করলেন- আমি তো অব্যশই তোমাদের মতো নই। আমায় অব্যশই (আল্লাহর তরফ থেকে) পানাহার করানো হয়। (ছহীহ বুখারী শরীফ)
عَنْ اَبِىْ سَعَيْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَنَّهُ سَمِعَ النَّبِى صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَالَ: لَا تْوَاصِلُوْا، فَاَيُّكُمْ اَرَادَ اَنْ يُّوَاصِلُ فَلْيُوَاصِلُ حَتّى السِّحْرِ- قَالُوْا فَاِنّكَ تُوَاصِلُ يَا رَسُوْلَ اللهِ- قَالَ: اِنِّىْ لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ اِنِّىْ اُبِيْتُ لِىْ مُطْعِمٌ يُطْعِمُنِىْ وِسَاقٍ يَسْقِيَنِىْ-
অর্থাৎ- ছাহাবীয়ে রাসূল সাইয়্যেদুনা আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরশাদ করতে শুনেছেন- তোমরা ছাওমে বেছাল রেখো না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ছাওমে বেছাল রাখার উদ্দেশ্য করে তবে সে যেন ছাহরী পর্যমত্ম তথা শেষ রাত্রি পর্যমত্ম ছাওমে বেছাল রাখে। ছাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন- ওহে রাসূল আপনি তো ছাওমে বেছাল রাখেন। উত্তরে এরশাদ করলেন- আমি তো অবশ্যই তোমাদের কারো মত নই। আমি অবশ্যই রাত্রি যাপন করি। একজন পানাহারকারী আমায় পানাহার করায়। (ছহীহ বুখারী শরীফ)
عّنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الَوِصَالِ فِىْ الصَّوْمِ، فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ: اِنّكَ تُوَاصِلُ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ اَيُّكُمْ مِثْلِىْ، اِنِّىْ اُبِيْتُ يُطْعِمُنِىْ رَبِّىْ وَيَسْقِيْنِىْ-
অর্থাৎ- সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনা কারী ছাহাবী সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন- রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাওমে বেছাল পালনে নিষেধ করেছেন। জনৈক ছাহাবী আরজ করলেন- ওহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তো ছাওমে বেছাল রাখেন। জবাবে আল্লাহর হাবীব এরশাদ করলেন- তোমাদের মধ্যে আমার ন্যায় আছে কেউ? (অর্থাৎ কেউ নাই) অবশ্যই আমি রাত্রি যাপন করি আমার প্রতিপালক আমায় পানাহার করায়। (ছহীহ বুখারী)
উপরিউক্ত চারটি ছহীহ হাদীছে পাকে আল্লাহর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে সতর্ক করে বারংবার বলেছেন- আমি তোমাদের কারো মত নই। তোমাদের মধ্যে আমার মতো কেউ নেই। তাইতো ইমামে আজম ইমামুল আইম্মাহ আবু হানীফা নুমান ইবনে ছাবেত রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু তাঁর সুপ্রসিদ্ধ ‘‘কাছিদায়ে নু’মান’’ এ বলেছেন-
وَاللهِ يَا يسن ! مِثْلُكَ لًمْ يَكُنْ فِى الْعَالَمِيْنَ وَحَقِّ مَنْ اَنْبَاكَ-
অর্থাৎ- ওহে ইয়াছিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যিনি আপনাকে নবী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন সেই মহান আল্লাহর শপথ। সমগ্র জাহানে আপনার মতো কেউ নেই।
আমিরুল মুমেনীন মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এরশাদ করেছেন- لَمْ اَرَى قَبْلَهُ وَبَعْدَهُ مِثْلَهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ অর্থাৎ রাসূলে খোদা আশরাফে আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্বে কিংবা পরবর্তীতে তাঁর মতো কাউকে দেখি নাই আমি আলি (রা:)। (সুবহানাল্লাহ)
উপরিউক্ত এসব অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীল-প্রমাণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষরূপে আখ্যায়িত করা তথা আকিদা পোষন করা কাফের-মুশরিকদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। কোন মুমিন নর-নারী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের মতো বলতে পারে না। পবিত্র কুরআনে করীমের বিভিন্ন সূরায় পরিলÿÿত হয় যে, যুগে যুগে আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসূলগণকে একমাত্র কাফের-মুশরিকরাই আমাদের মত মানুষ বলে আখ্যায়িত করেছে। যেমন,কুরআনে করীমের ১৪ পারার সূরা ‘হিজর’ এর ৩৩ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে- قَالَ لَمْ أَكُنْ لِأَسْجُدَ لِبَشَرٍ অর্থাৎ: ‘‘অভিশপ্ত ইবলিছ বললো, আমার জন্য শোভা পায়না যে, মানুষকে সাজদা করবো’’।
এখানে অভিশপ্ত ইবলিছ আদি পিতা সাইয়্যেদুনা আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালামকে একজন মানুষ হিসেবে অভিহিত করেছে। যদিও তিনি আদম জাতির আদি পিতা, আল্লাহর প্রেরিত মহান খলিফা ও নবী। এহেন শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যকে এড়িয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার অসদুদ্দ্যেশ্যে শয়তান আদম আলাইহিস সালামকে একজন মানুষ রূপে আখ্যায়িত করেছে। যা সুস্পষ্ট ও নিশ্চিত কুফুরি। নাউযুবিল্লাহ! ১৮ পারার সূরা ‘মু’মিনূন’ এর ২৪ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে- فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ অর্থাৎ:‘‘সাইয়্যেদুনা নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের কাফের সর্দাররা বললো- এতো নয়, কিন্তু তোমাদের মত মানুষ’’। নাউযুবিল্লাহ!
সূরা ‘মু’মিনূন’ এর ৩৩ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে- مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُونَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُونَ অর্থাৎ: ‘‘সাইয়্যেদুনা হুদ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের কাফের সর্দারগণ হযরত হুদ আলাইহিস সালামকে উদ্দেশ্য করে মমত্মব্য করলো- ‘‘এতো নয়, কিন্তু তোমাদের মত মানুষ, তোমরা যা আহার কর তা থেকেই তিনি আহার করেন এবং তোমরা যা পান কর, তা থেকেই তিনি পান করেন’’।
এসব নবী বিদ্বেষী কাফের-মুশরিকদের উদ্দেশ্য হল যে, ইনি যদি নবী হন তাহলে ফিরিশতাদের মত পানাহার থেকে বিরত থাকতেন। নাউযুবিল্লাহ!
এসব পথভ্রামত্ম নাফরমান নবুওয়াত-রেসালতের ন্যায় শ্রেষ্ঠতম মর্যাদার পরিপূর্ণতার প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি; বরং পানাহারের বৈশিষ্ট্যাবলী দেখে নবীকে নিজেদের মত মানুষ বলতে শুরু করেছে।
আর এটাই তাদের পথভ্রষ্টতার মূল ভিত্তি হলো।
২৩ পারার সূরা ‘ইয়াসীন’ এর ১৫ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে- قَالُوا مَا أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا অর্থাৎ: ‘‘কাফেরগণ বলল, তোমরা তো নও কিন্তু আমাদের মত মানুষ’’।
২৮ পারার সূরা ‘ইয়াসীন’ এর ০৬ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে- – فَقَالُوا أَبَشَرٌ يَهْدُونَنَا فَكَفَرُواঅর্থাৎ: ‘‘কাফেরগণ বলল, মানুষই কি আমাদের হেদায়েত করবে? সুতরাং তারা কাফির হয়েছে’’।
উপরিউক্ত আয়াত সমূহের মর্মবাণীর আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ রাববুল আ’লামীনের প্রেরিত নবী আদি পিতা সাইয়্যিদুনা আদম আলাইহিস সালামকে সর্বপ্রথম অভিশপ্ত ইবলিস শয়তানই ‘বশর’ তথা মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পরবর্তীতে ইবলিছ শয়তানের অনুসারী কাফের-মুশরিকরাই যুগে যুগে আল্লাহর মনোনীত ও প্রেরিত নবী-রাসুলগণকে ‘‘আমাদের ন্যায় মানুষ’’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কুরআন- হাদিসের আলোকে আম্বিয়ায়েকেরাম আলাইহিমুস সালামকে শুধু মানুষ হিসেবে অভিহিত করা সুস্পষ্ট কুফুরী এবং কাফেরদের প্রথা ও বৈশিষ্ট্য। হযরাতে আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্যধন্য, প্রিয়ভাজন, মনোনীত ও প্রেরিত খলিফা। তাঁরা হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং মানব জাতির জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা, ঐশী গুণে গুণান্বিত, বিশ্ববাসীর সম্মুখে খোদায়ী গুণ-গরিমা ও বৈশিষ্ট্যাবলীর বিকাশ মূল। তাদের এহেন অসংখ্য গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যকে উহ্য রেখে শুধু মানুষ হিসেবে সম্বোধন করা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষনেরই নামামত্মর। এটাও নিশ্চিত কুফুরী।
উল্লেখ্য যে, পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণকে যুগে যুগে মুশরিকরাই মানুষরূপে আখ্যায়িত করেছে। কিন্তু অত্যমত্ম বিস্ময়কর ও লজ্জাজনক হলেও সত্য যে, আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, নবীকূল সরদার, রহমতে আলম, নূরে মুজাসসাম আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুসত্মফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে এক শ্রেণির বাতিল পন্থী মুসলিম ইবলিছ শয়তান ও কাফেরদের অনুসরণে আমাদের ন্যায় মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে (নাউজুবিল্লাহ) এটা ঈমান আক্বিদা বিধ্বংসী জঘণ্যতম কুফরি। ইসলামি শরীয়তের সুস্পষ্ট ফায়সালা হলো কেউ যদি আল্লাহর হাবিবের লোম মুবারক কে তাচ্ছিল্য করে ‘‘শুআইরুন’’ (অর্থাৎ ছোট লোম) বলে, তৎক্ষণাৎ সে কাফের হয়ে যাবে। শানে রেসালাত এর এতটুকুন অবহেলা যদি কুফরি হয়, আল্লাহর হাবিবের শানে বেপরোয়া হয়ে তাকে আমাদের মত মানুষ রূপে আখ্যায়িত করা কত বড় ভয়ংকর কুফরি হবে সহজেই অনুমেয়।

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ – এর প্রসঙ্গ:
প্রসঙ্গত আল্লাহর পবিত্র বাণী ‘‘ হে রসূল আপনি বলুন (প্রকাশ্যমানবীয় আকৃতিতে তো) আমি তোমাদের মতো , আমার নিকট অহি নাজিল হয়।’’ এর মর্মার্থ এবং অত্র প্রবন্ধে উল্লেখিত সহীহ বুখারি শরীফের রেওয়াত إِنَّى لَسْتُ مِّثْلُكُمْ অর্থাৎ- আমি নবী তো অবশ্যই তোমাদের মত নই। এর র্মর্মবাণী বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। এজন্য মুফাচ্ছিরিনে কেরাম إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ- এর তাফসিরে বিভিন্ন অভিমত ব্যাক্ত করেছেন। যাতে কুরআনের বাণী ও হাদিস পাকের র্মমার্থের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমাধান হয়ে যায়। যমানার মুজাদ্দিদ শাহ অলি উল্লাহ মুুুুুুুুহদ্দিস দেহলভী (র) وَالضُّحَى- وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىএর ব্যাখ্যায় বলেছেন, রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর بشريت তথা মানবীয় অস্তিত্বের দিকটা তো তার মধ্যে মোটেই অবশিষ্ট থাকেনি আল্লাহর নূর সমূহের আধিক্য সার্বক্ষণিক ভাবে তাকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। সর্বাবস্থায় তারঁ পবিত্রতম সত্ত্বা ও পূর্ণতা সমূহের মধ্যে কেউই তাঁর মতো নয়।
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ- – আয়াতে তাঁকে আপন বাহ্যিক মানবীয় আকৃতির কথা প্রকাশ করার জন্য বিনয় প্রকাশার্থেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে- এটাই অভিমত ব্যক্ত করেছেন মুফাসসিরকুল সরদার সাইয়্যেদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (র.)। (তাফসীরে খাযেন ও খাজায়েনুল ইরফান)
কোন কোন মুফাসসির অভিমত ব্যক্ত করেছন- মানব জাতির হেদায়েতের জন্য আর্বিভুত নবী হিসেবে বিভিন্ন মানবীয় বৈশিষ্ট্য, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদি তাঁর সত্ত্বায় প্রকাশ পায়- এদিক মূল্যায়নে তিনি بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ- কিন্তু হাক্বীকত তথা প্রকৃত সত্ত্বা ও সরূপের কেউ তাঁর সতুল্য-সমকক্ষ নয়; এ বিষয়টি বিবৃত হয়েছে ছহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত إِنَّى لَسْتُ مِّثْلُكُمْ এর মর্মার্থের মধ্যে। সুতরাং কুরআন ও হাদীসের মধ্যে কোনরূপ দ্বন্ধ নেই।
তাছাড়া আয়াতে কুরআনে উল্লেখিত يُوحَى إِلَيَّ – অর্থাৎ : ‘আমার নিকট ওহী নাযিল হয়’। এ বৈশিষ্ট্যের আলোকে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সকল মানবের সারি হতে এমন ভাবে আলাদা হয়ে যান যেমনি ভাবে মানব বাকশক্তি সম্পন্ন হওয়ায় মূল্যায়নে অন্যান্য সকল বাকশক্তিহীন প্রাণী হতে আলাদা ও পৃথক হয়ে যায়। এরপরও যদি কেউ বলে- ‘নবী আমাদের মত’ আমরা এহেন নির্বোধের উদ্দেশ্যে বলবো- সে গরু-ছাগল ইত্যাদি বাকশক্তিহীন প্রাণীর মতো।
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ – তাফসীরে আরো অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে। প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় এবং বিবেক-বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ও নবী প্রেম সমৃদ্ধ মু’মিন নর-নারীর জন্য এটুকুই যথেষ্ট বিবেচনায় এখানেই শেষ করা হল। বাসত্মবিক পক্ষে রাসূলে খোদা, আশরাফে আম্বিয়া মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল গুণ-গরিমায়, প্রতিটি বৈশিষ্ট্যে, শ্রেষ্ঠত্বে, মহত্বে কারো সঙ্গেই তুলনীয় নন। স্র্ষ্টার পরে সকল সৃষ্টির শীর্ষে তিনি একক, অদ্বিতীয়, অতুল-অনুপম শান-আজমতের অধিকারী। ইমাম শরফুদ্দীন বুছীরী (রহমতুল্লাহি আলায়হি) নিন্মোক্ত কাছিদায় নবীজীর অদ্বিতীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন-
مُنَزَّهٌ عَنْ شَرِيْكٍ فِىْ مُحَاسِنِهِ * فَجَوْهَرُ الْحُسْنِ فِيْه ِغَيْرُ مُنْقَسِمِ –
অর্থাৎ: ‘‘রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রতম জাত-সত্ত্বায় তো কোনরূপ শরীক-অংশিদার নেই। তাঁর গুণাবলী-বৈশিষ্ট্যোবলীতেও অন্য কারো অংশিদারিত্ব নেই। তাঁর অপূর্ব রূপ-সৌন্দর্য একক ও অদ্বিতীয়। অন্য কোন সৃষ্টির মধ্যে বিভাজ্য হবার নয়’’।

আওলাদে রাসূল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর একটি মূল্যবান নছীহতনামা

আওলাদে রাসূল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর একটি
মূল্যবান নছীহতনামা
ভাষামত্মরে : মাওলানা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন আল আযহারী*
তারিখ- ৫ছফরুল মযাফ্ফার, ১৩৮৯ হিজরী, ২২ এপ্রিল ১৯৬৯ ইংরেজী

বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
নাহমাদুহু ওয়া নুছাল্লি আলা রাসুলিহিল করিম
তারিখ ২৩ যিলক্বদ ১৩৯২ হিজরী
৩১ ডিসেম্বর ১৯৭২ ইংরেজী
প্রতি,
জনাব আলহাজ্ব আশরাফ আলী সাহেব (সাল্লামাহুর রাহমান)
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
পরসমাচার এই যে, উভয় পক্ষে মঙ্গল সন্নিহিত হোক। আপনার টেলিগ্রাম মারফত জানতে পারলাম ‘‘আলহামদু লিল্লাহ ওয়াশ শুকরু লিল্লাহ’’ আপনারা সকলে নিরাপদে নিজ নিজ ঘরে পৌঁছেছেন। এই সফর বড় কামিয়াব সফর ছিল। উভয় জগতে কামিয়াব ও সফলতা নসীব হোক। দোয়া করি এই সফর যেন মঞ্জুর হয়। আমিন, ছুম্মা আমিন!
تسلى ركهى، جو لوگ سلسلہ ميں ا چكے ہيں- گويا وه لوگ حضرات كرام كى روحانى اولاد ميں داخل ہو گئ ہے؛ خواه وه بنگالى ہو يا بهارى ہو ،سندهى ہو يا پنجابى ہو ؛ سب كو ايك دوسرے كيساتھ محبت وہمدردئ ركهنى ضرورى ہے۔ ايك دوسرے کی عزت كرنا ، بهائ كى تكليف وخوشى كو اپنى خوشی وتكليف سمجهنا ہے-
বিশ্বাস করুন, যে সব লোক পীরের হাতে বাইয়াত গ্রহণ পূর্বক সিলসিলা তথা তরীকতের দাখিল হলেন প্রকৃতপক্ষে তারা সিলসিলার পীর-মুরশিদের রূহানী সমত্মানে পরিণত হয়ে যায়। তারা বাঙ্গালী হোক কিংবা বিহারী হোক সিন্দি কিংবা পাঞ্জাবী। প্রত্যেকে পরস্পরের সহিত আমত্মরিকতা, ভালবাসা, সহানুভুতি প্রদর্শন করা অত্যাবশ্যক। একে অপরকে ইজ্জত-সম্মান করা কর্তব্য। পীর ভাইদের সুখ-দু:খকে নিজের সুখ-দু:খ মেনে নেয়া।
دنيا والوں كے دهندے اٹہتے رہتے ہيں اور ٹہنڈے ہوتے رہتے ہيں۔ ليكن يہ برادرى طريقت يہ نہ ختم ہونى والى برادرى ہے۔ دنيا، عالم برزخ وعالم اخرت كى مضبوط برادرى ہے۔ ايسا كام نہيں كرنا چاہۓ كہ بعد ميں پشيمانى اٹهانى پڑے۔ اولاد ا گر ادهر ادهر ہو تو والدين کى بدنامى ہوتى ہے؛ يہ كتنى افسوس كى بات ہوگى كہ ہمارے نالائقى كے سبب سے حضرات وسلسلہ كى بدنامى ہو ۔ خدا وند تبارك ان سبكو وبنده كو سمجه عطا فرماوے اور راه راست پر ثابت قدم ركهے۔ امين ثم امين-
দুনিয়ামুখী লোকদের স্বার্থে উত্থান-পতন ঘটে। তবে, তরীকতের ভ্রাতৃত্ববোধ কখনো সমাপ্তি হওয়ার বন্ধন নয়। ইহকাল,কবর জগৎ (আলমে বরযখ) এবং পরকালেরও দৃঢ়-ভ্রাতৃত্ব বন্ধন হবে। জেনে রাখুন, এমন কাজ করবেন না যার ফলশ্রম্নতিতে পরে অনুতপ্ত হতে হয়। সমত্মান যদি এদিক ঐদিক (অবাধ্য) হয়, তাতে মা-বাবার বদনাম হয়। এটা কতই আফসোস তথা অনুতাপের বিষয় হবে যে, আমাদের অযোগ্যতা, অনুপযুক্ততার ফলে সিলসিলা এবং পীর মাশায়েখদের দুর্নাম হবে!! আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাহ সহ সকলকে ইহা অনুধাবন করার তাওফিক দিন। এবং সকলকে সহজ-সরল রাসত্মার উপর অটুট রাখুন। আমিন ছুম্মা আমিন!
আপনি এবং হাজী চিনু মিয়া উভয়ের মাঝে ঐক্য,বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবেন এবং কোন সমস্যা দেখা দিলে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করবেন। আল্লাহ তা’য়ালা আপনাদেরকে তাঁর নিরাপদ আশ্রয়ে রাখুন এবং তিনি সবাইকে আসমান-জমীনের সকল বালা-মুসিবত হতে হেফাজত করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন!
আর হাযারাত তথা পীর-মাশায়েখদের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে যে সব ডিউটি বা দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে তা পালনে তাওফিক দান করুন!
চিনু মিয়া ও তার পরিবারসহ সকল পরিজনকে আমার সালাম বলবেন এবং তাঁকে সকল দু:খ-বেদনায় শামিত্মর বানী শুনাবেন। আল্লাহ তা’য়ালা হযারাতের সদকায় নিজ আশ্রয়ে রাখুন। আমিন, ছুম্মা আমিন! আমার স্নেহস্পদ আব্দুল মান্নানে প্রতি আমার দোয়া ও প্রীতি এবং অন্যান্য পীর ভাইদেরকে দোয়া ও সালাম বলবেন। আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম সহ সকল ভাই বোনদেরকে আমার দোয়া ও সালাম জ্ঞাপন করবেন। বিশ্বাস রাখুন যে, এতেই সর্বপ্রকারের কল্যাণ-মঙ্গল অমত্মর্নিহিত রয়েছে। পরিশেষে আল্লামা তাহের শাহ এবং আল্লামা ছাবের শাহ এর সালাম কবুল করবেন।
মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ
স্বাক্ষরিত

মসজিদে নববী : আসহাবে সুফ্ফাহ ও ইলমে তাসাওউফ

মসজিদে নববী :
আসহাবে সুফ্ফাহ ও ইলমে তাসাওউফ
ড. আব্দুল্লাহ আল-মারুফ

১৯৮৩ সালে আমি ‘‘সুফ্ফাহ’’ প্রথম দেখি। মসজিদে নববীর মূল অংশে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতে থাকি, এই ‘‘উঁচু ভিটাটিতে’’ বসে আছেন হযরত আবু হুরায়রা (রা:), তার পাশে আরও অনেকে শুয়ে বসে আছেন। কেউ কালো, কেউ সাদা। গায়ে সসত্মা কাপড়-চোপড়। দারিদ্র ক্লিষ্ট অবয়বেরও কী নূরানী উদ্ভাস। প্রায় দেড় হাজার বছর পর লোক বদলেছে, কিন্তু ঐ স্থান বদলায়নি। আশে পাশেই ছিলেন সাইয়্যেদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক, হযরত উমর, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত তালহা, হযরত যুবায়ের, হযরত জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম আরও কত সাহাবা। তাঁদের কেউ সেনাপতি, কেউ কাতেবুল ওয়াহয়ি, কেউ ক্বারী, কেউ তো দোভাষী আবার কেউ তো ব্যবসায়ী। অথবা কৃষক। তাঁরা মধুর সন্ধানে দূর থেকে উড়ে আসা মৌমাছির মত। মধু সংগ্রহ করেও আপন ঘর মৌচাকে ফিরে যায়। ওয়াহির জ্ঞান-মধু আহরণ করতে কেউ তো এক দিন পরপর আসেন, আনসার ভাই অন্যদিন সেখানে যান। সবারই স্ত্রী-পরিবার, ঘর-সংসার আছে। একটি সমাজ তাঁরাই প্রাণময় করে রেখেছেন উৎপাদন, সরবরাহ, বেচা-কেনা ইত্যাদি কর্মকান্ডে।
কিন্তু কিছু লোক ছিলেন, মসজিদের চত্ত্বরে কবুতরের মত। এখানেই উড়াউড়ি করে। খাবার খায় এবং মসজিদ ঘিরেই ঘুরপাক খায়। সুফ্ফায় যারা রাতে ঘুমান, ইবাদত করেন তারাই নবীজীর প্রতিটি বাক্য ও কর্ম দেখা অর শোনার জন্য সদা উৎকর্ণ ও ব্যাকুল থাকেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যা হাদিয়া আসতো, তা থেকে তাদের দিতেন। তাঁরা যেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিদিনের মেহমান।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মসজিদে একদল লোক দেখেন জিকির করছেন, আরেকদল কুরআন মাজীদ মুখসত্ম করছেন, তাফসীর শোনছেন। আরেক দল মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষায় ব্যসত্ম। আসহাব সুফ্ফাহ বা সুফ্ফা ওয়ালাগণ যেন সব কিছুতেই আছেন। বিশেষ করে তারা যেন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পেই আছেন। সব সময় এখানে থাকার সুবিধার্থে বা সামর্থ্যের অভাবে তারা বিয়েও করতেন না। এ ছিল সাধারণ অবস্থা। পরবর্তীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহের তাকিদ দেওয়াতে তাঁরা ওদিকেও গেছেন।
ইবাদতের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ ও দুনিয়া বিমুখ সাহাবীদের সাদাসিদে জীবন যাপনকে লক্ষ্য করেই পরবর্তীতে অনেকেই বলেছেন যে, ‘‘সুফী’’ শব্দটি আহল্ আস-সুফ্ফাহ শব্দ থেকে উৎকলিত হয়েছে। নামটি আদৌ ‘‘সুফ্ফাহ’’ থেকে এসেছে কিনা এ নিয়ে দু’কথা থাকলেও তাসাউফের মূল চেতনার সাথে যে সুফ্ফাবাসীর জীবনযাত্রার সাথে মিল আছে এতে কোন সন্দেহ নেই।
অল্পে তুষ্টি হচ্ছে সুফিদের ভূষণ। সামর্থ্য থাকলেও কম খাওয়া, কম ঘুমানো এবং আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা সূফিদের অভ্যাস থাকে। নিজেদের দেহকে শাসন করে মনের ওপর রাজত্ব বিসত্মার করতে দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করা তাদের পথ ও পদ্ধতি; যার মাধ্যমে তাঁরা অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন।
অনুরূপভাবে আহলে সুফ্ফায় বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্র থোকে আসা একদল লোক ছিলেন যারা স্বচ্ছল ঘরের সমত্মান ছিলেন। ইসলামের টানে ঘর ছেড়েছেন। সংখ্যায় তারা প্রায় ৪০০ জন হলেও একই সঙ্গে ছিলেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন মিশন বা অপারেশনে পাঠাতেন। এখনকার তথাকথিত কিছু সুফির মত আয়েশী ও পলায়নপর মানসিকতার লোক ছিলেন না তাঁরা।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) যখন সুফ্ফায় থাকতেন তখন তার সাথে প্রায় ৭০ জন সাহাবী ছিলেন। তাদের কারও কারও পরনে কেবল হাঁটু পর্যমত্ম ঢাকে এমন একখন্ড কাপড় ছিল, রুকুতে গেলে ছতর খুলে যাবে ভয়ে হাতে চেপে ধরতেন। অধিকাংশ সময় খেজুরই ছিল তাদের তিনবেলার আহার। কিন্তু তাদের এই সবর ও ধর্মপ্রীতির জন্য মহনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, দারিদ্রে থেকেও হৃষ্টচিত্তে এই যে তোমাদের প্রচেষ্টা, এর ওপর টিকে থাকলে তোমরাই হবে বেহেসেত্ম আমার অন্যতম সাথী।
أبشروا، ياأصحاب الصفة ! فمن بقى منكم على الصف الذى انةم عليه اليوم راضيا بما فيه فانهم من رفقالى يوم القيامة
কিন্তু শাব্দিকভাবে صوف শব্দমূলের সাথে صففه শব্দের মিল এত ঘটিষ্ঠ নয়। যারা মিল খুঁজেছেন তারা তা কষ্ট-কল্পিতভাবেই করেছেন। صوف শব্দের অর্থ পশম। প্রশমী জামার এই খোলশকে নির্ভর করে যারা তাসাওউফ শব্দ আবিষ্কারের দাবী করেন তাদেরকে বলব, তাহলে তো একটি ভেড়াই বড় সুফি। তার গায়ে কেবল সূফ ই সূফ। পশম-ই পশম। হ্যাঁ, শীতকালে অনেকেই সূফি হয় আর শীত প্রধান দেশে তো সবাই সূফি!
গবেষণার ফল স্বরূপ আমরা তাসাওউফ-এর মূল শাব্দিক অর্থ, যা গ্রহনীয়, তা এখন বলে দিতে চাই।
দামেশে্কর প্রখ্যাত আলেম শেখ আরসেলান বলেছেন:
ان التصوف كلمة اشتقت من الصفا
تصوف শব্দটি صفا (অর্থাৎ পরিশুদ্ধতা বা সাফ করা) থেকে উৎকলিত। এ অর্থটি পবিত্র কুরআনের تزكيه বা পরিশুদ্ধতার সাথে হুবহু মিলে যায়। তাযকিয়া শব্দটি তাসফিয়ার সমার্থক। তাই এ মতের পক্ষেই পন্ডিতগণ সমর্থন দিয়েছেন।
শব্দের পিছে না পড়ে এই পরিভাষার অমত্মরালে যে মর্ম আছে তা অমাদেরকে দেখতে হবে। কারণ, এমন অনেকক নাম আছে যা জন্মের বহু পরে রাখা হয়েছে। যেমন আরবী ব্যাকরণ এর নাম, নাহ্বু ও সারফু বা ‘আরূদ’ রাখার বহু আগেও এর অসিত্মত্ব ছিল। কারণ ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে আসে। ব্যাককরণ ভাষাকে পরিবর্তন করে না বরং ভাষাকে পর্যবেক্ষণ করেই কিছু ব্যাকরণ আবিষ্কার করা হয়ে থাকে।

