সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়ম

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়ম!!!

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়মঃ সালাতুত তাসবিহ হাদীস শরীফে ‘সালাতুত তাসবীহ’ নামাযের অনেক ফযীলত বর্ণিত আছে। এই নামায পড়লে পূর্বের গুনাহ বা পাপ মোচন হয় এবং অসীম সওয়ার পাওয়া যাবে। রাসূলুল্লাহ সালল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা হযরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুকে এই নামায শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, এই নামায পড়লে আল্লাহ আয-যাওযাল আপনার আউয়াল আখেরের সগীরা কবীরা জানা অজানা সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।
তিনি বলেন, চাচা জান ! আপনি যদি পারেন, তবে দৈনিক একবার করে এই নামায পড়বেন। যদি দৈনিক না পারেন, তবে সপ্তাহে একবার পড়বেন। যদি সপ্তাহে না পারেন, তবে মাসে একবার পড়বেন। যদি মাসে না পারেন, তবে বছরে একবার পড়বেন। যদি এটাও না পারেন, তবে সারা জীবনে একবার হলেও এই নামায পড়বেন ।
সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়মঃ চার রকাত । প্রতি রকাতে সূরা ফাতিহার পর, যে কোন সূরা পড়তে পারেন। তবে এই নামাযে বিশেষত্ব এই যে, প্রতি রকাতে ৭৫ বার করে, চার রকাতে মোট ৩০০ বার তাসবীহ পড়তে হবে।
তাসবীহঃ سُبْحاَنَ الله وَالْحَمدُ للهِ وَلآَ اِلَهَ اِلاَّاللهُ وَاللهُ اَكْبرُ উচ্চারণঃ সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।
@ ১ম রাকাত এ সানা পড়ার পরে তাসবীহ টি ১৫ বার পড়তে হবে
@ তারপর স্বাভাবিক নিয়মে সুরা ফাতিহা ও অন্য আরেকটি সুরা অথবা অন্তত তিন আয়াত পড়ার পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।
@ এরপর রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবীহ পরার পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে
@ এরপর রুকু হতে দাড়িয়ে গিয়ে “রাব্বানা লাকাল হামদ” পড়ার পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।
@ এরপর সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।
@ প্রথম সিজদা থেকে বসে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।
@ এরপর আবার সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।
@ তারপর একই ভাবে ২য় রাকাত পড়তে হবে, ( সুরা ফাতিহা পড়ার আগে তাসবীহ টি ১৫ বার পড়তে হবে ।)
@ অতপর ২য়রাকাত এর ২য় সিজদার পর “আত্তহিয়্যাতু…”, দরুদ আর দোয়া পড়ার পরে সালাম না ফিরিয়ে , ২য় রাকাত এর মতো ৩য় এবং ৪থ রাকাত একই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে (তাসবীহ টি ১৫ বার পড়ে স্বাভাবিক নিয়মে সুরা ফাতিহা ও অন্য আরেকটি সুরা পড়তে হবে) ।
কোন এক স্থানে উক্ত তাসবীহ পড়তে সম্পূর্ণ ভুলে গেলে বা ভুলে নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে কম পড়লে পরবর্তী যে রুকনেই স্মরণ আসুক সেখানে তথাকার সংখ্যার সাথে এই ভুলে যাওয়া সংখ্যাগুলোও আদায় করে নিবে। আর এই নামাযে কোন কারণে সাজদায়ে সাহু ওয়াজিব হলে সেই সাজদা এবং তার মধ্যকার বৈঠকে উক্ত তাসবীহ পাঠ করতে হবে না। তাসবীহের সংখ্যা স্মরণ রাখার জন্য আঙ্গুলের কর গণনা করা যাবে না, তবে আঙ্গুল চেপে স্মরণ রাখা যেতে পারে।

সালাতুস তাসবিহ নামাজের গুরুত্ব ও পড়ার নিয়মাবলী

যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর হুকুম এবং নবীজীর সুন্নত মোতাবেক ছিল। তারা সত্যিই আল্লাহর দরবারে নিজেদের অপরাধী, গুনাহগার, জালেম মনে করতেন। গ্রহণ করতেন তারা গুনাহ মাফের কার্যকরী পন্থা। তাই তো হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ প্রতি শুক্রবার এই নামাজ আদায় করতেন। হজরত আবু জাওযা রহঃ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রতিদিন জোহরের আজানের পর জামাত শুরু হওয়ার আগে সালাতুত তাসবিহ পড়তেন।সালাতুত তাছবীহ অত্যম্ত ফযীলতপূর্ণ নামায। এই নামাযে তিন শতবার তাছবীহ পাঠ করা হয়, তাই এই নামাজকে সালাতুত তাছবীহ বলা হয়। হাদীসে আছে, এই নামায পড়লে আল্লাহ পাক, আপনার আগের-পাছের, পুরাতন-নতুন,ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত, ছোট- বড়, গোপনে করা বা প্রকাশ্যে করা- যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দিবেন। এই নামায সম্ভব হলে দৈনিক একবার, তা না হলে সপ্তাহে একবার, তা না হলে মাসে একবার, যদি তাও না হয় বছরে একবার পড়া উচিত। যদি এটাও সম্ভব না হয় তাহলে জীবনে একবার হলেও নামাযটা পড়ে নিবেন । বিখ্যাত ওলামায়ে কেরামদের মতে,বিপদ-আপদ এবং চিন্তার অবসানের জন্য সালাতুত তাছবীহের চেয়ে কার্যকরী আমল আর নেই।

***কিভাবে সালাতুল তাসবীহ পড়তে হয়?***

>>জাওয়াল, সুর্যাস্ত, সূর্যোদয় , নামায এর জন্য নিষিদ্ধ ও মাকরুহ সময় বাদে দিন অথবা রাতের যেকোন সময় একবারে চার রাকাত এ এই নামায আদায় করতে হয়। কিন্তু যোহরের আগে পড়াকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।(ফাত্বয়াহ আলামগীন)

>>সালাতুল তাসবীহ তে যে তাসবীহ পড়তে হবেঃ

“সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার”

>>বিস্তারিত নিয়মঃ

নিম্নোক্ত উপায়ে পুরো চার রাকাত এ মোট ৩০০ বার উপর্যুক্ত তাসবীহ পড়তে হবে>

# ১ম রাকাত এ সানা পড়ার পরে তাসবীহ টি ১৫ বার পড়তে হবে

# তারপর স্বাভাবিক নিয়মে সুরা ফাতিহা ও অন্য আরেকটি সুরা অথবা অন্তত তিন আয়াত পড়ার পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।

# এরপর রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবীহ পরার পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে

# এরপর কিয়াম এ গিয়ে “রাব্বানা লাকাল হামদ” পড়ার পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।

# এরপর সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।

# প্রথম সিজদা থেকে বসে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।

# এরপর আবার সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পরে তাসবীহ টি ১০ বার পড়তে হবে ।

# তারপর একই ভাবে ২য় রাকাত পড়তে হবে, কিন্তু ২য় রাকাত এ সুরা ফাতিহা পড়ার আগে তাসবীহ টি ১৫ বার পড়তে হবে ।

# অতপর ২য়রাকাত এর ২য় সিজদার পর “আত্তহিয়্যাতু…”, দরুদ আর দোয়া পড়ার পরে সালাম না ফিরিয়ে , ১ম রাকাত এর মতো ৩য় রাকাত শুরু করতে হবে(তাসবীহ টি ১৫ বার পড়ে স্বাভাবিক নিয়মে সুরা ফাতিহা ও অন্য আরেকটি সুরা পড়তে হবে) একই প্রক্রিয়া পরবর্তী ২রাকাত শেষ করতে হবে।

[আবু দাউদ ও তিরমিযী]

সালাতুত তাসবিহ

সালাতুত তাসবিহ
মাইমুনা আক্তার তাছলিমা
সালাত মানে নামাজ আর তাসবিহ মানে তাসবিহ পাঠ করা তথা সুবহানাল্লাহ (হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র) বলা। সালাতুত তাসবিহর নামাজ চার রাকাত। যেহেতু এ নামাজে বিশেষ তাসবিহ নির্ধারিত নিয়মে নির্দিষ্ট সংখ্যায় পাঠ করা হয়, তাই এ নামাজের নাম হয়েছে সালাতুত তাসবিহ বা তাসবিহর নামাজ। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত নবী করিম (সা.) একদা তাঁর চাচা হজরত আব্বাস (রা.) কে বললেন, ‘চাচাজান, আমি কি আপনাকে এমন একটি আমলের সন্ধান বলে দেব না, যা পালন করলে আল্লাহ তায়ালা আপনার আগের ও পরের, নতুন ও পুরনো, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত, প্রকাশ্য ও গোপনীয়, সগিরা ও কবিরা সব গোনাহ মাফ করে দেবেন? আর সে আমলটি হলো, আপনি চার রাকাত সালাতুত তাসবিহ নামাজ পড়বেন। সম্ভব হলে আপনি প্রতিদিন একবার করে এ নামাজ পড়বেন, যদি তা না পারেন প্রত্যেক জুমার দিন একবার এ নামাজ পড়বেন, আর যদি তাও না পারেন তাহলে বছরে একবার পড়বেন, তাও যদি সম্ভব না হয় তবে সারা জীবনে অন্তত মাত্র একবার হলেও এ নামাজ পড়বেন। এ নামাজ পাঠে জীবনের সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়।’ (কানজুল উম্মাল ও বায়হাকি)। বৃহস্পতিবার দিবাগত (জুমার) রাতে অথবা জুমার দিন কাবলুল জুমার নামাজের আগে পড়া উত্তম।

সালাতুত তাসবিহ আদায়ের নিয়ম : চার রাকাত সালাতুত তাসবিহ সুন্নাত বা নফল নামাজের নিয়ত করে এর প্রত্যেক রাকাতে সূরা (ফাতেহা) পাঠের আগে ১৫ বার এবং সূরা (কেরাত) পাঠের পর ১০ বার নিম্নোক্ত দোয়া (তাসবিহ) পড়ে রুকুতে যাবেন। তৎপর রুকুর তাসবিহর পর ১০ বার, রুকু থেকে দাঁড়িয়ে ১০ বার, প্রথম সেজদার তাসবিহর পর ১০ বার, প্রথম সেজদা থেকে উঠে বসে (দুই সেজদার মধ্যখানে) ১০ বার, দ্বিতীয় সেজদার তাসবিহর পর ১০ বার। এভাবে প্রত্যেক রাকাতে ৭৫ বার পড়া হবে। এরূপে চার রাকাত নামাজে মোট ৩০০ বার ওই তাসবিহ পড়ে নামাজ সম্পন্ন হবে।

সালাতুত তাসবিহর দোয়া : ‘সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদু লিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।’ অর্থ, আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আল্লাহ মহান।

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়ম

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়মঃ সালাতুত তাসবিহ হাদীস শরীফে ‘সালাতুত তাসবীহ’ নামাযের অনেক ফযীলত বর্ণিত আছে। এই নামায পড়লে পূর্বের গুনাহ বা পাপ মোচন হয় এবং অসীম সওয়ার পাওয়া যাবে। রাসূলুল্লাহ সালল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা হযরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুকে এই নামায শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, এই নামায পড়লে আল্লাহ আয-যাওযাল আপনার আউয়াল আখেরের সগীরা কবীরা জানা অজানা সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।

তিনি বলেন, চাচা জান ! আপনি যদি পারেন, তবে দৈনিক একবার করে এই নামায পড়বেন। যদি দৈনিক না পারেন, তবে সপ্তাহে একবার পড়বেন। যদি সপ্তাহে না পারেন, তবে মাসে একবার পড়বেন। যদি মাসে না পারেন, তবে বছরে একবার পড়বেন। যদি এটাও না পারেন, তবে সারা জীবনে একবার হলেও এই নামায পড়বেন ( তবু ছাড়বোন না)।

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়মঃ চার রকাত । প্রতি রকাতে সূরা ফাতিহার পর, যে কোন সূরা পড়তে পারেন। তবে এই নামাযে বিশেষত্ব এই যে, প্রতি রকাতে ৭৫ বার করে, চার রকাতে মোট ৩০০ বার তাসবীহ পড়তে হবে।

তাসবীহঃ سُبْحاَنَ الله وَالْحَمدُ للهِ وَلآَ اِلَهَ اِلاَّاللهُ وَاللهُ اَكْبرُ উচ্চারণঃ সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। প্রথমে দাড়িয়ে চার রকাতের নিয়্যাত করে, ছানা, তা’উয ও তাসমিয়া পড়ার পড়ে ১৫ বার তাসবীহ অতপর, সূরা ফাতিহার পড়ে, যে কোন একটি সূরা পড়ে দাড়ানো অবস্থায় ১০ বার তাসবীহ অতপর, রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবীহ পড়ে , রুকুঅবস্থায় ১০ বার তাসবীহ অতপর, রুকু হতে উঠে দাড়ানো অবস্থায় ১০ বার তাসবীহ অতপর, ১ম সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পড়ে, সিজদা রতঅবস্থায় ১০ বার তাসবীহ অতপর, সিজদাহ হতে উঠে বসাঅবস্থায় ১০ বার তাসবীহ অতপর, ২য় সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ পড়ে, সিজদারত অবস্থায় ১০ বার তাসবীহ।

এই ভাবে প্রথম রকাত শেষ করে , বাকি তিন রকাত নামাজ শেষ করতে হবে।

প্রশ্নোত্তর – আল্লামা মুফ্তী সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান

প্রশ্নোত্তর

আল্লামা মুফ্তী সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান

 মুহাম্মদ মুনির উদ্দীন
আ’লা হযরত বুক ফাউন্ডেশন, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন:সিহাহ্ সিত্তা গ্রন্থের ইমামগণের ওফাতের হিজরী সন বর্ণনা ও ইমামগণকে কোন গ্রন্থ লিখেছেন যদি তা বর্ণনা দেন তাহলে উপকৃত হব।

 উত্তর: অসংখ্য হাদীস গ্রন্থের বিখ্যাত ছয়টি হাদীস-এ রাসূল এর গ্রন্থ রয়েছে যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও জনপ্রিয়। আর এই ছয়টি গ্রন্থকে একত্রে ‘সিহাহ সিত্তা’ বলা হয়। এগুলো যথাক্রমে: ১. সহীহ বুখারী শরীফ কৃত: ইমামদ্দুনিয়া ফিল্ হাদিস ইমাম আবু আবদুল্লাহ্ মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বিন ইব্রাহীম বিন মুগীরা বিন বরদীজবাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি। জন্ম: ১৩ শাওয়াল ১৯৪ হিজরি, জুমার দিন। তিনি ঈদুল ফিতরের চন্দ্ররাতে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে ইন্তেকাল করেন ২৫৬ হিজরিতে। বুখারাতে তাকে দাফন করা হয়।
২. সহীহ মুসলিম শরীফ কৃত: ইমাম মুসলিম বিন হাজ্জাজ আল্ কোশায়রী রহমাতুল্লাহি আলায়হি। জন্ম: ২০৪ হিজরিতে ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ইন্তেকালের দিন, তিনি ৫৫ বছর বয়সে ২৫ রজব ২৫৯ হিজরি রবিবার বিকালে ইনতেকাল করেন।
৩. সুনানে নাসায়ী শরীফ কৃত: ইমাম আহমদ বিন আলী বিন শোয়াইব নাসায়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর জন্ম ২১৫ হিজরিতে খোরাসানের ‘নাসা’ নামক স্থানে। তিনি ১৩ সফর বা শাবান, ৩০৩ হিজরি সনের সোমবার দিন মক্কায় ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। অনেকের মতে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাকে দাফন করা হয়।
৪. সুনানে আবি দাউদ কৃত: হযরত ইমাম সোলাইমান বিন আশআস সিজিসতানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি। তিনি কান্দাহারের নিকটবর্তী ‘সিজিসতান’ নামক স্থানে ২০২ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৫ শাওয়াল শুক্রবার ২৭৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।
৫. জামে তিরমিজি কৃত: আবু ঈসা মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন ছাওরাহ্ আত্ তিরমিযী রহমাতুল্লাহি আলায়হি। তিনি বলখের তিরমিয নামক স্থানে ২০০ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। হিজরি সনের ১৩ রজব, সোমবার তিরমিয শহরে তিনি ইন্তেকাল করেন।
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ্ কৃত: আবু আবদুল্লাহ্ মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ বিন আবদুল্লাহ্ বিন মাজাহ্ আল্ কায্বীনি রহমাতুল্লাহি আলায়হি। তিনি ২০৯ হিজরিতে দায়লাস অঞ্চলে কাজবীন নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ২২ রমজান ২৭৩ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। এটাই প্রসিদ্ধ অভিমত। তবে হাদিস বিশারদগণের মধ্যে কেউ কেউ হাদিসের প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য ছয়টি গ্রন্থ সিহাহ সিত্তার মধ্যে সুনানে ইবনে মাজার স্থলে অন্য কিতাব কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
[তারিখে ইলমে হাদিস তথা হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাস কৃত: আল্লামা মুফতি আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদী বরকাতী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও মুকাদ্দামায়ে মেশকাত কৃত: আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইত্যাদি]

 মুহাম্মদ রিদওয়ানুল করিম (সোহেল)
বিএমএ গেইট, ভাটিয়ারী, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন: একজন সুন্নি ব্যক্তির অজানতে ভ্রান্ত আক্বীদার ইমাম আক্বদ পরিচালনা করেছে। কিন্তু পরে জানতে পারে ঐ ইমাম ভ্রান্ত আক্বীদার অনুসারী। এ আক্বদ শুদ্ধ হবে কিনা? ক্বোরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে দলীল সহকারে জানালে উপকৃত হব।

 উত্তর: ভ্রান্ত ও বাতিল আক্বীদার অনুসারী ইমাম ও খতিবের মাধ্যমে জেনে শুনে নিকাহ্/ আক্বদের অনুষ্ঠান পরিচালনা করবে না। নিকাহ্/আক্বদ প্রিয় নবী সরওয়ারে দু’আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মহান ও পবিত্রতম সুন্নাত। ভ্রান্ত ও বাতিল আক্বীদার অনুসারী ইমাম ও খতিবের মাধ্যমে জেনে শুনে নিকাহ্ বা আক্বদ পরিচালনা করলে রহমত ও বরকত নাযিল হবে না। তদুপরি ভ্রান্ত ও বাতিলের মাধ্যমে আক্বদ/ নিকাহ্ পরিচালনা করার অর্থ হলো তাদের সম্মান করা। আর তাদের কে সম্মান করা হারাম এবং তাদের ভ্রান্ত ও কুফরী আক্বীদাকে সমর্থন করার নামান্তর। উল্লেখ্য যে, কুফরী আক্বীদাকে সমর্থন করাও কুফরী। তবে কনের পে উকিল ও স্বাীদের মাধ্যমে ইজাব-কবুল তথা নিকাহ্ অনুষ্ঠিত হলে আক্বদ শুদ্ধ হয়ে যাবে। অবশ্য উত্তম পন্থা হল এ ধরনের আক্বদ হক্কানী-সুন্নি আলেমের পরিচালনায় পুনরায় আয়োজন করা।

 মীর মুহাম্মদ আসলাম উদ্দীন
পাহাড়তলী, রাউজান, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন: বিভিন্ন মাহফিলে ওলামায়ে কেরামগণ বলে থাকেন পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশী। তবে এটা বলা হয় না যে, সন্তানের প্রতি মা-বাবার কারণীয় কি? এতে করে গ্রামের অধিকাংশ মা-বাবা বুঝে থাকেন ছেলে মেয়ে জন্ম দিয়েছি এতেই আমাদের দায়িত্ব শেষ। এখন ছেলে মেয়েরাই আমাদের জন্য সব কিছু করবে। না হয় আল্লাহর গজব পড়বে ইত্যাদি বদ-দোয়া করেন। এতে অনেক ছেলে মেয়ে সঠিক নির্দেশনার অভাবে নষ্ট হয়ে য়ায়। মানুষ হতে পারে না। আমার প্রশ্ন হল, মা-বাবার প্রতি সন্তানদের এবং সন্তানদের প্রতি মা-বাবার দায়-দায়িত্ব কি? ক্বোরআন হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করলে উপকৃত হবো।

 উত্তর: মা-বাবা সন্তানের জন্য বড় নেয়ামত তেমনি ছেলে সন্তান ও পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর প থেকে বড় নেয়ামত। তাই ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক মা-বাবার প্রতি যেভাবে ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। তদ্রƒপ ছেলে-মেয়ের প্রতি মা-বাবারও কর্তব্য ও দায়িত্ব রয়েছে।
যেমন পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ করেন-
وقضى ربك الا تعبدوا الا أياه وبالوالدين احسانا-
অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক চূড়ান্ত বিধান ও ফায়সালা দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবেনা এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। [সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত ২৩]
আল্লাহ্ তা‘আলা আরো এরশাদ করেন-
اما يبلغن عندك الكبر احدهما او كلاهما فلا تقل لهما افٍّ ولاتنهرهما وقل لهما قولا كريمأ-
অর্থাৎ তাদের (মা-বাবার) মধ্যে কোন একজন অথবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধ্যকে উপনীত হয় তবে তাঁদেরকে উঁহ শব্দ বল না অর্থাৎ (তারা কষ্ট পায় মত কোন শব্দ বলিও না,) তাঁদেরকে ধমক দিও না এবং তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে সম্মান জনক কথা বল।
[সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত ২৩]
সুতরাং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তাদেরকে কষ্ট না দেয়া, সম্মান প্রদর্শন করা, তাঁদের বার্ধক্য অবস্থায় সাধ্যানুযায়ী তাদের খেদমত আনজাম দেয়া, অসহায় অবস্থায় তাঁদের খানা পিনার ব্যবস্থাসহ যাবতীয় খোজ-খবর রাখা, তাদের অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা সেবা দেয়া ইত্যাদি মাতা-পিতার হক তথা কর্তব্য ও দায়িত্ব ছেলে-সন্তানের উপর। হাদীস শরীফে প্রিয় নবী সরকারে দু’আলম রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- আল্লাহ্র সন্তুষ্টি মাতা-পিতার সন্তুষ্টির উপর আর আল্লাহ্ তা‘আলার নারাজী মাতা-পিতার অসন্তুষ্টির উপর নির্ভরশীল। [সুনানে ইবনে মাজা ইত্যাদি]
সুতরাং মাতা-পিতার সন্তুষ্টি অর্জনে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং নারাজী ও অসন্তুষ্টি হতে বেচে থাকা ও ছেলে-সন্তানের একান্ত দায় দায়িত্ব।
অপর দিকে ছেলে-সন্তানের জন্য মা-বাবার দায় দায়িত্ব ও কর্তব্যও কম নয়, ছেলে-মেয়ে ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাদের কে যথাযথ যতœ করা সুন্দরভাবে লালন পালন করা, সময় হলে আদব-কায়দা, লেখা-পড়া, দ্বীনি জরুরী বিষয়াদি যেমন ঈমান-আক্বিদা, নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, অযু-গোসল, ক্বোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহ্ রাসূলের মহব্বত, নবীজির আওলাদে পাক, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তবে তাবেয়ীন ও আল্লাহর প্রিয় হক্কানী আওলিয়ায়ে কেরামের চরিত্র আদর্শ এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি শিা দেয়া মাতা-পিতার উপর একান্ত দায়িত্ব। দায়িত্বে অবহেলা করলে যেভাবে ছেলে-সন্তানকে জবাব দিহী করতে হবে তদ্রƒপ ছেলে-মেয়ের প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করলে এবং মা-বাবার কারণে ছেলে-মেয়ে নষ্ট হয়ে গেলে মা-বাবাকেও আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে জবাব দিহী করতে হবে।
[মুসনাদে আহমদ ও মেরকাত শরহে মেশকাত ইত্যাদি]

 মুহাম্মদ মুনির উদ্দীন
শিক- হাইলধর উচ্চ বিদ্যালয়, আনোয়ারা।
 প্রশ্ন: জনৈক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পূর্বে স্বীয় ওয়ারিসগণকে বলে যান যে, তার (মরহুমের) পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে ৪ গন্ডা জমি তার মহল্লার মসজিদের জন্য দান করবে। উক্ত ব্যক্তি অনেক সম্পত্তির মালিক। আমার প্রশ্ন হলো মরহুমের ঐ চার গন্ডা জমি সাব-রেজিষ্ট্রারের মাধ্যমে কমিটি পরিচালিত অন্য কোন মসজিদে দান করলে আদায় হবে কিনা? জানালে উপকৃত হব।

 উত্তর: মহল্লার মসজিদ বা যে মসজিদের জন্য দান করার কথা জায়গার মালিক মৃত্যুর পূর্বে বলে গেছেন উক্ত মসজিদের জন্যই দান করতে হবে। তা অন্য মসজিদে বা কোন মাদ্রাসা অথবা এতিম খানায় দান করা যাবে না, যেহেতু জায়গার মালিক বা দানকারী অথবা নির্দিষ্ট মসজিদের জন্য ওয়াক্ফকারীর বিবরণ ও বর্ণনাই চূড়ান্ত, এটাই ইসলামী শরীয়তের ফায়সালা।
[ফতোয়ায়ে ফয়জুর রসূল: কৃত মুফতি জালাল উদ্দীন আমজাদী রহ. ইত্যাদি]

 মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম
বাংলাদেশ সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি
 প্রশ্ন: কয়েকটি বই পুস্তকে দেখেছি মসজিদে প্রবেশ করার পর نَوَيْتُ سُنَّتَ الْاِعْتِكَافُ দোয়াটি পড়ে নিলে অনেক সাওয়াব অর্জিত হয়। আর এতে সুন্নাতে মুবারাকার সাওয়াব রয়েছে। আসলে তা কতটুকু সঠিক? আর মসজিদে ইতিকাফ করার জন্য শর্ত সমূহ কি কি? বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

 উত্তর: হুযূর পাক রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ই’তিকাফকারী গুনাহ্ থেকে বিরত থাকে এবং নেক আমল দ্বারা এত অধিক পরিমাণ সাওয়াব লাভ করে যেন সে সকল নেক আমল সম্পন্ন করল।
[সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ]
ই’তিকাফ একটি উত্তম ইবাদত। ই’তিকাফ শব্দের অর্থ অবস্থান করা এবং নিজকে আবদ্ধ করে রাখা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মসজিদে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিয়্যত সহকারে অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলা হয়। ই’তিকাফ তিন প্রকার। প্রত্যেক প্রকারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত ও নিয়ম-কানুন রয়েছে। যথা: ক. ওয়াজিব তথা মান্নতের ই’তিকাফ। মান্নত পূর্ণ হলে যা আদায় করা ওয়াজিব। এর জন্য রোযা শর্ত এবং রোযাসহকারে মান্নতি ই’তিকাফ যে সব মসজিদে নিয়মিত জমাআত সহকারে পঞ্জেগানা নামায আদায় করা হয় উক্ত মসজিদে আদায় করা ওয়াজিব। খ. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্। মাহে রমযানের শেষ দশ দিন মসজিদে যে ই’তিকাফ আদায় করা হয়। এ প্রকারের ই’তিকাফেও রোযা শর্ত। রোযা বিহীন তা শুদ্ধ হবে না। গ. মুস্তাহাব। এ প্রকারের ই’তিকাফের জন্য রোযা কিংবা নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা শর্ত নয়, বরং কেউ মসজিদে প্রবেশকালে نَوَيْتُ سُنَّتَ الْاِعْتِكَافُ (নাওয়াতু সুন্নাতাল ই’তিকাফ) নিয়্যত করলেই মসজিদে অবস্থানকালীন সময় ই’তিকাফ হিসেবে গণ্য হবে এবং ই’তিকাফকারী যতণ মসজিদে অবস্থান করবেন ই’তিকাফের সওয়াব পাবেন। আর মসজিদ হতে বের হওয়ার সাথে সাথে ই’তিকাফ শেষ হয়ে যাবে। অবশ্য এমন ই’তিকাফকারীর জন্যও অসংখ্য সাওয়াব ও ফজিলত রয়েছে। সুতরাং উল্লিখিত মাসয়ালা ছহি ও শুদ্ধ আছে। বিধায় আমল করা যাবে। [দুররে মুখতার ও ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ইত্যাদি]

 আবদিল মোস্তফা
পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম
 প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় চাঁদা তুলে প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপন করা হয়। উক্ত সংগৃহীত টাকা ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদ্যাপনের পর কিছু টাকা অবশিষ্ট থেকে যায়। ঐ টাকা কোন গরীব মুসলমান নর-নারীর লেখা-পড়ার উপকরণ ক্রয়ের জন্য অথবা ফাতেহায়ে ইয়াজদাহুম উদ্যাপনের কাজে খরচ করা যাবে কি না? ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে জানানোর অনুরোধ রইল।

 উত্তর: উপরোক্ত বিষয়ে উত্তম পন্থা হল ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন উপলে সংগৃহীত চাঁদা/ টাকা ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের চূড়ান্ত হিসাব করে যাবতীয় আনুষঙ্গিক ব্যয় বাদ দিয়ে অবশিষ্ট টাকা চাঁদাদাতা বা মালিকদের হাতে ফেরত দেয়া, যদি সম্ভব হয়। আর যদি তা সম্ভব না হয় আগামী বৎসরের ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনে ব্যয় করবে অথবা ফাতেহায়ে ইয়াজদাহুমেও ব্যয় করতে পারবে। বস্তুতঃ দরূদ-সালাম সম্বলিত মাহফিল সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে খরচ করা যাবে। তবে যদি আয়-ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব নিকাশের বিবরণ ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মাহফিল শেষে উপস্থিত সকলের সামনে আম-এলান করা হয় এবং অধিকাংশ হাদিয়া/চাঁদা দাতাদের গরীব-অসহায়দের কল্যাণে অবশিষ্ট টাকা ব্যয় করতে আপত্তি না থাকে বরং সম্মতি পাওয়া যায় তবে অবশিষ্ট টাকা গরীব দুঃখী এলাকার মুসলিম নর-নারীর বিবাহ-শাদী ও লেখা পড়ার ও বই-পুস্তক ক্রয়ে তথা জনকল্যাণে ব্যয় করা যাবে। তখন সবাই সাওয়াবের অধিকারী হবে।

 মুহাম্মদ ফোরকান
পূর্ব গহিরা, রায়পুর আনোয়ারা।
 প্রশ্ন:১. আমাদের গ্রামের মসজিদের মহল্লাবাসী, মসজিদ পরিচালনা কমিটি এবং উপেদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে মসজিদের নামকরন করা হয় ‘‘পূর্ব গহিরা মুহাম্মদিয়া জামে মসজিদ’’। উক্ত মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মরহুম আবদুস সোবহান এবং দাতা হিসেবে মরহুমা বিলকিস জান বিবির নাম সর্বসম্মতিক্রমে প্যাড ও রশিদ বইয়ে উল্লেখ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এমতাবস্থায় উক্ত প্রতিষ্ঠাতা ও দাতার নাম মসজিদের দেওয়ালে স্মৃতিফলকে উল্লেখ করলে শরীয়তের কোন বাধা আছে কী? স্মৃতি ফলকে প্রতিষ্ঠাতার নাম আগে আসবে নাকি দাতার নাম আগে আসবে, বিধি মোতাবেক জানালে কৃতজ্ঞ হবো।
২. আমাদের গ্রামের মসজিদে এক ব্যক্তি একটি অযু করার ঘাটের আর্থিক অনুদান প্রদান করেন, উক্ত টাকায় মসজিদ কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারী কিংবা অন্য কোন বিশ্বস্থ ব্যক্তির মাধ্যমে যদি উক্ত ঘাট নির্মিত হওয়ার পর অনুদানকৃত ব্যক্তির নাম, সহযোগিতাকারী এবং অনুরোধকারী ব্যক্তিদের নাম স্মৃতি ফলকের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয়। উক্ত ঘাটে উল্লেখিত স্মৃতি ফলকের কারণে ওযু করতে কোন সমস্যা শরীয়তের দৃষ্টিতে আছে কিনা? জানালে খুশী হব।

 উত্তর: ১. প্রতিষ্ঠাতা ও দাতার ইহসান ও বদান্যতা তথা এত বড় অবদানকে স্মরণ রাখার জন্য এবং নূতন প্রজন্মের অবগতির জন্য তাদের নামে মসজিদের প্যাড ও রশিদ বই ছাপালে এবং অধিকাংশ মুসল্লিগণের সম্মতিতে তাদের নাম মসজিদের স্মৃতি ফলকে উল্লেখ করলে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন আপত্তি নাই। প্রতিষ্ঠাতার নাম আগে আসা ভালো।
উত্তর:২. অসুবিধা নাই। তবে এসব বিষয় নিয়ে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর মধ্যে যেন দলাদলি ও ঝগড়া-ফ্যাসাদ সৃষ্টি না হয়। সে বিষয়ে অবশ্যই সজাগ দৃষ্টি একান্ত জরুরী।

 সৈয়দ আহমদ রেযা
শীতল ঝর্ণা আবাসিক এলাকা, অক্সিজেন, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন: চার রাকাত বিশিষ্ট বা তিন রাকাত বিশিষ্ট ফরয নামাযে ইমাম সাহেব ভুলবশত প্রথম বৈঠকে না বসে পরিপূর্ণ দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর মুসল্লিদের মধ্যে হতে কেউ লোক্মা দিলে বা আল্লাহু আকবর বলে ইমাম সাহেবকে বসে যাওয়ার ইঙ্গিত করলে ঐ অবস্থায় বসে গেলে নামায শুদ্ধ হবে কিনা? বিস্তারিত জানালে কৃতঙ্গ হব।

 উত্তর: ইমাম সাহেব চার রাকাত বা তিন রাকাত বিশিষ্ট ফরয নামাযে ভুলবশত: প্রথম বৈঠকে না বসে দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে যদি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে না যায় বরং বসার নিকটবর্তীতে মুক্বতাদিদের মধ্য হতে কেউ লোকমা দিলে এবং ঐ লোকমা আমলে নিয়ে ইমাম সাহেব বসে পড়লে উক্ত নামাযে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু ইমাম সাহেব পরিপূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর মুক্বতাদিদের মধ্য হতে কেউ লোকমা দিলে সাথে সাথে লোকমা দাতার নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। এবং ঐ লোকমা আমলে নিয়ে ইমাম সাহেব বসে পড়লে সকলের নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। কারণ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর প্রথম বৈঠকে পুনরায় ফিরে যাওয়া হারাম। আর লোকমার স্থান ব্যতীত অনর্থক লোকমা দেওয়া নামায ফাসেদ বা ভঙ্গ হওয়ার অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে আল্লামা আবদুছ ছাত্তার হামদানি কতৃক রচিত ‘‘মু’মিন কি নামায’’ নামক কিতাবের ৮৪ পৃষ্ঠায় রয়েছে।
امام پهلا قعده بهول كر اٹهنے كو كهڑا هو رها تها اور ابهى سيدها كهڑا نه هواتها تو مقتدى كے بتانے (لقمه دينے) ميں كوئى حرج نهيں بلكه بتانا هى چاهئے هاں اگر پهلا قعده چهوڑ كر امام پورا كهڑا هوجائے توامام كے پورا يعنى بالكل سيدها كهرا هوجانے كے بعد اسے بتانا (لقمه ديهنا) جائزنهيں اگر تب مقتدى بتائے گا تواس مقتدى كي نماز جاتى رهے گى اور اگرامام اس مقتدى كے بتانے پر عمل كر كے سيدها كهڑا هونے كے بعد قعده اولى ميں لوٹيگا توسب كى نماز جاتى رهے گى كه پورا كهڑا هو جانے كے بعد قعدة اولى كے لئے لوٹنا حرام هے تواب مقتدى كا بتانا محض بيجا بلكه حرام كى طرف بلانا اوربلاضرورت كلام هوا اور وه مفسد نماز هے-
উক্ত মাসআলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা আলা হযরত রহমাতুল্লাহি আলায়হি ফতোয়ায়ে রেজভীয়া ৩য় খণ্ড, ৬৪৫ পৃষ্ঠায় এবং ১২৩ পৃষ্ঠায় আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। উপরুক্ত বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা ইমাম ও মুক্তাদি উভয়ের জন্য একান্ত কর্তব্য ও জরুরী মনে করি।
والله ورسوله اعلم بالصواب-

 মুহাম্মদ আবুল হাসেম নঈমী আত্তারী
রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন: আমি ফজরের নামাযের ইমামতিতে সূরা ফাতিহা পড়ে সূরা ‘ত্বীন’ শুরু করলাম। গড় গড় করে পড়ে যাচ্ছি। মাঝখানে খেয়াল করলাম কেরাতের যে শব্দগুলো কানে আসতেছে তা সূরা ‘ত্বীনের’ নয় কেরাত শেষ করলাম। ইন্নাহা আলাইহিম মো’সাদাতুন ফি আমাদিম মোমাদ্দাদাহ্ বলে। বুঝতে পরলাম সূরা হুমাযাহ্ পড়লাম। এই নামায কি আদায় হবে? শরীয়তের দৃষ্টিতে জানালে উপকৃত হব।

 উত্তর: নামাযের সূরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সূরা বা ছোট তিন আয়াত বা তার পরিমাণ লম্বা এক আয়াত পড়া ওয়াজিব। কিন্তু কেউ যদি ভুলবশত সূরা ফাতিহার পর এক আয়াত থেকে অন্য আয়াতে এবং এক সূরা হতে অন্য সূরায় চলে যায় এবং এভাবে নামায সম্পন্ন করলে তার নামাযের কোন তি হবে না। এবং তার নামায আদায় হয়ে যাবে। তদ্রƒপ সূরা ফাতিহার পর এক সূরার স্থলে অন্য আর এক সূরা পড়ে নামায আদায় করলে নামায শুদ্ধ হয়ে যাবে।
[১. ফাতাওয়া ফয়জুর রাসূল কৃত ফকিহে মিল্লাত আল্লামা জালালুদ্দীন আহমদ আমজাদী। খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪২, ২. ফাতাওয়ায়ে রেজভিয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১২৫, কতৃ: ইমাম আ’লা হযরত শাহ আহমদ রেযা রহ. ইত্যাদি]

 মুহাম্মদ শওকত হোসাইন
চিকদাইর, রাউজান, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন: কোনো অমুসলিম যদি স্বইচ্ছায় কোনো মুসলিম ইমাম, আলেম, মুফতি, খতিব বা ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব বা কলেমা পড়িয়ে মুসলমান করানোর অনুরোধ করে তখন উক্ত ইমাম বা মুফতি সাহেব আগামীকাল আস, কিছুণ পর আস, সভা শেষ হওয়ার পর আসিও বা একটু অপো কর ইত্যাদি অপো মূলক কথা বলা কতটুকু ইসলামী শরিয়ত সম্মত? এতদ্বিষয়ে ইসলামী নির্ভযোগ্য ফিক্হ ও ফতোয়া গ্রন্থের ফায়সালা জানানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।

 উত্তর: কোনো অমুসলিম যদি স্বইচ্ছায় কোনো মুসলিম ইমাম, খতিব, মুফতি, মুহাদ্দিস, বক্তা অথবা ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব বা আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন উক্ত ইমাম, খতিব, মুফতি, বক্তা বা মুসলিম জ্ঞানীর উপর ফরয তাকে কালবিলম্ব না করে সাথে সাথে মুসলিম বানিয়ে নেয়া। অন্যথায় তিনি নিঃসন্দেহে গোনাহগার হবেন। ইসলাম গ্রহণের আগ্রহী বক্তিকে ‘আগামীকাল আসিও, কিছুণ পর আস, একটু অপো কর, অমুকের নিকট যাও, সভা শেষে আসিও ইত্যাদি অপো মূলক কথা বলে বিলম্ব করানো শরিয়তসম্মত নয় বরং তা কুফরীর দিকে ধাবিত করে। ফোকাহায়ে কেরাম এহেন কাজকে জোরালোভাবে নিষেধ করেছেন। এতদ্বিষয়ে ইমাম ইবনে হাজর মক্কী স্বীয় গ্রন্থ ‘‘اعلام الاعلام بقواطع الاسلام’’ -এ বলেন-
لو قال كافر لمسلم اعرض على الاسلام فقال حتى ارى او أصبر ألى الغد او طلب عرض الاسلام من
واعظ فقال اجلس ألى اخر المجلس كفر-
অর্থাৎ যদি কোনো কাফের (অমুসলিম) কোনো মুসলমানকে বলে যে, আমার নিকট ইসলাম পেশ করান, তখন উক্ত মুসলিম ব্যক্তি বলল- ‘‘আমাকে একটু বিবেচনা করতে দাও অথবা আগামীকাল পর্যন্ত অপো কর’’। অথবা কোনো অমুসলিম কোনো বক্তার (ওয়ায়েজ) কাছে মুসলিম হওয়ার প্রস্তাব দিল, তখন উক্ত ওয়াজে বলল, সভা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাক। তবে সে বক্তা বা মুসিলম কুফরী করল।
[ইলামুল আলাম বিকাওয়াতিয়িল ইসলাম কৃত: ইমাম ইবনে হাজার মক্কী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ফতোয়ায়ে মুফতী মুহাম্মদ হামেদ রেজা খান রেবলভী রহ.]
বিশ্বখ্যাত মুফতি মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহমাতুল্লাহ আলায়হি- شرح الففه الاكبر -এর বলেন,
كافر قال لمسلم اعرض على الاسلام فقال اذهب الى فلان العالم كفر-
অর্থাৎ কোনো কাফের (অমুসলিম) কোনো মুসলমানকে বলল যে, আমার নিটক ইসলাম পেশ করুন- তখন উক্ত মুসলিম ব্যক্তি বলল অমুক আলেমের নিকট যাও- তবে সে কুফরি করল।
[শরহে ফিহহে আকবর: কৃতৃ মোল্লা আলী ক্বারী ও ফতোয়ায়ে হামে দিয়া]
শায়খ মুহাম্মদ আল-মারূফ ইবনে আলী -مجمع الانهر شرح ملتقى الا بحر নামাক গ্রন্থে বলেন,
كافر جاء الى رجل وقال اعرض على الاسلام فقال
اذهب فلان يكفر وقيل لا يكفر-
অর্থাৎ কোনো অমুসলিম কোনো মুসলিম ব্যক্তির নিকট এসে বলল যে, আমাকে ইসলাম ধর্মে দীতি করান তথা আমাকে মুসলমান বানিয়ে নেন, অতপর উক্ত মুসলিম বলল, ‘অমুকের নিকট যাও।’ এটা দ্বারা সে কুফরি করল। কোনো কোনো ফোকাহায়ে কেরাম বলেছেন কুফরি হবে না। তবে অবশ্য মারাত্মক অপরাধ ও গুনাহ্ করল।
[মাজমায়ুল আনহর শহরে মূলতা কালআবহার-কৃত: শায়খ মুহাম্মদ আল মারূফ ইবনে আলী রহমাহুল্লাহু, ফতোয়ায়ে হামেদিয়া]
ইবনে হাজর মক্কী প্রাগুক্ত গ্রন্থে বলেন-
كان يسأله كا فر يريد الاسلام ان يلقّنه كلمة الاسلام
فلم يفعل او يقول له أصبر حتى افرغ من شغلى-
অর্থাৎ কোনো অমুসলিম কোন মুসলমানের নিকট ইসলাম গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তখন উক্ত মুসলমানের একান্ত কর্তব্য দায়িত্ব হবে তাকে যেন ইসলামের কলেমা পড়িয়ে দেয়, কিন্তু সে তা না করে বলল যে, আমার ব্যস্ততা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপো কর। (এটি কুফরীর অন্তর্ভুক্ত)
[প্রাগুক্ত: ইবনে হাজার মক্কী রহ., প্রাগুক্ত মুফতি মুহাম্মদ হামেদ রেজা রহ.]
ইবনে হাজর মক্কী প্রাগুক্ত কিতাবে আরো বলেন-
قال له كافر اعرض على الاسلام فقال لا ادرى صفة الايمان او قال أذهب الى فلان الفقيه انه متضمن ببقائه على الكفر ولو لخظبة والرضا بالكفر كفر-
অর্থাৎ কোনো অমুসলিম কোনো মুসলিমের নিকট ইসলাম গ্রহণ করানোর প্রস্তাব দিল তখন উক্ত মুসলিম বলল, ‘‘আমি ঈমান সম্পর্কে তেমন জানি না অথবা বলল- অমুক ফকিহের নিকট যান।’’ এমনটি বলা কুফরির অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এটা সন্তুষ্টি থাকা বুঝায়। আর কুফরির উপর সন্তুষ্টি থাকাটাও কুফর ও বেঈমানী। [প্রাগুক্ত: ইবনে হাজার মক্কী রহ.]
ফোকাহায়ে কেরামের আলোচনা হতে আমাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তিকে বিলম্ব করানো কুফরি। ফোকাহায়ে কেরাম এহেন কাজকে কুফরি বলার কারণ হচ্ছে উক্ত বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই বিলম্ব করা যাবে না। কারণ উক্ত অমুসলিম যদি বিলম্ব করতে গিয়ে মারা যায় তাহলে এর দায়ভার উক্ত ইমাম, খতিব, হুজুর বা মুসলিম যাকে ইসলাম গ্রহণ করানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তাকেই নিতে হবে।
উপরোক্ত বিষয়টি স্পর্শকাতর, বিধায় এ বিষয়ে হক্কানী ওলামায়ে কেরামের জন্য নেহায়ত সজাগ ও সতর্ক থাকা জরুরী।
[শরহুল ফিক্হিল আকবর কৃত: মোল্লা আলী ক্বারী রহ., ফতোয়ায়ে হামিদিয়া কৃত: মুফতি হামেদ রেজা বেরলভী রহ. ও মাজমায়ূল আনহর কৃত: মুহাম্মদ আল মারূফ ইবনে আলী রহ. ইত্যাদি]

 মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান
নায়েবে ইমাম মসজিদে রহমানিয়া
গাউসিয়া, বায়েজিদ, চট্টগ্রাম
 প্রশ্ন: চোগলখুরি, পরনিন্দা করা, ঝাগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত থাকা, জাম‘আত অবস্থায় শরীর হেলানো-দুলানো, চায়ের দোকানে বসে অশ্লীল-সিনেমা ইত্যাদি দেখা, বিলম্বে মাগরিবের জামা‘আত শুরু করা, অন্যের হক নষ্ট করা এবং জুমার খোতবার মাঝখানে কথা বলা এ ধরনের আচরণ প্রকাশ পেলে এমন ইমামের পিছনে নামাযে ইক্তদা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধ হবে কিনা? তাছাড়া একজন ইমামের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত ইসলামী শরিয়তের আলোকে জানালে উপকৃত হব।

