মিলাদ ও কিয়াম সম্পর্কে আলোচনা | জসিম উদ্দিন আজহারী

নূর নবী সম্পর্কে আলোচনা | জসিম উদ্দিন আজহারী

ইসলামে হজ্জের গুরুত্ব

ইসলামে হজ্জের গুরুত্ব
আবু হোরায়রা বর্ণিত এক হাদিসে ইসলামের
নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম
বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ্জ করে
এবং অশ্লীল ও গোনাহের কাজ থেকে বেঁচে
থাকে, সে হজ্জ থেকে এমতাবস্খায় ফিরে আসে
যেন আজই মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়েছে।
অর্থাৎ জন্মের পর শিশু যেমন নিষ্পাপ থাকে,
সেও তদ্রূপই হয়ে যায়।” [৩] আরেকটি হাদিসে
তিনি বলেছেনঃ “শয়তান আরাফার দিন হতে
অধিক লজ্জিত ও অপদস্থ আর কোনো দিন
হয় না, কেননা ওই দিন আল্লাহতায়ালা স্বীয়
বান্দার প্রতি অগণিত রহমত বর্ষণ করেন ও
অসংখ্য কবিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” তিনি
আরো বলেছেনঃ “একটি বিশুদ্ধ ও মকবুল হজ্জ
সমগ্র পৃথিবী ও পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুর চেয়ে
উত্তম। বেহেস্ত ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু
তার প্রতিদান হতে পারে না।”
অর্থ
ইসলামের বর্ননা অনুসারে হজ্জ একটি
আবশ্যকীয় বা ফরজ উপাসনা। এটি ইসলামের
৫ম স্তম্ভ। হজ্জ শব্দের আভিধানিক অর্থ
“ইচ্ছা” বা “সংকল্প” করা। আচার ও আদব-
কায়দার বিবেচনায় হজ্জ হলো বৎসরের
নির্দ্দিষ্ট দিনে নির্দ্দিষ্ট পোশাকে কয়েকটি
স্থানে অবস্থান বা ওকুফ, ক্বাবা শরীফের
তাওয়াফ, পশু কোরবানী, নির্দ্দিষ্ট স্থানে
পরপর ৩দিন কংকর নিক্ষেপ এবং সাফা-মারওয়া
টিলাদ্বয়ের মধ্যে হাঁটা।
হজ্বের ঐতিহাসিক পটভূমি
কাবাঘরে সর্বপ্রথম হজ্জ আদায় করেন
ইসলামের নবী আদম ; তারপর নূহ সহ অন্য
ইসলামের অন্যান্য নবী-রাসূল এ দায়িত্ব পালন
করেন। ইব্রাহিম (আ:) এর সময় থেকে হজ্জ
ফরয বা আবশ্যকীয় ইবাদত হিসেবে নির্ধারিত
করা হয়। হিজরি সনের ১২তম মাস হলো
জিলহজ্জ মাস। ইসলামের বর্ননা অনুসারে এই
সময়ই স্রষ্টা ইব্রাহিম কে হজ্জ ফরজ হওয়ার
কথা ঘোষণা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।
কোনো কোনো বর্ণনায় আছেঃ এ আদেশের
পর ইব্রাহিম আবু কোবাইস পাহাড়ে আরোহণ
করে দুই কানে অঙ্গুলি রেখে ডানে-বামে এবং
পূর্ব-পশ্চিমে মুখ ফিরিয়ে ঘোষণা করেছিলেনঃ
লোক সব, তোমাদের পালনকর্তা নিজের গৃহ
নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর এই গৃহের
হজ্জ ফরজ করেছেন। তোমরা সবাই
পালনকর্তার আদেশ পালন করো”। এই বর্ণনায়
আরো উল্লেখ আছে যে ইব্রাহিম এর ঘোষনা
স্রষ্টার পক্ষ থেকে বিশ্বের সবখানে পৌঁছে
দেয়া হয়।[৪]
হজ্জ-এর বিভিন্ন আচার-কায়দা ইব্রাহিম এর
জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন ইসলামিক
বর্ননায় উল্লেখ আছে ইব্রাহিম স্রষ্টার
নির্দেশে তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরাকে নির্জন
মরুভূমিতে রেখে এসেছিলেন। সেখানে, ক্বাবা
শরীফের অদূরে, বিবি হাজেরা নবজাত শিশু
ইসমাইল কে নিয়ে মহাবিপদে পড়েছিলেন।
সাহায্যের জন্য কাউকে না পেয়ে তিনি পানির
খোঁজে সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে
দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। এই ঘটনাকে স্মরন
করেই হজ্জের সময় মুসলিমদের জন্য সাফা-
মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে হাঁটার নিয়ম রয়েছে।
ইসলামিক বর্ননায় উল্লেখ আছে স্রষ্টা
বেহেশত বা স্বর্গ থেকে আদম ও হাওয়া কে
যখন পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন, এতে তারা পরস্পর
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে উভয়ে
আরাফাত ময়দানে এসে মিলিত হন। এই ঘটনার
কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজ্বের একটি অংশ হিসেবে
মুসলিমরা আরাফাতের ময়দানে এসে উপস্খিত
হয়ে স্রষ্টার কাছে কান্নাকাটি করে ইবাদতে মগ্ন
হন।