আমরা যখন ৭দিন বয়সে নবজাতকের জন্য আকীকা করি, নাম রাখি তখন কেউ তো বলে না যে বিগত ৭দিন এই শিশুর অসিত্মত্ব ছিলনা। তেমনি তাসাওউফ নামটি পরে রাখা হলেও তাযকিয়া শিশু আগেই জন্মেছিল।
তবে আহলে সুফ্ফাহ থেকে সূফি বা তাসাওউফ নামটির শুরু হলে তো আর বলার কিছুই নেই। তা হতে পারে। ঈমানকে আমরা এখন আকীদা বলি, ইসলামকে শরীয়ত বলি আর ইহসানকে বলি তাসাওউফ। এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই দীন ইসলম গঠিত। এ বিষয়টি শেখাবার জন্যই হযরত জিব্রাইল (আ:) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে প্রতিরূপে দেছিয়েছেন। তিনি তাঁকে তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলে হযরত জিব্রাইল (আ:) প্রতিবারই বলেছিলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। উপস্থিত সাহাবাগণ বিস্ময় প্রকাশ করলেন। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘‘এ তো তোমাদের ভাই জিব্রাইল, তোমাদেরকে দীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন। (বুখারী, হাদিসে জিব্রাইল)এ তিনটি প্রশ্নোত্তরের মধ্যেই গোটা ইসলাম ধর্ম ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আহলে সুফ্ফাহ তো ঈমান গ্রহণ করেছেন স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে, তারা ইসলাম অনুশীলন করেছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করে- মহানবী বলেছিলেন, ‘সালাত কর, যেভাবে আমাকে সালাত করতে দেখ’। তারা এমনভাবে ইবাদত কতেন যেন আল্লাহকে দেখছেন। সে জন্যই এই সুফিরা না খেয়ে থাকতেন, আবার জিহাদ করতেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর হয়েছিলেন, যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রা:)। আহলে সুফ্ফাহ এর আদর্শ তাই না খেয়ে থাকা বা তালি দেওয়া জামা পরা নয়। তাদের আদর্শ ছিল মহান আল্লাহর সান্নিধ্য ও নবীজীর ভালবাসা লাভের জন্য গভীর সাধনায় নিমগ্ন থাকা। কেবল ময়লা জামা পড়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকা, কখনও তাসাওউফ হতে পারেনা।আহলে সুফ্ফার ওই ভিটে এখনও সমতল থেকে একটু উঁচু স্থান হিসেবে বিদ্যমান। কিন্তু সেই দিলের মানুষ কি আর আছে?
এখন তাসাওউফ পন্থী আছে, কিন্তু জীবনে কি একবারও জিহাদ করেছে? সর্বোচ্চ জিহাদ হচ্ছে মনের সাথে যুদ্ধ করা। আমরা কি সুদের সাথে যুদ্ধ করেছি? আমরা কি কোন যৌতুক বন্ধ করেছি? আমরা কি বাল্য বিবাহে বাঁধা দিয়েছি? আমরা কি ঘুষের প্রসত্মাব ফিরিয়ে দিয়েছি? আমরা কি নিজের সমত্মানকে নামাযি বানাবার চেষ্টা করেছি? আমরা কি কোন এখলাছের সাথে কোন রোগীকে সহানুভূতি জানিয়েছি? আমরা কি বিপদে পড়ে আল্লাহকে স্মরণ করেছি? আমরা কি স্ত্রীর ভাল ব্যবহারের জন্য তাকে ধন্যবাদ বা স্বীকৃতি দিয়েছি। আমরা কি সমাজের অভাবী মানুষকে ভাল পরামর্শ দিয়েছি। আমরা কি নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও পরের উপকার করেছি?
কুপ্রবৃত্তি সব সময় ভাল কাজের বাঁধা দিয়েছে, অলক্ষ্যে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়েছে, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের পথে যাত্রা অব্যাহত রেখেছি।
অথচ আহলে সুফ্ফাহ নতুন বিশ্বসভ্যতার সূচনাকারী মহান রাসূলুল্লাহকে অনুকরণ করে জীবন পথে এগিয়ে গেছেন। তাঁদের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি হাজার হাজার হাদীস। আসহাবে সুফ্ফার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত আবু হুরায়রা (রা:) ছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনাকারী। কত বড় কাজ করে গেছেন তাঁরা।
এখন কোন কাজ না করে ভেড়ার পশমের জামা পরেই সূফি হওয়া যায়। তাহলে তো ভেড়াই অরিজিনাল সূফি! ভেড়ার পশম মানুষের জামার জন্য আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। সে জন্য এটা পরা জায়েয আছে। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা সব সময় বান্দাহর কলবের অবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও মসজিদে ভাল কাপড়–চোপড় পরে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
خذوا زينتكم عند كل مسجد
‘‘তোমরা প্রতিটি সিজাদার সময় তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর’’। এর অর্থ এভাবেও করা যায়, ‘‘তোমরা প্রত্যেক মসজিদে সুন্দর পোশাক পরিধান কর’’।
প্রথম তরজুমাটি বেশি মূলানুগ। কারণ মসজিদ ছাড়াও যেখানে ই নামায পড়ি না কেন সুন্দর পরিপাটিভাবে নিজেকে সাজিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো উচিত।
যাহোক, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সবাইকে এমন ভাল কাপড় চোপড় পরতে বলেননি যা কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু তিনি বলেছেন, ফারদ সালাত শেষে তোমরা স্থান বদল করে সুন্নাত পড়বে। যাতে গুমটভাব না থাকে। আতর-খুশবু মেখে না আসতে পারলে যেন সুগন্ধি তেল মেখে আসে। দাঁত মাজাতে তাগিদ দিয়েছেন। কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া ও পরিচ্ছন্নতার জন্যই। তিনি বলেছেন, কাঁচা পেয়াজ খেলে আমার মসজিদে আসবে না। তিনি বলেছেন-. اكرموا شعركم‘‘তোমাদের চুল-দাড়ির যত্ন নেবে’’। এবাবে তার উদ্দেশ্য ছিল বাহ্যিক সৌন্দর্যও যেন বজায় থাকে। তার এই চেতনা বুঝতে না পেরে অনেকেই পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে আসেনা বটে, কিন্তু মোজার গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। আরেক জনের মুখের ওপর সজোরে হাঁচি দেয়। ঘর্মাক্ত-মলিন কয়েকদিনের ব্যবহৃত জামা নিয়ে মসজিদে আসে। বলে, এটি নামাযের জামা।
বস্ত্তত: পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরলে মানুষের মনের মধ্যে একটি পবিত্রতার ভাব আসে, যা সামাজিক সমাবেশে বা মসজিদে নামাযের জামাতে অংশগ্রহণের জন্য খুবই উপযোগী।
আসহাবে সুফ্ফাহ যেহেতু মসজিদের ভেতরেই থাকতেন তাই, তারা সাধ্যমত সুন্দরও পরিচ্ছন্ন থাকতে সচেষ্ট ছিলেন। তাদের মধ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সকল শিক্ষার প্রতিফলন ছিল। যাহোক, বান্দাহ তো কালবের অবস্থার ওপর পুরষ্কার বা তিরষ্কার পাবেন। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন- يوم لا ينفع مال ولا بنون الا من اتى الله بقلب سليم
‘‘সেই (কেয়ামতের ভয়াবহ) দিনে সম্পদ অথবা সমত্মান কোন উপকারে আসবে না, তবে সেই (পরিত্রাণ পাবে) যে আল্লাহর কাছে নির্ভেজাল অমত্মর (কালব) নিয়ে উপস্থিত হবে।’’
ক্বালবকে ‘‘সালীম’’ বা সহি-সালামতে রাখতে হলে অবশিষ্ট ৬টি অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। আবার কালব যদি সালীম থাকে তাহলে ওই অঙ্গগুলোও নিয়ন্ত্রিত থাকে। মূল নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র হচ্ছে কালব। চোখ, কান, হাত, পা, পেট ও গোপনাঙ্গ এই সব অঙ্গ আমাদেরকে অনেক সময় গোনাহে লিপ্ত করতে চায় তখন কালব তাতে বাধা দেয়। কিন্তু নাফ্স বা কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানের প্ররোচনায় যখন কোন গোনাহ হয়ে যায়, এতে কালবের ডিসপেস্ন বোর্ডে একটি কালো দাগ পড়ে। এভাবে দাগ বা কালো ফোঁটা পড়তে পড়তে কালব তার কার্যকারিত প্রায় হারিয়ে ফেলে। এটাকেই বলা হয় ‘কালব মরে গেছে’। এ সময় বান্দা কেবল গোনাহ করতেই মজা পায়। কেউ তাকে নসিহত করতে আসলে তাকে অসহনীয় মনে হয়। তবে যদি নসিহতের শক্তি বেশি হয় তাহলে দিলে আবার হেদায়াতের নূর পয়দা হয়। কাপড়ের দাগ গভীর হলে যেমনি বেশি শক্তিশালী ডিটারজেন্ট পাওডার বা ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগ করা হয়। দিল পরিষ্কারের জন্য আল্লাহর যিকর হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর। এই ব্যবস্থা পত্র আমাদের নবীজী দিয়ে গেছেন।
তাসাওউফের প্রধান কাজ তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি। লোভ, কাম, ক্রোধ ইত্যাদি রিপু আমাদেরকে প্রতিনিয়ত ভুল পথে নিয়ে যেতে চায়। এ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখে নসিহত করেছেন আবার ব্যবহারিকভাবেও চর্চা করিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন- الحريص محروم লোভীরা বঞ্চিত হয়। من يضمن لى ما بين شفةقه وما بين فخذيه اضمن له الجنة ‘‘যে আমাকে তার দু ঠোটের মাঝখানের বস্ত্ত এবং দুই উরুর মাঝখানের বস্ত্তর গ্যারান্টি দেবে আমি তাকে বেহেশতের গ্যারান্টি দেব’’। তিনি বলেছেন- الغضب يأكل الحسنات كماتأكل النار الحطب ‘‘ক্রোধ সুনদর কর্মগুলোকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যেমনি আগুন লাকড়িকে পুড়িয়ে দেয়’’।
লোভ, কাম, ক্রোধ সম্পর্কে কেবল এই মূল্যবান বাক্য বলেই তিনি ক্ষামত্ম দেননি। তার কাছের লোকদের তিনি তা হাতে কলেমেও শিক্ষা দিছেন। যারাই অল্প একটু সময়ের জন্য হলেও তার সংস্পর্শে এসেছেন জীবনে মোড় ঘুরে গেছে তাদের। তবে আসহাবে সুফ্ফাহ এই সুহবত পেয়েছিলেন অনেক বেশি। আর তাই ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সুহবত এতই প্রয়োজনীয় যে, মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন- يا ايها الذين امنوا اتقوا الله وكونوا مع الصادقين ‘‘ওহে যারা ঈমান এনেছ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যনিষ্ঠদের সাথে থাকো’’।
সত্যনিষ্ঠ- যাঁরা বিশ্বাসকে বাসত্মবরূপ দিয়েছেন। তাঁদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থেকে ঈমান ও তাকওয়ার পরিপূর্ণতা অর্জন কর। একটি মডেল সামনে রেখে চল। একজন মুর্শিদ তোমাকে প্রতিনিয়ত সঠিক কাজটি করার পরামর্শ দেবেন।
এমনি একটি ঘটনা আমরা দেখি মসজিদে নববীতে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাশ দিয়ে একজন মুসল্লি সবেমাত্র অযু করে নামায পড়লো। তিনি বললেন- ارجع فصل فانك لم تصل ‘‘ফিরে গিয়ে নামায পড়, কারণ তুমি নামায পড়নি’’। এভাবে তৃতীয়বার বললেন। এবার কারণটি খোলাসা করে দিলেন। সাহাবীকে বললেন, তুমি অযু করার সময় পায়ের গোড়ালী ভিজেনি। তোমার অযুই হয়নি, নামায কীভাবে হবে। এটি ছিল ট্রেনিং। তাঁর জন্য এবং যাঁরা সেখানে ছিলেন সবার জন্য। কারণ শুষ্ক আবহাওয়ার আরব দেশে পা ভাল করে ধোয়া মনযোগ সাপেক্ষ ব্যাপার। এই ভুল প্রায় হতে পারতো। তাই এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন।
আরেকবার এক সাহাবী মসজিদে নববীতে দৌঁড়ে এসে কোন রকমে রুকুতে গিয়ে ইমামের সাথে সালাতে যোগ দিয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, زاد لك الله صرصا فلاتصل আল্লাহ তোমার আগ্রহ বাড়িয়ে দিল, তবে এভাবে আর করনা। অথবা বলেছেন- এভাবে হাঁপিয়ে দৌড়ে এসো না, স্বাভাবিকভাবে আসবে। (فلا تعد বা فلا تعدّو দু’ভাবে পড়া যায়)
এখানেও সাহচর্যের বরকতে এভাবে প্রতিটি হরকত, প্রতিটি পরতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তারা মহাভাগ্যবান যাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে সুধরে দিয়েছেন। তবে কেউ বিব্রতবোধ করতে পারেন এ ভেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময়ে ব্যক্তি বিশেষের নাম উল্লেখ না করে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে বলতেন- তোমাদের কী হয়েছে, তোমাদের মধ্যে ওমুখ কাজটি হতে দেখা যায়। এটি ঠিক নয়। এভাবে ব্যাপক ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে সম্বোধন করে বলতেন। মানুষকে বিব্রত করা তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন কারো বাড়িতে দাওয়াতে গিয়ে খাওয়ার পাতে বসে জিজ্ঞেস করো না এটি হালাল, না হারাম। কারণ মুসলমানের প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করা ঈমানের আবেদন। হারাম জানা থাকলে অবশ্যই ওই হারাম খাদ্য-বস্ত্র, টাক-পয়সা গ্রহণ করা হারাম। কিন্তু বেশি পরহেযগারী দেখানো অবাঞ্ছনীয়।
এই যে আচরণ বিধি তা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশ্ববিদ্যালয় ওই মসজিদে নববীতেই শেখার সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল। আসহাবে সুফ্ফাহ তাই ধন্য মানবগোষ্ঠী যারা নতুন বিশ্বসভ্যতার প্রতিষ্ঠাতার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন। এ জন্য আমরা দেখতে পাই, একজন গ্রাম্য চাষা-ভূষা লোকও যখন একজন পীরের দরবারে কিছুদিন থাকেন তার সিরাত-সুরাত, ভদ্রতা, শিক্ষাচার, জীবনদর্শন কীভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। পীর বলতে আমরা তাসাওউফের শিক্ষক বুঝে থাকি। একজন ফিজিক্যাল ফিটনেসের শিক্ষক যেমন প্রথমে নিজে ফিট থাকে, তারপর অন্যকে শরীর ভাল রাখার তা’লীম দেন, তেমনি একজন পীর বা মুর্শিদ প্রথমে নিজে পূর্ণ-পরিণত (কামেল) হবেন তারপর অন্যকে পূর্ণ-পরিণত করতে সচেষ্ট (মুকাম্মেল) হবেন।
একজন পীর তার খানকায় রেখে কিছু লোককে একেবারে সোনার মানুষ বানিয়ে তারপর খোলাফত দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। এটি কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশেষ শিষ্য এই আসহাবে সুফ্ফার অনুসরণেই করে থাকেন। তাসাওউফ বলতেই যুহাদ বা অল্পেতুষ্ট থেকে কঠোর সাধনা বোঝায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধনী সাহাবীগণ ও এই যুহদ অবলম্বন করতেন। আসহাবে সুফ্ফাহ যেন এই যুহদকে তাদের দেহের ভূষণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনী আলোচকগণ এই সুফ্ফাহ ও আসহাবে সুফ্ফাহ এর আলোচনা বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই বিশেষ দিকটি তাই মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আলোচনার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে আসে। আজকের ভোগের দুনিয়ায় ত্যাগের ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদেরকে সত্যনিষ্ঠার আদর্শে প্রনোদনা দিবে এবং প্রতিলোভের ফাঁদে পড়া থেকে রক্ষা করবে, আশা করা যায়। জীবনের মহান লক্ষ্য অর্জনে যে নির্মোহ সাধনার প্রয়োজন তা আমরা পাব সে যুগের আহলে সুফ্ফাহ আর এযুগের হক্কানী তাসাওউফ চর্চাকারীদের জীবন-দর্শনে, তাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং শিক্ষা ও দীক্ষায় উজ্জীবিত উম্মাহ চেতনায় জীবন পথে এগিয়ে যাবার তাওফীক দিন। আমীন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন।
وصلى الله على النبى الامين واله واصحابه اجمعين-