 উত্তর: ইমামের চরিত্র যদি প্রশ্নে উল্লিখিত চরিত্রের অনুরূপ হয় এমন ইমামের পেছনে জেনে শুনে ইক্বতিদা করা মাকরূহে তাহরীমা। না জেনে কেউ ইক্বতিদা করলে পুনরায় উক্ত নামায আদায় করা ওয়াজিব। এ ধরনের ইমামকে অপসারণ করা অপরিহার্য। আর যদি সম্ভব না হয় তবে জামা‘আত শেষ হওয়ার পর দু’তিন জন মিলে জামা‘আত সহকারে নামায আদায় করবে। অথবা সম্ভব হলে অন্য মসজিদে গিয়ে যোগ্য ও মুত্তাকি ইমামের সাথে জমাতে শরীক হবে। কারণ প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ফাসিক-ই মু’লিন্ বা প্রকাশ্য ফাসিক। এমন ব্যক্তির পেছনে ইক্বতিদা করা বা নামায আদায় করা ফক্বিহ্গণ মাকরূহে তাহরীমা বলে ফতোয়া দিয়েছেন। যেমন ‘‘মারাকিউল ফালাহ্’’ ফিক্বহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে,
كره امامة الفاسق العالم لعدم اهتمامه بالدين فتجب
اهانته شرعًا فلا يعظم بتقديمه للامامة-
অর্থাৎ ফাসিক ব্যক্তিকে ইমাম বানানো মাকরূহে তাহরীমা। যেহেতু দ্বীনের প্রতি তার নিকট গুরুত্ব নাই। সুতরাং তার প্রতি হেউ প্রদর্শন করা ওয়াজিব। শরিয়তের দৃষ্টিতে তাকে ইমাম বানিয়ে সম্মান প্রদর্শন করা যাবে না। যেমনিভাবে ফতোয়া-ই রেজভিয়্যাহতে উল্লেখ আছে যে-
فان نقديم الفاسق اثم والصلوة خلنه مكروهة تحريما والجامعة واجبة فهما درجة واحدة ودرء المفاسد اهم من جلب المصالح- (فتاؤى رضويه- جلد ৩- صفحه ২৫৩)
অর্থাৎ প্রকাশ্য ফাসিক ব্যক্তিকে ইমাম বানানো বা নিযুক্ত করা গুনাহ। এ ধরনের ফাসিকের পেছেনে নামায পড়া মাকরূহে তাহরিমা। এবং জমা‘আতের সাথে নামায আদায় করা ওয়াজিব (অর্থাৎ ওয়াজিবের কাছাকাছি) ওয়াজিব আর মাকরূহে তাহরিমা একই দরজার অন্তর্ভুক্ত (অর্থাৎ একটার বিপরীত আর একটি) উল্লেখ্য যে, উপকার অর্জনের চেয়ে ফ্যাসাদ দূর করা অবশ্যই জরুরী। সুতরাং জেনে শুনে এমন ফাসিক ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দিলে মোতাওয়াল্লী ও মসজিদের কমিটি সকলে গুনাহগার হবে। তাছাড়া চোগলখুরি করা, অন্যের হক নষ্ট করা, অন্যায়ভাবে মু’মিন-মুসলমানের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া গালি-গালাজ করা, মানুষকে কষ্ট দেয়া কবীরাহ গুনাহ। আর মাগরিবের নামায ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথে আদায় করা তথা প্রথম ওয়াক্তে পড়ে নেয়া মুস্তাহাব। বিনা ওজরে দেরি করা মাকরূহ-ই তানযীহি। জুমা ও ঈদের নামাযে উভয় খোতবা আরবীতে পাঠ করা সুন্নাত। আরবীতে খোতবা পাঠকালে ভিন্ন ভাষায় কথা বলা মাকরূহ।
ইমামের যোগ্য ওই ব্যক্তি যে নামায ও পবিত্রতার বিধানাবলী সকলের চেয়ে অধিক জানেন। যদিও অন্য শাস্ত্রে পূর্ণ জ্ঞান না রাখে। তবে শর্ত হল এতটুকু ক্বোরআন পাকের সূরা-কেরাত যেন স্মরণ থাকা যে পরিমাণ পড়া সুন্নাত ও সঠিকভাবে মাখরাজ আদায়ে সম, আহলে সুন্নাত ওয়াল জমাআতের পরিপন্থী কোন কাজে লিপ্ত হয় না এবং অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকে। অর্থাৎ এসব গুণাবলীসহ ওই ব্যক্তি ইমামতির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত যিনি তাজভীদসহ ইলমে ক্বিরআত জানেন এবং তদানুযায়ী নামায আদায় করেন। যদি কয়েক ব্যক্তির মধ্যে ওই গুণাবলী সমান হয়, তখন যিনি অধিক মুত্তাকী-পরহেযগার ও খোদাভীরু অর্থাৎ হারামকে যিনি পরিহার করে এমন কি সন্দেহজনক বিষয়কেও এড়িয়ে চলে।
যদি মুত্তাকী হওয়ার গুণে উপস্থিত সকলে সমান হয়, তখন যিনি অধিক বয়স্ক অর্থাৎ যার বেশি জীবন ইসলামী অবস্থায় অতিবাহিত করেছে। এতে সমান হলে তখন যিনি অধিক সৎচরিত্রবান, এতেও যদি সমান হয় যিনি তাহাজ্জুদ গুজার, এভাবে যে অধিক উত্তমগুণাবলীর অধিকারী, যার বংশ সম্ভ্রান্ত, গোত্রের দিক দিয়ে যিনি শ্রেষ্ঠ বা সম্মানিত, তিনিই ইমাম হবেন। তারপরও যদি কয়েক ব্যক্তি সমান মর্যাদার অধিকারী হলে তাদের মধ্যে উপরোক্ত ধারাক্রমে যিনি প্রাধান্য পাবেন, তিনিই ইমামের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। ক্রীতদাস, অন্ধ, জারজসন্তান, খোজা, কুষ্ঠরোগী, নির্বোধ প্রমুখ ব্যক্তিকে ইমাম নিযুক্ত করা মাকরূহ-ই তানযীহি। আর এমন ব্যক্তি যদি হয় যে, বদআক্বীদা ও বদমাজহাব পোষণকারী যার বদআক্বীদা ও আমল কুফরী পর্যন্ত পৌঁছেনি এবং প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত (ফাসিক-ই মু’লিন) যেমন মদ্যপায়ী, জুয়াখোর, ব্যভিচারী, সুদখোর, চোগলখোর প্রমুখ যারা প্রকাশ্য কবীরাহ্ গুনাহ করে তাদেরকে ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করা গুনাহ। তাই তাদের পেছনে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমা। না জেনে পড়ে থাকলে জানার পর ওই নামাযের সময় বা ওয়াক্ত থাকলে পুনরায় পড়ে নেবে অন্যথায় কাযা করবে। আর যার বদআক্বীদা ও বদআমল কুফর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে জেনে-শুনে তার পেছনে ইক্বতিদা করা বা ওই ধরনের ব্যক্তিকে ইমাম নিযুক্ত করা নিঃসন্দেহে হারাম। সুতরাং ইমাম নিযুক্ত করার সময় ইমামতির জন্য যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া প্রত্যেক মসজিদ কর্তৃপরে একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।
[মারাকিউল ফালাহ্, রদ্দুল মুহতার, নুরুল ইযাহ্, ফতোয়া-ই রজভিয়া, যুগজিজ্ঞাসা ইত্যাদি]

 মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন
পাইরোল, পটিয়া, চট্টগ্রাম।
 প্রশ্ন: আমার ভাইপোর জন্য একটি মেয়ে ঠিক হয়েছে। সে মেয়েটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের পরিপন্থি একটি ছাত্রী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। কথা প্রসঙ্গে আমার ভাইপো শ্বাশুরকে পায়ে ধরে সালাম করা জায়েয বললে, মেয়েটি জবাব দিল শরিয়তের দৃষ্টিতে কাউকে পায়ে ধরে সালাম করা জায়েয নেই। উল্লেখ্য মেয়েটি ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মেয়েটির কথা সত্য কিনা? যদি মিথ্যা হয় তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে কাকে কাকে পায়ে ধরে সালাম করা জায়েয। দলিলসহ বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
 উত্তর: ইসলাম সুন্দরতম একটি আদর্শের নাম। ইসলামের শিষ্টাচারিতা অতি চমৎকার। ছোটদের স্নেহ এবং বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শিা। সম্মানীত ব্যক্তিবর্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন সালাম প্রদান, দেখলে সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাওয়া, হাত ও কদম বুচি করা। উল্লেখ্য যে, মা-বাবা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, মামা-মামী, চাচা-চাচী, বড়ভাই-বড়বোন, শ্বাশুড়-শাশুড়ি উস্তাদ ও হক্কানী পীর মুর্শিদ ইত্যাদির কাছ থেকে দোয়া নেওয়ার অন্যতম পন্থা হল সালাম বিনিময়ের পর কদমবুচি করা। কদমবুচি ইসলামী শরিয়তসম্মত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সমর্থিত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং তা সুন্নাত। এটাকে নাজায়েয ও হারাম বলা হাদীস শরীফের ও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত একটা সুন্নাতকে অস্বীকার করা। যা ইসলামী আহকাম ও বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞদের চরিত্র।
প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সুনানে আবু দাউদ শরীফ ও মেশকাত শরীফে বর্ণিত আছে-
عن زارع وكان فى وفد عبد القيس قال لما قدمنا المدينة وجعلنا نبادر من رواحلنا فنقبل يد رسول
الله صلى الله عليه وسلم ورجله-
অর্থাৎ হযরত যারেঈ (বিশিষ্ট সাহাবা) রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু যিনি আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন আমরা যখন মদীনা শরীফে আগমন করলাম আমরা আমাদের বাহন থেকে তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম। এবং রসূলে আকরাম হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানী হাত ও কদম মুবারক চুম্বন করলাম।
শিফা শরীফে ইমমা কাজী আয়াজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবায়ে রসূল হযরত বুরাইদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একজন বেদুঈন নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মু’জিযা তলব করল। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বেদুঈনকে এরশাদ করলেন ঐ বৃটাকে বল আল্লাহর রসূল তোমাকে ডাকছেন। সে যখন বলল বৃটা তার ডানে বামে ও সম্মুখে পেছেনে ঝুঁকল তখন ওটার শেকড়গুলো উপড়ে গেল তারপর উক্ত বৃটি শিকড়গুলো সহ বালি উড়িয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে দাঁড়ালো এবং বলল আস্ সালামু আলায়কা এয়া রাসূলাল্লাহ্! বেদুঈন বলল আপনি তাকে আদেশ করুন যেন এটা স্বীয় স্থানে ফিরে যায়। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে ওটা ফিরে গেল এবং বৃটি সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বেদুঈন বলল আপনি আমাকে অনুমতি দিন আমি আপনাকে সাজদা করব। তিনি এরশাদ করলেন যদি কাউকে সাজদা করার হুকুম দিতাম তাহলে নারীকে হুকুম দিতাম সে যেন তার স্বামীকে সাজদা করে। বেদুঈন আরজ করল হুযূর! তাহলে আমাকে আপনার হস্ত ও কদম মুবারক দ্বয় চুম্বন করার অনুমতি দিন। অতঃপর তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করলেন, হযরত ইমাম বুখারী তাঁর রচিত আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেন হযরত ইবনে আমের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, একদিন আমরা হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম অতপর আমরা হুযূরের পবিত্র হাত ও পা দ্বয় ধরে চুম্বন করলাম।
উল্লেখিত বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সম্মানিত ব্যক্তিদের হাত ও পা চুম্বন করা কোনো না-জায়েয আমল নয়। বরং রসূল করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সমর্থিত একটি বরকত মণ্ডিত সাহাবায়ে কেরামের আমল। এটাকে না-জায়েয বলা মানে নবীজির সাহাবায়ে কেরামের নূরানী আমল ও তরিকাকে অস্বীকার করা যা অজ্ঞতা ও মুনাফেকীর নামান্তর। সুতরাং ছেলে-মেয়েদের ঈমান আক্বিদা ও নেক আমল সমূহ সংরণের জন্য তাদেরকে নবী-অলি বিদ্বেষীদের খপ্পর ও বদ-সোহবত থেকে বিরত রাখা মা-বাবা ও প্রকৃত অভিভাবকের উপর একান্ত দায়িত্ব এবং তাদের কে সহি শিা প্রদান করা ফরযে ঈমানী ও নেহায়ত জরুরী। বিশেষত বর্তমান ফিতনা ফ্যাসাদের নাজুক সময়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মাসিক তরজুমান, গাউসিয়া তারবিয়াতি নেসাব সহ সুন্নী প্রকাশনা পড়ার প্রতি তাকিদ ও উৎসাহিত করা সময়ের দাবী।
[কিাতাবুশ্ শেফা কৃত: ইমাম কাজী আয়াজ রহ., সুনানে আবি দাউদ শরীফ কৃত: ইমাম আবু দাউদ রহ., মেশকাত শরীফ, ও যুগজিজ্ঞাসা ইত্যাদি]

আল্লাহ বিনা কারণে কিছু সৃষ্টি করেন নি

আল্লাহ বিনা কারণে কিছু সৃষ্টি করেন নি
ড. এম. শমশের আলী

আমাদের চারপাশে যেসব জড় ও জীব পদার্থ দেখি সেগুলোর বৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হতে হয়। জড় পদার্থের কথাই ধরা যাক। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ৯২টি মৌলিক পদার্থ খুঁজে পেয়েছেন। যা দিয়ে অন্য যৌগিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। এসবের পরও কিছু উপাদান তৈরি করা হয়েছে। তবে সেগুলোর স্থায়িত্ব বেশি নয়। এই উপাদানগুলোর এক একটির আণবিক ও পারমাণবিক গঠন এক এক রকম। এদের মধ্যে কোনটি বায়বীয়, কোনটি তরল, আবার কোনটি কঠিন অবস্থায় বিরাজ করে। কোনটি আবার একাধিক অবস্থাতে বিরাজ করতে পারে। এদের কোনটিকে বাদ দিয়ে জড় ও জীব জগতের কথা চিন্তা করা যায় না। কৃষির কথাই ধরা যাক; মাটিতে ম্যাগনেশিয়াম, সালফার, ক্যালসিয়াম, লৌহ ইত্যাদি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে। এর কম-বেশি হয়ে গেলে বিপদ। এদের কোন কোনটি থাকে অত্যন্ত অল্প মাত্রায় যেগুলোকে বলা হয় ট্রেস এলিমেন্টস। এসব ট্রেস এলিমেন্টসের হেরফের হয়ে গেলে শরীরে নানা রকম রোগ-ব্যাধি দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে জীবজগতের সব প্রাণীর কোষে যে উঘঅ নামক অণু থাকে যাকে বলা হয় বংশগতি নীলনকশা, তাতে হাউড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, সালফার এবং ফসফরাস থাকতেই হবে। তা সে মশার উঘঅ-ই হোক বা মানুষের উঘঅ-ই হোক। এই উঘঅ মোলিকুলের অংশবিশেষকেই বলা হয় জিন (এবহব)। একেক প্রাণীর দেহের কোষের মধ্যে উঘঅ থাকে। আবার একই সংখ্যক জিন (এবহব) বিশিষ্ট প্রাণীর উঘঅ-এর মধ্যে কতকগুলো রাসায়ণিক যৌগ যেমন- অফহিরহব (অ), ঞযুসরহব (ঞ), এঁধহরহব (এ), ঈুঃড়ংরহব (ঈ), থাকে। তার ওপর একই প্রাণীর চারিত্রিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য একই রকম। এজন্য কোন দু’জন মানুষ বা দুই প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য একই হতে পারে না। এই জিনের সংখ্যার হেরফের এবং উঘঅ মোলিকুলের বিন্যাসের হেরফের জীব বৈচিত্র্যের জন্য দায়ী। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে এতরকম জড় পদার্থ, এত রকম জীব পদার্থ কেন সৃষ্ট করা হল? এই প্রশ্নটির উত্তর মহান আল্লাহ্ তা’আলা সুরা আল্ ইমরানের ৩:১৯০-১৯১ আয়াতে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন:
৩:১৯০ ইন্না ফি খালকিস সামা ওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়াখতিলাফিল লাইলী ওয়ান নাহারী লা আয়াতিল্লি উলিল আল বাব।
বাংলা অনুবাদ: আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নির্দেশনাবলী রহিয়াছে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকের জন্য।
৩:১৯১- আল্লাজিনা ইয়াজকুরুনাল্লাহা কিয়ামাও ওয়া কুউদাও ওয়া আলা জুনুবিহীম ওয়া ইয়া তাফাকারুন্না ফি খালকিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, রাব্বানা মা খালাকাতা হা যা বাতিলা ছুবহানাকা ফাকিনা আজাবান্নার।
বাংলা অনুবাদ- যাহারা দাঁড়াইয়া, বসিয়া ও শুইয়া আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল এবং পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে ও বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি ইহা নিরর্থক সৃষ্টি করো নাই, তুমি পবিত্র, তুমি আমাদিকে অগ্নি শাস্তি হইতে রা কর।’
ক্বোরআনের এই আয়াত দুটি ক্বোরআনে বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গ উপস্থাপন করা এক অনবদ্য পন্থারই নির্দেশক। ক্বোরআন বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়, এখানে পদার্থের বলবিদ্যা বা পদার্থের ভর তুল্যের কোন সমীকরণ তুলে ধরা হয়নি। অথচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ইঙ্গিতমূলক প্রায় সাড়ে সাতশ আয়াত রয়েছে ক্বোরআনে। প্রশ্ন জাগতে পারে কথাগুলো কিভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এর উত্তরে বলা যায় যে, ক্বোরআন কতগুলো এৎধহফ চৎরহপরঢ়ষবং বা প্রধান সূত্রাবলীর মাধ্যমে অনেক বেশি কথা চুম্বক আকারে প্রকাশ করেছে। ওপরের আয়াত দুটি এমনই এক ধরনের প্রধান সূত্রের নির্দেশক। এই সূত্রটিকে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতে গেলে একটি বিরাট গ্রন্থ সৃষ্টি হবে। যা হবে ইকোলজি বা পরিবেশ বিজ্ঞান সংবলিত। অর্থাৎ এ ধরনের একেকটি সূত্র একেকটি শাস্ত্রের জন্ম নেয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আজকের ঊপড়ষড়মরংঃ বা পরিবেশ বিজ্ঞানীর মূল কথাই হচ্ছে: ঘড়ঃযরহম যধং নববহ পৎবধঃবং ভড়ৎ হড়ঃযরহম অর্থাৎ বিনা কারণে কোন কিছুই সৃষ্টি করা হয়নি। বিদেশী পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ক্বোরআন পড়েছেন তা নয়। কিন্তু তাদের পর্যবেণে ও পরীা-নিরীার মাধ্যমে তারা যা পেয়েছেন তা উপরোক্ত দুটি আয়াতেরই প্রকাশ মাত্র। আজকে আমরা জানি যে, পৃথিবীতে প্রাণী ও উদ্ভিদ মিলিয়ে
তিন কোটি জাতের প্রাণ আছে (খরভব ভড়ৎসং)। মানুষ এই তিন কোটি প্রাণের একটি। একটা ফড়িং, কাঁকড়া, সাপ, মশা, মাছি, শিয়ালকাটা, সজনে গাছ, পুঁইশাক, গান্ধা ফুল ইত্যাদি এই তিন কোটি প্রাণীরই অন্তর্ভুক্ত। বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীর মধ্যে মাত্র ত্রিশ লাখ প্রাণের কার্যক্রম জানতে পেরেছে। বাকি প্রাণগুলোর ঋঁহপঃরড়হং বা কাজ এখনও বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারেনি। অথচ এই প্রাণগুলো প্রকৃতিরই অংশ এবং কোন রকমভাবে এরা প্রকৃতির পরিবেশের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রশ্ন জাগতে পারে স্রষ্টা মশা সৃষ্টি করতে গেলেন কেন? এর উত্তরে বলা যায় মশা যে কামড়ায়, মশা যে শুধু দংশন করে এবং ম্যালেরিয়ার বাহক হিসেবে কাজ করে তা নয়, মশা অনেক ছোট ছোট মাছের খাদ্যও বটে! প্রকৃতিতে দেখা যায় যে একটি ছোট প্রাণীকে একটি বড় প্রাণী খাচ্ছে, সেই প্রাণীকে তার চেয়ে বড় প্রাণী খাচ্ছে এবং আরও বেশি বড় প্রাণী এই বড় প্রাণীকে খাচ্ছে। একে বলা হয় ইংরেজিতে চৎবফধঃরহম প্রকৃতিতে এই প্রক্রিয়া সর্বত্র বিরাজমান এবং এই প্রক্রিয়া ভারসাম্য রায় একটি শক্তিশালী সূত্র। প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এই তিন কোটি প্রাণীর মধ্যে যদি কোন একটি প্রাণীর মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তাকে কি আমরা সমূলে ধ্বংস করে ফেলব! এর উত্তর হচ্ছে ‘না।’ কারণ এই প্রাণের নিশ্চয়ই এমন কিছু কার্যক্রম আছে যা প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর। আমরা যা করতে পারি তা হলো এই প্রাণীর সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারি বিশেষ পর্যায়ে। কিন্তু এদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেললে আমাদেরকে হয়তো চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ব্যাকটেরিয়ার কথা যা শুনলে আমরা আঁতকে উঠি। মনে রাখতে হবে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরে রোগ ঘটায় বটে! কিন্তু অনেক ব্যাকটেরিয়া আমাদের প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর। এই যে আমরা দই খাই তাতেও তো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। উদ্ভিদ যে নাইট্রোজেন ব্যবহার করে সেই নাইট্রোজেন ফিক্সেশনে ব্যাকটেরিয়া বিশেষ অবদান রাখে। মাটির উপরিভাগে যে স্তর সেখানেও অনেক উপযোগী ব্যাকটেরিয়া আছে। সেজন্য মাটির উপরিভাগ কেটে নিয়ে খালি ইট বানানো আমাদের জন্য এক অর্থে তিকরও বটে। যে প্রধান সূত্রটির কথা উল্লেখ করা হলো তার আরও অনেক তাৎপর্য আছে- তার একটি হলো আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে যে নৈসর্গ বা পরিবেশ রেখেছেন সেই পরিবেশই মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ্
তা’আলা লালনকর্তা ও পালনকর্তা হিসেবে এই পরিবেশের মধ্যে তার জীবন ধারণের মধ্যে উপযোগী উপাদান রেখেছেন। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক, বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডের যে আম, জাম, লিচু, আনারস, কাঠাল, আমলকি, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, কুল, ডাব, কমলা, বেল, তাল, নারকেল ইত্যাদি রয়েছে এগুলো বাদ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে আপেল আনার কোন দরকার পড়ে না। মনে রাখতে হবে আমাদের পরিবেশে যা কিছু ফলে তার প্রতিটি আমাদের জন্য উপযোগী। গ্রীষ্মকালের সজনে ডাটা অল্প করে হলেও তা খাওয়া ভালো। কারণ দেখা গেছে এই সজনে ডাটার একটি অহঃর-ারৎধষ গুণ রয়েছে। ঈযরপশবহ চড়ী-এর প্রতিরোধে এর একটা সহায়ক ভূমিকা আছে। এ ধরনের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেসব উদ্ভিদের কথা বলে শেষ করা যায় না। গাঁদা ফুলের পাতার রস রক্তরণ বন্ধ করে এটা অনেক লোকই জানে। তেমনি শিয়াল কাটারও গুণাগুণ রয়েছে। আবার ওইদিকে গুঁইসাপের একটা ভূমিকা রয়েছে সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। এসব কথা চিন্তা করলে এই কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের মধ্যে যা কিছু আমরা দেখি না কেন, তা বিনা কারণে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেননি।
আজকে আমরা ইরড়ফরাবৎংরঃু বা জীববৈচিত্র্যের কথা বলি। কিন্তু ক্বোরআনের উপরিউক্ত আয়াতে এই জীববৈচিত্র্যের কথা যেভাবে বলা হয়েছে তা এর চেয়ে আরও সুন্দরভাবে বলা সম্ভব নয়।
পরিশেষে একথা বলতে হয়, মানুষকে টিকে থাকতে হলে এই তিন কোটি জাতের প্রত্যেকটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এটাই হওয়া উচিত মানুষের মৌলিক বিশ্বাস। আমরা যখন বলি নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও। তখন শুধু আমরা মানুষের কথাই চিন্তা করি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ আজ বুঝতে পেরেছে মানুষ ছাড়া প্রতিটি প্রাণী যা আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এটাই ঊপড়-চযরষড়ংড়ঢ়যুএর মূল কথা। মোট কথা হচ্ছে এই যে, আমরা যদি আল্লাহর সৃষ্টি সব জীবের সঙ্গে একটি ঐকতান সৃষ্টি করে বসবাস করতে পারি তবে সেটিই হবে আমাদের ও প্রাণীর জন্য পরম মঙ্গলের কথা। আমরা আল্লাহ্ তা’আলার প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টিকে সৃষ্টির প্রতি সঠিক মনোভাব পোষণ করাই আমাদের কর্তব্য। একটি মুহূর্তের জন্যও আমরা ভুলে না যাই আমাদের প্রভু কোনকিছুই বিনা কারণে সৃষ্টি করেননি।

মাস্জিদ-ই নবভী শরীফ: আসহাবে সুফ্ফাহ্ ও ইলমে তাসাঊফ

ড. আবদুল্লাহ্ আল্ মা’রূফ

১৯৮৩ সালে আমি ‘‘সুফ্ফাহ্’’ প্রথম দেখি। মসজিদে নবভীর মূল অংশে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতে থাকি- এই উঁচু ভিটাটিতে যেন বসে আছেন হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। তাঁর পাশে আরও অনেকেও যেন শুয়ে-বসে আছেন। কেউ কালো, কেউ সাদা। গায়ে সস্তা কাপড়-চোপড়। দারিদ্র্য ক্লিষ্ট অবয়বেরও কী নূরানী উদ্ভাস! প্রায় দেড় হাজার বছর পর লোক বদলেছে, কিন্তু ওই স্থান বদলায়নি। আশেপাশেই ছিলেন সাইয়্যেদুনা আবু বাকর, উমার, উসমান, আলী, তালহা, যুবায়ের, জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম আরও কত সাহাবা। তাদের কেউ সেনাপতি, কেউ কাতেবুল ওয়াহ্য়ি, কেউ ক্বারী, আবার কেউ তো ব্যবসায়ী, অথবা কৃষক। তাঁরা মধুর সন্ধানে দূর থেকে উড়ে আসা মৌমাছির মত। মধু সংগ্রহ করে আপন ঘর মৌচাকে ফিরে যায়। অহির জ্ঞান-মধু আহোরণ করতে কেউ তো এক দিন পরপর আসেন, আনসার ভাই অন্যদিন সেখানে যান। সবারই স্ত্রী-পরিবার, ঘর সংসার আছে। একটি সমাজ তারাই প্রাণময় করে রেখেছেন উৎপাদন, সরবরাহ, বেচা-কেনা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে।

কিন্তু কিছু লোক ছিলেন, মসজিদের চত্বরের কবুতরে মত। এখানেই উড়াউড়ি করে। খাবার খায় এবং মসজিদ ঘিরেই ঘুরপাক খায়। সুফ্ফায় যারা রাতে ঘুমান, ইবাদত করেন, তারাই নবীজির প্রতিটি বাক্য ও কর্ম দেখা আর শোনার জন্য সদা উৎকের্ণ ও ব্যাকুল থাকেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যা হাদিয়া আসতো, তা থেকে তাদের দিতেন। তারা যেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিদিনের মেহমান।

মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর মসজিদে একদল লোক দেখেন জিকির করছেন, আরেকদল ক্বোরআন মাজিদ মুখস্থ করছেন, তাফসীর শোনছেন। আরেক দল মাস্আলা-মাসায়েল শিক্ষায় ব্যস্ত। আসহাব সুফ্ফাহ্ বা সুফ্ফা ওয়ালাগণ যেন সব কিছুতেই আছেন। বিশেষ করে তারা যেন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পেই রয়েছেন। সব সময় এখানে থাকার সুবিধার্থে বা সামর্থের অভাবে তাঁদের কেউ কেউ বিয়ে-শাদীও করতেন না। এ ছিল সাধারণ অবস্থা। পরবর্তীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিবাহের তাকিদ দেওয়াতে তাঁরা ওদিকেও গেছেন।