বাংলা মিলাদ শরীফ | জসিম উদ্দিন আজহারী

হযরত আলী (রা.)-এর প্রজ্ঞা ও বীরত্ব

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ অনুসারী যে চারজন বিশেষ মর্যাদাবান সাহাবী খোলাফায়ে রাশেদীন হিসেবে মুসলিম উম্মার কাছে সম্মানিত, হযরত আলী (রা.) হলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি মহানবী (সা.)-এর জামাতা। তিনি যেমন ছিলেন বীর যোদ্ধা তেমনি ছিলেন জ্ঞানী ও বিদ্বান। রাসূল (সা.) তাঁকে ‘জ্ঞানের দরজা’ আখ্যায়িত করেন। শৌর্য-বীর্যের জন্য তিনি ‘আসাদুল্লাহ’ আল্লাহর সিংহ ও ‘ইয়াদুল্লাহ’ আল্লাহর হাত উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ৫৮৬টি হাদীস বর্ণনা করেন এবং তিরাশিটি সশস্ত্র জিহাদে বিজয় লাভ করেন।

সাহাবীদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ছিলেন সুপন্ডিত। অনন্য জ্ঞান প্রজ্ঞার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ নৈকট্যে থেকে সূরা নাজিলের প্রেক্ষেতসহ আয়াতসমূহের অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করার সুযোগ লাভ করেন তিনি। তিনি আল কুরআনের অন্যতম সংকলক। হযরত ওমর (রা.) কে হিজরত হতে মুসলিম সন গণনার পরামর্শ দেন তিনিই। হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, ‘আলী না হলে ওমর ধ্বংস হতো।’

আলী (রা.)-এর অসাধারণ বাগ্মিতা ও সাহসিকতার কাছে সকল প্রতিদ্বন্দ্বীই হার মানতো। তিনি ছিলেন সুকবি। তাঁর কবিতার বিভিন্ন সংকলন হয়েছে। ‘দীওয়ান-ই-আলী’ তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কাব্য সংকলন। মুসলিম বিশ্বে তো বটেই, এর বাইরেও তাঁর কাব্য সমাদৃত হয়েছে। সার্বজনীন ও কালোত্তীর্ণ বাণী ও শিল্পসৌন্দর্যে এ গ্রন্থ কালজয়ী।

হযরত আলী (রা.) মানবিক সকল মহত গুণে ও কর্মে অত্যুজ্জ্বল এক মর্দে মুজাহিদ। তাঁর অসাধারণ বিচারবুদ্ধি প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ধৈর্য, বীরত্ব ও ত্যাগ সাধনা অতুলনীয়। তিনি মানবতার মূর্তপ্রতীক।

হযরত আলী (রা.)-এর মতো এত সব বড় বড় মহত গুণে উজ্জ্বল ব্যক্তি আর নেই। মুসলিম জাতির মর্যাদা ও গৌরব সমুন্নত করে রেখেছেন তিনি ইতিহাসে। আলী (রা.) সত্যি-আলী। এমন বিশাল মহত ব্যক্তির মহত্ত্ব ও কার্যাবলী যত বেশি আলোচনা করা যায়, যত বেশি প্রচার করা যায়, পাঠকগণ ততবেশি অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত হবেন।

এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে হযরত আলী (রা.)-এর অসাধারণ প্রজ্ঞা সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি, সাহসিকতা, বীরত্ব ত্যাগ-সাধনা, ন্যায় বিচার ও মানবতা বোধ সম্পর্কে টুকরো টুকরো কিছু চমকপ্রদ ঘটনা গল্পাকারে এ গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘দীওয়ান-ই-আলী’ থেকে কয়েকটি কবিতা সংযোজন করে দেয়া হয়েছে। কবিতার টুকরোগুলো মনিমুক্তার মতো উজ্জ্বল ও মূল্যবান উপদেশপূর্ণ। আশা করি সবার ভালো লাগবে, বিশেষ করে তরুণ সমাজ প্রেরণা পাবেন।