স্মৃতির পাতা থেকে

স্মৃতির পাতা থেকে
আলহাজ্ব মুহাম্মদ আশরাফ আলী

আমরা বাংলাদেশী মুসলমানরা অতীব ভাগ্যবান হুজুর কিবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়াব শাহ (রহঃ) কে পেয়ে। যিনি সত্যিকার আওলাদে রসূল এবং গাউসে পাকের যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন। যার নূরানী পবিত্র হাতে বায়াত গ্রহণ করে এ অঞ্চলের মুসলমানেরা সত্যিকার ঈমানের তৃপ্তি পেয়েছেন।প্রকৃত পক্ষে আমি গুনাহগারকে (প্রবন্ধকার) এই মহান অলী গাউছে জামান আওলাদে রাসুল হযরাতুল আল্লামা শাহ সুফী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রাঃ) তাঁর পাক চরণে দীর্ঘ দিন একামত্ম গোলামী করার সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন। সু দীর্ঘকাল গোলামীর মাঝে হুজুর কিবলা (রাঃ) এর অসংখ্য কারামত এই নাচিজ গোলামের চোখে পড়েছে। সেসব কারামত ও স্মৃতি আমার জীবন সায়াহ্নে এসে রোমাঞ্চকর শিহরন জাগায়; হুজুর কিবলার স্নেহ পরশ ভালবাসার স্মৃতির দিগমেত্ম যখন সাঁতরাই তখন মনের অজামেত্ম চোখের পাতা ভিজে উঠে। বস্ত্তুতঃ আমার না আছে পুঁথিগত বিদ্যা, না আছে বাহ্যিক যোগ্যতা। তারপরও হুজুর কিবলায়ে আলমের মিশনের অনেক কাজ তিনি এ অধম গুনাহ্গারের দ্বারা করিয়ে নিয়েছেন। মূলতঃ এটাও একটা হুজুর কিবলার জ্বলমত্ম কারামত। অনেক সময ভাবতেও অবাক লাগে, যে এই অসংখ্য দুরুহ কাজ কীভাবে সম্পন্ন হলো? এই স্বল্প পরিসরে তার উদাহরণ দিয়ে আমি শেষ করতে পারবনা। এ প্রসঙ্গে হুজুর কিবলায় আলমের পবিত্র জবান থেকে বলেছিলেন ‘‘মোগল বাদশা আকবর। তার কোন পুঁথিগত বিদ্যা ছিল না, অথচ মোগল সাম্রাজ্যে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশী।’’ সুবাহান আল্লাহ!
স্মৃতির দুয়ারে হুজুর কিবালায়ে আলমের কত রোমাঞ্চকর কাহিনী ভেসে ওঠে তা হয়তো আমার শেষ জীবন পর্যমত্ম লিখলেও শেষ হবে না। যে কাহিনী কোন দিনই ভুলতে পারবেনা। তাই হুজুর কিবলায়ে আলমের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে গেলেই সেই দিনের স্মৃতি ভেসে আসে-এই তো মনে হয় সেদিনকারের ঘটনা ১৯৮৯ সালের ৩১শে জানুয়ারী ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় মাদ্রাসা করার জন্য জমি দেখতে গিয়েছিলাম; সাথে ছিলেন আলহাজ্ব চিনু মিয়া, হাজী আতাহার মোল্লা, হাজী সিরাজুল ইসলাম ও হাজী মতিউর রহমান আমার গাড়ী চালক মোঃ হারুন। সেদিন যা ঘটেছিল তা আল্লাহর অলির জ্বলমত্ম কারামত বৈঅন্য কিছু নয়। আমাদের গাড়ী বিশ্ব রোড দিয়ে নারায়ণগঞ্জের পথে চলছে। ইতিমধ্যে বিপরীত দিক থেকে একটি মালবাহী ট্রাক এসে ধাক্কা দিলে আমাদের গাড়ী মাঝিনা নদীর গর্ভে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সেই দুর্ঘটনায় হাজী সিরাজুল ইসলাম সাহেব আমাদেরকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে অনমেত্মর পথে যাত্রা করেন (ইনালিল্লাহে ওয়া ইনালিল্লাহে রাযিউন)। এবং আমি ২৪ মিঃ পানির নীচে থাকার পর আমাকে লোকজন টেনে তুলে হলি ফ্যামিলী হাসপাতালে নিয়ে যায়। হুযুর কিবলায়ে আলমের মিশনের তদারকীর কাজ এখনো অনেক বাকী আছে বিধায় আল্লাহর অসীম রহমতে সে যাত্রায় বেঁচে গিয়ে আমি আসেত্ম আসেত্ম সুস্থ হয়ে উঠি।
সে বার ডাক্তার আমাকে ১ মাস বিশ্রামে থাকতে বল্লেন; কিন্তু আমার মন যে মানেনা; আমার মুর্শিদের দরবারে আমাকে হাজিরা দিতেই হবে। একটু সুস্থ হতে না হতেই পূর্বের এরাধা মোতাবেক ৩য় বার হজ্জে যাবার নিয়তে পাকিস্থান হয়ে হুজুর কিবলায়ে আলমের সান্নিধ্য নিয়ে বাগদাদ শরীফ হয়ে পবিত্র হজ্জ ব্রত পালনে যাই। হুজুর কিবলায়ে আলম উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে মমত্মব্য করেন যে ‘‘হযরত ইউসুফ (আঃ) কে যে ভাবে পানির কুপে আল্লাহ রববুল আলামীন হেফাজত রেখে ছিলেন, তেমনি আপনাকেও ২৪ মিঃ পানির নীচে তিনি হেফাজত করেছিলেন’’।
হুজুর কিবলায়ে আলমের এরকম অসংখ্য অমরকীর্তি রয়েছে। তাঁর নেক নজরে আমি অধমকে ১০৮ বার তিনি পাকিসত্মান ছিরিকোট শরীফে হাজিরা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এবং তাঁর সহচার্যসহ ১০ বার বড় হজ্জ এবং ২৪ বার ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে মদীনা মানোয়ারায় হাজিরা দেওয়ার সৌভাগ্য তিনি আমাকে করে দিয়েছেন। এবং তাঁর নেক নজরে গাউছে পাকের ডাকে ৪ বার বাগদাদ শরীফ,২বার রেঙ্গুন এবং ৪১ বার আজমীর শরীফের যিয়ারত করার নছিব আমি গুনাহ্গারের হয়েছে। আমি না লায়েক ব্যক্তির পক্ষে এটাও হুজুর কিবলার নেগাহে করম নয় কি?
ঐবছরের আর একটি ঘটনা আমার স্পষ্ট আমার মনে আছে, তখন আমি ,আমার স্ত্রী , হাজী চিনু মিয়াও তার স্ত্রীসহ আমরা৪ জন হুজুর কিবলায়ে আলমের সফর সঙ্গী হয়ে আমরা সিরিকোট শরীফ হয়ে লাহোরের দাতা গঞ্জেবখশ লাহোরী (র) এর মাজার শরীফ যিয়ারত করে দিল্লী হয়ে আজমীর শরীফের উদ্দেশ্যে হযরত মাইনুদ্দিন চিশতি (র) এর মাযার যিয়ারত করলাম। তারপর হুজুর কিবলায়ে আলমের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহি আনা সাগরের তীরে বেড়াতে গেলাম। ঐবছর আমাদের সঙ্গে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার শায়খুল হাদিস আল্লামা নঈমী সাহেবও ছিলেন । আনা সাগরের তীরে আমরা হুজুর কিবলা (র) এর সাথে বসলাম এবং সাগরের দৃশ্য অবলোকন করছিলাম। সে মূহুূর্তে আনা সাগর যেন অপরূপে সজ্জিত হয়েছে। আমরা সবাই অবাক হয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি ,মনে হচ্ছে যেন আনা সাগরের সমসত্ম মাছ একত্রিত হয়ে কোন উৎসব করছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ খই ফোটার মত লাফাচ্ছে যেন আমাদের গায়ে এসে পড়বে এমন অবস্থা। (সুবহানাল্লাহ), হুজুর কিবলায়ে আলম মিটি মিটি হাসছেন এবং আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন ‘‘ দেখুন, আমাদের আগমনে মাছেরা বড়ই আনন্দিত’’। আমাদের অত্যমত্ম আফসুসের বিষয় আওলাদে রসূলকে অবুঝ প্রাণী জগতের মাছেরাও স্বসম্মানে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। অথচ আমরা মানব জাতি, সৃষ্টির সেরা হয়েও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা আওলাদে রসূলকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারছিনা।
জীবনের এখন শেষ সময়; শরীরে তেমন শক্তি নেই। তারপরও মুর্শিদ কেবলার প্রেম ভালবাসায় সিক্ত হয়ে প্রাণের টানে ছুটে যাই ছিরিকোট শরীফে। যতক্ষণ বাংলাদেশে থাকি ততক্ষণ হুজুর কিবলার পবিত্র হাতে প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় পায়চারি করি। প্রতিদিন সকাল-বিকাল মাদ্রাসায় আসতে না পারলে মনটা শূন্যতায় অস্থির হয়ে ওঠে। প্রতিদিন মাদ্রাসার মসজিদে নামাজ পড়ে খানকা শরীফের নীচতলায় অফিসে বসে ছবক আদায় করি এবং তখন কোন এক অজানা সুবাসে মনটা ভরে ওঠে, মনে হচ্ছে যেন হুজুর কিবলার শরীর মোবারকের খুশবু পাচ্ছি। এভাবে আমার প্রতিদিনের রুটিন চলে। তারপরও এই বার্ধক্য বসয়ে সময় সুযোগ হলে ছুটে যাই সেই সুদূর পাকিসত্মানের ছিরিকোট শরীফে।
আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কৃপায় এবং আমাদের মাশায়েখ হযরাতের নেগাহে করমে আমি অদম গুনাহগারের হুজুর কিবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ (র) এর একামত্ম কাছে থেকে খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি বহুবার। মক্কা মোয়াজ্জামায় অবস্থন কালে সার্বক্ষণিক আমি তার কামরার সাথে থাকতাম । হুজুর কিবলার অনেক অলৌকি কারামাত আমার নজরে পড়েছে। হুজুর গভীর রজনীতে উঠে তাহাজ্জুত নামাজ পড়তেন, হুজুরকে দেখতাম সর্বদা নামাজ ও জিকিরে মশগুল থাকতেন।গভীর রাতে অনেক সময় হুজুরকে কামরায় দেখা যেতনা আমি অনুভব করতাম বিশেষ কোন বাহনে হুজুর অমত্মরাল হয়ে যেতেন । আমি কখনো হুজুরকে এবিষয়ে জিজ্ঞাসা করার সাহস পেতাম না। আজও তা আমার কাছে রহস্যময় হয়ে আছে। (সুবহানাল্লাহ)
আমার জীবনের অধিকাংশ সময় এই দরবারের খেদমতে অতিবাহিত করেছি। হুজুর কিবলায়ে আলেমের অসংখ্য কারামত স্বচোখে আলোকন করার সৌভাগ্য আমি অধম গুনাহগারে হয়েছে। ইনশাহ আল্লাহ যদি শরীর স্বাস্থ্য ভাল রাখেন তো ধারাবাহিকভাবে তা প্রকাশ করার ইচ্ছা রাখি। যদি হুজুর কিবলার মর্জি হয়।
শেষ করার আগে বর্তমান হুজুর কিবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মাঃ জিঃ আঃ) এর সম্পর্কে একটু না বললে আমার মনটা হালকা হবেনা। সনটা ছিল ১৯৯১ এর মার্চ মাস চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ জালালুদ্দিন সহ আমরা লন্ডন হয়ে আমেরিকায় যাই। আমেরিকা এবং লন্ডনে আমরা প্রায় ১মাস অবস্থান করি। আমেরিকার সেই সফরের দিনগুলোতে দেখেছি অন্য ধর্মাবলীদের মাঝে কী ভাবে হুজুর কিবলায়ে আলমের মাযহাব ও তরিকতের সূক্ষ্ম প্রচার কাজ চালিয়ে ছিলেন। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছি প্রতিদিন হুজুর কিবলা (মাঃ জিঃ আঃ) এর নূরানী চেহারা মোবারক ও অধ্যাত্মিকতার আকর্ষণে শত শত ইহুদী, খৃষ্টান তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ পূর্বক মুসলমান হয়েছে (সুবহান আল্লাহ বেহামদি)। এটাকে কি আমরা আওলাদে রসূলে জ্বলমত্ম কারামত বলবোনা?
পরিশেষে মহান আল্লাহ রবুবুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা তিনি যেন হুজুর কিবলায়ে আলম (রঃ) এর ইচ্ছা মোতাবেক তার নীতি আদর্শ ও নির্দেশাবলী মেনে চলার তওফিক দান করেন। আমিন, ছুম্মা আমিন, বেহুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরছালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
অনুলিখনঃ
মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম
সহকারি অধ্যাপক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুন্নী মহিলা মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা: প্রেক্ষিত কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মহিলা মাদরাসা

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুন্নী মহিলা মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা: প্রেক্ষিত কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মহিলা মাদরাসা
আলহাজ্ব মুহাম্মদ সিরাজুল হক

নারী আমাদের মাতৃজাতি। জগতের মহামানব, সাধক-তাপসকুলের জননী, নবী-রাসূল ওলী-আউলিয়াদের গর্ভধারিনী। বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক সকলেই মায়ের কোলে লালিত। ইসলামে মায়ের অধিকার সমান নয়, সমানের চেয়ে বেশি। কারণ, মানব সভ্যতার মূলভিত্তি বহুলাংশে নারীর উপর প্রতিষ্ঠিত। মায়ের কোলইতো সমাজ সংস্কারক মহাপুরুষদের প্রাথমিক শিক্ষাগার। এ নারীকে একটি নির্মল ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের সুযোগ দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে বিদ্যায়-বুদ্ধিতে ও স্বভাব-চরিত্রে সুগঠিত করে সমাজকে এক একটি যোগ্যতর কন্যা ও যোগ্যতর মা উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শভিত্তিক মহিলা মাদরাসা সমূহের প্রয়োজনীয়তা ও ভূমিকা অনস্বীকার্য।
পবিত্র কুরআনে মহিলাদের অধিকার ও বিধানাবলী সংক্রামত্ম বেশ কয়েকটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে, যেমন-সূরায়ে নিসা, সূরায়ে আহ্যাব, সূরায়ে নূর, সূরায়ে তালাক্ব ইত্যাদি। তন্মধ্যে সূরায়ে নিসা’র নামকরণই করা হয়েছে নারীজাতির নামে। আন-নিসা অর্থ ‘নারীগণ’। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, যে নারীজাতির অধিকার ও বিধি বিধান নিয়ে কুরআনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবতীর্ণ হল, সে নারীগণ কুরআনের সে অংশের সম্যক জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত থাকবে, তা হতেই পারে না। বরং কুরআনের অন্যান্য অংশের পাশাপাশি মহিলা সংক্রামত্ম অংশের জ্ঞান তাদেরকে তুলনামূলক বেশী শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে তাদের মধ্যে সচেনতা সৃষ্টি হয় এবং ইসলামে নারীর প্রতি বৈষম্যমুলক আচরণের যে মিথ্যা অপপ্রচার পাশ্চাত্য জগত চালিয়ে আসছে তা স্বয়ং নারীদের কাছেই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।
উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে আমরা অতি সহজেইই স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, ইসলামী শিক্ষায় সুশিক্ষিত নারী নিজের পরিবার ও সমাজের চিমত্মা চেতনা গঠনে ও সভ্যতা সংস্কৃতির পরিশুদ্ধি ও সংস্কার কাজে সুদূরপ্রসারী,ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারে। এর বাসত্মব প্রতিফলন উম্মুল মুমেনীন অর্থাৎ প্রিয় নবী (দঃ) এর সহধর্মীনীগণের পবিত্র জীবনীতে বিসত্মারিতভাবে লক্ষ্য করা যায়। তাঁদের পবিত্র কুটিরগুলিতে সর্বদাই মহিলা শিক্ষার্থীগণের সমাবেশ বিদ্যমান ছিল। এব্যাপারে আম্মাজান হযরত আয়শা সিদ্দীকা (রাঃ)-র গৃহতো তাঁর ইমেত্মকাল পর্যমত্মই বলতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগারের রুপ লাভ করেছিল। প্রিয় নবী (দঃ) হাতে গড়া এই মহিয়সী রমণী নিজেই নারীজগতের শ্রেষ্ঠতমা ও আদর্শ শিক্ষিকা বা মুআল্লিমা ছিলেন।
তৎকালীন নারীদের ইলম বা ওহীর জ্ঞান লাভের প্রতি অণুরাগ এবং তৎপ্রতি প্রিয় নবীজি (দঃ) -এর মনোযোগ ও মূল্যায়ন সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত সর্বশ্রেষ্ঠ হাদিস গ্রন্থ বুখারী শরীফে চমৎকার বর্ননা রয়েছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করে যে, একদা (মদীনায়) প্রিয় নবীর (দঃ) নিকট এক মহিলা (নারীদের পক্ষ থেকে) এসে আবেদন জানালেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! পুরুষগণ সরাসরি এসে আপনার পবিত্র কথাগুলো আহরণ করে থাকেন, কিন্তু আমরা নারীগণ এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অতএব, আমাদের জন্য আপনি নিজের তরফে(সপ্তাহে বা মাসে) একটি দিন ধার্য্য করে দিন, আমরা আপনার খেদমতে উপস্থিত হব আর আপনি আল্লাহর প্রদত্ত জ্ঞান হতে আমাদেরকে শিক্ষা দান করবেন। প্রিয় নবী (দঃ) মহিলার এ আবেদন স্থায়ীভাবে মঞ্জুর করে বললেন, ‘‘তোমরা (সপ্তাহের বা মাসের) অমুক অমুক দিনে অমুক অমুক স্থানে সমবেত হও, আমি এসে তোমাদের তা’লীম দেব’’। অতপর এ ধারা চালু হয়ে গেল। (বুখারী, মেশকাত) এটা মহিলা মাদরাসার জন্যই একটি দলিল।
মহিলাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার স্বপক্ষে উপরোক্ত হাদিসখানা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। এমনকি মজবুত ভিত্তি বা দলিল। সুতরাং মুসলিম অধ্যুষিত এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সমত্মানরা যেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষা ইসলাম বিরোধী স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে ইহুদী খূস্টান ও পৌত্তলিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি নামের বর্বরতা ও পশুত্বের জীবন ধারণে নিমজ্জিত হয়ে নাসিত্মক্য চেতনা, বস্ত্তবাদী ধ্যান-ধারণা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ইত্যাদিকে প্রগতির প্রতীকরুপে লালন করে চলেছে, সেখানে মুসলমি সমত্মানদের মধ্যে নির্ভেজাল ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক চর্চার মাধ্যমে ইসলামী চিমত্মা চেতনা ও সভ্যতা সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসারের স্থায়ী ব্যবস্থা কল্পে বর্তমান মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা একামত্মই অপরিহার্য।
উপরিউক্ত সুমহান কর্মের ধারাবাহিকতায় এবং রাসূলে করিম (সা.) এর ৪০তম বংশধর কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরাতুল আল্লামা শাহ সূফী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যেব শাহ (রা.) এর একান্ত মনোবাসনা প্রতিফলনের নিমিত্তে ও আমাদের মাশায়েখ হাজরাতের নেক নজর ও করমে বর্তমান হুজুর কিবলায়ে আলম হযরাতুল আল্লামা শাহ সূফী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মা.জি.আ.)এর নূরানী হস্ত মোবারকে ৯, অক্টোবর ২০১০ সালে ঢাকার প্রাণ কেন্দ্র মোহাম্মদপুরস্থ টিককা পাড়ায় হাজী চিনু মিয়া (রহ.) এর বোন মরহুমা গুলবাহার বেগমের প্রদত্ত জমিতে কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মহিলা মাদরাসা নামে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে একটি ঐতিহাসিক মাইল ফলক কর্মযাজ্ঞের শুভ সূচনা করেন। যুগের চাহিদা মোতাবেক মাদরাসা পরিচালনা কমিটির অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মাদরাসাটি দিন-দিন উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দাখিল স্তরের জনবল কাঠামো অনুযায়ী সুদক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা দ্বারা আদর্শ জাতি গঠনের মহান প্রত্যয় সামনে রেখে তাদের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগীময় বিশ্বের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত, দক্ষ ও উন্নত চরিত্রের অধিকারীনী রূপে গড়ে তোলার মিশন চালু করতে আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবীব (সা.) এর অশেষ মেহেরবানীতে আমরা সফল কাম হবো (ইনশা আল্লাহ)। আমরা অত্যন্ত বুকভরা আশা নিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলতেপারি আওলাদে রসূলের কোন মিশনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়নি এবং হবেও না- ইনশা আল্লাহ। সেই নিরীক্ষে বলবো ‘‘কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মহিলা মাদরাসাও এদেশের শ্রেষ্ঠতম মাদরাসা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়। আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবিব (সা.) এর মেহেরবানী এবং আমাদের মাশায়েখ হাজারাতের নেগাহে করমে মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের কর্ম প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যে মাদরাসার ৭তলা বিশিষ্ট নতুন ক্যাম্পাস নির্মিত হয়েছে। যেখানে কামিল স্তর পর্যন্ত ছাত্রীদের ক্লাশ নেয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনের তাগিদে ছাত্রীদের আবাসিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে ছাত্রীদের ইউনিফর্মের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ছাত্রীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, সেলাই প্রশিক্ষণ প্রদান করা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।
এজন্য প্রয়োজন অর্থের। তাই সমাজের বৃত্তবানদের নিকট হুজুর কেবলায়ে আলমের এই মিশন জারি রাখার লক্ষ্যে তাদের সার্বিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে একটি আদর্শ জাতি গঠনের এ বিশাল কর্মজ্ঞে শামিল হওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে এই প্রয়োজন পূরণ করার নিমিত্তে ছেলেদের জন্য উল্লেখযোগ্য হারে মাদরাসার ব্যবস্থা থাকলেও মেয়েদের জন্য তা একেবারেই অপ্রতুল। তাই সময়ের বলিষ্ঠ দাবী হচ্ছে শুধু বাংলাদেশে নয় দেশ-বিদেশের প্রতিটি মুসলিম এলাকায় উল্লেখযোগ্য হারে সুন্নি মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতঃ মুসলিম কন্যাদের এ তীব্র অভাব পূরণে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিৎ। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ মহৎ কাজের তাওফিক ও সৎ সাহস দান করুন। আমীন।
অনুলিখক: মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম
সহ:অধ্যাপক (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)

শাফাআতে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম

শাফাআতে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম
মাওলানা মুহাম্মাদ মুশতাক আহমদ