ইবাদতের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবীদের সাদাসিধে জীবন যাপনকে লক্ষ করেই পরবর্তীতে অনেকেই বলেছেন যে, ‘সুফী’ শব্দটি আহল্-আস্-সুফ্ফাহ্ (اهل الصفة) শব্দ থেকে উৎকলিত হয়েছে। নামটি আদৌ সুফ্ফাহ্ থেকে এসেছে কিনা এ নিয়ে দু’কথা থাকলেও তাসাওউফের মূল চেতনার সাথে যে সুফ্ফাবাসীর জীবনযাত্রার সাথে মিল আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। অল্পে তুষ্টি হচ্ছে সুফিদের ভূষণ। সামর্থ্য থাকলেও কম খাওয়া, কম ঘুমানো এবং আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা সুফিদের অভ্যাসে থাকে। নিজেদের দেহকে শাসন করে মনের ওপর রাজত্ব বিস্তার করতে দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করা তাঁদের পথ ও পদ্ধতি, যার মাধ্যমে তাঁরা অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন।

অনুরূপ আহলে সুফ্ফাহ্ বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্র থেকে আসা একদল লোক ছিলেন যারা স্বচ্ছল ঘরের সন্তান ছিলেন। ইসলামের টানে ঘর ছেড়েছেন। সংখ্যায় তারা প্রায় ৪০০ জন হলেও একই সঙ্গে ছিলেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন মিশন বা অপারেশনে পাঠাতেন। জিহাদের সময় তাঁরা জীবন তুচ্ছ করে প্রথম কাতারে থেকে লড়তেন। এখনকার তথাকথিত কিছু সুফির মত আয়েশী ও পলায়নপর মানসিকতার লোক ছিলেন না তাঁরা।

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যখন সুফ্ফায় থাকতেন তখন তাঁর সাথে প্রায় ৭০ জন সাহাবী ছিলেন। তাঁদের কারও কারও পরনে কেবল হাঁটু পর্যন্ত ঢাকে এমন একখণ্ড কাপড় ছিল। রুকুতে গেলে সতর খুলে যাবে ভয়ে হাতে চেপে ধরতেন। অধিকাংশ সময় খেজুরই ছিল তাঁদের তিনবেলার আহার। কিন্তু তাঁদের এই সবর ও ধর্মপ্রীতির জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, দারিদ্রে থেকেও হৃষ্টচিত্তে এই যে তোমাদের প্রচেষ্টা এর ওপর টিকে থাকলে তোমরাই হবে বেহেশতে আমার সাথী।

اَبْشِرُوْا يَا اَصْحَابَ الصُّفَّةِِ فَمَنْ بَقَىَ مِنْكُمْ عَلَى النَعْتِ الَّذِىْ اَنْتُمْ عَلَيْهِ اَلْيَوْمَ رَاضِيًٍا بِمَا فِيْهِ فَاِنَّهُمْ مِنْ رُفَقَائِيْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ-

কিন্তু শাব্দিকভাবে ‘‘صوف’’ শব্দমূলের সাথে صُفْفَة শব্দের মিল এত ঘনিষ্ট নয়। যারা মিল খুঁজেছেন তারা তা কষ্টকল্পিতভাবেই করেছেন। صوف শব্দের অর্থ পশম। পশমী জামার এই আবরণকে নির্ভর করে যারা তাসাওউফ শব্দ আবিস্কারের দাবী করেন তাদেরকে বলব, তাহলে তো একটি ভেঁড়াই বড় সুফি। তার গায়ে কেবল সুফ-ই সুফ- পশম-ই পশম। হ্যাঁ শীতকালে অনেকেই সুফি হয় আর শীত প্রধান দেশে তো সবাই সুফি! তাছাড়া আরবী ব্যাকরণ অনুসারে সুফ্ফার প্রতি সম্পৃক্ত করে শব্দ গঠন করলে হয়- ‘সুফ্ফী’; সুফি হয় না।

গবেষণার ফল স্বরূপ আমরা তাসাওউফ-এর মূল শাব্দিক অর্থ, যা গ্রহণীয়, তা বলতে চাই। দামেশকের প্রখ্যাত আলেম শেখ আরসেলান বলেছেন-

ان التصوف كلمة اشتقت من الصفا-

تصوف শব্দটি صفا অর্থ (পরিশুদ্ধতা বা সাফ করা) থেকে উৎকলিত। এ অর্থটি পবিত্র ক্বোরআনের تزكيه বা পরিশুদ্ধতা-এর সাথে হুবহু মিলে যায়। তাযকিয়া শব্দটি তাসফিয়ার সমার্থক। তাই এ মতের পক্ষেই পণ্ডিতগণ সমর্থন দিয়েছেন। শব্দের পিছে না পড়ে, এই পরিভাষার অন্তরালে যে মর্ম আছে তা আমাদেরকে দেখতে হবে। কারণ, এমন অনেক নাম আছে যা জন্মের বহু পরে রাখা হয়েছে। যেমন আরবী ব্যাকরণ-এর নাম নাহ্ভ ও সারফ বা ‘আরূদ্ব রাখার বহু আগেও এর অস্তিত্ব ছিল। কারণ ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে আসে। ব্যাকরণ ভাষাকে পরিবর্তন করে না বরং ভাষাকে পর্যবেক্ষণ করেই কিন্তু ব্যাকরণ আবিস্কার করা হয়ে থাকে।

আমরা যখন ৭ দিন বয়সে নবজাতকের জন্য আকীকা করি, নাম রাখি তখন কেউ তো বলে না যে, বিগত ৭ দিন এই শিশুর অস্তিত্ব ছিল না। তেমনি ‘তাসওউফ’ নামটি পরে রাখা হলেও ‘তাযকিয়া’ এর আগে থেকে শুরু হয়। তবে আহলে সুফ্ফাহ্ থেকে সুফি বা ‘তাসাওউফ’ নামটি শুরু হলে তো আর বলার কিছুই নেই।

ঈমানকে আমরা এখন আকীদা বলি, ইসলামকে শরীয়ত বলি আর ইহসানকে বলি তাসাওউফ। এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই দ্বীন ইসলাম গঠিত। এ বিষয়টি উম্মতকে শেখানোর জন্যই জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম, মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে কার্যত দেখিয়েছেন। তিনি তাকে তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলে জিব্রাঈল প্রতিবারই বলেছিলেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। উপস্থিত সাহাবীগণ বিস্ময় প্রকাশ করলেন। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘‘এ তো তোমাদের ভাই জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম, তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।’’

[বুখারী/হাদীসে জিব্রাঈল]

এ তিনটি প্রশ্নোত্তরের মধ্যে গোটা ইসলাম ধর্ম ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আহলে সুফ্ফাহ্ তো ঈমান গ্রহণ করেছেন স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে, তারা ইসলাম অনুশীলন করেছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লা বলেছিলেন: সালাত কর, যেভাবে আমাকে সালাত করতে দেখ। তারা এমনভাবে ইবাদত করতেন যেন আল্লাহকে দেখছেন। সেজন্যই এই সুফিরা না খেয়ে থাকতেন, আবার জিহাদ করতেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্ণর হয়েছিলেন, যেমন আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। আহলে সুফ্ফাহ্-এর আদর্শ তাই না খেয়ে থাকা বা তালি দেওয়া জামা পরা নয়। তাদের আদর্শ ছিল মহান আল্লাহর সান্নিধ্য ও নবীজির ভালোবাসা লাভের জন্য গভীর সাধনায় নিমগ্ন থাকা। কেবল ময়লাযুক্ত জামা পরে নিছক চোখ বন্ধ করে বসে থাকা কখনও তাসাওউফ হতে পারে না।

আহলে সুফ্ফার ওই জায়গাটা এখনও সমতল থেকে একটু উঁচু স্থান হিসেবে বিদ্যমান। যিয়ারতকারীগণ ওখানে নামায-তিলাওয়াত করে বরকত লাভ করেন। এখন তাসাওউফ পন্থি আছে, কিন্তু জীবনে কি একবারও জিহাদ করেছে? সর্বোচ্ছ জিহাদ হচ্ছে প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করা। আমরা কি সুদের সাথে যুদ্ধ করেছি? আমরা কি কোন যৌতুক বন্ধ করেছি? আমরা কি ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি। আমরা কি অন্যায় আবদারকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা কি নিজের সন্তানকে নামাযি বানাবার চেষ্টা করেছি? আমরা কি কোন অপরিচিত মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছি? আমরা কি নিষ্ঠার সাথে কোন রোগীকে সহানুভূতি জানিয়েছি? আমরা কি বিপদে পড়ে আল্লাহকে স্মরণ করেছি! আমরা কি স্ত্রীর ভাল ব্যবহারের জন্য তাকে ধন্যবাদ বা স্বীকৃতি দিয়েছি? তার খারাপ ব্যবহারে ধৈর্য ধরে তাকে বুঝাতে চেষ্টা করেছি? আমরা কি সমাজের অভাবী মানুষকে ভাল পরামর্শ দিয়েছি? আমরা কি নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও পরের উপকার করেছি?

কুপ্রবৃত্তি সব সময় ভাল কাজে বাধা দিয়েছে, অলক্ষে শয়তান ওয়াস্ওয়াসাহ্ দিয়েছে। আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করে সত্য সুন্দর ও মঙ্গলের পথে যাত্রা অব্যাহত রেখেছি? অথচ আহলে সুফ্ফাহ্ নতুন বিশ্বসভ্যতার সূচনাকারী মহান রাসূলুল্লাহকে অনুকরণ করে জীবন পথে এগিয়ে গেছেন তাদের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি হাজার হাজার হাদীস। আসহাবে সুফ্ফার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনাকারী। কত বড় কাজ করে গেছেন তাঁরা! সব সময় বান্দার কলবের অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও মসজিদে ভাল কাপড়-চোপড় পরে আসার জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন-

خُذُوْا زِيْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ-

তোমরা প্রতিটি সাজদার সময় তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর। এর অর্থ এভাবে করা যায়: তোমরা প্রত্যেক মসজিদে সুন্দর পোশাক পর। প্রথম তরজমাটি বেশি মূলানুগ। কারণ মসজিদ ছাড়াও যেখানেই নামায পড়ি না কেন সুন্দরপরিপাটিভাবে নিজেকে সাজিয়ে আল্লাহর সামনে দাড়ানো উচিত।

যা হোক, মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তখন সবাইকে এমন ভাল কাপড়-চোপড় পরতে বলেননি, যা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু তিনি বলেছেন, ফরয সালাত শেষে তোমরা স্থান বদল করে সুন্নাত পড়বে। যাতে গুমটভাব না থাকে। আতর-খুশবু মেখে না আসতে পারলে যেন সুগন্ধি তেল মেখে আসে। দাঁত মাজার (মিসওয়াক) তাগিদ দিয়েছেন। কুলি করা, নাকে পানি দেওয়াও পরিচ্ছন্নতার জন্যই তিনি বলেছেন। কাঁচা পেয়াজ খেয়ে আমার মসজিদে আসবে না। তিনি বলেছেন- أَئْرِمُوْا شَعْرَكُمْ তোমাদের চুল দাড়ির যতœ নেবে। এভাবে তার উদ্দেশ্য ছিল বাহ্যিক সৌন্দর্যও যেন বজায় থাকে। তাঁর এই চেতনা বুঝতে না পেরে অনেকেই পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে আসে না বটে, কিন্তু মোজার গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। আরেক জনের মুখের ওপর সজোরে হাঁিচ দেয়। ঘর্মাক্ত মলিন কয়েক দিনের ব্যবহৃত জামা নিয়ে মসজিদে আসে। আর বলে, এটি নামাযের জামা।

বস্তুত পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরলে মানুষের মনের মধ্যে একটি পবিত্রতার ভাব আসে, যা সামাজিক সমাবেশে বা মসজিদে নামাযের জামাতে অংশগ্রহণের জন্য খুবই উপযোগী। আসহাবে সুফ্ফাহ্ যেহেতু মসজিদের ভেতরেই থাকতেন তাই তারা সাধ্যমত সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকতে সচেষ্ট ছিলেন। তাদের মধ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সকল শিক্ষার প্রতিফলন ছিল। যা হোক, বান্দা তো কালবের অবস্থার ওপর পুরস্কার কিংবা তিরস্কার পাবেন। মহান আল্লাহ্ বলেন-

يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُوْنٌ اِلَّا مَنْ اَتَى اللهَ بَقَلْبِ سَلِيْمٍ-

তরজমা: ‘‘সেই (কেয়ামতের ভয়াবহ্) দিনে সম্পদ অথবা সন্তান কোন উপকারে আসবে না, তবে সেই (পরিত্রাণ পাবে) যে আল্লাহর কাছে নির্ভেজাল অন্তর (ক্বলব) নিয়ে উপস্থিত হবে।’’

ক্বলবকে ‘সালীম’ বা সহি-সালামতে রাখতে হলে অবশিষ্ট ৬টি অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। আবার ক্বলব যদি সালীম থাকে তাহলে ওই অঙ্গগুলোও নিয়ন্ত্রিত থাকে। মুল নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র হচ্ছে ক্বলব। চোখ, কান, হাত, পা, পেট ও গোপনাঙ্গ এই সব অঙ্গ আমাদেরকে অনেক সময় গোনাহে লিপ্ত করতে চায় তখন ক্বল্ব তাতে বাধা দেয়। কিন্তু নাফ্স বা কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানের প্ররোচনায় যখন কোন গোনাহ্ হয়ে যায় এতে ক্বলবের ডিসপ্লে বোর্ডে একটি কালো দাগ পড়ে। এভাবে দাগ বা কলো ফোঁটা পড়তে পড়তে ক্বল্ব তার কার্যকারিতা প্রায় হারিয়ে ফেলে। এটাকে বলা হয় ক্বল্ব মরে গেছে। এ সময় বান্দা কেবল গোনাহ্ করতেই মজা পায়। কেউ তাকে নসিহত করতে আসলে তাকে অসহনীয় মনে হয়। তবে যদি নসিহতের শক্তি বেশি হয় তাহলে দিলে আবার হেদায়াতের নূর পয়দা হয়। কাপড়ের দাগ গভীর হলে যেমনি বেশি শক্তিশালী ডিটারজেন্ট পাউডার বা ব্লিচিং পাউডার যোগ করা হয়। দিল পরিস্কারের জন্যে আল্লাহর যিক্র হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর। এই ব্যবস্থা পত্র আমাদের নবীজি দিয়ে গেছেন।

তাসাওউফের প্রধান কাজ তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি। লোভ, কাম, ক্রোধ ইত্যাদি রিপু আমাদেরকে প্রতিনিয়ত ভুল পথে নিয়ে যেতে চায়। এ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মুখে নসিহত করেছেন আবার ব্যবহারিকভাবেও চর্চা করিয়েছেন। তিনি বলেছেন- اَلْحَرِيْصُ مَحْرُوْمٌ লোভীরা বঞ্চিত হয়।

مَنْ يَضْمَنُ لِىْ مَا بَيْنَ شَفَتَيْهِ وَمَابَيْنَ فَخِذَيْهِ اَضْمَنُ لَهُ الْجَنَّةَ-

‘‘যে আমাকে তার দু’ঠোঁটের মাঝখানের বস্তু এবং দুই উরুর মাঝখানের বস্তুর গ্যারান্টি দেবে আমি তাকে বেহেশতের গ্যারান্টি দেব।’’ তিনি বলেছেন-

اَلْغَضُبَ يَاْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ-

অর্থাৎ ‘‘ক্রোধ সুন্দর কর্মগুলোকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যেমনি আগুন লাকড়িকে পুড়িয়ে দেয়।’’ লোভ, কাম, ক্রোধ সম্পর্কে কেবল এই মূল্যবান বাক্য বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি। তার কাছের লোকদের তিনি তা হাতে কলমেও শিক্ষা দিয়েছেন। যারা অল্প একটু সময়ের জন্য হলেও তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন জীবনের মোড় ঘুরে গেছে তাদের। তবে আসহাবে সুফ্ফাহ্ এই সুহবত পেয়েছিলেন অনেক বেশি। আর তাই ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সুহবত (সৎসঙ্গ) এতই প্রয়োজনীয় যে, মহান আল্লাহ্ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন-

يَااَيُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ وَكُوْنُوْ مَعَ الصَّادِقِيْنَ-

অর্থাৎ ‘‘ওহে যারা ঈমান এনেছ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যনিষ্ঠদের সাথে থাকো।’’

সত্যনিষ্ঠ- যারা বিশ্বাসকে বাস্তবরূপ দিয়েছে- তাদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থেকে ঈমান ও তাক্বওয়া পরিপূর্ণতা অর্জন কর। একটি মডেল সামনে রেখে চল। একজন মুর্শিদ তোমাকে প্রতিনিয়ত সঠিক কাজটি করার পরামর্শ দেবেন। এমনি একটি ঘটনা আমরা দেখি মসজিদে নবভীতে। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে একজন মুসল্লি সবেমাত্র অযু করে নামায পড়লো। তিনি বললেন- اِرْجِعْ فَصَلِّ فَاِنَّّكَ لَمْ يُصَلِّ -‘‘ফিরে গিয়ে নামায পড়, কারণ তুমি নামায পড়নি।’’ এভাবে তৃতীয়বার বললেন। এবার কারণটা খোলাসা করে দিলেন। সাহাবী বললেন, তুমি অযু করার সময় পায়ের গোড়ালি ভিজেনি। তোমার অযুই হয়নি নামায কিভাবে হবে? এটি ছিল ট্রেনিং। তার জন্য এবং যারা সেখানে ছিলেন সবার জন্য। কারণ শুষ্ক আবহাওয়ার আরব দেশে পা ভাল করে ধোয়া মনযোগ সাপেক্ষ ব্যাপার। এই ভুল প্রায় হতে পারতো। তাই এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন।

আরেকবার এক সাহাবী মসজিদে নবভীতে দৌঁড়ে এসে কোন রকমে রুকুতে গিয়ে ইমামের সাথে নামাযে যোগ দিয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, زَادَ اللهُ حِرْصًا فَلَا تَعُدْ অর্থাৎ আল্লাহ্ তোমার আগ্রহ বাড়িয়ে দিন, তবে এভাবে আর করনা। অথবা বলেছেন- এভাবে হাঁপিয়ে দৌঁড়ে এসো না স্বভাবিকভাবে আসবে। [فَلَا تَعُدْ বা فَلَاتَعَدُوْ (এভাবে দৌঁড়িও না) দু’ভাবে পড়া যায়।]

এখানেও সাহচর্যের বরকতে এভাবে প্রতিটি হরকত, প্রতিটি পরতে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তারা মহাভাগ্যবান যাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে শুধরে দিয়েছেন। তবে কেউ বিব্রতবোধ করতে পারেন এ ভেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময়ে ব্যক্তি বিশেষের নাম উল্লেখ না করে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে বলতেন- ‘‘তোমাদের কী হয়েছে, তোমাদের মধ্যে অমুক কাজটি হতে দেখা যায়, এটি ঠিক নয়। এভাবে ব্যাপক ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে সম্বোধন করে বলতেন।

মানুষকে বিব্রত করা তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন- কারো বাড়িতে দাওয়াতে গিয়ে খাওয়ার পাতে বসে জিজ্ঞেস করবে না- এটা হালাল না হারাম। কারণ মুসলমানদের প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করা ঈমানের আবেদন। হারাম জানা থাকলে অবশ্যই ওই হারাম খাদ্য, বস্ত্র, টাকা-পয়সা গ্রহণ করা হারাম। কিন্তু বেশি পরহেযগারী দেখানো অবাঞ্ছনীয়।

এই যে আচরণ বিধি, তা মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশ্ববিদ্যালয়- ওই মসজিদে নবভীতেই শেখার সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল। আসহাবে সুফ্ফাহ্ তাই ধন্য মানবগোষ্ঠী যারা নতুন বিশ্বসভ্যতার প্রতিষ্ঠাতার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন। এজন্য আমরা দেখতে পাই, একজন গ্রাম্য চাষাভুক্ষ লোকও যখন একজন পীরের দরবারে কিছুদিন থাকেন তার সিরাত-সুরাত, ভদ্রতা-শিষ্টাচার, জীবন দর্শন কীভাবে পরিবর্তিত হয় যায়। পীর বলতে আমরা তাসাওউফের শিক্ষক বুঝে থাকি। একজন ফিজিক্যাল ফিটনেসের শিক্ষক যেমন প্রথমে নিজে ফিট থাকে, তারপর অন্যকে শরীর ভাল রাখার তালিম দেন। তেমনি একজন পীর বা মুর্শিদ প্রথমে নিজে পূর্ণ-পরিণত (কামেল) হবেন তারপর অন্যকে ‘পূর্ণ-পরিণত করতে সচেষ্ট’ (মুকাম্মেল) হবেন।

একজন কামেল পীর তার খানকায় রেখে কিছু লোককে একেবারে সোনার মানুষ বানিয়ে তারপর খেলাফত দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। এটি কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষ শিষ্য এই আসহাবে সুফ্ফার অনুসরণেই করে থাকেন।

তাফওউফ বলতেই যুহদ বা অল্পে তুষ্ট থেকে কঠোর সাধনা বোঝায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ধনী সাহাবীগণও এই যুহদ অবলম্বন করতেন। আসহাবে সুফ্ফাহ্ যেন এই যুহ্দকে তাদের দেহের ভূষণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী আলোচকগণ এই আসহাবে সুফ্ফাহ্-এর আলোচনা বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই বিশেষ দিকটি তাই মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আলোচনার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে আসে। আজকের ভোগের দুনিয়ায় ত্যাগের ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদেরকে সত্যনিষ্ঠার আদর্শে প্রণোদনা দেবে এবং অতি লোভের ফাঁদে পড়া থেকে রক্ষা করবে, আশা করা যায়। জীবনের মহান লক্ষ্য অর্জনে যে নির্মোহ সাধনার প্রয়োজন তা আমরা পাব সে যুগের আহলে সুফ্ফাহ্ আর এ যুগের হক্কানী তাসাওউফ চর্চাকারীদের জীবন-দর্শনে, তাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা ও দীক্ষায় উজ্জীবিত উম্মাহ চেতনায় জীবন পথে এগিয়ে যাবার তাওফীক দিন। আ-মী-ন।

وَصَلَّ اللهُ عَلَىِّ النَّبِيُّ الْكِرٍيْمِ وَاَلِهِ وَاَصْحَابِهِ اَجْمَعِيْنَ-

মাযহাব অনুসরণ : একটি পর্যালোচনা

মাযহাব অনুসরণ : একটি পর্যালোচনা
মুফতি মুহাম্মদ ওবাইদুল হক নঈমী

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ

وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَ‌ٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩﴾
এরশাদ হচ্ছে

ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের আর তোমাদের মধ্যে যারা মতায় অধিষ্ঠিত তাদেরও (নির্দেশ মেনে চলো)। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে সেটাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমীপে উপস্থাপন করো তথা কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে এর সমাধান খুঁজে বের করো (সঠিক সিদ্ধান্ত লাভের আশায়) যদি আল্লাহ্ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হও। এটা উত্তম এবং এর পরিণাম সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। [সূরা নিসা : আয়াত : ৫৯]