মহানবী (সা.)-এর বাণী

এক. আমি প্রজ্ঞার নগরী আর আলী তার তোরণ।

দুই. হে আলী, তোমার সাথে আমার বন্ধন, তুমি আমার ভাই এ জগতে এবং পরজগতে।

তিন. যে ব্যক্তি আমার বন্ধু সে আলীরও বন্ধু, আর যে আলীর বন্ধু সে আমারও বন্ধু।

চার. আলী আমার একাংশ আর আমি আলীর একাংশ।

পাঁচ. আলীর তলোয়ারের এক আঘাত আসমান ও জমিনের সবার ইবাদতের চেয়ে শ্রেয়।

ছয়. হারুন যেমন মুসার প্রতিনিধি, আমার পক্ষ থেকে তুমিও সেরূপ প্রতিনিধি।

পরিচয়: হযরত আলী (রা.)। শৌর্যে-বীর্যে আশ্চর্য রকম দীপ্তিময় একটি নাম। বিশ্বের ইতিহাসে অনেক জ্ঞানী-গুণী, ধ্যানী সাধক কবি সাহিত্যিক, রাষ্ট্রনায়ক, সাহসী সেনানায়ক বীর যোদ্ধা এবং আরো অনেক মহত গুণের অধিকারী ব্যক্তি রয়েছেন। কিন্তু হযরত আলী (রা.)-এর মতো এত সব বড় বড় মহত গুণের উজ্জ্বল ব্যক্তি আর নেই। তিনি অতুলনীয়। আলী (রা.) সত্যি-আলী। মুসলিম জাতির মর্যাদা এবং গৌরব সমুন্নত করে রেখেছেন ইতিহাসে।

মহানবী (সা.) নবুওত প্রাপ্তির দশ বছর আগে হযরত আলী (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। প্রিয় রাসূল (সা.)-এর রক্তের সাথে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আলীর পিতা আবু তালিব মুহাম্মদ (সা.)-এর আপন চাচা। সেই সূত্রে তিনি নবীজীর আপন চাচাতো ভাই। তাঁর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ নবীজীর ফুফু।

হযরত আলীর (রা.) জন্ম হয়েছিল কাবা ঘরে। কারো কারো মতে কাবা শরীফের ভিতরে নয়, পাশে কোন হাশেমীর ঘরে। তবে একথা সত্য যে, তাঁর জন্মস্থানে পবিত্র কাবা ঘরের ছোঁয়া ছিল। এই পবিত্র পরশই ক্রমে তাঁর জীবনকে করেছে উজ্জ্বল ও মহান। তাঁর নানার নাম ছিল আসাদ। তাই তাঁর মাতা ফাতিমা ছেলের নাম রেখেছিলেন-আসাদ। ‘আসাদ’ অর্থ সিংহ। বস্ত্তত হযরত আলীর জীবনী আলোচনা করলে এই নামের সার্থকতা উপলব্ধি করা যায়। সিংহের মতোই তেজ আর শক্তি ছিল তাঁর।

ছেলের ‘আসাদ’ নামটি পিতা আবু তালিবের পছন্দ হয়নি। ভাবলেন, তাঁর ছেলের নাম হবে আরো সুন্দর, আরো মিষ্টি। কি দেয়া যায় নাম!

তিনি ছেলের নাম রাখলেন-আলী।

আলী শব্দের অর্থ-সমুন্নত।

তাঁর ছেলে সমস্ত ভয়ভীতি, লোভলালসার ঊর্ধ্বে। হিংসা ঘৃণা ছুবে না তাঁর পা। ত্যাগে সাধনায় জ্ঞানে গুণে হবে অতুলনীয়।

পিতার দেয়া নামেরও তিনি ছিলেন সার্থক রূপকার।

শৈশবে আলী (রা.)-এর পেট কিছুটা মোটা ছিল। এ নিয়ে সমবয়সীরা তাঁকে যথেষ্ট হাসি ঠাট্টা করত। তাতে তিনি মোটেও চটতেন না। বরং তাদের হাসিপরিহাস যেন নিজেও উপভোগ করতেন। আবু সাঈদ তামীমী বলেছেন, আমরা তাঁকে পেটমোটা বলে উপহাস করলে তিনি মোটেও রেগে যেতেন না, উল্টো পরিহাস করে বলতেন, ‘হ্যাঁ, পেটটি আমার মোটাই বটে, তবে তা বেশি খাবার কারণে নয়। এতে অনেক বিদ্যাবুদ্ধি আর ইলম জমা আছে বলেই এমন মোটা দেখাচ্ছে।