মহান রাববুল আলামীন হাশরের দিন স্বীয় অপরিসীম অনুগ্রহ ও দয়ায় আপন গুনাহগার বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন। বান্দাগণ তাঁরই নিকট মুজরিম ও অপরাধী। আর তিনিই তাদের ক্ষমা ও মার্জনা কারী। আর এ ক্ষমা ও মার্জনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা’য়ালার উপর কারো কোন জোর বা বলপ্রয়োগের অবকাশ নেই। তিনিই একমাত্র ক্ষমা ও অনুগ্রহের মালিক। তবে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর মকবুল ও নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দাদের ইজ্জত-সম্মান প্রদর্শনের জন্য স্বীয় মাহবুব, পছন্দনীয় ও মনোনীত বান্দাদের আজমতে শান জাহির করার লক্ষে স্বীয় বিশেষ প্রিয়ভাজন বান্দাদের বিশেষত্য প্রকাশনার্থে রোজ হাশরে উনাদেরকে এমন মর্যাদা ও মকাম দান করবেন। যেখানে তার মাহবুব ও মনোনীত বান্দাদেরকে অনুমতি দিবেন যেন তাঁরা গোনাহগার বান্দাদের জন্য আল্লাহ্র দরবারে সুপারিশ করেন। আর আল্লাহ্ তা’য়ালাও তাঁদের সুপারিশ গ্রহণ করে অসংখ্য গুনাহগারদের মাফ করবেন।
শাফায়াতের অর্থঃ-
মূলত শাফায়াত শব্দটি আরবী ‘শাফয়ুন’ শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যার অর্থ হলো এক বস্ত্তর সাথে অনুরূপ বস্ত্তর মিলন সাধিত করা। সাথী হওয়া, কারণ প্রতিবেশী ‘শুফআর’ দাবির মাধ্যমে বিক্রয়কৃত জমিকে তার মালিকানার সাথে মিলিয়া নেয়।
অনুরূপভাবে দু’ রাকাত নামাজকেও ‘শাফআ‘ বলা হয়। কেননা এক রাকাতের সাথে অপর রাকাতের মিলানো হয়। আর অনুরূপভাবে সুপারিশ করার অর্থ হলো অপরাধী ব্যক্তি তার সুপারিশের জন্য আল্লাহর কোন মকবুল বান্দাদের সাথে তাকে মিলিয়ে নেয়। তাই সুপারিশ ও সাহায্য করাকে শাফায়াত বলা হয়।
আর পরিভাষায় শাফায়াতের অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে শরহে আকায়েদ নসফী গ্রন্থের পার্শ্ব টীকায় উল্লেখ করা হয় وفى الاصطلاح رفع العقوبة وطلب التجاوز عن الذنب-
অর্থাৎ পরিভাষায় শাফায়াতের অর্থ হল, ‘‘শাসিত্ম রহিত করা ও গুনাহ মার্জনার প্রার্থনা করা।’’
আল্লামা ইবনুল আসীর (রহ.) শাফায়াতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-
الشفاعة: السوال فى التجاوز عن الذنوب والجرائم بينهم
অর্থাৎ ‘‘পরস্পরেরর মাঝে অপরাধ ও গুনাহ্ ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করা।’’ (শরহে সহীহ মুসলিম)
আল্লামা মুকাতিল (রহ.) শাফায়াতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-
الشفاعة هى توسل الانبياء والمرسلين والصالحين الى الله تبارك وتعالى للمذنبين لانقاذهم من العذاب فى يوم الحساب –
অর্থাৎ ‘‘শাফায়াত হলো শেষ বিচারের দিন পাপী লোকদেরকে শাসিত্ম হতে মুক্তি দেয়ার জন্য নবী রাসূলগণ এবং সালেহীন তথা আউলিয়ায়ে কেরাম কর্তৃক আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সুপারিশ করা।’’
সাধারণত কবীরা গুনাহ বা সগীরা গুনাহ মাফ করানো, আযাব হালকা বা পরিপূর্ণরূপে রহিত করানো বা বেহেশতের পদমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর নিকট কোন সম্মানিত, গ্রহণযোগ্য, মনোনীত, নৈকট্যপ্রাপ্ত ও প্রিয়ভাজন বান্দা আল্লাহ পাকের অনুমতিক্রমে কোন ব্যক্তির জন্য আল্লাহর সমীপে সুপারিশ করাকে শাফায়ত বলা হয়।
আল্লাহ রাববুল ইজ্জত তাঁর প্রত্যেক নবী ও রাসূল আলাইহিমুস্ সালামকে আপন আপন অবস্থানে অনেক নেয়ামত ও মর্যাদার অধিকারী করেছেন। মহান রাববুল আলামীন আমাদের প্রিয়নবী হুযূর আকরম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে অজস্র অগণিত অপরিসীম নিয়ামত ও অতুলনীয় মর্যাদা দান করেছেন তন্মধ্যে অন্যতম মহান নিয়ামত ও গৌরবপূর্ণ মর্যাদা হলো- শাফায়াতে উযমা বা সুপারিশের সর্বোচ্চ পদ মর্যাদার অধিকারী হওয়া। এ প্রসঙ্গে মহান রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআন পাকে ইরশাদ করেন-وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا-
অর্থাৎ ‘‘হে প্রিয় হাবীব! আপনি রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামায কায়েম করুন। যা আপনার উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব বা বাড়তি ফযীলত। (যার বিনিময়ে) অচিরেই আপনার প্রতিপালক (রোজহাশরে) আপনাকে এমন স্থানে সমাসীন করবেন যেখানে সবাই (স্রষ্টা ও সকল সৃষ্টি) আপনার প্রশংসা করবে।’’( সূরা বনী ইসরাঈল: ৭৯)। আলোচ্য আয়াতে মকামে মাহমূদ (প্রশংসিত স্থান) দ্বারা শাফায়াতে কুবরার আসনে সমাসীন হওয়াই উদ্দেশ্য। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই মকামে মাহমূদের ব্যাখ্যা দিয়ে ইরশাদ করেছেন-
هو المقام الذى اشفع فيه لامتى –
অর্থাৎ ‘‘ইহা ঐ স্থান যেখানে আমি আমার উম্মতের জন্য শাফায়াত করব।’’ (তাফসীরে জিয়াউল কুরআন)
এ পর্যায়ে আমিরুল মূমিনীন ফিল হাদীস হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী (রহ.) তাঁর
রচিত বিশ্ববিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুত তাফসীরের অমর্ত্মগত-
بَاب قَوْلِهِ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا-
নামক অধ্যায়ে সাইয়্যেদেনা হযরতআব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রহ.) থেকে নিম্নোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন-
قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا يَقُولُ إِنَّ النَّاسَ يَصِيرُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ جُثًا كُلُّ أُمَّةٍ تَتْبَعُ نَبِيَّهَا يَقُولُونَ يَا فُلَانُ اشْفَعْ يَا فُلَانُ اشْفَعْ حَتَّى تَنْتَهِيَ الشَّفَاعَةُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَلِكَ يَوْمَ يَبْعَثُهُ اللَّهُ الْمَقَامَ الْمَحْمُودَ
অর্থাৎ বর্ণনাকারী বলেন আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরা (রহ.) কে ইরশাদ করতে শুনেছি , অবশ্যই মানুষ কিয়ামতের দিবসে দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। প্রত্যেক উম্মত তাদের আপন আপন নবীদের অনুসরণ করবে। তারা নবীগণের দরবারে গিয়ে সবিনয় আবেদন করবে, হে আমাদের নবী! আপনি এ নাজুক সময়ে মহান আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করুন। হে আমাদের নবী! আপনি এ সংকটময় অবস্থায় আমাদের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করুন। হে আমাদের নবী ! আপনি এ নাজুক সময়ে মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। পরিশেষে সুপারিশ করার দায়ভার রাসূলে মুয়ায্যম নবীয়ে আকরম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূরানী দায়িত্বে এসে পৌঁছবে। আর উহাই হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফায়াতের মহান মর্যাদা। যা ঐ দিবসে যে দিন আল্লাহ পাক জাল্লা শানুহু তাঁকে মকামে মাহমূদ তথা শাফায়াতের উযমার পদ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। (বুখারী শরীফ, ২য় খন্ড পৃষ্ঠা # ৬৮৬)
সিহাহ সিত্তাহ সংকলকদের অন্যতম ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস থেকে বর্ণনা করেন একদিন গুনাহগার উম্মতের দরদী নবী হুযুরে আকরম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইবরাহীম খলিলুল্লাহ (আঃ) এর এ উক্তিটি তিলাওয়াত ফরমালেন-
رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থাৎ ‘‘হে আমার রব! ঐ মূর্তিগুলো অনেক লোককেই পথভ্রষ্ট করেছে যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা আমার দলভূক্ত হবে। আর যার আমার অবাধ্য হয়েছে তাদের প্রতি আপনি তো ক্ষমামীল ও দয়াবান।’’ ( সূরা ইবরাহীম: ৩৬)। অতঃপর হুযুরে করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর উক্তিটি তিলাওয়াত করলেন।
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অর্থাৎ ‘‘হে আল্লাহ যদি আপনি তাদেরকে আযাব দেন তাহলে নিশ্চয়ই তারা তো আপনার বান্দা। আর যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন তাহলে আপনি তো অবশ্যই পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’’
(সূরা মায়িদাহ: ১১৮)। অতঃপর নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন হাত মুবারক উঠালেন এবং উম্মতের মায়ায় কান্না করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন-
اللهم امتى امتى-
‘‘হে আল্লাহ আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন। আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন।’’ তখন আল্লাহ তা’য়ালা হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে বললেন হে জিবরাঈল! আমার হাবীব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো কেন তিনি এভাবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন অথচ রাববুল আলামীন নিজেই ভালো জানেন।অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) হুযুরে আকদস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে হাযির হয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করলেন। তখন রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলছেন উহা সম্পর্কে তিনি আল্লাহ্ তা’য়ালাকে অবহিত করলেন। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা তা অধিক ভালো জানেন।
তখন আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করলেন-
اذهب الى محمد فقل انا سنرضيك فى امتك ولا نسوءك- يا جبريل
অর্থাৎ ‘‘হে জিবরাঈল! আমার মাহবুব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট যাও এবং আমার পক্ষ থেকে পয়গাম পৌঁছিয়ে দাও। যে হে হাবীব! অচিরেই আমি আপনাকে আপনার উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করবো এবং আপনাকে কষ্ট দিবনা।’’
ইমাম বুখারী, মুসলিম ও আহমদ (রঃ) জ্বলীলুল কদর সাহাবী হযরত আবূ হুরায়রা (রহ.) এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন, হযরত আবূ হুরায়রা (রহ.) বলেন-একদা শাফীউল মুযনেবীন রাসূলে রাবিবল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে গোশত পেশ করা হল। রাসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যেহেতু বাহুর গোশত পছন্দনীয় ছিল, তাই হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট বাহুর গোশত পেশ করা হল, অতঃপর তিনি দাঁত মুবারক দিয়ে গোশত খাওয়া শুরু করলেন। এমতাবস্থায় প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমালেন- কিয়ামত দিবসে আমি সকল মানুষের সরদার হবো। তোমরা কি জানো, আমার সেই কর্তৃত্ব কিভাবে হবে? অতঃপর তিনি নিজেই বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা’য়ালা কিয়ামত দিবসে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে এমন এক সমতল ময়দানে একত্রিত করবেন, যেখানে ঘোষণা কারীর আওয়াজ সবাই শুনতে পাবে আর তিনিও সবই দেখতে পাবেন। সূর্য মানুষের নিকটবর্তী হবে। দুঃখ-কষ্ট ও দুঃশ্চিমত্মা হবে তাদের অসহনীয়। তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকবে, তোমরা কি দেখতেছনা কিরূপ অবস্থায় পতিত হয়েছে, তোমরা কি চিমত্মা করতেছনা কি ধরণের পেরেশানীতে পতিত হয়েছে, এ অসহনীয় দুঃখ যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ হবে কিভাবে? আস এমন একজনকে তালাশ করি যিনি আমাদের জন্য আল্লাহর সমীপে সুপারিশ করতে পারেন।তখন একজন অপরজনের সাথে পরামর্শ করে বলবে। চলো আমরা হযরত আদম (আঃ) এর নিকট যাই। অতঃপর সকলে একমত হয়ে হযরত আদম (আঃ) এর নিকট গিয়ে আবেদন করবে হে আদম (আঃ) আপনি সকল মানুষের পিতা। আল্লাহ তা’য়ালা আপনাকে স্বীয় কুদরতি বরকতময় হাতে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মধ্যে রুহ দিয়েছেন। সকল ফেরেশতাদেরকে আপনার সম্মানার্থে সিজদার আদেশ প্রদান করেছেন। অতঃপর তারা সকলে আপনাকে সিজদা করে সম্মানিত করেছেন। আপনি আল্লাহর সমীপে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি দেখছেন না আমরা কি কঠিন অবস্থায় আছি। আপনি কি আমাদের দুঃখ যন্ত্রনা প্রত্যক্ষ করছেন না? হযরত আদম (আঃ) জবাবে বলবেন, আমার রব এখন এমন ক্রোধ ও মহিমায় আছেন যেরূপ আগেও কখনো ছিলেন না। পরেও কখনো হবেন না। কথা হলো আল্লাহ পাক আমাকে বিশেষ গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তার যথাযথ প্রতিফলন আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে কথা মনে করে আমি আমার পরিণতির চিমত্মায় মগ্ন আছি। নিজের ও সুপারিশের প্রয়োজন বোধ করছি। নাফসি নাফসি (হায় আমার কী হবে, আমার কী হবে)। এই এখন আমার অবস্থা। বরং তোমরা হযরত নূহ (আঃ) এর কাছে যাও। তাঁকেই সুপারিশকারী হবার আবেদন জানাও। একথা শুনে মুক্তিকামী মানুষেরা তখন হযরত নূহ (আঃ) এর কাছে যাবে এবং বলবে হে নূহ (আঃ)! আপনি পৃথিবীবাসীর নিকট সর্বপ্রথম রাসূল। আল্লাহ্ পাক আপনার নাম রেখেছেন ‘আবদে শাকুর’ (শুকরগুযার বান্দা)। আমাদের দিকে নজর দিন। আপনি দেখতেছেন কি করুণ অবস্থা আমাদের। এ দূরাবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করুন। হযরত নূহ (আঃ) বলবেন, আমার প্রতিপালক এখন এমন প্রচন্ড গযব অবস্থায় আছেন, যেরকম অবস্থা কখনো আগেও হয়নি এবং পরেও হবে না। কথা হলো-আমি আমার অবাধ্য কওমের জন্য বদ দু’য়া করেছিলাম। যার জন্য আমি নিজের চিমত্মায় পেরেশান। এখন আমার অবস্থা নাফসি নাফসি। বরং তোমরা হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ (আঃ) এর কাছে যাও। ব্যতিব্যসত্ম মানুষ এখন ছুটে যাবে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কাছে।তারা আবেদন করবে-আপনি আল্লাহর নবী এবং সমগ্র পৃথিবীবাসীর মধ্যে একমাত্র আপনিই আল্লাহর বন্ধু খলীল। আপনি অবশ্যই দেখতেছেন আমরা কি নাজুক অবস্থায় আছি। দয়া করে ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের নিমিত্তে আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করুন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বলবেন, আমার রব ভীষণভাবে রুষ্ট। এমনটি তিনি অতীতে কখনো হননি। আর ভবিষ্যতেও কখনো হবেন না।তিনি তাঁর তিনটি তাওরিয়ার কথা উল্লেখ করবেন। যেগুলোকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মানুষ মিথ্যা মনে করেছিল। সে কথা স্মরণ করে আমার অবস্থা এখন নাফসি নাফসি। অর্থাৎ নিজেকে নিয়ে ব্যসত্ম। বরং তোমরা অন্যের জনের কাছে যাও। হযরত মূসা (আঃ) এর নিকট যাও। অতঃপর উদভ্রামত্ম জনতা হযরত মূসা (আঃ) এর কাছে ছুটে যাবে এবং বলবে হে মূসা (আঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ পাক রিসালাত এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে আপনাকে মর্যাদা দান করেছেন। আপনি মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আমাদের কী সংকটপূর্ণ অবস্থা আপনি নিশ্চয় অবলোকন করছেন। হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বলবেন, আমার রব আজ এমন ক্রোধান্বিত। যেমনটি অতীতে কখনো হননি এবং ভবিষ্যতেও হবেন না। কথা হলো- আমি আল্লাহর আদেশ ব্যতিত একজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। এখন আমার অবস্থা নাফসি নাফসি অর্থাৎ নিজের চিমত্মায় নিজেই ব্যসত্ম। বরং তোমরা হযরত ঈসা (আঃ)এর কাছে যাও। তখন মানুষ হযরত ঈসা (আঃ) এর কাছে ছুটে যাবে। এবং উনাকে বলবে, হে হযরত ঈসা (আঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল। আপনি দোলনায় থাকা অবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলেছেন। আপনাকে আল্লাহ ঐ কালিমা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। যা হযরত মরিয়ম (আঃ) এর অমত্মরে ঢেলে দিয়েছিলেন। আর আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর পছন্দনীয় রুহ্। সুতরাং আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর সমীপে সুপারিশ করুন। আপনি অবশ্যই দেখতেছেন, যে আমরা কেমন বিভীষিকাময় অবস্থায় আছি। জবাবে ঈসা (আঃ) বলবেন, নিশ্চয় আমার প্রতিপালক আজ এমন রাগান্বিত যেমনটি অতীতে কখনো হননি এবং ভবিষ্যতেও কখনো হবেন না। অবশ্যই হযরত ঈসা (আঃ) নিজের কোন ইজতিহাদী ত্রুটির কথা উল্লেখ করবেন না। তথাপিও তিনি বলবেন আজ আমার অবস্থা নাফসি নাফসি অর্থাৎ নিজ চিমত্মায় মগ্ন আছি। বরং তোমরা আমি ছাড়া অন্য জনের কাছে যাও। শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে চলে যাও। শাফীউল মুযনেবীন ইরশাদ করেন- অতঃপর মুক্তিকামী বিশাল জনশ্রম্নত মুক্তির আশায় আমার নিকট ছুটে আসবে। আর আবেদন করবে হে প্রশংসিত সত্ত্বা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি আল্লাহর প্রিয় নবী ও সর্বশেষ রাসূল। আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়াতেই আপনার পূর্বাপর মাগফেরাতের ঘোষণা দিয়েছেন। আপনি মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন।আপনি অবশ্যই দেখতেছেন কী নাজুক পরিস্থিতি আমাদের। নিশ্চয় আপনি অবলোকন করছেন সংকটাপন্ন অবস্থার। নবীজি বলেন অতঃপর আমি আরশের নীচে গিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হবো। অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা আমার সিনা মুবারককে উম্মু্ক্ত করে দিবেন এবং অমত্মকরণে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের এমন কালিমাসমূহ সৃষ্টি করে দিবেন যা ইতিপূর্বে আর কারো অমত্মরে সৃষ্টি করা হয়নি। অতঃপর আমাকে বলা হবে-
يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ سَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَرْفَعُ رَأْسِي فَأَقُولُ أُمَّتِي يَا رَبِّ أُمَّتِي يَا رَبِّ أُمَّتِي يَا رَبِّ فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ أَدْخِلْ مِنْ أُمَّتِكَ مَنْ لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ مِنْ الْبَابِ الْأَيْمَنِ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ وَهُمْ شُرَكَاءُ النَّاسِ فِيمَا سِوَى ذَلِكَ مِنْ الْأَبْوَابِ ثُمَّ قَالَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ مَا بَيْنَ الْمِصْرَاعَيْنِ مِنْ مَصَارِيعِ الْجَنَّةِ كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَهِجَرَ اَوْحِمْيَرَ أَوْ كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَبُصْرَى-
হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার মাথা মুবারক উঠান। আপনি প্রার্থনা করুন। যা প্রার্থনা করবেন তা দেয়া হবে। আর শাফায়াত করুন। আপনার সুপারিশ কবূল করা হবে। তখন আমি আমার মাথা উঠাব এবং বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত, হে আমার রব! আমার উম্মত, হে আমার রব! আমার উম্মত অর্থাৎ আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন। তখন বলা হবে আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব কিতাব নেই তাদেরকে বেহেশতের ডান দিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। আর তাদের জন্য বেহেশতের অন্যান্য দরজা দিয়ে প্রবেশ করারও অধিকার রয়েছে। সেই সত্ত্বার শপথ করে বলছি যার কুদরতের কব্জায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রাণ রয়েছে, নিশ্চয় বেহেশতের দরজাসমূহের মধ্যে দু’পার্টের মধ্য খানে এতবেশী দূরত্ব থাকবে যতপরিমান দূরত্ব মক্কা নগরীও মকামে হিজর বা হিমিয়ার এর মধ্য খানে অথবা মক্কা নগরী ও মকামে বুসরার মধ্যখানে রয়েছে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদ)
এভাবে আল্লাহর হাবীব এর শাফায়াতের মাধ্যমে মহান রাববুল আলামীনের অফুরমত্ম অপরিসীম রহমতের ভান্ডার খুলে যাবে। যার বর্ণনা অসংখ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
শাফায়াতের প্রকারসমূহঃ
বিশ্ববিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা বদরউদ্দীন আইনী (রহ.) ও ইমামুল মুফাসসিরীন আল্লামা করতুবী (রঃ) এবং অন্যান্য মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ আল্লামা কাযী আবুল ফযল আয়ায (রহ.) থেকে নকল করেছেন যে, হুযুর পুরনূর শাফিয়ে ইয়াউমিন নুশুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজ হাশরে পাঁচ প্রকারের শাফায়াত করবেন।
১) শাফায়াতে আ’ম্মায়ে কুবরা অর্থাৎ এই শাফায়াতের দ্বারা মুমিন ও কাফির সকলেই উপকৃত হবে। এই শাফায়াত হাশরের ময়দানে সূর্যের প্রচন্ড উত্তাপে দূর্বিসহ যাতনা ও ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণ ও হিসাব কিতাব তরান্বিত করার জন্য হবে। আর ইহাই হল –
مقام الشفاعة العظمى العامة- অর্থাৎ শেষ বিচারের দিবসে সার্বজনীন মহান শাফায়াত-সুপারিশ এর সর্বোচ্চ মর্যাদার আসন, যার মাধ্যমে সর্বপ্রথম শাফায়াতের দ্বার উম্মুক্ত হবে।
২) কতিপয় সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য সুপারিশ করবেন।
৩) এমন কিছু ব্যক্তি যারা গুনাহের কারণে দোযখের শাসিত্মর উপযোগী সাব্যসত্ম হবে। হুযূর আনওয়ার সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুপারিশের মাধ্যমে আল্লাহ পাক তাঁদেরকে ক্ষমা করবেন এবং দোযখে না দিয়ে সরাসরি বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।
৪) ঐ সকল পাপী যাদেরকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর রাসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশ করে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন।
৫) বেহেশতবাসীদের পদ মর্যাদা বৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশ করবেন।
আল্লামা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘লুমআতের’ মধ্যে উপরোক্ত পাঁচ প্রকার ছাড়াও আরো অতিরিক্ত পাঁচ প্রকার শাফায়াতের বর্ণনা দিয়েছেন।
১) ঐ সকল বান্দা যাদের পাপ ও পূণ্য সমান সমান হবে। তাদেরকে বেহেশতে প্রবেশ করানোর জন্য প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশ করবেন।
২) বেহেশতের দরজা উম্মুক্ত করার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশ করবেন।
৩) যারা আযাবের উপযোগী হবে তাদের আযাব হালকা করার জন্য সুপারিশ। যেমন- প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচা আবূ তালেবের আযাব হালকা করার জন্য সুপারিশ করবেন।
৪) বিশেষভাবে মদীনাবাসীদের জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশ করবেন।
৫) পৃথকভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রওজা শরীফ জিয়ারতকারীদের জন্য সুপারিশ করবেন।
এ ছাড়া আল্লামা গোলাম রসূল সাঈদী তাঁর ‘শরহে সহীহ মুসলিম’ নামক গ্রন্থের ২য় খন্ডে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অন্যান্য নবী রাসূলগণ, আলেমগণ, শহীদগণ, নাবালেক শিশুরা এবং পবিত্র কুরআনসহ অনেকের জন্য মোট ৪৯ প্রকার সুপারিশের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।
আল্লামা কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহঃ) সাতাশ জন সাহাবায়ে কেরাম থেকে শাফায়াতের হাদীস বর্ণিত হওয়ার বিষয় সত্যায়ন করেছেন। কিন্তু এতগুলো সুস্পষ্ট সহীহ হাদীস থাকা সত্ত্বেও ফেরকায়ে মুতাযিলা ও খারেজীগণ শাফায়াতের অস্বীকার করেছে।
কাযী আয়ায (রহঃ) বলেন সমসত্ম সলফ ও তৎপরবর্তী আহলে সুন্নাতের ওলামাগণ শাফায়াত প্রমাণিত হওয়ার উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন। আর কিছু মুতাযিলা ফেরকা ও খারেজীরা শাফায়াতকে অস্বীকার করেছে (উম্মাদাতুল ক্বারী)।
বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) বলেছেন-
هذا حديث مةواةر، فةعس من انكر الشفاعة –
অর্থাৎ ‘‘এই হাদীসে শাফায়াত মুতাওয়াতির হাদীস। সুতরাং যে ব্যক্তি শাফায়াতকে অস্বীকার করে সে অনেক বড় হতভাগা’’। (তাফসীরে জিয়াউল কুরআন)
ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহঃ) হযরত ফারুকে আ’যম থেকে বর্ণনা করেন যে,তিনি একদিন খুতবার মধ্যে ইরশাদ করেছেন-
انه سيكون فى هذه الامة قوم يكذبون بعذاب القبر فيكذبون بالشفاعة –
অর্থাৎ ‘‘অচিরেই এই উম্মতের মধ্যে এমন একদল সৃষ্টি হবে, যারা কবরের আযাবকে স্বীকার করবে না এবং শাফায়াতকে অস্বীকার করবে। (বুখারী ও মুসলিম)
ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রহঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল-ফিকহুল আকবরের’ মধ্যে উল্লেখ করেছেন-
وشفاعت الانبياء عليهم الصلوات والسلام حق وشفاعت نبينا عليه الصلوات والسلام للمومنين المذنبين ولاهل الكبائر منهم المستوجبين العقاب حق ثابت-
অর্থাৎ ‘‘নবীগণ আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম এর শাফায়াত হক (সত্য)।’’ আর আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফায়াত সগীরা গুনাহগার মুমিনগণের জন্য এবং কবীরা গুনাহকারী যাদের উপর শাসিত্ম ওয়াজিব হয়েছে তাদের জন্য সত্য ও প্রমাণিত।
এ প্রসঙ্গে ‘আল আকায়িদুন নাসাফিয়্যা’ গ্রন্থের নিম্নোক্ত উক্তি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য-
والشفاعة ثابتة للرسل والاخيار فى حق اهل الكبائر –
অর্থাৎ ‘‘রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম এবং উম্মতের সৎকর্মশীল উলামাগণ, শহীদগণ ও আউলিয়ায়ে কেরাম এর সুপারিশ কবীরা গুনাহকারীদের ক্ষেত্রে হক ও গ্রহণযোগ্য।’’
কারণ হাদীস শরীফে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
شفاعتى لاهل الكبائر من امتى –
অর্থাৎ ‘‘আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীদের জন্য আমার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে।’’ (আহমদ, আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিববান, হাকেম ও তাবরানী)
উক্ত হাদীসটি মশহুর হাদীস। বরং শাফায়াতের বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলো অর্থগত দিক দিয়ে মুতাওয়াতির পর্যায়ের। যেমন- আল্লামা সা’দ উদ্দীন তাফতাজানী (রঃ) তাঁর রচিত ‘শরহুল আকায়িদিন নাসাফিয়্যা’ গ্রন্থে বলেন-
وهو مشهور بل الاحاديث فى باب الشفاعة متواترة المعنى-
অর্থাৎ ‘‘উক্ত হাদীসটি মাশহুর। বরং শাফায়াতের অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীসসমূহ অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির।’’ অনুরূপ মমত্মব্য বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী (রঃ) স্বীয় গ্রন্থ ‘শরহুল ফিকহিল আকবর’ গ্রন্থেও করেছেন।
পূর্ববর্তী যুগের মুতাযিলা ও খারেজীদের ন্যায় বর্তমান যুগের ওহাবী ও দেওবন্দী সম্প্রদায়ও জোড়ালোভাবে শাফায়াতকে অস্বীকার করে চলেছে। শাফায়াত বিল মুহাববত (আল্লাহর নিকট মাহবুব তথা প্রিয়ভাজন হওয়ার কারণে সুপারিশের অধিকার লাভ) ও শাফায়াত বিল ওয়াজাহাত (আল্লাহর নিকট সম্মানিত হওয়ার কারণে সুপারিশের অধিকার লাভ) এ দু’টোই তারা স্বীকার করে না।আর শাফায়াত বিল ইয্ন (অনুমতির ভিত্তিতে সুপারিশের অধিকার লাভ) স্বীকার করলেও তার এমন অর্থ বর্ণনা করে যাতে শানে মুসত্মাফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি অস্বীকৃতি বুঝা যায়। ওহাবী ও দেওবন্দীদের গুরু মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী তার ‘তকভীয়াতুল ঈমান’ গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে লিখেছেন, ‘‘কেউ কারো সুপারিশকারী ও সাহায্যকারী হবে না।’’ তাদের গুরু শাফায়াত বিল মুহাববত এর অর্থ বর্ণনা করেন, যদি আল্লাহ তা’য়ালা তার মাহবুব বান্দার শাফায়াত কবূল না করেন তাহলে তিনি মনে কষ্ট পাবেন। এই কারণে তার ভালবাসার ভিত্তিতে তার সুপারিশ গ্রহণ করা। আর এটা আল্লাহর শান বিরোধী। এ ধরণের সুপারিশকারী কাউকে মনে করা শিরক ও নিরেট অজ্ঞতা। আর শাফায়াত বিল ওয়াজাহাতের অর্থ বর্ণনা করেন,যদি আল্লাহ তা’য়ালা তার নিকট কোন সম্মানিত বান্দার সুপারিশ কবূল না করেন তাহলে তাঁর ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। আর এটাও আল্লাহর শানের বিরোধী। (তকভীয়াতুল ঈমান গ্রন্থের সারসংক্ষেপ)
অথচ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদা এবং বিশ্বাস হলো শাফায়াত বিল ইয্ন শাফায়াত বিল মুহাববত, শাফায়াত বিল ওয়াজাহাত সবগুলোই আল্লাহর শানে উপযোগী, বিরোধী নয়। মূলত শাফায়াত বিল মুহাববত ও শাফায়াত বিল ওয়াজাহাত দু’টোই শাফায়াত বিল ইয্ন এর অমত্মর্ভুক্ত। আল্লাহ তা’য়ালা স্বয়ং পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থাৎ ‘‘হে মাহবুব! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও তাহলে আমারই অনুসরণ করো। তাহলে তোমাদেরকে আল্লাহ তাঁর মাহবুব বান্দা বানিয়ে নিবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা-আল-ইমরান-৩১)
যদি রাসূলের অনুসারীগণ আল্লাহর মাহবুবা হন তাহলে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী আল্লাহর মাহবুব হবেন না? অবশ্যই তিনি আল্লাহর মাহবুব ও প্রিয় বান্দা। এছাড়া স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ইরশাদ করেছেন- ‘‘আমার উপাধি হচ্ছে হাবীবুল্লাহ তথা আল্লাহর প্রিয় বন্ধু।’’
আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর মাহবুব ও পছন্দনীয় বান্দাদেরকে যেসব মর্যাদা দান করেছেন তন্মধ্যে অন্যতম হলো তাঁদের সুপারিশ কবূল করা এবং তাঁদের আবেদন মঞ্জুর করা। আর কবূল না করা বা মঞ্জুর না করার মধ্যে তাঁদের কোন কষ্ট বা দুঃখ নেই। কিন্তু ইহা তাঁদের সেই মুহাববত বা মর্যাদার বিপরীত, যা তিনি তাঁদেরকে দান করেছেন।
আল্লাহ স্বয়ং নিজেই হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেছেন, যখন আমি আমার বান্দাকে ভালবেসে ফেলি, তখন—ولئن سئلنى لاعطينه
অর্থাৎ ‘‘যদি আমার মাহবুব বান্দা আমার কাছে প্রার্থনা বা আবেদন করেন, তাহলে অবশ্যই অবশ্যই আমি তাঁকে তা প্রদান করি। (সহীহ বুখারী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা # ৯৬৩)
আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর সম্মানিত বান্দাকে এই মর্যাদা দান করেছেন যে, তিনি তাঁদের আবেদন কবূল করেন। আর যদি কবূল নাও করেন তাতে তাঁর কোন ক্ষতি বা ভয়ের আশংকা নেই। তবে এই সম্মানিত বান্দার ফরিয়াদ গ্রহণ না করাটা সেই মর্যাদা ও সম্মানের পরিপন্থী যা তিনি তাঁর মকবুল ও সম্মানিত বান্দাদেরকে দান করেছেন। যেমন-আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন-
وَجِيهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ
অর্থাৎ ‘‘হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের অমত্মর্ভুক্ত।’’ (সূরা-আল ইমরান-৪৫)
হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন- وَكَانَ عِنْدَ اللَّهِ وَجِيهًا
অর্থাৎ ‘‘তিনি (মূসা আঃ) আল্লাহ তা’য়ালার নিকট ইজ্জত ও সম্মানের অধিকারী ছিলেন।’’ (সূরা আহযাব-৬৯)
আর হযরত ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুব আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা পাক কালামে ঘোষণা করেন- وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ
অর্থাৎ ‘‘নিশ্চয় তারা আমার নিকট উত্তম পছন্দনীয় ও মনোনীত বান্দা।’’ (সূরা-ছোয়াদ-৪৭)
হযরত ঈসা, হযরত মূসা, হযরত ইব্রাহীম, হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়াকুব আলাইহিমুস সালাম যদি আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সম্মানিত, পছন্দনীয়, মনোনীত ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের আক্বা ও মাওলা হাবীবে খোদা নবীয়ে দোজাহান সরওয়ারে কায়েনাত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের চাইতে আরো বেশী সম্মানিত, মর্যাদাবান ও নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়ার অধিক হকদার। কারণ আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে নিজেই ঘোষণা দেন-
وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
অর্থাৎ ‘‘আপনার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ সবচেয়ে বেশী।’’ (সূরা নিসা: ১১৩)
অতএব উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত যে, হুযূর রহমতে আলম নূরে মুজাস্সাম শাফীউল মুযনেবীন সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজ হাশরে আল্লাহ তা’য়ালার অনুমতি সাপেক্ষে শাফায়াতের মহান মর্যাদার অধিকারী এবং তিনিই সর্বপ্রথম সুপারিশের দ্বার উম্মোচনকারী। আর তাঁরই মাধ্যমে অন্যান্য নবী-রাসূলগণ, শুহাদায়ে কেরাম,ওলামায়ে কেরাম, সালেহীন তথা আউলিয়ায়ে কামেলীন আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শান-মান বুঝার ও উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন এবং হাশরের দিবসে তাঁর সুপারিশ নসিব করুন। আমীন বিহুরমাতি হাবীবিকাল কারীম।