আলোকপাত
সুন্নী মুসলিম হিসাবে আমাদের অন্তরে এই বিশ্বাস ও আক্বীদাহ রাখতে হবে যে, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিবেদিত হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার একক ও নিরংকুশ আনুগত্যই হলো তাওহীদের মর্মকথা এবং সাথে সাথে রসূলে করীম রাউফুর রহীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আনুগত্যও এ জন্য অত্যাবশ্যক যে, তাঁর প্রতিটি কথন, জীবনের প্রতিটি আচরণ উম্মতের নিকট শরীয়তে ইলাহীয়ার প্রতিবিম্ব হিসেবেই বিবেচিত। এমনকি রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোন নির্দেশ বাহ্যত কুরআন মজীদের বিপরীত প্রতীয়মান হলেও সেেেত্র ব্যাখ্যা সাপেে তাঁর নির্দেশিত বিষয় তথা হাদীস শরীফই শরীয়তের দলীল হিসেবে গণ্য হবে। হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর জীবদ্দশায় হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে ২য় বিবাহের অনুমতি না দেয়া এবং হযরত খুযাইমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর স্যা দুইজন সাীর সা্েযর সমতূল্য ঘোষণা দেয়া ইত্যাদি এরই অন্তর্ভুক্ত। অতএব মুমিন দাবীদার কোন ব্যক্তি কোন গ্রহণযোগ্য ও শরয়ী কারণ ব্যতিরেকে রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত অমান্য করা মূলত নিজের ঈমানকে অস্বীকার করার নামান্তর। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ
فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُوْنَ حَتّى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُوْا فِىْ اَنْفُسِهِمْ حَرَجٌ مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا ـ
অর্থ: ‘সুতরাং হে মাহবুব! আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা মু’মিন হবে না যতণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদের েেত্র আপনাকে বিচারক মানবে অতঃপর আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অন্তরে সংশয় রাখবে না এবং সমর্পিত চিত্তে গ্রহণ করবে না।’’
এ আয়াতে ঈমানের পূর্ণতা নয় বরং ঈমানকেই অস্বীকার করা হয়েছে। অতএব এ বিষয়ে ভিন্ন মতের কোনও অবকাশ নেই যে, মানুষের ইহ ও পরকালীন মুক্তি ও সাফল্যের জন্য আল্লাহ্তায়ালাও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র যথাযথ আনুগত্যের কোন বিকল্প আছে। নিঃসন্দেহে কোন বিকল্প পথ নেই।
আলোচ্য আয়াতে اولى الامر এর আনুগত্যের কথাও বলা হয়েছে। যার অর্থ ‘আদেশ দাতাগণ’, মতায় অধিষ্ঠিত ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরকাকের মতে اولى الامر দ্বারা ‘কোরআন-সুন্নাহ’র জ্ঞানের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণকেই বুঝানো হয়েছে। উক্ত মতের পে যাদের অবস্থান তাদের মধ্যে হযরত জাবের বিন আবদিল্লাহ, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস, হযরত মুজাহিদ, হযরত আতা বিন আবি রিবাহ, হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কারো কারো মতে উক্ত اولى الامر দ্বারা মুসলিম শাসকবর্গ উদ্দেশ্য।
ইমাম আবু বকর জাস্সাস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর মতেاولى الامر শব্দটির ব্যাপকার্থ ধরা হলে তাফসীরদ্বয়ের মাঝে আর কোন বিরোধ থাকে না। তখন অর্থ দাঁড়াবে প্রশাসনের েেত্র তোমরা প্রশাসকবর্গের এবং আহকাম ও মাসায়েলের েেত্র বিজ্ঞ আলেমগণের কথা মেনে চলো। যদি আমরা তাঁর উক্ত মতের সাথে আরেকটি কথা সংযোজন করি তাহলে اولى الامر এর ব্যাপকার্থকে সীমাবদ্ধতার পরিসরে নিয়ে আসা যায়, আর তা হলো اولى الامر দ্বারা যদি মুসলিম শাসক উদ্দিষ্ট হয় তাহলে কোন সমস্যা নেই। কারণ প্রশাসন, আহকাম ও মাসায়েলের েেত্র শাসকবর্গ সুবিজ্ঞ আলেমগণের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য। সুতরাং শাসকবর্গের আনুগত্য আলেমগণের আনুগত্যের নামান্তর মাত্র।
মোদ্দাকথা হলো, আলোচ্য আয়াতের আলোকে আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আনুগত্য যেমন ফরজ ঠিক তেমনিভাবে সুশাসক বা কোরআন-সুন্নাহ্র যথোপযোগী ব্যাখ্যাদাতা বিজ্ঞ আলেম ও মুজতাহিদগণের আনুগত্যও অপরিহার্য, আর পরিভাষায় এরই নাম হলো তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণ। তাক্বলীদ বা কোন ইমামের মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতার স্বপে উক্ত আলোচ্য আয়াত ছাড়াও পবিত্র কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রত্য ও পরো প্রমাণ রয়েছে।
আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ

ধর্মজ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে প্রত্যেক দল থেকে কেন একটি উপদল বের হয় না, যেন ফিরে এসে স্বজাতিকে সতর্ক করতে পারে এবং যেন স্বজাতিরা সর্তকবাণী শ্রবণ করে সর্তক হতে পারে। [সূরা তাওবা, আয়াত : ১২৩]
উক্ত আয়াতের সারমর্ম হলো উম্মতের মাঝে এমন একটি দল থাকা অপরিহার্য যারা দিবা-রাত্রি কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকবে এবং ইজতিহাদ বঞ্চিত মুসলমানদের মাঝে ইজতিহাদ প্রসূত জ্ঞান বিতরণ করবে সাথে সাথে সর্বসাধারণের করণীয় হলো তাঁদের প্রদর্শিত মত, পথ অনুসরণ করা এবং যাবতীয় অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকা। উক্ত আয়াতের হুকুম ও তাক্বলীদের মাঝে বৈপরীত্য কোথায়? মহান আল্লাহ্ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ

অর্থাৎ তোমরা না জানলে বিজ্ঞজনদের কাছে জিজ্ঞেস করো। [সূরা নাহাল, আয়াত- ৪৩]
উল্লেখিত আয়াত নিঃসন্দেহে তাকলিদ বা মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতা প্রমাণ করছে। আয়াতে বলা হচ্ছে জ্ঞানের দৈন্যের কারণে অনভিজ্ঞ লোকদের উচিত অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসমুদ্রে বিচরণকারী ব্যক্তিদের দ্বারস্ত হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমল করা।
এভাবে পবিত্র কুরআনে তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণের স্বপে এমন অসংখ্য প্রামান্য তথ্য রয়েছে। অনুরূপ পবিত্র হাদিস শরীফে তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণের স্বপে প্রামান্য তথ্য বিদ্যমান। যেমন- হযরত হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনÑ

অর্থাৎ আমার পরে তোমরা আবু বকর ও ওমর এ দুইজনকে অনুসরণ করে যাবে। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, আহমদ]
উল্লেখিত হাদীসেاقتداء শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
ধর্মীয় আনুগত্যের অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন

অর্থ- তোমরা (আমার কর্মপদ্ধতি প্রত্য করার মাধ্যমে)
আমাকে অনুসরণ করে যাও আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদেরকে অনুসরণ করে যাবে। [বুখারী, মুসলিম]
এভাবে সাহাবায়ে কেরামসহ সিংহভাগ পূর্ববর্তী ইসলামী মনীষীদের অসংখ্য উক্তি তাকলীদ তথা মাযহাব মানার পে প্রমাণ বহন করে।
উল্লেখ্য একজন মুকাল্লিদ (তাক্বলীদকারী) তার অনুসরণের পাত্র কোন মুজতাহিদকে আইন প্রণেতা বা শরীয়তের স্বতন্ত্র উৎস মনে করে না (যেমন আহলে হাদীস বা লা-মাযহাবীদের একটি অংশ মুকাল্লিদ সম্পর্কে তেমনটি মনে করে থাকে) বরং এই বিশ্বাসে তারা মুজতাহিদগণের অনুসরণ করে থাকে যে, কুরআন ও সুন্নাহ্ হলো ইসলামী শরিয়তের প্রধান দু’টি শাশ্বত উৎস এবং এ উৎসদ্বয়ের সুবিশাল ও বিস্তৃত জগতে সে (তাক্বলীদকারী) একজন অসহায় ও আনাড়ি পথিক মাত্র আর অন্যদিকে মুজতাহিদ হলেন সেই সমুদ্রের একজন নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সেেেত্র তাঁর প্রদত্ত ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তই হলো বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ এবং বাস্তব সত্যের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি মাত্র। সুতরাং মুজতাহিদগণ আইন প্রণেতা নন বরং আইনের ব্যাখ্যাদাতা। আহলে হাদীস বা লামাযহাবীদের ন্যায় যে বা যারা ইমাম আযম আবু হানীফা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম মালেক (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) প্রমুখ ইমামগণকে নিজেদের সাথে তুলনা করার ঘৃণ্য অপচেষ্টায় লিপ্ত, মূলত এহেন চিন্তাধারা তাদের স্থুলবুদ্ধি, হীন মানসিকতা এবং নগ্ন নির্লজ্জতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ ধরনের ব্যক্তি বা সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
আলোচ্য আয়াতের শেষাংশ দ্বারাও অনেকে একটি অগ্রহণযোগ্য ও দুর্বল অভিমত ব্যক্ত করে থাকে। আয়াতাংশটি হলো-
فان تنازعتم فى شئ فردوه الى الله والرسول ان كنتم تؤمنون بالله واليوم الاخر
অর্থাৎ আয়াতের প্রথমাংশে বর্ণিত ‘ঈমানদার’ দ্বারা যে সকল সাধারণ ঈমানদার উদ্দেশ্য। فان تنازعتمদ্বারা ঠিক একই শ্রেণীর ঈমানদার উদ্দিষ্ট। অর্থাৎ তারা আয়াতটির এই অর্থ নেয়, ‘হে ঈমানদারগণ যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে সেটাকে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সমীপে উপস্থাপন করো তথা কুরআন ও হাদীস থেকে এর সমাধান খুঁজে বের করো যদি আল্লাহ্ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হও। এ সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের বক্তব্য হলো আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশে সর্বসাধারণকে এবং শেষাংশে ইজতেহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন ইমামগণকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লামা আবু বকর জাস্সাস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) আহকামুল কুর’আনে ব্যক্ত করেনÑ

অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তায়ালাاولى الامر তথা মুজতাহিদগণকে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো, কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাধান দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘‘সাধারণ লোক’’ এবং বিজ্ঞ আলেম শ্রেণীভূক্ত নয় এমন ব্যক্তির সে যোগ্যতা নেই। কেননা এ পর্যায়ের ব্যক্তিরা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাধান দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয়। ‘‘লা মাযহাবীদের’’ কর্ণধার নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁনও ‘ফাতহুল বয়ান’ গ্রন্থে এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন- তিনি বলেন-

মূলত এখানে [فان تنازعتم দ্বারা] মুজতাহিদগণকে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।
অতএব সাধারণ মুসলমানরা মুজতাহিদগণের ইজতিহাদ প্রসূত মাসায়েল অনুযায়ী আমল করার মাধ্যমেই আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যথাযথ আনুগত্য প্রকাশ করবে।
আশা করি, পাঠক মহল ‘‘তাক্বলীদ’’ বা মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সংপ্তি প্রামাণ্য তথ্য দ্বারা বুঝতে পেরেছেন।
* তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণ সাধারণত দু’প্রকার,
১.تقليد مطلق তথা মুক্ত তাক্বলীদ
২.تقليد شخصى তথা ব্যক্তি তাক্বলীদ।
পরিভাষায়,تقليد مطلق বা মুক্ত তাক্বলীদ বলতে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের পরিবর্তে বিভিন্ন মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণকে বুঝায়, تقليد شخصىবা ব্যক্তি তাক্বলীদ বলতে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করাকে বুঝায়। সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগে ‘‘মুক্ত তাকলীদ’’ ও ‘‘ব্যক্তি তাকলীদ’’ উভয়েরই প্রচলন ছিল। অবশ্য উভয় প্রকারের ল্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তবে পরবর্তীতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেেিত উম্মাতের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞ আলেম ও ফকীহগণ। সর্বসম্মতভাবে মুক্ত তাকলীদের পরিবর্তে ব্যক্তি তাকলীদের পে রায় দিয়েছেন। কেননা তাঁরা ‘প্রবৃত্তির দাসত্ব’’ নামে এক ভয়ংকর ব্যাধি সর্বসাধারণদের মাঝে প্রত্য করেছিলেন। যে প্রবৃত্তির দাসত্বকে চরিতার্থ করার জন্য শরীয়তকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে তারা সামান্যতম কুণ্ঠিত হলো না, এ ধরণের সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা যখন নিজেদের ঘৃণ্য চাহিদা পূরণে মুক্ত তাকলীদের নামে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল প্রমাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ঠিক এহেন মুহুর্তে মুক্ত তাক্বলীদের পরিবর্তে ব্যক্তি তাকলীদের অপরিহার্যতার পে এক বৈপ্লবিক রায় প্রদান করে, বিজ্ঞ মুজতাহিদগণ তাদের এক অনন্য দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁদের কবর শরীফকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন। আমীন। সুতরাং ব্যক্তি তাকলীদের অপরিহার্যতার ধারাবাহিকতায় আজ পৃথিবী জুড়ে সমাদৃত হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী এই চারটি বরহক্ব মাযহাব বিদ্যমান আছে।
মাযহাবগুলোর রূপকার হলেন যথাক্রমে ইমাম আযম আবু হানীফা নু’মান বিন ছাবিত (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম দারুল হিজরাহ্ হযরত মালেক বিন আনাস (রাহমাতুল্লহি আলাইহি) ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রিছ আশ্শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। আমাদের আক্বীদাহ হলো ইমাম চতুষ্টয়সহ সকল ছালেহ ইমাম ও মুজতাহিদ হক্বপন্থীদের অর্ন্তভূক্ত। তবে ইমামুল হারামাইন, আল্লামা শামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) সহ বিজ্ঞজনদের অভিমত হলো বর্তমানে ছাহাবা, তাবেয়ীগণসহ এমন কোন ইমাম বা মুজতাহিদের তাকলীদ বৈধ নয় যাদের মাযহাব ও ফতোয়া পূর্ণাঙ্গ ও সুবিন্যস্তাকারে আমাদের কাছে নেই। বিশ্লেষণের নিরিখে আমরা বলতে পারি একমাত্র চার ইমামের মাযহাব ও ফতোয়া সুবিন্যস্ত গ্রন্থাবদ্ধ। সুতরাং অনিবার্য কারণবশতঃ উক্ত চার ইমাম ছাড়া অন্য কারো তাক্বলীদ সম্ভব নয়। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী থেকে যেকোন একটি মাযহাবের অনুসরণ করা ওয়াজিব। মাযহাব না মানা পথভ্রষ্টতা।
মহান আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে তাকলীদের অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা বুঝার তাওফীক দান করুন। লামাযহাবীসহ সকল বাতিলপন্থীর মন্দ আক্বীদাহ্ থেকে আমদের ক্বলবকে পবিত্র রাখুন। কুরআন-সুন্নাহ্র নির্দেশিত সঠিক পথ ও মতে চলার মাধ্যমে দু’জাহানের সাফল্য দান করুন। আমীন, বিহুরমতি সায়্যিদিল মুরসালিন।

দ্বীনী দাওয়াত-৯ (গ)

দ্বীনী দাওয়াত-৯ (গ)
মুফতি আবুল কাশেম মোহাম্মদ ফজলুল হক

তাবলীগ জামাতের বিশ্ব মুবাল্লিগ তারিক জামিল সাহেব মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর সময়কার ঘটনাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে মধুর কিছু সংলাপ প্রচারে এনেছেন। ‘রাসূলুল্লাহ কি আজমত’ কিতাবের ১৬১-১৬৩ পৃষ্ঠায় তার ঐ সংলাপগুলো স্থান পেয়েছে। তাবলীগ জামাত বিরাট একটা দল অস্বীকার করার জো নেই। তবে বিভিন্ন দরবার ও সিলসিলায় বিভক্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীদের একত্রে আদমশুমারীর আওতায় আনা হলে সংখ্যাটি অসংখ্য গুণ বেশী হবে তাতেও কোন সন্দেহ নেই। যে সকল আক্বিদা-বিশ্বাস-আমলে সুন্নীদের সাথে তাবলীগীদের বিরোধ পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার একটি। তাদের অসহ্য যন্ত্রণার কারণ এটি। তাবলীগীদের যন্ত্রণার এই ক্ষতস্থানে তাদের মুরুব্বী তারিক জামিল সাহেব খাঁটি লবণ ছিটালেন কি না কে জানে। বক্তব্যটি পড়লে এমনই মনে হয়। ১৬১ পৃষ্ঠায় এ সংক্রান্ত শিরোনামটিই মীলাদুন্নবী- বিরোধী তাদের পাথুরে মনোভাবের উপর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত। শিরোনামটি হল ‘আপ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি পয়দায়েশ পর খুশিয়োঁ কে মানাযের’। অর্থাৎ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনের আনন্দের দৃশ্যাবলী।’ এই যে ‘পয়দায়েশ পর খুশীয়োঁ’Ñ এর আরবী ভাষান্তর করলেই তো ‘ঈদ-এ মিলাদুন্নবী’ হয়। তাবলীগী মুবাল্লিগ যা উর্দুতে বললেন সুন্নীরা তা বলে আরবীতে। এই তো পার্থক্য। মুবাল্লিগ সাহেবের শিরোনামে বুঝা গেল, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর পৃথিবীতে শুভাগমন পরম আনন্দের এবং ঐ আনন্দের অনেক দৃশ্যও তখন সংঘটিত হয়েছিল। তিনি কয়েকটি ঘটনাও উল্লেখ করেছেন।

যেমন, যে বছর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে শুভাগমন করেছেন সে বছর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর সম্মানার্থে আল্লাহ পাক দুনিয়ার কোন নারীর গর্ভে কন্যা সন্তান দান করেননি। তাঁর শুভ আগমনের দিন এক সমুদ্রের মাছ অন্য সমুদ্রের মাছকে গিয়ে মোবারকবাদ জানিয়েছিল। যেখানে মূর্তি ছিল সেগুলো ভেঙ্গে পড়তে লাগল, পূজা করার মত যেখানে আগুন জ্বলছিল তা আপনিই নিভে যেতে লাগল, আসমানে আলোকসজ্জা চলছিল এবং সাগরেও আনন্দের জোয়ার বইছিল। যখনই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পয়দা হলেন মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার সমস্ত ঘর আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। হযরত আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন, মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত আমার সামনে খুলে গেল, মাদায়েনের শাহী মহল দেখা গেল, সিরিয়ার রাজ দরবার খুলে গেল, হিরা ও ইয়েমেনের রাজ প্রাসাদগুলো আল্লাহ পাক আমাকে দেখিয়ে দিলেন।”

প্রিয় পাঠক, বিশেষত ওলামায়ে কেরাম, এই ছিল তারিক জামীল সাহেবের তাবলীগী সমাচার। কথাগুলো বড় মধুর। আরো ভালো লাগত কাকরাইলসহ তাবলীগ জামাতের ইজতিমা ও মজলিসগুলোতে যদি এ কথাগুলোর বাস্তবতা প্রদর্শিত হত।

এক সমুদ্রের মাছ অন্য সমুদ্রে গিয়েছিল প্রিয় নবীর শুভাগমনের মোবারকবাদ দেয়ার জন্য। এ বিষয়টি কে জানিয়েছিল ঐ মাছগুলোকে? মহান আল্লাহ তায়ালা। তাহলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনের মেসেজ আসমান থেকে সাগরে আসতে পারলে ১২ রবিউল আউয়ালে ঐ মেসেজ পৃথিবীর সকল মসজিদে যাওয়া প্রয়োজন। কাকরাইল থেকে তাবলীগ অধ্যুষিত সমজিদগুলোতে গেলেও ইতর বিশেষ হওয়ার কথা নয়। আসমানে আলোকসজ্জাও কুদরতি ব্যবস্থাপনার অংশ। তবে তো পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে আলোকসজ্জা করাকে বিদআত বলার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা’র ঘর আলোকিত হলো কোন্ সে নূরে? মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত মা আমেনার সামনে খুলে গেল কোন্ সে নূরে? সিরিয়া-মাদায়েন-হিরা ও ইয়েমেনের রাজপ্রাসাদগুলো উদ্ভাসিত হল কোন্ নূরে? চন্দ্র-সূর্যের আলোতে, মোটেই নয়। মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা’র নিজের অলৌকিত্বের নূরেও নিশ্চয়ই নয়। যদি তাই হত তবে তা বারই রবিউল আওয়াল নির্দিষ্ট তারিখে খাস না হয়ে বরং অন্যান্য সময়েও মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ওই প্রাসাদগুলো অবলোকন করতেন। অথচ এমনটি কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় না। তা হলে অবশিষ্ট থাকল এ কথা বলাÑ যে নূরে মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা’র ঘর আলোকিত হল, যে নূরে মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা আপন ঘরে বসেই সিরিয়া দেখতে পেলেন, গাছপালা পাহাড় পর্বতের আবরণ ভেদ করে যে নূরের শক্তিতে মা আমেনার দৃষ্টি হিরা ও ইয়েমেনের রাজ প্রাসাদে গিয়ে পড়ল, যে নূর মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা-এর দৃষ্টিকে মাদায়েনের রাজ-দরবারে পৌঁছাল, সে নূর আমাদের পেয়ারা নবী, নূরের নবী রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর। এটা এমনও নয় যে, মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা স্বপ্নে দেখেছিলেন। এটা সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থার ঘটনা। নবজাতক নবীর নূরের পাওয়ারে সিরিয়া- মাদায়েন- হিরা- ইয়েমেনের মত হাজার মাইল দূরের দৃশ্য দেখতে যদি মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা-এর সামনে পাহাড়-পর্বত কিংবা দূরত্ব বাধা না হয় তবে খোদ ঐ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া দেখতে চাইলে খোদার সৃষ্টির কোন বস্তু সামনে বাধা হওয়ার সাহস দেখাবে? যে নূর মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা-এর দৃষ্টি বাড়িয়ে দিল এতগুণ বেশী, যে হাজার মাইল দূরেও দেখা যায়, সে নূর যদি হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর চোখে লাগে তবে তো মদীনা শরীফ থেকে হযরত সারিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধের ময়দান দেখতে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়; সে নূর যদি হযরত বড়পীর আব্দুুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির চোখে আসে তবে সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থান থেকে সূর্যোদয়ের জায়গায় স্বীয় মুরীদের অবস্থা অবলোকন করতে গাউসে পাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মোটেই সমস্যা হওয়ার কথা নয় এবং সে নূরের পরশ যদি আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহিÑএর চোখে লাগে তবে হাজার মাইল দূরের ‘জামেয়া’র কুতুবখানায় উঁই পোকার কিতাব কাটার দৃশ্যও ভালই দেখা যায় আল্লামা তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর বেলায়াতের চোখে। মৌলভী সেজে হিন্দুস্থানে বসে যে লোক লিখেছে ‘দেয়ালের পেছনে কি আছে তা দেখার ক্ষমতা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর নেই’, তাকে পাষন্ড না বলে উপায় কি? তারিক জামিল-সমাচার ওই নরাধমের সবক হতে পারে ভাল মতই। মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার কোল আলো করে আসা প্রিয় দুলালের নূরের এমন দেদীপ্যমান জীবন্ত ঘটনা বর্ণনার পর সে নবীকে নূর বলতে জবান কিংবা কলমের সামনে সংশয় কিংবা কুন্ঠা আসার কথা নয়। পৃথিবীতে কত সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু নবজাতক জন্ম নেয়ার সময় হাজার মাইল দূরের বস্তু এমনভাবে গর্ভ-ধারিনী মায়ের সামনে উদ্ভাসিত হওয়ার ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নেই। এমন ঘটনা কি ভোলা যায়, এমন ঘটনা যেদিন ঘটেছে সেদিনটিকে কি স্মৃতি থেকে ফেলে দেয়া যায়। না, মোটেই না। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জন্ম এবং শিশু অবস্থায় বাক্সবন্ধি হয়ে নীল নদে ভেসে ভেসে ফেরাউনের ঘাটে যাওয়ার ঘটনা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করে মহান আল্লাহ দুনিয়াবাসীকে ভুলতে দেননি। পিতা ছাড়া আল্লাহর কুদরতি ব্যবস্থাপনায় মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম-কাহিনী এবং তাঁর উম্মতের উপর নেয়ামত স্বরূপ আসমান থেকে নাযিল হওয়া জান্নাতী খাবারের আনন্দঘন ঘটনা আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করে চির স্মরণীয় করে রেখেছেন। উম্মত হয়ে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর এমন আলোকিত আগমন, এমন আনন্দের জোয়ার তোলা শুভাগমনকে আমরা ভুলি কি করে!! আসমানে আনন্দ, জমীনে আনন্দ। প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনে এক সাগরের মাছ অন্য সাগরের মাছকে মোবারকবাদ জানানোর জন্য বের হতে বাধ্য করে তাঁর পবিত্র বেলাদতের নির্মল-নিখাদ যে আনন্দ, সে আনন্দই তো সবাইকে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর মহান জুলুসে টেনে আনে। কি বৃদ্ধ, কি শিশুÑ আনন্দের মহা জমায়েতে আজ সকলেই একাকার। প্রবল এই আনন্দের তীব্র ধাক্কা মক্কার আশে পাশের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে শিরকের শেকড় উপড়ে তাওহীদের আওয়াজ বুলন্দ করেছে। সে কারণেই পবিত্র ঈদ-এ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূলত তাওহীদকে উচ্চকিত করার মহা আয়োজন এবং ‘ফাল্ ইয়াফ্রাহু’ বলে পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে আনন্দ উদ্যাপন করার খোদায়ী নির্দেশও একই কারণেই। মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যারা শিরক বলে ঐ সকল অবিবেচক আদম এ সত্যটিই বুঝতে পারেনি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনের দিন যেহেতু আরবের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়েছিল, সুতরাং ওই দিন, মানে বারই রবিউল আওয়াল আসলেই মুসলিম মননে মূর্তি-মুক্ত ও শিরক মুক্ত হওয়ার ভাবনা ও প্রতিজ্ঞা জাগ্রত হবে নতুনভাবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনকালীন ওই ঘটনাগুলো সে কারণে বেশী করে আলোচনা করা প্রয়োজন এবং এই প্রয়োজনের অপরিহার্য বাস্তবতাই পবিত্র ঈদ-এ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর মাহফিল। যতদিন মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর মাহফিল হবে ততদিন মূর্তি-প্রতিমা ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য আমাদের সামনে আসবে, অগ্নি উপাসকদের পূজোর আগুন নিভে যাওয়ার দৃশ্য আমাদের এক আল্লাহর বিশ্বাস দৃঢ় করার নতুন প্রতিজ্ঞার জন্ম দেবে এবং এভাবে মুসলিম সমাজে তাওহীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হবে। মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর মাহফিলকে শিরক-বিদআত-নাজায়েজ ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে বন্ধ করার প্রয়াস প্রকারান্তরে তাওহীদ চর্চার আংশিক পথ বন্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টার নামান্তর। মূলত: রাসূল পাঠিয়েই যেহেতু মহান আল্লাহ তায়ালা জমীনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছেন সেহেতু তাওহীদী শিক্ষা চিরায়ত রাখতে হলে রেসালাতের ধারাবাহিক চর্চা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। সুতরাং তাওহীদের ধোঁয়া তুলে যারা রেসালতের অলোচনা তথা পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শান- মান-মর্যাদার আলোচনা ও চর্চা করাকে নিরুৎসাহিত করতে চায় তাদের এহেন তাওহীদ চর্চা ইবলিসী তাওহীদ চর্চার আধুনিক রূপ। কারণ, ইবলিস আল্লাহকে আল্লাহ স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও আদম আলাইহিস সালামের মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করেনি এবং সে কারণে আদম-সম্মানের স্বীকৃতি বিহীন তাওহীদের স্বীকৃতি মহান আল্লাহ কবুল করেননি। বরং তাকে ‘মুয়াল্লিমুল মালায়েকা’র সম্মানজনক স্থান থেকে বিতাড়িত করে মালাউন শয়তানের লাঞ্ছনাকর স্থানে নামিয়ে দিলেন। এটাই খোদায়ী বিধান। নবুয়ত ও রেসালতকে কোনভাবে অবজ্ঞা কিংবা উপেক্ষা করে খোদার আপন হতে চাইলে শয়তানে পরিণত হওয়াই কপালের লিখন। পক্ষান্তরে আল্লাহর দরবারে আপন হতে চাইলে রেসালতের সামগ্রিক চর্চা ও অনুসরণের মাধ্যমেই তা সম্ভব। সূরা আলে ইমরানের ৩৩ নম্বর আয়াতে ‘ফাত্তাবিউনি ইউহ্ বিব্কুমুল্লাহ’ দ্বারা সে কথার নির্দেশনাই প্রদান করা হয়েছে আমাদেরকে।

পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর জীবনে বদরের যুদ্ধ একটি ঘটনা। ১৭ রমযান প্রতি বছর যদি ঐ ঘটনার স্মরণে তা ‘বদর দিবস’ নামে উদ্যাপন করা যায়Ñ যা মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর বিরোধীরাও ঘটা করে উদ্যাপন করেÑ তবে পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর দুনিয়াবী জীবনের শুরুর ঐতিহাসিক পবিত্র ‘বেলাদতের’ ঘটনাকে প্রতি বছর বারই রবিউল আউয়ালে ‘বেলাদত দিবস’ তথা মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামে উদ্যাপন করা ‘বদর দিবস’ পালন করার মানদন্ডেই ইসলামী পুণ্যময় অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত হতে বাধ্য। মানে বদর থেকে ‘বদর দিবস’ যেমন অনুষ্ঠানের শিরোনাম, ‘বেলাদতে নবী’ থেকে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে রকমভাবে একটি অনুষ্ঠানের শিরোণাম। বলতে পারেন দুটোই (ধ+ন)২ এর সূত্রে গাঁথা অংক। একই নিয়মে চলে, একই গন্তব্যে গিয়ে মিলিত হয়। বদর দিবসকে জায়েজ মনে করে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নাজায়েজ বললে যে সূত্র-বিভ্রাট হবে। ট্রেনের চাকা একটিকে পেছনে রেখে অন্যটিকে যেমন গন্তব্যে পোঁছানো যায় না, মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নাজায়েজ ফতোয়া দিয়ে তেমনি ‘বদর দিবস’ উদ্যাপনকে জায়েযের গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এই দ্বৈত চরিত্রের কাজটিই চলছে আমাদের সমাজে। একটি কাজকে কলমের ভাষায় ভালো বলে মুখের ভাষায় বলে নাজায়েজ। ‘ইজম’ তাড়িত হয়ে যে কাজকে পরম পুণ্যের মনে করা হয় ঐ কাজের একই মানদন্ডের আরেকটি কাজকে ইজমের কারণেই বলা হয় বিদআত। দলের বা গোষ্ঠীর দায়িত্বে থাকা নেতা যা লিখে যায়, অনুসারীদের কাজ বা বিশ্বাসে প্রতিফলিত হয় তার বিপরীত কিছুর। এই হল আমাদের সামাজিক বাস্তবতা। নারায়নগঞ্জে এক বিচারিক আদালতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর যুগে ঈদ-এ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর মাহফিলের কোন উদাহরণ নাই এই যুক্তিতে যখন মীলাদুন্নবীকে বিরোধীরা বিদআত তথা নাজায়েজ বলল, তখন আমাদের চ্যালেঞ্জ ঘোষণা হল এই বলে যে, প্রচলিত তাফসীরুল কুরআন মাহফিলের উদাহরণও তো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর যুগে ছিল না। নবী-যুগে না থাকাই যদি হয় নাজায়েজ হওয়ার একমাত্র মানদন্ড তাহলে তো প্রচলিত তাফসীরুল কুরআন মাহফিলও নাজায়েজ হবে। অথচ প্রতিপক্ষ ঘটা করে তাফসীরুল কুরআন মাহফিল আয়োজন করে ঐ মাহফিলেই পবিত্র ঈদ-এ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিদআত ও নাজায়েজ ফতোয়া প্রদান করে। প্রতিপক্ষের দাবি অনুসারে এহেন আচরণ একটি বিদআতের আয়োজন করে অন্য জিনিসকে বিদআত বলার অপপ্রয়াস। গ্রাম্য জীবনে গুণীজনের কাছে শোনা চোরের গল্পটিও সেরকমই। চোর ধরা পড়ার ভয়ে মাথায় টুপি দিয়ে অন্যকে চোর বলে দৌড়াচ্ছে! এই যে ধরুন তারিক জামিল সাহেবের মধুর বক্তব্যটি। শিরোনাম দিয়েই তো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনের আনন্দের স্বীকৃতি দেয়া হল। অতঃপর যা লিখলেন তা তো এক কথায় তাক লাগানো। কিন্তু আমল বিশ্বাসে এগুলোর প্রতিফলন নেই।

লক্ষ্য করুন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর পৃথিবী বক্ষে শুভাগমন হল উপলক্ষ। আর মহান রাব্বুল আলামীন সারা দুনিয়ায় কোন পরিবারে মেয়েসন্তান না দিয়ে পুরো এক বছর ছেলেসন্তান দান করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেন এবং এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য হল এ উপলক্ষে সবাইকে আনন্দে রাখা। কারণ, ছেলেসন্তান, মেয়েসন্তান সবই আল্লাহর নেয়ামত হলে মানুষ সাধারণত ছেলেসন্তান পেলে তুলনামূলক আনন্দিত হয় বেশী। তাহলে তারিক জামিল সাহেবের আলোচনা থেকে যা বুঝা গেল, আমাদের পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে শুভাগমনকে ‘উপলক্ষ’ করে মহান রাব্বুল আলামীন কুদরতী কর্মসূচি গ্রহণ করলেন এবং বাস্তবায়নও করলেন। এটা বেদনার কর্মসূচি নয়Ñ ভরা আনন্দ ও খুশির কর্মসূচি।

লক্ষ্য করার বিষয়, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমন ছিল এক দিনের ঘটনা আর এ উপলক্ষে খোদায়ী কর্মসূচী ছিল পুরো এক বছরব্যাপী। আনন্দের এই কর্মসূচির আওতায় সারা দুনিয়ার সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হল। মানে পবিত্র ঈদ-এ মীলাদন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৈশ্বিক কর্মসূচি। বাংলাদেশ- পাকিস্তান- হিন্দুস্থানের যেমন, এটা সৌদি আরবেরও কর্মসূচী। জামেয়া কাদেরিয়ার কর্মসূচি যেমন, পটিয়া-হাটহাজারী-মেখল-কাকরাইলেরও কর্মসূচি। আবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমন উপলক্ষে যাদেরকে মহান আল্লাহ ছেলেসন্তান দান করলেন তাদের সকলেই কি আল্লাহ এক বলে বিশ্বাস করত? কারণ, যুগটাই যে পৌত্তলিকতার অন্ধকারের। অধিকাংশ লোকই সেই অন্ধকারের বাসিন্দা। মানে পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর আগমন উপলক্ষে কাফের-মুশরিক-বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সকলেই খোদায়ী করুণা প্রাপ্ত হল। এ তো মহান আল্লাহর আম করুণার দুনিয়ার হিস্যা। আবু লাহাবের ঘটনা কি আরও জীবন্ত নয়? ভাতিজা জন্ম নেয়ার আনন্দে সুয়াইবা ক্রীতদাসীকে আযাদ করে দিল। আনন্দ প্রকাশই তো ছিল ক্রীতদাসী আযাদ করার প্রথম এবং শেষ কথা। পরকালে কিছু পাওয়ার কোন ধারণাই আবু লাহাবের ছিল না। কারণ, সে অবিশ্বাসী ছিল। পরকাল তো দূরের কথাÑ দুনিয়ার কিছু পাওয়ার আশাও ছিল না তার। ছেলেসন্তান জন্ম নেয়া মহা আনন্দের সে যুগে চাঁদের মত চেহারা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা ভাতিজার কথা শুনে হাতের আঙ্গুলের ইশারায় সুয়াইবাকে আযাদ করে আবু লাহাব ভাতিজা পাওয়ার আনন্দটাকে উপভোগ করলো মাত্র। অথচ এ কাজটুকুই হল তার পরকালের পুরস্কারের একমাত্র পাথেয়। চিরস্থায়ী এ জাহান্নামীর সারা জীবনের কৃতকর্মের জন্য নিরন্তর শাস্তির মধ্যেও প্রতি সোমবারে কিছুটা আরাম বোধ করে সে। যে আঙ্গুল দিয়ে সুয়াইবাকে আযাদ করেছে ঐ আঙ্গুল থেকে সুমিষ্ট নহর বের হয় সপ্তাহের এই দিনে এবং আবু লাহাব তা পান করে স্বস্তি বোধ করে। কারণ, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনে আনন্দ প্রকাশ বা উদ্যাপন করেছিল সে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শুভাগমনে আনন্দ প্রকাশ করে একজন কাফেরও যদি আখেরাতে পুরস্কৃত হয়, তবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর আশেক ঈমানদার উম্মত যদি এই মহান উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করে তবে তার পুরস্কার কি হবে তা বুঝার জন্য খুব একটা ভাবনার প্রয়োজন নেই। আবু লাহাব আনন্দ প্রকাশ করেছে একদিন, একবারের জন্য। আর অনন্তকাল ধরে প্রতি সপ্তাহের সোমবারে সে পুরস্কার পেতে থাকবে! কবি নজরুল লিখেছেন, “কি পাওয়া যায় দেখ্না বারেক হযরতকে মোর ভালবেসে,” আ’লা হযরত লিখেছেন, “আন্ধে নজদী দেখলে ইজ্জত রাসুলুল্লাহ কি”। কোন কাফের-মুশরিক তাদের দুনিয়াবী জিন্দেগীর ভাল কাজের পুরস্কার আখেরাতে পাবে না। এটা ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালা। এই নীতিমালার ব্যাতিক্রম শুধু একটাই। পবিত্র ঈদ-এ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদ্যাপন তথা পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর প্রতি সম্মান ও আদব। এই শ্রদ্ধা ও আদব প্রদর্শনই ঈমানের মূল। কারণ, মহান আল্লাহ তায়ালাকে আমরা কখনই দেখিনি। তিনি আমাদের কাছে অদৃশ্য। সুতরাং খোদায়ী বিধানের সত্যতা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে যখন এই বিধান যার মাধ্যমে পাওয়া হল তার সত্যতায় আমরা পরিপূর্ণ আস্থাশীল হব। আর কাউকে পরিপূর্ণ সত্য বলে বিশ্বাস করতে হলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে পারা যায় না। সে কারণেই পবিত্র কুরআনের সুরা ফাতাহÑএর ৯ নম্বর আয়াতে পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর প্রতি নিঃশর্ত আদব ও পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও ধারণ করার জন্য মহান আল্লাহ পাক নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, বুঝা গেল অদৃশ্য প্রভুর প্রদত্ত দ্বীনের সামগ্রিক সত্যতা তারই প্রেরিত রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর প্রতি পরিপূর্ণ আদব, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার উপরই নির্ভর করে। এটাই ধর্মের মূল কথা, বিজয়ের সূতিকাগার। তার ব্যতিক্রম পরাজয়ের কারণ। ড. ইকবালও মুসলিম জগতের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে নবীপ্রেমের অভাবকেই চি‎িহ্নত করেছেনÑ “ইয়ে ফাকা কশ্ যো মউত ছে র্ডতা নেহী জেরা, রূহে মুহাম্মদ উন্ কে বদন ছে নিকা’ল দো”। নবীপ্রেমের শিক্ষার আজ বড় অভাব। পৃথিবীর মধ্যে বিশেষায়িত সিলেবাস শিক্ষা দেয়ার ও গবেষণার জন্য কত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানই তো আছে। এমন কোন্ দেশ আছে যে দেশে স্বদেশ প্রেমের অধ্যায় বা সিলেবাস কিংবা রচনা শিক্ষার সর্বস্তরে শেখানো হয় না এবং এটা একটা প্রয়োজনীয় বিষয়ও। প্রতিটি দেশেই কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান, ছবি ইত্যাদির মাধ্যমে দেশপ্রেমের চর্চা করা হয়। তাহলে যে নবী না হলে কোন দেশ তো নয়ই, কুল-কায়েনাতের কোন কিছুই সৃষ্টি হত না, তাঁর প্রেমের শিক্ষা আরো বেশী প্রয়োজন নয় কি? শিল্পীর কন্ঠে যখন ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভুমি’ উচ্চারিত হতে শুনি তখন দেশ প্রেমের সবকটি মনের অজান্তেই একবার পড়া হয়ে যায়। সে জায়গায় যদি এমনটা গাওয়া হয়, ‘এমন নবী কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল নবীর সেরা সে যে আমার প্রিয় নবী’, তবে ধর্মীয় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা সৌদি ফেরত লম্বা জুব্বা পরা বঙ্গীয় অনেক হুজুরের নাক কুচ্কে একবার শ্যান দৃষ্টিতে তাকিয়ে শিল্পীকে মনে মনে হলেও ‘বেদাতী’ বলে ছাড়বে। পিতা-মাতার প্রতি আদব পরীক্ষার রচনার শিরোনাম। শিক্ষকের প্রতি আদব ও ভালোবাসা ওস্তাদ নিজেই ছাত্রদের শেখান যতটা গুরুত্ব দিয়ে, ঐ ওস্তাদের কাছেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর প্রতি আদব ও প্রেম ভালোবাসার রচনাটি অপ্রয়োজনীয় ‘বেদাতী সিলেবাস’। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর পালক পুত্র যায়দ বিন হারেসার মাতৃ ও পিতৃ সম্পর্কীয় লোকেরা যখন তাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর কাছ থেকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলেন, তখন তাঁদের দাবী প্রত্যাখ্যান করে নবীর গোলামীতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে নবীভক্ত ঐ সাহাবী পিতা-মাতার তুলনায় নবীপ্রেম অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন; ইসলামের শত্রু কর্তৃক আহত রক্তাক্ত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে পাগলিনী মা কোলে নিয়ে যখন জিজ্ঞেস করলেন “বাবা কেমন আছ” তখন মায়ের ¯েœহ আর নিজের অসহ্য যন্ত্রণা ভুলে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ‘মা আগে বল, আমার প্রিয় রাসুল কেমন আছেন, কোথায় আছেনÑ বলে দুনিয়াবাসীকে শিক্ষা দিলেন। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিজের জীবনের চেয়েও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অধিক ভালবাসার যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন; হুদাইবিয়ার সময়কালে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে মক্কা শরীফে আসা হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে কাফেররা ‘বিশেষ বিবেচনায়’ উমরাহ করার অনুমতি দেয়ার পরও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু “আল্লাহর শপথ! আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তাওয়াফ করব না যতক্ষণ না প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফ করবেন”Ñ বলে নবী প্রেমের যে বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন; নিজের জীবননাশের আশংকা থাকার পরও হিজরতের রাতে পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর বিছানায় শুয়ে থেকে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নবীর ভালোবাসার যে উদাহরণ তৈরি করলেন, আজকের সমাজে সে শিক্ষাগুলো নতুন করে জীবন্ত করা দরকার। কিন্তু আফসোস! নবীপ্রেমের কথা কুরআনে তো আছে, কুরআন চর্চায় আমরা তা রাখিনি; নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর আদবের কথা কুরআনে আছে, কিন্তু আমাদের কুরআন গবেষণায় বিষয়টির জায়গা হয়নি।

তিক্ত হলেও একথা সত্য যে, কুরআন-হাদীস থেকে ইবাদতের সবক আমরা যেভাবে গ্রহণ করেছি, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর মহব্বতের সবক আমাদের সমাজ সেভাবে গ্রহণ করেনি। পাশাপাশি নবী-বিদ্বেষীদের অপতৎপরতায় নবীপ্রেমের বিষয়টি আজ কারও কারও কাছে এতই আতংকের যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর প্রেম-ভালবাসা চর্চা করা মানে তাদের কাছে শিরক-বিদআতে লিপ্ত হওয়া! অথচ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পিতা-মাতাসহ সকলের চেয়ে নবীর মহব্বত বেশী না হলে কেউ ঈমানদারই হবে না। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর ভাষায়, যে মহব্বত না হলে ঈমানই হয় নাÑপরিতাপের বিষয় এই যে, কিছু কিছু লোকের কাছে ঐ মুহাব্বত চর্চাই শিরক। টাকা-ডলার-রিয়ালের জোরে এসব লোকের মিছিলটি আজ বড় হয়ে নবীপ্রেমের চর্চা আস্তে আস্তে সিংহের হা’Ñ এর মুখে পড়ে গেছে। কত ইমাম সাহেব ১২ ই রবিউল আওয়াল শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে নিরপেক্ষ কিংবা ঠান্ডা মেজাজের মানুষ প্রমাণ করার জন্য ঐ দিন তওবার বয়ান করে। ভাবটা এমন যে, শানে রেসালতের ওয়াজ করলে নিরপেক্ষতা হারিয়ে মানুষ মাথা গরম বলবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শান-মান বিদ্বেষীদের রক্তচক্ষু আজ কত ইমামের হৃদকম্প বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা মসজিদ নামের প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শানে রেসালাতের বয়ান করতে ভয় পায়। সে কারণে, আজ শানে রেসালাতের চর্চার জন্য শক্ত ভিতের প্রতিষ্ঠান দরকার। যে প্রতিষ্ঠান মানুষকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামÑএর শান-মান শিক্ষা দেবে। পবিত্র জশনে জুলুসে ঈদ-এ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীপ্রেম শিক্ষা দেয়ার এক বিশেষায়িত মহান প্রতিষ্ঠান।

লেখক: ঢাকার কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়ার উপাধ্যক্ষ ও বিভিন্ন চ্যানেলে ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও আলোচক।

রাহনুমা-ই শরীয়ত ও ত্বরীকত, হযরাতুল হাজ্ব আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব [দামাত বরকাতুহুমুল আলিয়া]’র

রাহনুমা-ই শরীয়ত ও ত্বরীকত, হযরাতুল হাজ্ব আল্লামা
সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব [দামাত বরকাতুহুমুল আলিয়া]’র