মহানবী (সা.) আলীকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। একবার আবদুল্লাহ ইবন আববাস জিজ্ঞেস করেন, আববাস মহানবী (সা.) কয়জন পুত্র ছিলেন। সবাই বাল্যকালে মারা গেছেন। তবু কোনটিকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন? হযরত আববাস (রা.) জবাব দেন-আলীকে। আব্দুল্লাহ আবার বলেন, আববা, আমি তো তাঁর পুত্রদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছি।

হযরত আববাস বলেন, মহানবী (সা.) তাঁর পুত্রদের চেয়ে আলীকেই বেশি ভালবাসতেন। তিনি বাইরে না গেলে আলীকে আমি অতি অল্প সময়ের জন্যেও তাঁর কাছ ছাড়া হতে দেখিনি। আলী মহানবীর প্রতি যেরূপ অনুরক্ত ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কোনো পুত্রকেও আমি পিতার প্রতি তত অনুরক্ত ও ভক্তি পরায়ণ দেখিনি।

হযরত আলী (রা.) দশ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে মজার একটি ঘটনা আছে। মহানবীর ঘরের দিকে চোখ পড়ে বালক আলীর। চমকে ওঠলেন তিনি। বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকালেন। এমন কান্ড আগে তিনি দেখেননি। রাসূল (সা.) আর বিবি খাদিজা (রা.) তাঁদের কপাল মাটিতে ঠেকাচ্ছেন। অথচ সামনে কেউ নেই, কিছু নেই। সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রশংসা করছেন। প্রার্থনা শেষ হলে আলী তাঁদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন বিষয়টির কথা। মহানবী (সা.) মধুর হেসে বললেন, আমরা এক আল্লাহর ইবাদত করেছি।

তিনি তাঁকেও সত্যের ছায়ায় আসার পরামর্শ দিলেন। এবার ভাবনায় পড়লেন আলী। বাপদাদার ধর্ম মূর্তিপূজা ছোট থেকে দেখে আসছেন। এখন বিনা চিন্তায় কি করে একে গ্রহণ করবেন? ইসলাম যে সত্যের কথা বলছে তা তিনি বুঝেছেন। তবু কেমন একটা বাধো বাধো লাগে। বাবাকে না জানিয়ে তো কিছু বলা যায় না। তাই বাবার অনুমতি নেয়ার জন্য মহানবী (সা.)-এর কাছে সময় চেয়ে নেন।

মহানবী এবার ভাল করে বুঝালেন আলীকে। বললেন, এ ব্যপারে কারো সাথে আলোচনা করা ঠিক হবে না। তুমি নিজেই গভীরভাবে চিন্তা করো। নিজের মন থেকেই উত্তর পেয়ে যাবে। সত্যি সত্যিই তিনি উত্তর পেয়ে গেলেন। তাঁর মনে পড়লো পিতার কথা। পিতা আগেই বলেছিলেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর যে কোন আদেশ বিনাদ্বিধায় মেনে নেবে। তাই পরেরদিন ভোরে তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। পঁচিশ বছর বয়সে হযরত আলী (রা.) রাসূল (সা.)-এর আদুরে কন্যা ফাতিমাকে বিয়ে করেন। ফাতিমার বয়স তখন পনের কি ষোল।

হযরত আলী (রা.) আপন সত্তাকে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্তার মধ্যে বিলীন করে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ছিল এক দর্পন স্বরূপ। এই দর্পনের মধ্যে রাসূল (সা.)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই প্রতিফলিত হতো। আল্লাহর রাসূলের সমগ্র রূপটি যদি কোনো মানুষের মধ্যে দেখার ইচ্ছে হয়, তবে হযরত আলীর চরিত্র এবং জীবন যাত্রার দিকে তাকাতে হবে।

অপত্য স্নেহ আদর ও ভালবাসায় নবী (সা.) আলীকে লালন পালন করেন। তাঁরই শিক্ষায় আলীর চরিত্র মহামানবীয় গুণে মাধুর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

হযরত আলী (রা.) খলিফা ছিলেন, সেনানায়ক ছিলেন, পন্ডিত ছিলেন, কবি ছিলেন, বাগ্মী ছিলেন এবং সব কিছুর উপরে তিনি ছিলেন মানুষ। মানব গুণের চরম ও পরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল তাঁর মধ্যে।

নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের অপর এক সাফল্য আলীর মানস গঠন। তাঁরই যতন্ন পরিশ্রম হাতের ছোঁয়া এবং সাধনার ফসল আলী (রা.) মানবতার গৌরব। সাধনার পথে সিদ্ধির পথে অগ্রসর হতে হতে মানুষ এমন স্তরে উন্নীত হয় যখন হয়তো স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে অন্তরাল থাকে না। স্রষ্টা আপন সৃষ্টিতে গর্ববোধ করেন।

রোম সম্রাটের প্রশ্নের জবাব: হযরত ওমর (রা.) খেলাফত কালে রোম সম্রাট কয়েকটি জটিল প্রশ্ন দূতের মাধ্যমে হযরত ওমর (রা.)-এর কাছে পাঠান। খলিফা প্রশ্নগুলো পাঠ করে বুঝতে পারলেন এর জবাব দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কে জবাব দিবেন? জবাব তো দিতেই হবে। খলিফা সোজা চলে গেলেন হযরত আলীর (রা.) কাছে। তাঁকে দেখালেন প্রশ্নগুলো। হযরত আলী (রা.) প্রশ্নগুলো পাঠ করে তখনই খুব দ্রুত কাগজে জবাব লিখে খলিফার হাতে তুলে দেন। খলিফা কাগজগুলো ভাঁজ করে দূতের হাতে দেন। দূত জিজ্ঞেস করেন, জবাবদাতা কে?

হযরত ওমর (রা.) বলেন, আলী। ইনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পিতৃব্যপুত্র, জামাতা এবং বন্ধু।

মুক্তি পেয়ে গেল কয়েদী: ভাষা আল্লাহর এক অপরিসীম নিয়ামত। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে অন্যতম পার্থক্য ভাষা। একই ভাষার একই শব্দের রয়েছে নানা রকম অর্থ ও মর্ম। কখনো ব্যবহার হয় মূল অর্থে। আবার কখনো ব্যবহার হয় রূপক অর্থে। বক্তার ভাষার অর্থ সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে ঘটে বিপদ। ভাষার মারপ্যাঁচ বুঝতে না পালে শ্রোতার যেমন লজ্জা পেতে হয়, বক্তার ভাগ্যে ঘটে যায় জেল-হাজত বাস। এমনি এক ঘটনা ঘটেছিল দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের সময়ে। এক ব্যক্তি উপস্থিত হলো তাঁর দরবারে। সে নির্ভীক চিত্তে খলিফাকে উদ্দেশ্য করে বললো, নিশ্চয় আমি ফিতনাকে ভালোবাসি, হককে অপছন্দ করি এবং যা দেখিনি, তার সাক্ষ্য প্রদান করি।

সাংঘাতিক কথা!

সে আর যায় কোথায়!

এত বড় দুঃসাহস খলিফা ওমরের সামনে। যাকে মহানবী (সা.) মুসলিম উম্মার মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ পালনে কঠোরতম ব্যক্তি বলেছেন। তাঁর সামনে থেকে কি এই ব্যক্তি রেহাই পেতে পারে? সে নিজেই তিনটি অন্যায়ের স্বীকৃতি প্রদান করছে। প্রথম কথা, যে ফিতনাকে ভালোবাসে, যে ভালোবাসার কোনো প্রশ্নই ওঠতে পারে না। দ্বিতীয় কথা, যে হক অপছন্দ করে, অথচ হককে পছন্দ করাই স্বাভাবিক। তৃতীয় কথা, যে না দেখে সাক্ষ্য প্রদান করে, যা গুরুতর অন্যায়। তাই খলিফা ওমর (রা.) তখনই তাকে বন্দী করে পাঠালেন কয়েদ খানায়।

লোকটি তার বক্তব্যে কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করল না। আবার খলিফাও স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন বিধায় কোনো রকম সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন মনে করা হলো না। চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো সংবাদটা। মহান খলিফা ওমর, যিনি সত্য প্রতিষ্ঠায় আর অন্যায় মিথ্যা দূরীকরণে বজ্রকঠোর তাঁর সামনে এমন নির্ভয় স্বীকারোক্তি করে লোকটা শুধু অন্যায়ই করেনি, এর জন্য শুধু জেল নয়, আরো কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। জনগণ তার সে কঠিন শাস্তির দিন গুনছে।

মহাজ্ঞানী রহস্য উন্মোচনকারী ও সূক্ষ্মদর্শী হযরত আলী (রা.) শুনতে পেলেন ঘটনাটা। তিনি সাথে সাথেই বুঝতে পারলেন লোকটির কথার মর্ম। তিনি সোজা চলে গেলেন ওমরের দরবারে। শুরু করলেন কথাবার্তা।

হযরত আলী : হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি অন্যায়ভাবে লোকটিকে বন্দী করেছেন।