কুরআন-হাদিস বনাম আহলে হাদিস

কুরআন-হাদিস বনাম আহলে হাদিস
মুফতি মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান

মহান আল্লাহ মানবজাতিকে স্বভাবজাতভাবে মুকাল্লিদ বা অনুসরণকারী হিসেবে সৃষ্টি করে এ ধরাতে প্রেরণ করেন। ব্যক্তিগত, আর্থ-সামাজিক, ভূগৌলিক সর্বক্ষেত্রে তাদেরকে দেখা যায় অনুকরণকারী হিসেবে। ব্যক্তির এক দল আরেক দলের, এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের তাকলীদ বা অনুসরণ করেই চলছে। চেতনে অবচেতনে আমরা সকলে পরষ্পর থেকে কিছু না কিছু শিখতে থাকি। আমাদের সকল প্রকার উন্নতি-উৎকর্ষ এ অনুসরণেরই কাছে দায়বদ্ধ। কাজেই তাকলীদ থেকে পালানোর সুযোগ নেই। নেই কোন উপায় তাকলীদ ব্যতিত।
দুনিয়ার কাজে তাকলীদ যত প্রয়োজন, এর চেয়ে বেশি দরকার দীনের ক্ষেত্রে। তাই উম্মতের মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম হতে শুরু করে বর্তমান পর্যমত্ম বিনা মতভেদে এর উপর আমল চলমান। নবীজীর জীবদ্বশায় সাহাবায়ে কেরাম রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুকরণ এবং নবীজীর তিরোধানের পর সাহাবায়ে কেরাম, তাবী, তাবে তাবী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরাম একে অপরের অনুসরণ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় উম্মতের বিশ্বখ্যাত আলেমগণ বিশেষ করে ইমাম গায্যালী, ইমাম রাযী, ইমাম তিরমিযী, ইমাম তাহাবী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম ইবনে হুমাম, ইমাম ইবনে কুদামা, ইমাম কাজী আয়ায, ইমাম ইবনে হাযর আসকালানী, ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী, ইমাম কুসতালানী, মোল্লা আলী ক্বারী প্রমুখ এবং তাঁদের পূর্ববর্তী-পরবর্তী যুগের লক্ষ লক্ষ আলেমগন শরীয়তের জ্ঞানে পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও সর্বদা আইম্মায়ে মুজতাহিদগণের প্রদত্ত মতামতকে অনুসরণ করতেন। আর এ ধরণের অনুসরণ ও অনুকরণের নাম তাকলীদ।
উল্লেখ্য যে শরীয়তের সকল বিধান কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট ও সরাসরি উল্লেখ নেই। এ পর্যায়ের মাসয়ালাগুলোকে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত মূলনীতির আলোকে বের করা এবং অত্র মাসয়ালার শরয়ী হুকুম নির্ণয় করা উম্মতের ঐ সকল মুজতাহিদগণের কাজ, যারা আরবি ভাষা, আরবি অভিধান, পরিভাষা, শব্দ প্রয়োগ ও পন্থা সম্পর্কে পূর্ণ অবগতিসহ কুরআন-হাদিস সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ে পারদর্শী এবং তাকওয়া-পরহেযগারীর শীর্ষস্থানে উপনীত, যেমন- ইমাম আযম আবু হানিফা (রা:), ইমাম মালেক (রা:), ইমাম শাফেয়ী (রা:), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ। আল্লাহ তায়ালা উল্লিখিত ইমামগণের মধ্যে নবীযুগের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে সাহাবী, তাবী ও তাবে তাবীদের সাহচর্যের বরকতে শরীয়তের মূলনীতি ও উদ্দেশ্যবলী বুঝার এবং কুরআন-হাদিসে স্পষ্ট ও সরাসরিভাবে বর্ণিত আহকাম ও বিধান হতে অবর্ণিত আহকামগুলো ইজতিহাদ ও কেয়াসের মাধ্যমে হুকুম বের করার বিশেষ প্রতিভা ও যোগ্যতা দান করেছেন। যার ফলে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত চার মাযহাব বিশ্বের বুকে বেশি প্রচার-প্রসার ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ চার মাযহাবের উপর নির্ভরযোগ্য ও বিশ্ববরেণ্য ওলামায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেন এবং যুগ যুগ ধরে উক্ত মাযহাব মান্য ও অনুসরণ করে বিশ্বের সকল মুসলমান কুরআন-সুন্নার উপর আমল করত: সঠিক পথের পথিক হয়েছেন।
সাম্প্রতিককালে বৃটিশ যুগের উৎপাদন তথাকথিত আহলে হাদিস সালাফী সম্প্রদায়ের দাবী: মাযহাব মানা বা কোন ইমামের তাকলীদ কিংবা অনুসরণ শিরিক! চমৎকার ফতওয়া, যে ফতওয়া নিজের উপর বর্তায়। কারণ তারা ইমাম আযম আবু হানিফা (রা:) কে সহ্য করতে সমস্যা হলেও ইবনে তাইমিয়া, আব্দুল ওহাব নজদীসহ এ জাতীয় লোকদের শুধু তাকলীদ করেনা; বরং তাদের ভ্রামত্ম আক্বিদা প্রচার-প্রসারে আরামের ঘুমকে হারাম করতে একটু চিমত্মা ও করেনা। অথচ মুখে বলে আমরা কারও তাকলীদ করিনা। মুখে এক রকম কাজে ভিন্ন, এটা কিসের নিদর্শন? আশা করি পাঠকগণের বুঝতে কষ্ট হবেনা।
সদ্য প্রসূত লা-মাযহাবী তথাকথিত আহলে হাদিসগণ জোরগলায় বলে বেড়ায় তারা হাদিস ব্যতিত অন্য কারও কথা কিংবা আমল মানবে না। চাই এ আমল বা উক্তি আবু বকর ছিদ্দিক (রা:)’র হউক অথবা ফারুকে আযম (রা:)’র কিংবা হযরত উসমানগণি (রা:)’র অথবা শেরে খোদা আলী (রা:)’র হউক। উক্ত দাবীর দ্বারা তাদের মুখোশ উন্মোচিত হল। যারা খোলাফায়ে রাশেদীন, আশরায়ে মুবাশ্শারাহসহ লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামের হাদিস ও আমল মানেনা তাদের নাম আহলে হাদিস! নূরের নবীর ঘোষণা বনী ইসরাঈল বাহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে। আর একটি মাত্র দল জান্নাতী, সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের উত্তরে নবীজী ইরশাদ করেন- একটি মাত্র জান্নাতী দল হচ্ছে, যারা আমি এবং আমার সাহাবায়ে কেরামের তরিকার উপর প্রতিষ্ঠিত।১ যে দল সাহাবায়ে কেরামকে মাইন্যাস করে সরলপ্রাণ মুসলমানকে জান্নাতের পথ ব্যতিরেখে চির অশামিত্মর পথে আহবান করে তাদের ব্যাপারে এখন গভীরভাবে চিমত্মা করার সময় এসেছে।
কুপ্রবৃত্তির আনুগত্যে আক্রামত্ম তথাকথিত আহলে হাদিস এর দাবী ‘কুরআন হাদিসের তাকলীদ বলতে কিছুই নেই তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা-বানোয়াট বিভ্রামিত্মমূলক ও কুরআন হাদিসের পরিপন্থি। কুরআন-হাদিসে তাকলীদ বা অনুকরণের দৃষ্টামত্ম এবং এর উপর আমলের নির্দেশ রয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ এ নির্দেশকে গ্রহণ ও বরণ করে সাহাবায়ে কেরাম থেকে যুগ যুগ ধরে আল্লাহ ওয়ালার বিশেষ নেয়ামত প্রাপ্তবান্দা, আলেমে রাববানীগণসহ সকল মুসলিম উম্মাহ তাকলীদের উপর গুরুত্ব সহকারে আমল করেন। পরিতাপের বিষয় কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থি মাযহাব বিরোধী আহলে হাদিস নামধারী গোষ্ঠীর বক্তব্য ও আক্বিদাকে বিশ্বাস করে সহজ সরল ধর্মপ্রাণ মুসলমান আজ বিভ্রামিত্মর শিকার হয়ে নিজেকে তাগুতী পথে ঠেলে দিচ্ছে। লা-মাযহাবী আহলে হাদিসের এ বিভ্রামিত্মর অবসানকল্পে তাকলীদ বা ইমামের অনুসরণের প্রমাণ-দলিল ও গুরুত্ব সংক্ষেপে কুরআন-হাদিসের আলোকে প্রদত্ত হলঃ-
দলীল নং একঃ
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘‘মুমিন থেকে সকলে একসাথে বের হওয়া সঙ্গত নয়। সুতরাং প্রত্যেক দলের এক অংশ বের হোক যারা ধর্মের জ্ঞান অর্জন করতঃ ফিরে এসে স্বজাতিকে সতর্ক করবেন।২ অত্র আয়াতের আলোকে একদল থেকে কিছু সংখ্যক লোক ইলমে দ্বীনের জন্য বের হয়ে ধর্মের জ্ঞান অর্জন করে নিজ এলাকায় এসে কুরআন-হাদিসের মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞাত নয় এবং কুরআন-হাদিস থেকে সরাসরি শরীয়তের বিধান উৎঘাটন করতে অপারগ এমন লোকদেরকে বিজ্ঞ আলেমগণ শরয়ী বিধান শিক্ষা দেবেন এবং এ শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করে সর্ব সাধারণ গণ আমল করবেন। আর এটাই হচ্ছে তাকলীদ বা ইমামের অনুসরণ।
দলীল নং দুইঃ
‘‘যদি তোমাদের জ্ঞান না থাকে তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর’’।৩ এ আয়াত দ্বারা তাকলীদ বা ইমামের অনুসরণ করা ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। অত্র আয়াতে জ্ঞানবানদেরকে জিজ্ঞেস করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যা জানতে চাওয়া হয় আর তা মানতে হয় এটাই বুদ্ধিমানের কাজ, এটাই স্বাভাবিক।
দলীল নং তিনঃ
‘‘হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহ ও রাসূল এবং তোমাদের শাসকদের অনুগত হও।৪ অধিকাংশ তাফসীরকারকদের মতে অত্র আয়াতে ‘উলিল আমর’ দ্বারা মুজতাহিদগণ উদ্দেশ্য। ইমামের তাকলীদ করা এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত।
দলীল নং চারঃ
বুখারী শরীফে কিতাবুল হজ্জ অধ্যায়ে উল্লেখ রয়েছে। ‘‘হযরত ইকরিমা (রা:) হতে বর্ণিত মদিনা বাসীগণ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাসের (রা:) নিকট জিজ্ঞেস করেন, কোন মহিলা তাওয়াফে যিয়ারত করার পর ঋতুবর্তী হলে বিদায়ী তাওয়াফ না করে সে (নিজ দেশে) যেতে পারবে কিনা? হযরত ইবনে আববাস উত্তরে বললেন হ্যাঁ, যেতে পারবে। তারা বললেন, আমরা যায়েদ ইবনে ছাবেতের (রা:) উক্তি পরিত্যাগ করে আপনার ফয়সালা কিছুতেই গ্রহণ করবনা। ইবনে আববাস (রা:) বললেন তোমরা মদিনা গিয়ে উক্ত মাসয়ালা জেনে নেবে। তারা মদিনা শরীফ পৌঁছে উক্ত মাসয়ালা সম্পর্কে জানলেন।৫
অপর সূত্রে বর্ণিত আছে, যায়েদ ইবনে ছাবিত (রা:)’র উক্তি হচ্ছে এক্ষেত্রে বিদায়ী তাওয়াফ করা ব্যতিত মেয়েলোক যেতে পারবেনা। এর দ্বারা সুষ্পষ্টরূপে বুঝা যায়, মদিনাবাসীগণ হযরত যায়েদ বিন ছাবিতের ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ করতেন । এ কারণেই তাঁরা এই ব্যাপারে হযরত ইবনে আববাসের মত প্রখ্যাত সাহাবীর ফতওয়া গ্রহণ করেন নাই এবং তাঁর উক্তি ও ফতওয়াকে প্রত্যাখ্যান করার কারণ শুধু এতটুকু বর্ণনা করেন, তাঁর ফতওয়া হযরত যায়েদ বিন ছাবেতের ফতওয়ার বিপরীত ছিল। এদিকে ইবনে আববাস (রা:) তাদেরকে প্রতিবাদ স্বরূপ একথা বলেন নাই তোমরা ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ করে গুনাহ করছো।
দলীল নং পাঁচঃ
‘‘হযরত মা’য়ায ইবনে জাবাল (রা:) হতে বর্ণিত, নবীজী তাঁকে ইয়ামান দেশের বিচারক হিসেবে প্রেরণকালীন সময়ে জিজ্ঞেস করেন সেখানে গিয়ে পারষ্পরিক কর্মকান্ডের ফয়সালা কিরূপে করবে? হযরত মু’য়ায বললেন, আল্লাহ তায়ালার কিতাবে যা কিছু আছে তদানুযায়ী ফয়সালা করব। নবীজী বললেন, যদি কিতাবুল্লার মধ্যে ঐ বিধান পাওয়া না যায় তখন কি করবে? তিনি বললেন আল্লাহর নবীর সুন্নাত অনুযায়ী ফায়সালা করব। নবীজী বললেন যদি সুন্নাতের মধ্যে না পাও (তখন কি করবে)? তিনি উত্তরে বললেন নিজের রায় ও বিবেক দ্বারা ইজতিহাদ করব। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আল্লাহ তায়ালার শোকর যে, তিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে (ফতওয়া সঠিক নিয়ম-পদ্ধতির) তৌফিক দান করেছেন’’।৬
হযরত মু’য়ায ইবনে জাবাল (রা:) ইয়ামান দেশের লোকদের শুধু গভর্নর হয়ে গমন করেন নাই, বরং কাজী ও মুফতি হয়ে তাশরিফ নিয়ে ছিলেন। কাজেই ইয়ামানবাসীদের তার তাকলীদ ব্যতিত উপায়ামত্মর ছিল না। বস্ত্ততঃ ইয়ামানবাসীগণ শুধু তাঁরই ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ করতেন।
তাকলীদ বা ইমামের অনুসরণ সম্পর্কীত কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য দলিল রয়েছে যা ক্ষুদ্র পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর যাদের পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে, তাঁদের জন্য কুরআন-হাদিসের একটা প্রমাণই যথেষ্ট।
ভ্রামত্ম মতবাদের অধিকারী তথাকথিত আহলে হাদিস সম্প্রদায় গুটি কয়েক মাসয়ালা তথা নামাযে রফে ইয়াদাইন, ইমামের পিছনে উচ্চ স্বরে আমিন বলা ও কিরাত পড়া এবং নাভির উপর হাত বাঁধা নিয়ে হাদিসের দোহাই দিয়ে মুসলিম সমাজকে যে হারে বিভ্রামিত্ম করছে, তাদের মনে রাখা দরকার উক্ত মাসয়ালা সম্পর্কীত সহী হাদিস হানাফী আলেমগণের নিকট তাদের চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে।
বুখারী শরীফের দোহাই দিয়ে আহলে হাদিস নামধারী গোষ্ঠি সাধারণ মুসলমানকে গোমরাহীর দিকে টেনে নেওয়ার অপকৌশল করলেও মূলত: অন্যান্য হাদিস গ্রন্থসহ বুখারী শরীফকে প্রকৃত মর্মে তারা মানেনা। ইমাম বুখারী (রহ:) হাদিসের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেক ইমামের উক্তি পেশ করেছেন যা তাকলীদে পরিচায়ক। অতএব, কৃষ্ণাঙ্গ-নিগ্রোর দাবী সে কর্পূরের মত শুভ্র-শেতাঙ্গ; এটা যেমন মিথ্যা, তেমনি করে আহলে হাদিসের দাবী হাদিসের উপর একমাত্র তারা আমলকারী, সেটাও অসত্য, আসলে তারা হাদিসের উপর আমলকারী নয় বরং হাদিস বর্জনকারী, একটি ভ্রামত্ম দল ।
তথ্যসূত্রঃ

১। আবু দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ।
২। সূরা তাওবা আয়াত নং- ১২৩।
৩। সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং- ০৭।

৪। সূরা নিসা, আয়াত নং- ৫৯।
৫। বুখারী শরীফ ২য় খন্ড, ২৩৭পৃষ্টা।
৬। তিরমিযী- ১৩২৭, আবু দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ।

রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও আওলাদে রসূলের দরবারের আদব ও করণীয়

রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও আওলাদে রসূলের দরবারের আদব ও করণীয়
মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম

বিশ্বজাহানের সর্বশেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী সাইয়েদুল মুরসালীন খাতামুন নাবিয়্যিন হযরত মুহাম্মদ মুসত্মাফা আহমদ মুজতাবা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দরবার ছিল আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার অনুশীলনের এক মহান শিক্ষানিকেতন। স্বয়ং জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) যখন রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট ওহী নিয়ে এসে বসতেন তখন তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সম্মুখে অত্যমত্ম আদবের সাথে বসতেন। কিভাবে একজন মহা মানবের সম্মুখে বসতে হবে তা জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)আল্লার নির্দেশে বসে দেখিয়েছেন। বোখরী শরীফের হাদীসে জিবরাঈলে বসার এই আদব-কায়দা সম্পর্কে বিসত্মারিত উল্লেখ রয়েছে।
দরবারে নববীতে যাঁরা বসতেন তাঁরা বসার আদব শিখিয়েছেন। যারা দাঁড়াতেন তাঁরা আদবের সঙ্গে দাঁড়াতেন, যাঁরা কথা বলতেন তাঁরা আদবের সঙ্গে কথা বলতেন। যাঁরা নামায আদায় করতেন তাঁরা রাসূলের অনুসরণে নামায আদায় করতেন। এক কথায় মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মজলিসে ও শিক্ষালয়ে যাঁরা বসার, যাওয়ার ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অনুসারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মানুষ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পরশ ও ছোঁয়ায় তাঁরা এমনই ধন্য হয়েছেন যে, উম্মতের মধ্যে তদের তুলনা আর কারো সাথে হবে না। এই যখন উম্মতের শ্রেষ্ঠতম মানুষদের অবস্থা তাহলে যিনি বিশ্ব জাহানের মহামানব তাঁর শিষ্টাচার ও মাধুর্যতার কোন সীমা-পরিসীমা আছে কি? না তাঁর তূলনা কেবল তিনিই পৃথিবীতে তাঁর অদ্বিতীয় আর কেউ নেই।
যাঁরা তাঁর সরাসরি ঈমানদার পুরুষ ও মহিলা সাহাবী হওয়ার যোগ্যতা ও সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তাঁদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আসসাহাবী কান্নুজুম’ অর্থাৎ আমার সাহাবীগণ উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায়। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অবর্তমানে তাঁদের প্রত্যেকেই এক একটি জগতের দিশারীর মত। এই গুণাবলী তাঁরা অর্জন করেছেন কেবল দরবারে নববীতে বসার ও আসার সুযোগ পাওয়ার কারণে।
দরবারে নববীর আদর্শ ও শিষ্টাচার সম্পর্কে কুরআনুল করীমের সূরা হুজুরাতে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের এক মহান শিক্ষা বা তালিম দিয়েছেন। সূরা হুজুরাতের মধ্যে আলোচিত বিষয়গুলোতে মুসলমানদের সংশোধনের বিধান ও শিষ্টাচার নীতি ব্যক্ত হয়েছে। উক্ত বিষয়গুলো বনী তামীম গোত্রের কিছু লোকের রাসুলুল্লাহর দরবারে আগমনকে কেন্দ্র করে হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) এর মধ্যে সরাসরি নির্দেশনা এরুপঃ
‘‘হে মুমনিগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং একে অপরের সাথে যে ভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাঁর সাথে সেরুপ উচ্চস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না। যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অমত্মরকে শিষ্ঠাচারের জন্য পরিশোধিত করেছেন। তাঁদের অধিকাংশই অবুঝ। যদি তারা আপনার আসা পর্যমত্ম (উচ্চস্বরে ডাকাডাকি না করে) সবরের সাথে অপেক্ষা করতো তাহলে তাদের জন্য তা মঙ্গলজনক হতো। (সূরা হুজুরাত আয়াতঃ ১-৫)
কুরআনের এ বর্ণনাসমূহের কিঞ্চিত বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়গুলোর শিক্ষা আমরা পেতে পারি তা হলোঃ তোমরা আল্লাহর রসূলের অগ্রণী হয়ো না। এর অর্থ (১) তোমরা পথ চলার সময় রাসূলের আগে আগে চলো না, (২) কথা বলার সময় রাসূলের আগে কথা বলো না, (৩) কথা বা কাজে রাসূলের নির্দেশের অপেক্ষা কর; তিনি অনুমতি দিলে কিংবা জবাব দেওয়ার জন্য বললেই কেবল কথা বল বা কাজ কর; (৪) খাওয়ার মজলিসে কেউ যেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আগে খাওয়া আরম্ভ না করে; তিনি কাউকে অগ্রে পাঠাতে চাইলেই কেবল তিনি আদেশ প্রাপ্ত অগ্রে যাবেন। যেমন সফরে বা জিহাদে যাওয়ার নির্দেশ।
পরবর্তীতে এক কঠোর নির্দেশের মাধ্যমে ইরশাদ হয়েছেঃ ‘‘তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না’’। দরবারে নববীতে রাসূলের কণ্ঠস্বরের চেয়ে তোমাদের কণ্ঠস্বর বড় হলে তোমদের অজামেত্ম তোমাদের আমলসমূহ নষ্ট বা নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে। এর দ্বারা ওলামায়ে কিরামগণ বলেন যে, যদি এমন উচ্চকণ্ঠ বা অগ্রে চলার কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মনে ব্যথা হয় তাহলে আল্লাহতা’য়ালা তোমাদেরকে ঈমান ও আমলের তওফীক থেকে বঞ্চিত করবেন। ফলে কুফরীর দিকে চলে যাওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে। (নাউজুবিল্লাহ)
অতঃপর কিছু সংখ্যক অশিক্ষিত বেদুঈনের উদাহরণ দিয়ে দরবারে নববীতে ডাকাডাকির আদবও শিখানো হয়েছে। বেদুঈনরা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হুজরার সম্মুখে গিয়ে চেঁচামেচি আরম্ভ করে তাঁকে ডাকাডাকি শুরু করে। ফলে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটে। আল্লাহ ত’াআলা তৎক্ষণাত জানিয়ে দেন এই বলে- রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন বাসগৃহ অবস্থান করেন বা বিশ্রামরত থাকেন তখন বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তাঁকে ডাকাডাকি করা অসামাজিক ও মুর্খলোকদের কাজ। এটি কোন বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়।’’ এতো হলো রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জীবিতাবস্থায়র কথা। পরবর্তী সময়ের জন্যও আলিমগণ বলেন, তাঁর অবর্তমানে রওজা মুবারকের সম্মুখে গিয়েও উচ্চস্বরে সালাম, দরুদ ও দোয়া পড়ার ব্যাপারে নিষেধ করেছেন। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হায়াতুন নবী এটা আমাদের আকীদা। সেজন্য তাঁর রওজাতো বটেই যে কোন স্থানেই তাঁর শানে কথা বলা ও দরুদ সালাম পেশ করার সময় অবশ্যই তাজীমের সাথে করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আলিমগণ উসত্মাদ ও ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের ক্ষেত্রেও একই হুকুমের কথা বলেছেন। কেননা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ সকল শিক্ষা দিয়েছেন সাহাবায়ে কিরামগণকে। একদিনের ঘটনা-জনৈক সাহাবী হযরত আবু বকর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অগ্রে হাঁটছেন তখন তিনি তাকে এই বলে বারন করলেন যে, ‘‘আবু বকর আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তুমি চলার সময় তাঁর অগ্রে চলো না’’। আলোচ্য বিষয় দ্বারা ওলামায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মর্যাদাবান ও ওলী বুযুর্গ ওসত্মাদ এবং সম্মানিত মুরববীদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে। তার আমল নষ্টের ব্যাপারটি শুধু আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মনে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হলেও উম্মতের পরবর্তী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের সাথে আদব ও শিষ্টাচার রক্ষার ব্যাপারটি বিধিবদ্ধ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। এ ধরনের আচরণ আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন না। শামিত্ম-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সুসভ্য জাতি গঠনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মানুষের সৃষ্টিলগ্নেই আল্লাহ ত’াআলা মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন আদব ও শিষ্টাচার অর্জনের। কারণ, আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে শয়তান আল্লাহ তা’আলার সংগে অহংকারীভাব প্রদর্শন ও বেআদবী করার ফলে সে আল্লাহর রহমত ও ফজল থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। এ প্রসংগে কবি বলেন, ‘‘আজ খোদা খাহিমে তওফিকে আদব, বেআদব মাহরুমে গাসত্ম আজ ফজলে রব’’ অর্থাৎ মহান আল্লাহর দরবারে আদব ও শিষ্টাচার এর তওফিক চাই, কেননা বেআদব (শয়তান) আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘যাকে কোমলতা ও শিষ্টাচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাকে সব রকমের কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত করা হয়েছে’’। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন, ‘‘সত্যিকার মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ক্রোধকে হজম করে এবং লোকদের সাথে ক্ষমার নীতি অবলম্বন করে চলে। আল্লাহ এ ধরনের মুহসিন তথা সংকর্মশীলদের ভালবাসেন’’। (সূরা : আলে ইমরান)
এবার প্রবন্ধের মূল শিরোনামের সাথে সম্পর্ক যুক্ত হাদীসের আলোকে একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া হলো-একবার হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত আলী (রা) এক সাথে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সংগে সাক্ষাত করার জন্য তার বাসভবনে (হুজুরায়) যান। তাঁরা গিয়ে দেখলেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হুজুরার দরজা মোবারক বন্ধ। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দু’জন ঘনিষ্ঠ সাহাবীর মধ্যে আপোসে এমন যুক্তি-তর্কের আলোচনা শুরু হয়, যা দরবারে নববীর আদব ও মর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক ও দৃষ্টামত্ম হিসেবে অতুলনীয়।
প্রথমে আলোচনার সূত্রপাত করেন হযরত আবূ বকর (রা)। তিনি হযরত আলী (রা) কে বলেন, এখন আমরা জানি না যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি অবস্থায় হুজুরার মধ্যে আছেন, তিনি হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছেন। এমতাবস্থায় আমরা কি করতে পারি? হ্যাঁ আমি একটা প্রসত্মাব করছি-আপনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দরজায় কড়া নাড়ুন, কেন না আপনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রিয় জামাতা। যদি তিনি বিশ্রামেও থাকেন আপনি তাঁর দরজা নাড়লে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিরক্ত হবেন না।
প্রতি উত্তরে হযরত আলী (রা) হযরত আবূ বকর (রা) কে বললেন: না রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দরজায় আপনি আওয়াজ করুন। কেননা আপনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বাল্য বন্ধু। সুতরাং আপনার আওয়াজে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিরক্ত হবেন না। এবার হযরত আবূ বকর (রা) হযরত আলী (রা) কে বললেন: আপনি যদি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হুজুরার দরজায় নাড়া দেন তাহলে তিনি রাগ করবেন না। কেননা আপনি তাঁর চাচাত ভাই, আপনাকে তিনি খুবই ভালবাসেন। এবার হযরত আলী (রা) তাঁকে বললেন-না আপনি দরজায় আওয়াজ করুন তাহলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নারাজ হবেন না, কেননা আপনি সর্ব প্রথম ইসলাম কবুল করেছেন। আপনার মর্যাদা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট অত্যধিক। সুতরাং আপনি একাজ করুন।
হযরত আবু বকর (রা) হযরত আলী (রা) কে বললেন-আপনিতো যুবকদের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলাম কবুল করেছেন। সুতরাং আপনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দরজায় নক করলে তিনি রাগাম্বিত হবেন না। এবার হযরত আলী (রা) তাঁর জবাবে বললেন-হে সম্মানিত আবু বকর (রা) আপনি সেই ব্যক্তি যাঁকে হিজরতের সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সংগে নিয়েছিলেন। গারেসুরের আপনি রাসুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথী। সুতরাং আপনি যদি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দজায় আওয়াজ করেন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নারাজ হবেন না।
হযরত আবু বকর (রা) হযরত আলী (রা) কে বললেন- হে আলী! আপনি সেই মহান ব্যক্তি যাকে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হিজরতে যাওয়ার প্রাক্কালে কুরাইশদের সকল আমানতের জামিনদার করে রাসূলের বিছানায় শুইয়ে রেখে গিয়েছিলেন। সুতরাং আপনি যদি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দরজায় আওয়াজ করেন তাহলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাখোশ হবেন না। উক্ত যুক্তির আলোকে হযরত আলী (রা) বললেন- হে মহান নেতা হযরত আবু বকর (রা)! আপনি সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর রসূল (সাল্ললাল্ললাহু আলাইহি ওয়াসাল্ললাম) এর জিহাদের জন্য সম্পদ চাওয়ার সাথে সাথে আপনার সমস্ত সম্পদ তাঁর দরবারে হাজির করেছিলেন। সুতরাং আপনি রসূলে করিম (সাল্ললাল্ললাহু আলাইহি ওয়াসাল্ললাম)কে ডাকলে বা দরজায় আওয়াজ করলে তিনি নাখোশ হবেন না। প্রতিউত্তরে হযরত আবু বকর (রা) বললেন আপনাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেরে খোদা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। সুতরাং আপনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে ডাকলে বা দরজায় আওয়াজ করলে তিনি নাখোশ হবেন না। প্রতিউত্তরে হযরত আলী (রা) বললেন-আবু বকর (রা) আপনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দরজায় নক করলে তিনি মনে কষ্ট নিবেন না। কারণ আপনার উপাধি হলো ‘সিদ্দীক’।
এবার হযরত আবু বকর (রা) বললেন-আপনি একাজটি করতে পারেন। তা হলে আল্লাহর রাসূল নারাজ হবেন না। কেননা তিনি আপনার সম্পর্কে বলেছেন যে, আমি যদি ইলমের শহর হই তাহলে সে শহরের দরজা হচ্ছে আলী। এভাবে তাঁদের দুজনের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ পর্যমত্ম কথোপকথন চলছিল। কিন্তু কেউ রাসূল (রা) এর দরজায় আওয়াজ দিতে সম্মত হননি। অর্থাৎ তাদের কেউ এ দায়িত্ব্ নিতে চান না যে, দরজা নাড়ালে যদি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটে। অবশেষে কেউ আর দরজার কড়ায় নাড়া দিলেন না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এরপর বিশ্রাম শেষে বের হয়ে আসলেন।
উপরিউক্ত কুরআন-হাদীস ও ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষনীয় ঘটনাবলীর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দরবারে নববী তথা আওলাদে রাসূলের দরবারে আগমন করা যেমন একটি পূণ্যময় কর্ম, যা আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন জগতে নাজাতের উছিলা হবে, এতে কোন প্রকার সন্দেহ থাকলে ঈমানহারা হবে। রসূলের দরবারে এসে বিশৃঙ্খলা ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা, উচ্চ আওয়াজে কথা বলা, সমাজকে ঘোলাটে করা, দরবারের আমানত জেনে-শুনে খেয়ানত করার অর্থই হলো সমসত্ম আমল বিনষ্ট হওয়া। এককথায় উভয় জাহানের সমসত্ম আমল বরবরাদ হয়ে জাহান্নামের স্থায়ী ঠিকানা গ্রহণ করা। প্রসঙ্গত, সম্মানিত পাঠক বৃন্দকে বলা-‘‘আমরা শেষ জামানার উম্মত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে দেখিনি, তার দরবারে বসার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি, তথাপি আমরা আওলাদে রসূলকে পেয়েছি। আওলাদের রসূলের দরবার পেয়েছি। সুতরাং তার আদব ও শিষ্টাচার যথাযথভাবে প্রদান করে আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনেক ধন্য করব। রসূল করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে যদি মানতেই হয় তাহলে আওলাদে রসূলের দরবারকে যথার্থ মর্যাদা প্রদান করে আসতে হবে। মহান আল্লাহ রববুল আলামিন বলেন. قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌঅর্থাৎঃ ‘‘হে হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও তাহলে আমার আনুগত্য কর, এটাই হল আল্লাহর ভালবাসা। আর আল্লাহ তোমাদে সকল পাপ মার্জনা করবেন, তিনি অতীব ক্ষমাশীল-অত্যমত্ম দয়ালু’’।
এই আয়াতে কারিমার রেশ ধরে বলতে চাই- কি পরিমাণ মর্যাদা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সাহাবায়ে কিরাম দিতেন। দরবারে নববীতে পিন পতন নীরবতা বিরাজ করত। সমগ্র বিশ্বে ইসলামের বাণী পৌছানো, মাত্র ১০ বছরে ৮২টি যুদ্ধ করা, তৎকালীন পারস্য ও রোম সম্রাটসহ সকল সম্রাটের নিকট দাওয়াত পৌঁছানো এবং সমগ্র আরব জাহান জয় করার এক বিশাল দায়িত্ব পালনের হেডকোয়াটার মসজিদে নববী হলেও সেখানে কোন হট্টগোল বা বিশৃঙ্খলার নজির নেই। এমন একদল কর্মীবাহিনী তিনি তৈরি করেছিলেন যাদের মধ্যে ছিল শ্রবণ ও আনুগত্য করার বৈশিষ্ট্য। এজন্যই তাঁরা বিশ্বকে জয় করতে পেরেছিলেন। তাই দরবারে নববীর যে মর্যাদা, আদব ও শিষ্টাচার তা সাহাবয়ে কিরামের আচরণের মাধ্যমে জগৎবাসীর জন্য উজ্জ্বল নিদর্শন ও শিক্ষণীয় হয়ে রয়েছে। এ শিক্ষাগুলো সোনার মানুষ তৈরির জন্য একামত্ম প্রয়োজন। একমাত্র দরবারে নববীর আদর্শ এবং সাহাবয়ে কিরামের আদব ও শিষ্টাচার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলে কিয়ামত পর্যমত্ম ভাল মানুষ গড়া সহজ ও সম্ভব। কিন্তু আজকাল মুসলিম সমাজের এক ভিন্ন ও ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখতে পাই। আজ পিতা-মাতা, মুরববী, উসত্মাদ, উলামা-মাশয়েখ কারও কোন কদর নেই। আদব ও শিষ্টাচার এর মনে হয় বিলুপ্তি ঘটেছে। সর্বদা লাঞ্ছিত হচ্ছে যুবকদের হাতে মুরববী ও গুণীজন। তাই আজ পুনরায় দরবারে নববী ও আওলাদে রাসুলের দরবারের সেই আদব ও শিষ্টাচারের শিক্ষা তুলে ধরতে হবে সকলের নিকট। তাহলে কিছুটা হলেও অবক্ষয় থেকে রক্ষা পাবে আমাদের সমাজ।
তথ্য সূত্রঃ
ক) কানযুল ইমান (বঙ্গানুবাদ)
খ) ইসলামের ইতিহাস
গ) ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত বিভিন্ন ম্যাগাজিন