দিক-নির্দেশনামূলক
ভাষণ
আ‘ঊযু-বিল্লাহি মিনাশ্ শায়ত্বানির রাজীম।
বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহীম।
ইন্নাল্লা-হা ওয়ামালা-ইকাতাহু ইয়ুসল্লূ-না ‘আলান্নবিয়্যি ইয়া- আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ
সল্লু আলায়হি ওয়াসাল্লিমূ তাসলীমা। আস্সালাতু ওয়াস্ সালামু আলাইকা এয়া রাসূলাল্লাহ্! ওয়া আলা-আলিকা ওয়া আস্হাবিকা এয়া রাহমাতাল্লিল আলামীন।
আমার অত্যন্ত সম্মানিত ক্বেবলা বাবাজী রাহ্মাতুল্লাহি আলায়হি হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং কেবলা হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির রূহানী সন্তানগণ, আমার প্রিয় ভাইয়েরা! আস্সালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্।
আমি, আপনারা সব ভাই, যত ভাই এখানে উপবিষ্ট আছেন- আন্জুমানের কর্মকর্তাবৃন্দ, জামেয়ার পরিচালক ও ব্যবস্থাপকবৃন্দ, শিক মণ্ডলী, ছাত্রবৃন্দ, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ-এর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আরো যারা উপবিষ্ট আছেন সবাইকে মুবারকবাদ দিচ্ছি। মুবরাকবাদ এজন্য দিচ্ছি যে, আজ আমরা যেখানে বসে আছি, আজ আমরা যে উদ্দেশ্যে অপেমান হয়ে বসে আছি, আজকের পর যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে ও কাজ করতে হবে- তা একটি মহান উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য মহান। আমরা হলাম নগণ্য। (মকসদ আযীম হ্যায়। হাম খাক্সার হ্যায়) আল্লাহ্ তা’আলা মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে চয়ন করে নিয়েছেন। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের চয়ন করে আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের উপর বড় ‘ইহসান’ করেছেন। (মহা অনুগ্রহ করেছেন।) আল্লাহ্ তা’আলা অন্য কারো মাধ্যমেও এ কাজ নিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন।
(হুযূর পীর সাহেব কেবলা তাঁর বক্তব্যের তরজমা করে দেয়ার আপো না করে সরাসরি তাঁর বক্তব্যের প্রতি মনোযোগ দেয়ার উপর জোর দিয়ে বলেন, সরাসরি বক্তার বক্তব্য শোনার মধ্যে একটি বিশেষ উপকার ও তৃপ্তি আছে। তিনি আরো বলেন- আপনারা উর্দু শিখুন! আমিও ইন্শা-আল্লাহ্ বাংলা শেখার চেষ্টা করবো। হযরাতে কেরামের কৃপাদৃষ্টিতে এটাও হয়ে যাবে ইন্শা-আল্লাহ্! তারপর বলেন) বাবাজীর কৃপাদৃষ্টি, হযরত চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির কৃপাদৃষ্টি, হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির কৃপাদৃষ্টি, পীরে তরীক্বত হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ দামাত বরকাতুহুমুল আলীর কৃপাদৃষ্টি আপনাদের প্রতি, আমাদের প্রতি রয়েছে।
হযরত তাহের শাহ্ সাহেব হুযূর তো, মা’শা আল্লাহ্, এ মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হলেন এ মিশনের সিপাহসালার। আর আমরা হলাম তাঁর সিপাহী। (ইউনিফর্ম পরিহিত, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত (অঝঋ) ভাইদের প্রতি ইঙ্গিত করে হুযূর কেবলা বলেন-) ওই দিকে যাঁরা বসে আছেন তাঁরাও সিপাহী, আমরাও সিপাহী। তারা ওয়ার্দি (ইউনিফর্ম) পরেছেন, আর আমরা পরিনি। আমরা যখনই বাংলাদেশে এসেছি, তখন, বিশেষ করে আজও ফোনে তাঁর সাথে আলাপ হয়েছে। আজ হযরত তাহের শাহ্ সাহেব হুযূরের ফোন এসেছে। তিনি জিজ্ঞাসা করছিলেন- গাউছিয়া কমিটির সভা হচ্ছে কিনা, হলে আমরা এখনো মিটিং এ যাইনি কেন? আমি বলেছি, আজ এখানে হরতাল হয়েছে। এ কারণে অনুষ্ঠানসূচীতে কিছুটা রদবদল করতে হয়েছে; প্রোগ্রাম শুরু হতে একটু বিল¤¦ হয়েছে। আমাদের যে উদ্দেশ্য, তাঁরও একই উদ্দেশ্য। আমি তাঁর মধ্যে এ ব্যাপারে যে আগ্রহ ও ব্যতিব্যস্ততা দেখেছি, তা আজকের প্রোগ্রামের জন্য অতি গুরুত্বগুর্ণ। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আল-হামদুলিল্লাহ্!
ভাইয়েরা আমার! আমি এব্যাপারে হযরত তাহের শাহ্ সাহেব হুযূরের কথা বললাম। বিষয়টি এ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এতে হযরত তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হিও রয়েছেন, হযরত খাজা চৌরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিও সামিল রয়েছেন। আমার আক্বার কৃপাদৃষ্টিও এর প্রতি রয়েছে আমার আক্বার দয়া এর সাথে রয়েছেন। কতোই মহান এ বিষয়!
বস্তুতঃ হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ বিগত ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এ মিশনের সূচনা করেছেন। আজ আমি সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্কে সাথে নিয়ে খানক্বাহ্ শরীফের উপর থেকে দেখছিলাম। দেখলাম এ জামেয়া, খানক্বাহ্ শরীফ তো এখন একটি পূর্ণ ‘রিয়াসত’ (ুদ্র রাজ্য বিশেষ)-এ পরিণতি হয়েছে। (দ্বীন ও শরীয়তের) একটি বিরাট বাগানে পরিণত হয়েছে। এ মহান কাজ সমাধা করে এ পর্যন্ত আসার জন্য তিনি আপনাদেরকেই নির্বাচন করেছেন।
প্রত্যেক যুগ ও সময়ের একেকটি দাবী ও চাহিদা আছে। যুগের চাহিদানুসারে বাবাজী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এসব কাজ সমাধা করেছেন। তিনি বাঁশখালীর শেখের খিলে এক মাহফিলে তাক্বরীর করছিলেন। তাক্বরীরের শুরুতে যখন আয়াত শরীফ- ‘‘ইন্নাল্লা-হা ওয়া মালা-ইকাতাহূ ইয়ুসল্লূ-না আলান্নাবিয়্যি; এয়া- আইয়্যূহাল্লাযী-না আ-মানূ-সল্লূ আলায়হি ওয়া- সাল্লিমূ তাসলী-মা’’ তিলাওয়াত করলেন, তখনতো দুরূদ শরীফ পড়া জরুরী ছিলো। কিন্তু ‘তাদের’ কেউই দুরূদ শরীফ পড়লো না। তাঁর সাথে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা বলেছেন, এরপর বাবাজী এমন ‘জালাল’ অবস্থায় ছিলেন, এতই ক্রোধান্বিত ছিলেন যে, তাঁর চোখে তখন রক্তাশ্র“ ঝরার উপক্রম হয়েছিলো। আর আপন মুরীদদেরকে বসালেন এবং বললেন, ‘‘আমাদেরকে এখানে (নাজির পাড়া) একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেখান থেকে যোগ্য ওলামা বের হবেন, সকাল-সন্ধ্যা অহরহ তাতে দ্বীনী শিা চলতে থাকবে।’’
আমি একদা একটি ফটোতে দেখছিলাম। বাবাজী দণ্ডায়মান ছিলেন। তাঁর মাথার উপর বাঁশের তৈরী ছাউনী (দালান তৈরী করার প্রাথমিক অবস্থায়) ছিলো। বাবাজীর সাথে আরো অনেকে ছিলেন। (আমি কারো নাম বলছিনা।) আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে-প্রাথমিক অবস্থায় এখানে বাঁশ-বেড়ার তৈরী ঘর দণ্ডায়মান ছিলো। তিনি ওটা দিয়ে শুরু করেছিলেন। (এটা হয়তো সেন্টারিং-এর দৃশ্য ছিলো, অথবা নির্মাণ সামগ্রী রাখার জন্য তৈরীকৃত সাময়িক ঘরের ফটো ছিলো। অন্যথায় জামেয়ার কার্যক্রম দালানেই আরম্ভ হয়েছিলো-প্রকাশক)
আজ দেখছি এ আযীমুশ্শান মাদরাসা, আযীমুশ্শান খানক্বাহ্ শরীফ! তদ্সঙ্গে এখানে তিনি খোদা ও রসূল-প্রেমের বাজার বসিয়েছেন। আজ মাত্র পঞ্চাশ/ষাট বছর হলো। যেখানে একদিন বাঁশ-বেড়া দাঁড়ানো ছিলো, সেখানে যখন আল্লাহর ওলীর হাত লাগলো, তাঁর বরকতময় ইশারা হলো, তখন আপনারা এত বড় প্রতিষ্ঠান কায়েম করেছেন; যাতে আজ প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে। এরপর থেকে আরো মাদরাসা প্রতিষ্ঠালাভ করতে লাগলো। সুতরাং এ কাজও আপনাদের অব্যাহত রাখতে হবে।
এ মাদরাসা, এ সিলসিলাহ্ একটি মজবুত কিল্লা। পুরানা যুগে সিপাহীদের জন্য কিল্লা তৈরী করা হতো। যেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহ হতো সেখানে সৈন্যদের সংরণের জন্য কিল্লা নির্মাণ করা হতো। আপনারাও তো সিপাহী, আমরাও সিপাহী। আমরা বলি-
‘‘সবসে আওলা ওয়া আ’লা হামারা নবী- সবসে বা-লা ওয়া ওয়ালা হামারা নবী’’
আমরা আযমতে মোস্তফার পতাকা উড্ডীন করে রেখেছি। বাতিলরা বলে-হুযূর -ই আকরামের সম্মান এতটুকু; এর থেকে কম করতে হবে, ইত্যাদি। আর আমরা বলি-
সবসে আওলা ওয়া আ’লা হামারা নবী-
সবসে বা-লা ওয়া ওয়ালা হামারা নবী।
আপনে মাওলা কা পেয়ারা হামারা নবী,
দো-নোঁ আলম কা দুলহা হামারা নবী-
কওন দে-তা হ্যায়? দেনে কো মুঁহ্ চাহিয়ে,
দেনে ওয়ালা হ্যায় সাচ্চা হামারা নবী।
নবীর মহত্ব বর্ণনা করা এমন বিষয়, যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান- ইন্নাল্লা-হা ওয়ামালা-ইক্বাতাহূ ইয়ুসল্লূ-না আলান্নাবীয়্যি; এয়া আইয়্যুহাল্লাযী-না আ-মানূ সল্লূ আলায়হি ওয়াসা সাল্লিমূ- তাসলীমা-। (নিশ্চয় আল্লাহ্ ও তাঁর ফিরিশ্তাগণ নবী-ই আক্রামের উপর দুরূদ পড়ছেন, (তাঁর মহত্ব বর্ণনা করছেন) হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর দুরূদ পড়ো এবং অতি যতœ সহকারে সালাম পড়ো!) যে কাজটির নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেটা তারা ছেড়ে দিচ্ছে। নির্দেশও এমনি যে, সেটা অবশ্যই পালন করতে হবে। এমন নয় যে, ইচ্ছা হলে পালন করবে, ইচ্ছা না হলে ছেড়ে দেবে। আমরা এ নির্দেশ পালন করেই যাচ্ছি, এ নির্দেশের পয়গাম মানুষের কাছে নিয়ে যাচ্ছি, যাতে হুযূর- আক্রামের চর্চা হয়।
তখন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন প্রকট ছিলো। আল্লাহর অনুগ্রহক্রমে আপনারা মাদরাসা নির্মাণ করেছেন। এ সিলসিলার ঝাণ্ডাও বাবাজীর বাচ্চাদের হাতে রয়েছে। পান্তরে, বাতিলরাও তাদের ছোট ছোট শক্তি নিয়ে এগুচ্ছিলো। সাথে সাথে হুযূর-ই আক্রামের শানে বেয়াদবীও চলতে থাকে। বাতিলরা তাদের মতা দেখাতে লাগলো। মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো। তখন বাবাজি সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি সাহেব দেখলেন, বাবাজি সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ সাহেব প্রত্য করলেন যে, বাতিল মাথাচাড়া দিয়েই যাচ্ছে। তখন তাঁরাও এ কথা প্রমাণিত করলেন যে, হুযূর-ই আক্রামের যাঁরা নাম নেন ও যাঁরা হুযূরের প্রেমিক ও প্রশংসাকারী তাঁরাও দুর্বল নন। তারা সীমাবদ্ধও নন। সুতরাং তিনি নিজের (বেলায়তী) মতা প্রদর্শন করলেন। আপনারা আপনাদের পূর্ণ সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। মাদরাসার খিদমত করেছেন, জশ্নে জুলূসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বের করেছেন। এ সবের প্রভাব এতোই কার্যকর হয়েছে যেমন- ‘স্বর্ণকারের শতসহস্র টুক্টাক্, আর কামারের হাতুড়ির এক আঘাত’’ অর্থাৎ ‘স্বর্ণকার হাজার বার টুক্টাক্ করে যতটুকু করতে পারে না,কর্ম্মকার তার হাতুড়ির একটি মাত্র আঘাতে তার চেয়ে বেশী কাজ সম্পন্ন করতে পারে।’ (উদাহরণ স্বরূপ একথা বলা হলো।)
হুযূরের রূহানী বাচ্চারা সারা বছর এমন দ্বীনী কাজ করতে থাকেন। তাঁরা চেষ্টারত থাকেন- কিভাবে হুযূর-ই আক্রামের শান-মান বৃদ্ধি পায়। যখন বাবাজির ফৌজ বের হয়, রসূলে আক্রামের আশিক্বগণ যখন লাখো লাখো সংখ্যায় বের হয়, তখন তা ওই কর্ম্মকারের আঘাতের মতো হয়ে বাতিলের উপর আঘাত করে। আ’লা হযরত বলেন-
ইয়ে রেযা কে নেযে কী মার হ্যায়,
জো বাতিল কে সীনোঁ মে ওয়ার হ্যায়।
অর্থাৎ এটা আহমদ রেযার বর্মের মার। যা বাতিলের বুকে গিয়ে আঘাত হানে। অনুরূপ, এসব খিদমত আমার আক্বার বর্মেরই আঘাত, হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটিরই আঘাত, যা বাতিলের বে গিয়ে লাগে। যখন জোরে শোরে জুলূস বের হয়, তখন বাতিলপন্থীরা নিজ নিজ ঘরে ঢুকে পড়ে। নিজেদের মুখ ঘোমটায় ঢেকে নেয়। আল্লাহর অনুগ্রহক্রমে আপনারা এখান থেকে জুলূস বের করতে শুরু করেছেন, আর এখন বাংলাদেশের কোণায় কোণায় জুলূস বের হতে আরম্ভ করেছে। যারা আগে জুলূস দেখলে চাদরে মুখ ঢেকে নিতো, তারাও আজ জুলূস বের করতে আরম্ভ করেছে।
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান- ইয়ুরী-দূনা লিয়ুত্বফিঊ-নূরাল্লা-হি বিআফ্ওয়া-হিহিম্; ওয়াল্লা-হু মুতিম্মু নূ-রিহী ওয়া লাউ কারিহাল কা-ফিরূ-ন। (তারা চায় আল্লাহ্র নূরকে মুখের ফুৎকার দিয়ে নিভিয়ে দিতে, আর আল্লাহ্ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেনই, যদিও অপছন্দ করে কাফিরগণ।) [সূরা সাফ্ : আয়াত-৮, পারা-২৮]
তারা চাচ্ছে এ নূরকে, এ সূর্যকে, যা আলোকদীপ্ত হয়েছে, তাদের মুখের ফুৎকার দ্বারা নিভিয়ে দিতে। ওই আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ, যা হুযূর-ই আক্রামেরই শান, কারো মুখের ফুৎকারেও কি নেভানো যেতে পারে? কখনো না।
নূরে খোদা হ্যায় কুফরকে আসর সে খান্দাহ্যন
ফূঁকূঁ সে ইয়ে চেরাগ বুঝায়া নেহীঁ যা সেক্তা।
(কুফরের অপৎপরতার কারণে আল্লাহর নূর আরো বেশী আলোকিত হয়; আরো অধিক শোভা নিয়ে হেসে ওঠে। মুখের ফুঁক দ্বারা এ প্রদীপকে নেভানো যায় না।)
ওইসব নির্বোধকে দেখুন! তারাও তাদের মুখের ফুঁক দ্বারা ওই প্রদীপকে নেভাতে চাচ্ছে! (এটাতো সম্ভব হয়নি, বরং নবীর মহত্ব ও মর্যাদার প্রচার আরো বেশি হয়েছে।)
এমন একটা সময় ছিলো, যার চাহিদানুসারে এ জামেয়া, এ আন্জুমান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ জুলূসের প্রবর্তন করা হয়েছে। এমনকি সময়ের চাহিদা ও দাবী যা যা ছিলো, তার সবই যথাসময়ে পূরণ করা হয়েছে। আজ থেকে ২৪/২৫ বছর পূর্বে একই কারণে ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু এ দীর্ঘ ২৪/২৫ বছরেও এ কমিটির তেমন কোন উন্নয়নমূলক কাজ নজরে পড়ছে না। অবশ্য, আপনাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে। সুতরাং আপনারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সেটার শাখা-প্রশাখা কায়েম করেছেন। আজ এ প্রতিনিধি সভায় বেইজ যাঁদের গলায় শোভা পাচ্ছে- তাঁরা সবাই ‘গাউসিয়া কমিটি’র প্রতিনিধি। আজ কমিটির ২৫ বর্ষপূর্তি (সিল্ভার জুবিলী বা রজত জয়ন্তী) উদ্যাপনের কথা চলছে কিন্তু কমিটি এখনো যেন তার প্রাথমিক পর্যায় বা সোপান অতিক্রম করছে।
আমি, বাবাজি (হযরত ক্বেবলা তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- এ যে ‘গাউসিয়া কমিটি’ গঠিত হয়ে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে। এ কমিটি গঠনের হিক্মত কি? এটা আবার কখনো ‘আন্জুমান’-এর প্রতিপ হয়ে দাঁড়াবে না তো? তখন বাবাজি হযরত তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেছিলেন, ‘‘আপনার প্রশ্নের জবাব তো আমি এখন দিচ্ছি না; সময়ই এ প্রশ্নের জবাব দেবে। হয়তো আমি তখন (এ জাহেরী) দুনিয়ায় থাকবো না।’’
আহলে সুন্নাতের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। যদি আমরা আমাদের কাজ নব উদ্যমে আরম্ভ করি, প্রতিটি অলিগলিতে, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, বাজারের দোকানগুলোতে, মোটকথা সর্বত্র আহলে সুন্নাতের বাণী পৌঁছানোর জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি, তবে এ কাজ আরো বেগবান হবে। (এ পথে আমাদের কোন ভয় নেই। কারণ) আপনাদের হাতের উপর বাবাজি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির হাত রয়েছে। আপনাদের কোন ভয় নেই। আপনারা ভয় করবেন না। আপনাদের কোন তি কিংবা অসুবিধা হবে না। আপনাদের প্রতি বাবাজি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির কৃপাদৃষ্টি রয়েছে। হযরত জুনায়দ বাগদাদীর ঘটনা পড়–ন! তিনি এমনি এক পর্যায়ে বলেছিলেন- ‘‘আমি সরকার-ই দু’আলমের দামন ধারণ করে আছি।” দামন যখন ধারণ করেছেন, তখন তিনি গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেবেন। সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে, হাত পা নাড়তে নাড়তে যদি মজবুত জাহাজে উঠে আসা যায়, তখন বাইরে ঝড়, তুফান চলতে থাকলেও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। আলহামদু লিল্লাহ! আমরাও আমাদের কাক্সিত গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বাবাজি তো আমাদেরকে এ কাজে নিয়োজিত করেছেন। এখন আমরা কি শুধু আমাদেরকে বাঁচাবো? পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য কি কোন চিন্তা-ভাবনাই করবো না? আমাদের সন্তান-সন্তুতির চিন্তা, আশ-পাশের লোকদের চিন্তা, অন্যান্য মুসলমান ভাইদের চিন্তা কি কখনো করবো না? অবশ্যই করতে হবে। এজন্যই আজ গাউসিয়া কমিটির দায়িত্ব ওই চিন্তা-ভাবনা করা। কমিটি ও এর শাখাগুলোকে ভাবতে হবে এখন কী করা চাই। কাজতো আমরা করছি। মাদ্রাসা ইত্যাদিও প্রতিষ্ঠালাভ করছে। কিন্তু অন্যদিকে বাতিলপন্থীরা নতুন নতুন পদ্ধতিতে কাজ করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় কি তাদেরকে কাজ করতে দিয়ে আমাদের নিরব থাকা উচিৎ হবে, না তাদের লাগাম ধরে রুখে দিতে হবে? হ্যাঁ, তাদের রুখতে হবে। অবশ্য, তাদের রুখার জন্য কী করা চাই? তারা যদি ভারী হাতিয়ার নিয়ে ধেয়ে আসে, তখন কি তাদেরকে হাত দিয়ে রুখবে? যদি এসব লোক অলিতে-গলিতে ও বাজারে গিয়ে তাদের হাতিয়ার ব্যবহার করে, তবে তাদেরকে রুখার জন্য কি ওই পুরানা হাতিয়ার ব্যবহার করে ান্ত হলে চলবে? অবশ্যই আমাদের নিকট পুরানা যেসব হাতিয়ার আছে সেগুলোকেও সংরণ করতে হবে।
যেমন- গাউসিয়া কমিটির শাখা-প্রশাখাও গঠন করতে হবে, মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি বলছি না- ওইসব কাজ ছেড়ে দিন, এ কাজগুলো করুন। জামেয়াগুলোও পরিচালনা করতে হবে, মাদরাসাও চালাতে হবে, সিল্সিলার কাজও চালিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে বাইরে থেকে আমাদের দ্বীনের উপর যেসব হামলা চালানো হচ্ছে তার মোকাবেলার জন্যও আমাদের অনুরূপ হাতিয়ারব্যবহার করতে হবে। আমাদের নিজেদেরকে বাঁচাতে হবে, আমাদেরও ভাইবোনদের বাঁচাতে হবে। হুযূর আলাইহিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর উম্মতকে বাঁচাতে হবে।
আর এখন তো ফিৎনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ফিৎনা খুব দ্রুত গতিতে ছড়ায়। কিন্তু তার পরিণাম ভাল হয় না। আমি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে যাচ্ছি না। হুযূর- আক্রামের পবিত্র যুগের ঘটনাবলীরও কোন উদ্ধৃতি এখন দিচ্ছি না। আমি এ যুগের কথা বলছি। পাকিস্তানে এসব গোস্তাখ রাতের বেলায় পাহাড়ের উপর থেকে ডেকে ডেকে বলে, হে অমুক! আমরা আগামী কাল সকালে তোমাদের অমুককে যবাই করে ফেলবো। বাস্তবেও তারা সকালে এসে গণ-মানুষেরই সামনে মানুষ যবাই করে। আউলিয়া-ই কেরামের নিদর্শনগুলোকেও ছাড়ছে না। সেখানে গিয়ে, মাযারে গিয়ে যায়েরীনকে হত্যা করছে। মাযারের পবিত্রতা বিনষ্ট করছে। কিন্তু (পাকিস্তানের) আর্মি ও প্রশাসন নিরব থাকে। তাছাড়া, তারা জিহাদের নামে হাজার হাজার মানুষকে পাহাড়ের উপর থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। টেনে-হিঁছড়ে নিয়ে গিয়ে গর্ত ও নদীতে ফেলে দিয়েছে। সম্মানিত মানুষকে অপমান করে লাশ বানিয়ে নিপে করেছে। অতি দ্রুতগতিতে এসব অপকর্ম সম্পন্ন করেছে। আমাদেরকেও ফিৎনার পথ রুদ্ধ করতে হবে। নিরাপত্তা ও শান্তির পথ খুঁজে বের করে মানুষকে ওই পথে চালাতে হবে।
এ েেত্র আউলিয়া কেরামের মিশনই একমাত্র মুক্তির পথ। বাতিলগণ এ মিশন থেকে মানুষকে সরাতে চায়। যখন থেকে মানুষ আউলিয়া-ই কেরামের মিশন থেকে সরে গেছে, তখন থেকে তারা ফিৎনার শিকার হয়েছে। আমাদের কাজ বাতিলের সাথে লড়াই করা; হযরাত (আউলিয়া-মাশাইখ)-এর দামনের সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করা, যাতে ফিৎনার পথ রুদ্ধ করা যায়। দুনিয়া থেকে এখন নিরাপত্তা ও শান্তি চলে গেছে। এমতাবস্থায় নিজেদেরকে ও আমাদের সন্তান-সন্তুতিকে বাঁচাতে হবে। মুসলমানদের রা করতে হবে। যদি আমরা এ কাজটি না করি, আল্লাহ্ মা করুন! আমরা যদি এ কাজ থেকে বিরত থাকি, তবে হে আমার সাথীরা! আমাদের আক্বা নারায হবেন, তাজদারে মদীনা অসন্তুষ্ট হবেন। লোকেরা গোমরাহ্ হতে থাকবে। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানদের এ কান্তিকালে এর খিদমত আন্জাম দেয়া আপনাদের দায়িত্বে বর্তানো হয়েছে। আল্লাহর মিশন আপনাদের হাতে দেয়া হয়েছে। অবশ্য আপনারাও দায়িত্ব পালনের প্রমাণ দিয়েছেন। তখন এক সময় ছিলো। বাবাজি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি আয়াত শরীফ পড়েছিলেন। কেউ সেটার জবাবদাতা ছিলো না। (তার প্রতিকারও তিনি করেছেন।) আজ চতুর্দিকে দুরূদ শরীফের সুরে আকাশ-বাতাস মুখরিত হচ্ছে। কবি বলেন-
আজ উন্কী মাহাক্নে দিলকে গুন্ছে খিলা দিয়ে
জিস রাহ্ চল দিয়ে কূসে বসা দিয়ে।
(আজ তাঁর খুশ্বু হৃদয়ের বৃে ফুল ফুটিয়েছে। তিনি যে পথ দিয়ে গিয়েছেন সেটাকে আবাদ করে দিয়েছেন।)
তিনি (হযরত বাবাজি সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি) আজ বাংলাদেশের অলিতে গলিতে পর্যন্ত যিকরে মোস্তফা (হুযূর করীমের চর্চা) ছড়িয়ে দিয়েছেন। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন। নিজেরা দুরূদ শরীফ পড়ছেন, অন্যান্য লোকও পড়ছেন। এমনকি বাতিলগণও হিদায়ত লাভ করে দুরূদ শরীফ পড়ছে। এ ইশক্বে মোস্তফার উন্নতি সাধন আপনাদেরই দায়িত্বে বর্তানো হয়েছে। অবশ্য ইশক্বের পাঠশালার ধরণ কিছুটা ভিন্ন। কবি বলেন-
মকতবে ইশ্ক্ব কা আন্দায নিরালা হ্যায়।
উস্কো ছুট্টি নেহীঁ মিলী, জিস্নে সবক ইয়াদ কিয়া।
(ইশক্বের পাঠশালার নিয়ম-নীতি ভিন্ন ধরনের। এখানে ওই শিার্থী ছু’টি পায় না, যে সবক হৃদয়স্থ করেছে।)
এমনিতে মাদ্রাসা ও স্কুলগুলোতে নিয়ম হচ্ছে- যে ছাত্রটি সবক শিখে ফেলে তাকে শিক বলেন- শাবাশ! তুমি যেহেতু সবক শিখে নিয়েছো, সেহেতু তোমার ছুটি! তুমি যেতে পারো! কিন্তু এ ইশক্বের পাঠশালায় আপনারা যেহেতু সবক শিখে নিয়েছেন, সেহেতু আপনারা ছুটি পাবেন না। গাউসিয়া কমিটির দায়িত্ব আপনাদের পালন করতে হবে। এ কাজ আপনাদেরই দায়িত্বে। একথা আমি বলছি না। আমি টেপ রেকর্ডারের প্লেয়ার-যন্ত্র মাত্র। যেমন- মাওলানা সাহেব ওয়ায-তাক্বরীর করেন। সেটা রেকর্ডার রেকর্ড করে, আর প্লেয়ার সেটাই শোনায়। খিদমতের এ সব কথাও আমি বলছি না, হযরত তাহের শাহ্ সাহেব ক্বেবলা বলছেন না। এটা আমার আক্বার ফরমান। মাশা-ইখ হযরাতের ইচ্ছা। তাঁরা আপনাদের থেকে কাজ নিতে চান। আমরা তো সিপাহী (সিপাহ্সালারের নির্দেশ পালন করা আমাদের কাজ)। আমরা এখানে এসেছি মেহমান হিসেবে। এ সফরে কখনো এখানে আসি, কখনো ওখানে যাই। কাজ কিন্তু আপনাদেরকেই সমাধা করতে হবে।
দেখুন! কান্ত হয়ে পড়বেন না। অলসতা করবেন না। কেউ যদি অলসতা করে, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। এ অলসতার পরিণতিও আজব ধরনের! আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
ওয়া ইন্ তাতাও ল্লাউ ইয়াস্তাবদিল কাউমান গায়রাকুম আল আয়াত…।
অর্থাৎ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, যে দায়িত্ব বর্তানো হয়েছে তা পালন করতে গিয়ে যদি অলসতা করো, আর একথা ভাবো যে, ‘আমরাতো জুলূস বের করছি, ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্যাপন করছি, মাদরাসাও পরিচালনা করছি। আবার এর উপর হযরত তাহের শাহ্ সাহেব ক্বেবলা বলছেন- গাউসিয়া কমিটিতেও এসে কাজ করো, আমরা এতোগুলো কাজ করতে পারবো না!’ আমার কথা হলো আপনারা একথা ভাবতেও পারবেন না! আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমাচ্ছেন-
‘‘ফাইন তাতাওয়াল্লাউ’’ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, ‘‘ইয়াস্তাবদিল ক্বাউমান গাইরাকুম’’- এ জায়গায় তোমাদের ব্যতীত অন্য জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে দেবেন। আপনাদেরকে ডিউটি থেকে সরিয়ে দেবেন। এটা কতো ভয়ানক কথা! আল্লাহ্ তা‘আলা অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে দেবেন। কাজতো আল্লাহ্ পাক নেবেনই। কাজ করতে করতে আগে বাড়তে হবে; পেছনে যাবেন না। এ কথার দায়িত্ব তো আল্লাহ্ তা‘আলা আপন বদান্যতায় নিয়েছেন- কাজ কার থেকে নেবেন।
কাজ করার জন্যও বিশেষ বিশেষ লোক থাকে। এ বিশেষ লোক হিসেবে আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাদেরকে বেছে নিয়েছেন। কথিত আছে যে, মুহাব্বতের জন্যও কিছু খাস্ দিল্দার লোক থাকেন। আর ওই খাস দিলদার লোক আপনারাও। যদি আমরা অনুপযুক্ত প্রমাণিত হই তবেই তো ‘ইয়াস্তাবদিল ক্বাউমান’ আল্লাহ্ অন্য জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসবেন। বলবেন- ‘তোমরা পেছনে সরে দাঁড়াও। অন্য জনগোষ্ঠী একাজ সমাধা করবে।’ সুতরাং খোদা না করুন, এ কাজ যদি আমরা করতে ব্যর্থ হই, তবে তা আমাদের অকৃতকার্যতার পরিচায়ক হবে। এ কেমন মারাত্মক অকৃতকার্যতা? দুনিয়াতেও অকৃতকার্য, আখিরাতেও অকৃতকার্য। এ কারণে কাজ আপনাদেরকে করতেই হবে। হযরাত এ কাজ আপনাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আজই আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যে সব লোক কান্ত- পরিশ্রান্ত হয়ে গেছেন, তাঁরা যেন চুপিসারে কেটে পড়েন। কিন্তু আপনাদের দ্বারা এমনটি হতে পারে না। হযরত ইমাম হোসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁর সাথীদের বলেছিলেন, খুব সম্ভব এটা তাঁর শাহাদাতের পূর্ববর্তী রাতে বলেছিলেন, ‘‘হে আমার সাথীরা! এটা অতি মুশকিল কাজ। মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এর হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই।
আমি দৃঢ়তার সাথে দ্বীনের হিফাযত করবোই। এটা বড়ই সংকটপূর্ণ সোপান। যদি তোমরা চাও, তবে আজ রাতেই তোমরা চলে যেতে পারো। যদি আমার সামনে থেকে চলে যেতে তোমাদের লজ্জাবোধ হয়, তবে আমি চেরাগ নিভিয়ে নিচ্ছি। অন্ধকারের মধ্যেই তোমরা চলে যেতে পারো।’’ কিন্তু তাঁর সাথীরা বলেছিলেন, ‘‘আমরা আপনাকে ছেড়ে যেতে পারি না।’’ এ মিশনেও আপনাদের মধ্যে হোসাইনী জযবাহ্ থাকতে হবে। এ জয্বাহ্ (উদ্দীপনা) নিয়েই আপনাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। কাজের প্রয়োজন। যদি কেউ একথা বলেন- ‘আমাদের এসবের দরকার নেই।’ (তবে এটাতো হতেই পারে না।)
বাজারে গিয়ে লোকেরা সওদা টেষ্ট করে নেয়। আমাদের পানি রাখার প্রয়োজনে আমরা বাজার থেকে কলসী কিনি; কিন্তু কেনার আগে কলসীটাকে ভাল করে দেখে নিই-তাতে কোন ছিদ্র আছে কিনা। যদি ঠিকটাক পাই তবে সেটা উপরে তুলে বাজিয়ে দেখি- আওয়াজ সঠিক আসছে কিনা। যদি আওয়াজও সঠিক আসে তবেই সেটা খরিদ করি। বাবাজি আপনাদেরকেও সওদা করেছেন। কিন্তু যারা কান্ত হয়ে পড়েছেন, আর বলেন- ‘আমাদের এখন ছুটির দরকার, তাহলে ছুটি তো নেই-ই। (শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হযরত পীর সাহেব ক্বেবলা বলেন), ‘‘এমন কেউ আছেন কি?’’ (সবাই বললেন, ‘‘না’’।)
(হুযূর ক্বেবলা খুশী হয়ে পবিত্র ক্বোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-)
আল্লাহ্ তা‘আলার ফরমান হচ্ছে- ‘‘ওয়ালতাকুম মিন্কুম উম্মাতুঁই ইয়াদ্‘ঊ-না ইলাল্ খায়রি ওয়া ইয়া’মুরূ-না বিল মা’রূ-ফি ওয়া ইয়ানহাউনা ‘আনিল মুনকারি;’’ (তরজমা: তোমাদের মধ্য থেকে একটা দল এমনই হওয়া চাই যে, তারা সৎকাজের প্রতি ডাকবে, ভাল কথার হুকুম দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে। আর এসব লোক সফলকাম।) [পারা-৪, রুকূ-২’ কান্যুল ঈমান]
নেকীর দিকে নম্রতা ও ভালবাসার সাথে মানুষকে আহ্বান করতে হবে।
এ কাজ সিলসিলাও করছে, জামেয়াগুলোও করছে, একই কাজ গাউসিয়া কমিটিকেও করতে হবে। তবে প্রত্যেক কাজের একটি স্বতন্ত্র ধরন রয়েছে। এ দেখুন, ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ (প্রণীত ও প্রকাশিত) হয়েছে। এখানে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান সাহেবও আছেন, তাঁর সাথে অন্যান্য দ আলিমগণও রয়েছেন। তাঁরা আমাদের হাতে ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ পৌঁছিয়েছেন। এ ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ প্রত্যেকের নিকট থাকা চাই। এটা পড়তে হবে। এটাও পড়বেন, সাথে সাথে ক্বোরআন মজীদ এবং হাদীস শরীফও পড়বেন। আমি মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান সাহেবের সাথে কথা বলেছি। মাশাআল্লাহ! তিনি বলেছেন- বাংলা ভাষায় ক্বোরআন মজীদের তরজমা (অনুবাদ)ও হয়েছে, তাফসীরও হয়েছে- ‘কান্যুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান’ এবং ‘কান্যুল ঈমান ও নূরুল ইরফান’ হাদীস শরীফও হয়েছে; যেমন- ‘মিরআত শরহে মিশকাত’। আপনাদের মাহফিলগুলোতে এ তরজমা ও তাফসীর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলো) থেকে বয়ান করবেন, তরবিয়াতী নেসাব থেকেও। আমাদের বুনিয়াদী কাজ হচ্ছে- ক্বোরআনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। আমাদেরকে একথা বুঝতে হবে যে, মুসলিম উম্মাহ্র ক্বোরআনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কতোই ভয়ঙ্কর!
আপনারা একটি বিষয় ল্য করেছেন, মসজিদগুলোতে এটা দেখা যায় যে, বাতিল ফির্কাগুলো ক্বোরআনকে পেছনে ঠেলে দেয় আর তাদের তাবলীগী নেসাবকে এগিয়ে দেয়। আর আমাদের ডাকতে হবে ক্বোরআনের দিকে। এখানে একটি বুঝার বিষয় রয়েছে। তা হচ্ছে এ যে ‘তারবিয়াতী নেসাব’ তৈরী করা হয়েছে তা আমাদের সিল্সিলার পরিচয় বহন করে। কিন্তু মূল মকসূদ (উদ্দেশ্য) হচ্ছে ‘ক্বোরআন’। সুতরাং সাথে সাথে ক্বোরআনের চর্চাও চালিয়ে যেতে হবে। যেমন-প্রত্যেক মাহফিলে পবিত্র ক্বোরআন থেকে, হোকনা একটি দু’টি আয়াত একজন তাফসীরসহ পড়বেন, আর সবাই শুনবেন। তারপর ‘হাদীস-ই রসূল’ এবং ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ থেকেও একই নিয়মে পড়বেন ও শুনবেন। ‘গাউসিয়া নেসাব’ থেকে আমলের বিষয়গুলোও পড়বেন। হুযূর ক্বেবলা মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান’র উদ্দেশ্যে বলেন) ক্বোরআন মজীদ ও হাদীস শরীফ থেকে কিছু বিষয়বস্তু নির্বাচন করে দিতে হবে।
এর কর্ম-পদ্ধতি হচ্ছে- প্রত্যেক বৃহস্পতিবার আসরের পর, আসরের নামাযের পর, এ কাজের জন্য বিভিন্ন ‘টীম’ তৈরী করবেন। মহল্লায়-মহল্লায়, অলিতে গলিতে ও বাজারগুলোতে আর যেখানে যেখানে প্রয়োজন মনে করবেন তিন-তিন, চার-চার, পাঁচ-পাঁচ জনের টীমগুলো গিয়ে মানুষকে দাওয়াত দেবেন-‘‘ভাই! মাগরিবের নামাযের পর অমুক মসজিদে একটি সংপ্তি দ্বীনী মাহফিল হবে। আসুন! মাহফিলে ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে আলোচনা (বয়ান) হবে।’’ যে ক্বোরআনকে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হিদায়তের জন্য দিয়েছেন, তা থেকে সারগর্ভ আলোচনা হবে। গণমানুষকে একথা বুঝানোর চেষ্টা করবেন যে, আমরা ক্বোরআনকে ছেড়ে দেয়ার কারণে আজ লাঞ্ছিত হচ্ছি। আল্লামা ইকবালও একথা বলেছেন-
উয়হ্, যমানে মে মু‘আয্যায থে মুসলমাঁ হো-কর,
আওর তোম খা-র হুয়ে তা-রেকে ক্বোরআঁ হো-কর।
অর্থ: মুসলমানী নিয়ে তারা মুখ্য ছিলো ধরা তলে, আর তোমরা ক্বোরআন ছেড়ে যাচ্ছো আজি রসাতলে। [জাওয়াব-ই শেক্বওয়া]
অর্থাৎ মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কও দুর্বল হয়েছে ক্বোরআনকে ছেড়ে দেয়ার কারণে। বাতিল ফির্কাগুলোর কাণ্ড দেখুন! তারা সুকৌশলে ক্বোরআনকে পেছনে ঠেলে দিয়ে তাদের নেসাবকে এগিয়ে দিয়েছে। এভাবেই তারা এগিয়ে চলেছে। আমরা কিন্তু ক্বোরআনকে আগে আগে রেখে, আমাদের নেসাবকে সাথে রেখে এগিয়ে যাবো। ইন্শা-আল্লাহ্! আমরা এ কাজ শুরু করবো।
তারপর মাগরিবের নামাযের পর থেকে এশা পর্যন্ত এ দাওয়াতী মাহফিল করবেন। মসজিদগুলোতে এশার নামায যথাসময়ে সম্পন্ন করে নেবেন। আর কতটুকু সময় লাগে তা-ই নেবেন। অবশ্য মসজিদ ছাড়া অন্যত্র, যেমন-এখানে (খানক্বাহ্ শরীফ) ইচ্ছা করলে আমরা এশার নামায একটু দেরীতেও সম্পন্ন করতে পারি। এ কাজের জন্য যতটুকু সময়ের দরকার তা অবশ্যই ব্যয় করবেন। সাথী-বন্ধুদের এতে সামিল করবেন, যথানিয়মে এ প্রোগ্রামকে বাস্তবায়িত করবেন। যেসয জায়গায় আমাদের গাউসিয়া কমিটি আছে, সে সবস্থানে ভাইদের সাথে আলিমদেরকে সামিল করবেন। আমি আলিমদের উদ্দেশ্যেও বলছি- আপনাদেরও এ কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আপনাদেরও সময় দেয়া দরকার। গাউসিয়া কমিটি ও এর শাখাগুলো এ কাজের মনিটরিং করবে। এটা অতি প্রয়োজনীয়। তারা এসব কাজের রেকর্ড সংরণ করবেন।
আমাদের গাউসিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আপনি এগিয়ে আসুন! আপনি আরো তৎপর হোন! আপনার দায়িত্ব পালনে স্থির ও অবিচল থাকুন! বাতিলের সাথে মোকাবেলা করতে হবে! জওয়ানদের মতো আপনাকে কাজ করতে হবে। কমিটিগুলোর আপনাকে খবর রাখতে হবে। সেগুলো সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি না থাকলে চলবে না।
এটা একটা জিহাদ। যুদ্ধের ময়দানে এক ধরনের জিহাদ। এটাও দ্বীনী/এক ধরনের জিহাদ। এটা নাফ্সের সাথে জিহাদ। এটা বৃহত্তর জিহাদ। একদা ময়দানে কুফর ও কাফিরের সাথে জিহাদ ছিলো। সাহাবা-ই কেরাম যুদ্ধ করে ফিরে এসেছেন। হুযূর-ই আকরামের দরবারে বর্ণনা দিচ্ছিলেন কে কিভাবে যুদ্ধ করেছেন, কতজন শহীদ হয়েছেন, কতজন জখমপ্রাপ্ত হয়েছেন। কে কতজন কাফিরকে কতল করে জাহান্নামে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন ইত্যাদি। তখন হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন- ‘‘এখন জিহাদে আসগর থেকে জিহাদে আকবরের দিকে যাও! ছোটতর জিহাদ থেকে বৃহত্তর জিহাদের দিকে অগ্রসর হও! আশাদ্দুল জিহাদি জিহাদুল হাওয়া।’’ (কঠিনতর জিহাদ হচ্ছে নাফ্স বা প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করা)। দেখুন! যে জিহাদের মধ্যে কাফিরদের মোকাবিলা ছিলো, যেখানে জীবন-মৃত্যুর ব্যাপার ছিলো, সেটা ছিলো ছোটতর জিহাদ। আর যে কাজ আপনাদের দ্বারা নেয়া হচ্ছে সেটা হচ্ছে জিহাদে আকবর (বড়তর জিহাদ)। এ জিহাদেও আপনাদেরকে কামিয়াব হতে হবে। জিততে হবে। এ জন্য কর্মতৎপর হতে হবে, কিছু সময় ব্যয় করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
আপনারা যখন এ কাজ শুরু করবেন, তখন বাতিল ফির্কাগুলো পেরেশান হয়ে যাবে। তখন বাতিল ফির্কাগুলো আপনাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রও করতে পারে; যাতে আপনাদের কাজ রুখে যায়। সুতরাং এমন যেন না হয় যে, কিছুদিন এ কাজ করবেন, তারপর স্তব্ধ হয়ে যাবেন। না, আপনাদেরকে এ দায়িত্ব (যিম্মাদারী) পালনই করতে হবে। এ কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ কাজ করতেই হবে। আমি কিন্তু মৌখিক জমা-খরচে বিশ্বাস করি না। হযরাতে কেরামও রাখেন না কারণ, মৌখিক জমা, খরচও হয়ে যায়। তাই এ কাজ জযবাহ্ নিয়ে, আগ্রহের সাথে করতে হবে। বাতিল আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ছে, তাদের অশুভ দৃষ্টি এখন আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রতি। তাদের দৃষ্টি এখন আমাদের প্রতিটি জিনিষের দিকে। এখন যদি আমরা নিদ্রাবিভোর হয়ে থাকি, তখনতো তারা আরো বে-পরোয়া হয়ে যাবে। এর পরিণাম কি হবে?
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন- ‘‘ইন্নাল্লাহা লা- ইয়ুগায়্যিরু মা- বিক্বাউমিন হাত্তা- ইয়ুগায়্যিরু- মা- বি আন্ফুসিহিম।’’ (নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা কোন জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতণ না তারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে।) আল্লাহ তা‘আলা একথাও এরশাদ করেছেন, যা আমি পূর্বেও উল্লেখ করেছি, যদি তোমরা অলস হয়ে যাও তবে আল্লাহ তা‘আলা অন্য জনগোষ্ঠীকে তোমাদের স্থলে নিয়োগ করবেন। তারা বলবে, তোমরা পেছনে যাও, এ কাজ তোমাদের দ্বারা হবে না। এটা তোমাদের সাধ্যে নেই।’ সুতরাং আমাদের অবস্থা আমাদেরকেই বদলাতে হবে। এজন্য প্রস্তুতি আমাদেরকেই নিতে হবে। আজই আমাদেরকে ডিসাইড করতে হবে। ফয়সালাকারী আলোচনা করে নিতে হবে। আমরা চুপ করে বসে থাকলে তো বাতিল এগিয়ে যাবে। সুতরাং বাতিলকে আপনাদেরকেই রুখতে হবে। ‘‘আমরা বাতিলকে রুখবই’’-এ জয্বা আমাদের থাকতে হবে। অবশ্য, কাজের জন্য চাই জোশ, আর কাজ করতে বের হলে প্রয়োজন হবে হুঁশ। বাতিলদেরকে আর আমরা পথভ্রষ্ট করতে দেবো না।
এ কাজের জন্য ‘বিস্তরাহ্’ (বিছানা ইত্যাদি) বহন করতে হবে না। বিছানা ইত্যাদির উপর তো আমাদেরই সাওয়ার হবার কথা। তা আমাদের উপর কেন সওয়ার হবে? এটাতো ‘নেছার’ বা স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। সুতরাং যেসব জায়গায় আপনাদের সাথী (সহকর্মী) আছেন, যেখানে আমাদের মারকিয (শাখা-প্রশাখা, সুন্নী ও পীরভাই) আছে, ওই জায়গার জন্য বের হোন! যেখানে গাউসিয়া কমিটির শাখা-প্রশাখা রয়েছে, ওখানে প্রোগ্রাম তৈরী করুন! আমাদের সংখ্যা তো, আলহামদু লিল্লাহ্; ছোট নয়, অনেক বড়। কাজেই, হযরাতেরও উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমরা বসে থাকি। তাঁরা চান আমরা ময়দানে বের হয়ে পড়ি।’ ‘ইন্শা-আল্লাহ্! আমরা অবশ্যই বের হবো! এটা কোন মা’মূলী কাজ নয়। তাই হিকমতের সাথে আমরা বের হবো। বাহ্যত! এটার প্রকৃতি যাই মনে হোক না কেন? এর ফলাফল অতি চমৎকার। হুদায়বিয়ার সন্ধির ধারাগুলো বাহ্যত আমাদের দুর্বলতার পরিচায়ক বলে মনে হয়েছিলো। কিন্তু তা ছিলো হিকমত বা প্রজ্ঞায় ভরা। এটা মহা বিজয়ের দরজা খুলে দিয়েছিলো। কাফিরগণ হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মক্কায় বহু কষ্ট দিয়েছিলো। তাঁকে হিজরত করতে বাধ্য করেছিলো। হুযূরের সাথে সাহাবা-ই কেরামও হিজরত করেছেন- কেউ আগে, আর কেউ পরে। কিন্তু এসব কাজেই অগণিত হিকমত ছিলো। সুতরাং আমাদের মধ্যেও কাজের জন্য চাই জোশ ও উদ্দীপনা, আর কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে চাই হিকমত বা সুন্দর সুন্দর কৌশল।
আমাদের এ কাজ করতে হবে বড়ই নম্রতার সাথে। ভালবাসার সাথে, যখন আমরা কাজ শুরু করবো তখন হিকমতের সাথে করবো। সঠিক দিক-নির্দেশনা মেনে চলবো। এটা অত্যন্ত জরুরী।
এ প্রসঙ্গে আমি আলোচনা করেছি। এ মুহূর্তে আমাদের চাই একটি ‘থিংক ট্যাংক’ (চিন্তা-গবেষণার বিভাগ)। প্রত্যেক বিষয়ের জন্য একটি বিশেষ ‘জনগোষ্ঠী’ থাকা দরকার। যেমন কেউ থাকেন লেখক, কেউ বক্তা, কেউ পাঠক ও গবেষক। আমি আরো আলোচনা করবো। এ থিংকট্যাংকার গাউসিয়া কমিটি সুন্দরভাবে পরিচালনা পন্থা-পদ্ধতি তৈরি করবেন। ‘ফিডব্যাক’ বের করবেন। বিগত সময়গুলোতে আমাদের সামনে যে সব সমস্যা এসেছে, আগামীতেও আসতে পারে। সেগুলোও তাতে আসতে হবে। তাঁরা বসে গভীরভাবে পর্যবেণ ও চিন্তা-ভাবনা করে সেগুলোর সমাধান বের করবেন। আমরা যদি হিকমত ছেড়ে দিয়ে শুধু জয্বাহ্ (আবেগ) নিয়ে চলি, তবে আমরা হয়তো কাক্সিত ফল পাবো না। এ কাজের জন্য জযবাহ্ও থাকতে হবে, হিকমতও। এ দু’টি সাথে নিয়ে এগুতে হবে। আপনারা সিদ্ধান্ত নিন। ইন্শা-আল্লাহ, আল্লাহ্ তা‘আলাই আপনাদের হিফাযত করবেন। হযরাতে কেরামের কৃপাদৃষ্টির সন্ধানে থাকুন! তাঁদের কৃপাদৃষ্টি আমাদের প্রতি থাকলে, ইন্শা-আল্লাহ্, আমরা কামিয়াব হবোই। আল্লাহ্ তা‘আলা নসীব করুন! আমীন!!
আরো একটি কথা আমি বলতে চাই। তা হলো-
গাউসিয়া কমিটি ও এ মিশনের জন্য যদি কোন পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তবে টেলিফোনেও কথা হতে পারে। আমি আসতেও পারবো। এমনকি এক ঘন্টার জন্যও যদি প্রয়োজন হয়, তবে আমি এসে যাবো ইন্শা-আল্লাহ! সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ও আসতে পারবে। যখনই এতদুদ্দেশ্যে প্রয়োজন হবে, আমরা দৌঁড়ে এসে যাবো, ইনশা-আল্লাহ্! আমাদের চাই কাজ।
আর একটি কথা। তা হচ্ছে- আপনারা কখনো ভুলবেন না যে, এ ‘গাউসিয়া কমিটি’ যা বাংলাদেশে গঠিত হয়েছে, যদি আমরা কাজ করি, তবে আপনারা দেখবেন- এটার কাজ সমগ্র দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। আজ গোটা দুনিয়া উদ্গ্রীব হয়ে আছে। ইনশা-আল্লাহ্ এটাকে গোটা দুনিয়ায় প্রসারিত করতে হবে।
আপনারা ভাইদের আমি পুনরায় শোক্রিয়া আদায় করছি, ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ সব কাজ, মাদ্রাসা পরিচালনা, গাউসিয়া কমিটি চালানো- একেক টি বড় বড় কাজ। মুহাব্বত ও জয্বার সাথে এগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য তো আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ্র সন্তষ্টি রয়েছে, তাঁর মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সন্তুষ্টির মধ্যে, তাঁর মাহবূবের সন্তুষ্টি নিহিত আছে তাঁর মাহবূবের আশিক্বদের সন্তুষ্টির মধ্যে, ওলী ও গাউসগণের সন্তুষ্টির মধ্যে। হুযূরের সন্তুষ্টি, ইনশা-আল্লাহ্, আমাদেরকে আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছাবে।
আপনারা ধন্য। এটা হযরাতের প থেকে একটা তোহ্ফা। এটাকে সংরণ করুন! আপনারা ভাগ্যবান। এ সৌভাগ্যের জন্য আপনাদের গর্ববোধ করা দরকার। তাকাব্বুর বা অহংকার নয়, আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা চাই। গোটা দুনিয়াও এমন সৌভাগ্যের জন্য হা-পিত্যেশ করছে। আল্লাহ তা‘আলা কাজ আমাদের থেকে নিচ্ছেন! আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাদেরকে কাজের উপর দৃঢ়তা দান করুন! আমীন!!
ওয়া -আ-খির দাওয়া-না আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন!!।