খলিফা : কেন? সে নিজ মুখে স্বীকার করেছে, একটি নয়, তিনটি অপরাধ করেছে।

হযরত আলী : লোকটি বলেছে, আমি ফিতনাকে ভালোবাসী। এর দ্বারা সে বুঝাতে চাচ্ছে যে, সে সম্পদ ও সন্তানকে ভালোবাসে। কেন না, আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের সম্পদরাজি ও সন্তানাদি হচ্ছে ফিতনা। লোকটি আরো বলেছে যে, সে হককে অপছন্দ করে। এ কথার দ্বারা সে বুঝাচ্ছে যে, সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে। যা অবশ্যই হক ও চিরসত্য। কেন না, আল্লাহ বলেছেন, মৃত্যু যন্ত্রণা অবশ্যই আসবে। তৃতীয় কথা, লোকটি বলেছে, আমি যা দেখিনি, তা সাক্ষ্য দিই। একথার অর্থ হলো, সে এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ আছেন এবং এক, অথচ সে তাঁকে দেখেনি।

হযরত আলী (রা.)-এর এই ব্যাখ্যা শুনে খলিফা ওমর (রা.) লোকটির কথার মর্ম বুঝতে পারলেন এবং তখনি চিৎকার দিয়ে বলে ওঠলেন, ‘হায়! যদি না হতো আলী, তাহলে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেতো ওমর।’ এরপর কি আর লোকটি হাজতে থাকতে পারে? সাথে সাথেই সে মুক্তি পেল। লোকমুখে চারদিকে প্রচারিত হতে লাগলো হযরত আলী (রা.)-এর তত্ত্বজ্ঞান আর অসাধারণ বিচার ক্ষমার কথা। (চলবে)

সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
প্রভাষক, আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
জামেয়া কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

নাম ও উপনাম : সৈয়্যদ আহমদ শাহ, বাংলাদেশের জনগণের কাছে তিনি ছিরিকোটি হুজুর বা পেশোয়ারী হুজুর নামে পরিচিত।
জন্ম ও বংশ পরিচিতি: তিনি ১৮৫৭ সালে পাকিস্থানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান খায়বার পাখতুনখা-KPK) হাজারা জিলার অন্তর্গত ছিরিকোট নামক গ্রামের সম্ভ্রান্ত রাসূল বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। শাজরা শরিফের বংশনামা অনূযায়ী তিনি প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ৩৯ তম নূরানী সন্তান। তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত সৈয়্যদ গফুর শাহ প্রকাশ কাপুর শাহ সর্বপ্রথম দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে বর্তমান পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ সিরিকোট অঞ্চলে আসেন এবং বিজয় ও আবাদ করেন। এ জন্য তাঁকে ফাতিহে সিরিকোট বা সিরিকোট বিজেতা বলা হয়। তিনি ছিলেন হযরত সৈয়্যদ আহমদ সিরিকোটি রহমাতুল্লহি আলায়হি’র ঊর্ধতন ১৪তম পূর্বপুরুষ।
শিক্ষাকাল: অতি অল্প বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন মুখস্ত করেন। অতঃপর স্বদেশে ও বিদেশে দ্বীনি শিক্ষার বিভিন্ন সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ বিষয়ে অসাধারণ পান্ডিত্য অর্জন করেন এবং উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৮৮০ সালে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘ফাযিল’ সনদ লাভ করেন।
বায়আত ও খিলাফত লাভ: দীর্ঘ দিন ব্যবসা ও দ্বীনী কর্মে আফ্রিকায় অবস্থানের পর ১৯১২ সালে আফ্রিকা হতে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং হযরত আল্লামা আবদুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র হাতে ক্বাদিরীয়া ত্বরীকায় বায়‘আত গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর সিরিকোটের পাহাড় হতে ১১ মাইল দূরে পীরের লঙ্গর খানার জন্য কাঠ বহন করে আনতেন ১৯২৩ সালে তিনি তাঁর পীর কর্তৃক খিলাফত ও ইজাযত প্রাপ্ত হন।
অবদান: আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটির উল্লেখযোগ্য অবদান হল-
১. আফ্রিকার ক্যাপাটাউন, জাঞ্জিবা ও মোমবাসা শহরে সেখানকার জনগণের মাঝে দ্বীনী দাওয়াত পৌঁছান। এ সময় তিনি শিয়া সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদ হতে সাধারণ মুসলমানদের আক্বিদা-আমল সংশোধনে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তাদেরকে সুন্নী-হানাফী মাযহাবে দীক্ষিত করেন। সেখানকার ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, তিনিই সেখানে সর্বপ্রথম মসজিদটি নির্মাণ করেন।
২. পীরের নির্দেশে তিনি ১৯২০ সালে র্বামার উদ্দেশ্যে পুনরায় স্বদেশ ত্যাগ করেন এবং সেখানে প্রায় ষোল বছর অবস্থান করেন। সেখানকার বিভিন্ন মসজিদে তিনি ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সাধারণ মুসলমানদেরকে ইসলামের সঠিক রূপরেখার দিক-নির্দেশনা দান করেন। মাযহাব-মিল্লাতের খিদমাত সূচারূপে বাস্তবায়ন কল্পে তিনি ১৯২৫ সালে আনঞ্জুমান-এ-শুরায়ে রহমানিয়া নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. ১৯৪১ সালে রেঙ্গুন হতে তিনি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আসেন এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সঠিক আক্বিদার প্রচার-প্রসারে আত্ম নিয়োগ করেন। তিনি সুন্নি আক্বিদা প্রচারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। তরিকতের কর্ম সম্পাদনের জন্য আনঞ্জুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া বাংলাদেশ, নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন; যার মধ্যমে আজ বাংলাদেশে শতাধিক সুন্নি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে ইসলামের সঠিক মতাদর্শ বাস্তবায়নে হাজার হাজার আলেমে দ্বীন তৈরিতে নিরলস অবদান রেখে চলেছে। রাজধানী ঢাকার জামেয়া কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা ১৯৬৪ সালে তারই সুযোগ্য উত্তরসূরী ও একমাত্র সন্তান হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি’র পবিত্র হস্তে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. তাঁর পীর খাজা আব্দিুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি রচিত ত্রিশপার সম্বলিত অদ্বিতীয় দূরুদ শরিফের কিতাব ‘মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রকাশনা তাঁরই পবিত্র হস্তে সম্পাদিত হয়।
৫. বাংলাদেশে ‘মাসলকে আ’লা হযরত’ (ইমাম শাহ আহমদ রেযা খান বেরেলভী রাহমাতুল্লাহি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামের সঠিক মতাদর্শ) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
কারামাত:
১. আধ্যাত্মিক উৎর্কষতা সাধনে আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র অদম্য স্পৃহা ও মনের ব্যাকুলতা দেখে তার পীর হযরত আল্লামা আবদুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁকে আশ্বস্থ করেন। স্বয়ং আল্লামা সিরিকোটি রহমাতুল্লাহিআলায়হি তা বর্ণনা প্রদান করেন এভাবে, “একদা আমি হুযুর কিবলা আল্লামা আবদুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি’র হুযরা শরীফের সম্মুখস্থ বারান্দায় এ বিষয়ে চিন্তা মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ হুযুর দরজা খুলে এসে আমাকে উদ্দেশ করে সম্মুখস্থ নবনির্মিত মসজিদের দিকে ইশারা করে বলতে লাগলেন-“দেখ! এই মসজিদের বাইরে চুনকাম করা হচ্ছে।” পরে দেখা গেল, আমি চৌহর শরীফে যাতায়াতকালে যখনই কোন কিছুর দিকে দেখি না কেন; তা আমাকে সালাম দিতে থাকে আর আমিও সালামের উত্তর দিতে লাগলাম। পরে বুঝতে পারলাম যে, এ দ্বারা আমার সময় নষ্ট হচ্ছে তাই সে দিকে খেয়াল ছেড়ে দিলাম।
২. আল্লামা সিরিকোটি রহমাতুল¬াহি আলাইহি যখনই মসজিদে রুকু-সিজদা করতেন, তখন তাঁর সাথে সাথে মসজিদের মিনার কাত হয়ে যেত। এমনকি মসজিদের আশে-পাশের গাছ-গাছালিকেও সিজদায় অবনত হতে দেখা গেছে। তা দেখে সেখানকার খ্যাতনামা অলি আবদুল হামিদ প্রকাশ সুলতানুল আউলিয়া একদা শোরগোল করে উঠেন এবং বায়’আত হওয়ার অভিলাষ ব্যক্ত করলেন।
৩. বাঙ্গালী মসজিদে তিনি প্রত্যহ আসরের নামাজের পর তাকরীর করতেন। সেখানে উপস্থিত মুসল্লীদের জন্য তিনি প্রতিদিন একপোয়া (২৫০ গ্রাম) ওজনের খাবার সংকুলান হয়, এমন ডেক্সিতে হালুয়া রান্না করতেন এবং নিজ হাতে পরিবেশন করতেন। দেখা যেত- কোন কোন দিন ৪০ থেকে ৫০ জনও উপস্থিত থাকত। সবাই সমানভাবে খাবার গ্রহণ করতেন।
৪. উক্ত মসজিদের মুয়াজ্জিন বলেন, একদা আমি মাগরিবের সময় মসজিদ সাফ করে সংলগ্ন হাউযে গেলাম, তখন দেখি তিনি সেখানে অযু করতেছেন। ঐ সময় মসজিদের দোতলায়
গিয়ে দেখি তিনি সেখানে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে তাকরীর ফরমাচ্ছেন।
৫. ১৯২৮ সালে শা’বান মাসের ৩ তারিখ, বুধবার যোহরের সময় হুযূর কিবলা আল্লামা সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র প্রথম পুত্র আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সালিহ শাহ রহমাতুল্লাহি আলায়হি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সে দিন আসরের নামাযের পর আল্লমা সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি বার্মার রেঙ্গুনের বাঙ্গালী মসজিদ সংশ্লিষ্ট হুযরাতে দরজা বন্ধ করে ঢুকে পড়েন র্দীঘক্ষণ ধরে। ওদিকে ঐ সময়ে নিজবাড়ীর সন্নিকটস্থ জানাযার মাঠে তাঁকে ঐ সন্তানের জানাযার নামায পড়াতে দেখা যায়।
ওফাত: ক্ষণ জন্মা এই মহা মনীষী ১৩৮০ হিজরি মুতাবিক ১৯৬১ সালের ১০ যিলক্বদ, বৃহস্পতিবার সিরিকোট শরীফে ইন্তেকাল করেন।
আগামী ২৬ আগস্ট রোজ: বুধবার এই মাহান সাধকের ফাতিহা খানি ঢাকার জামেয়া কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা ও চট্টগ্রাম আলমগীর খানেকাতে ১১ যিলক্বদ ২৭ আগস্ট রোজ: বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে। সবান্ধব দাওয়াত রইল।
সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বিস্তারিত জীবনী জানতে পড়ুন- ১. সুন্নিয়াতের পঞ্চরত্ন: বদিউল আলম রিজভী
২. সিরিকোট থেকে রেঙ্গুন: মোসাহেব উদ্দিন বখতিয়ার
৩. বাংলা মজমুআ সালাওয়াতে রাসূল এর ভূমিকা: এম এ মান্নান
৪.শাজরা শরীফ: প্রকাশনায়, আন্জুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম।
৫.মাসিক তরজুমান (বিভিন্ন সংখ্যা ): প্রকাশনায়, আন্জুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম।
৬.বাগে ছিরিকোটি প্রকাশনায়, আল্লামা তৈয়্যেবিয়া সোসাইটি, চট্টগ্রাম।
৭. পাকিস্তান: দেশ ও কৃষ্টি, প্রকাশক, ইষ্ট পাকিস্তান স্কুল টেক্স বুক বোর্ড।
৮. আঞ্জুমান ওয়েব সাইট, ইত্যাদি।