অঙ্গীরকারনামা
আমাদের মনে হয়, আমরা যে কাজটি করতে যাচ্ছি, আমরা আজ যে কাজের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি, সেটাকে আমাদের পূর্ণ নিয়ম মাফিক ও গুরুত্বসহকারে সম্পন্ন করতে হবে। আমার ধারণা মতে এটা একটা বড় কাজ। কোন বড় কাজ অঙ্গিকার সহকারে করা চাই, অঙ্গিকারও, আল্লাহর দরবারে দো‘আ-প্রার্থনাও। আসুন, আগামীতে যে কাজটি করবো, তা অঙ্গিকারের সাথে করি!

অঙ্গীকার
আ‘ঊযু বিল্লাহি মিনাশ্ শায়ত্বানির রাজীম। বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম। হে আল্লাহ্! আমি আজ অঙ্গীকার করছি যে, দ্বীনের উন্নতি, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান-ই আক্বদাসের উন্নতি এবং আক্বীদার সংরণের জন্য যেই যিম্মাদারী গাউসিয়া কমিটির প থেকে আমাদেরকে অর্পন করা হয়েছে, ও হবে, গাউসিয়া কমিটির প্রোগ্রাম অনুসারে (সেটা) এ অপরিহার্য কাজ আমি পালন করবো। হযরাত, হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে আমাদের প্রার্থনা- হুযূর করীমের ওসীলায় আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের পথ প্রদর্শন করুন!
এ অঙ্গীকার পূরণ করবো, দিনরাত এর জন্য মেহনত করবো এবং প্রয়োজন অনুসারে সঠিক পথে, সিরাতে মুস্তাক্বীমের উপর অটল থাকার জন্য হযরাতের প থেকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, তা আমি যথাযথভাবে পালন করবো।
আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সাহায্য, মদদ ও দৃঢ়তা দান করুন! আর হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দয়া ও ‘শাফা‘আত-ই ক্বুব্রা’ নসীব করে ধন্য করুন! আমীন!!