গাউসুল আজম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)

‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম’ বা ‘গিয়ারবী শরীফ’ ওলীকুলের শ্রেষ্ঠ, কুতুবে রব্বানী, মাহবুবে সোবহানী গাওসুল আজম হযরত মুহিদউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর ওফাত দিবস হিসেবে পরিচিত এই পবিত্র দিবসটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদযাপিত হয়ে থাকে। তারই প্রবর্তিত কাদেরিয়া তরিকাপন্থী কোটি কোটি মুসলমানের নিকট দিবসটির তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। তরিকতের ইমাম মহান সাধক হযরত গাওসুল আজমের রূহানী, আধ্যাত্মিক, ভক্ত-অনুসারীর প্রাণপ্রিয় এই ‘বড় পীর’ দুনিয়াময় ইসলামের যে আলোক শিখা জ্বালিয়ে গেছেন তা অনন্তকাল অনির্বাণ থাকবে।
গাওসুল আযম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.) মা-বাবা উভয় দিক থেকে ছিলেন হাসানী-হোসাইনী অর্থাৎ হযরত আলী (র.)-এর বংশধর। তিনি হিজরী ৪৭০ সালের ১ রমজান মোতাবেক ১০৭৭-৭৮ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ৫৬০-৬১ সাল মোতাবেক ১১৬৬ খৃস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯০-৯১ বছর। বাগদাদে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। কোরআন তফসীর, হাদীস, ফেকাহ, বালাগত (অলংকার শাস্ত্র, সাহিত্য), ইতিহাস অংকশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি প্রচলিত সব বিষয়ে সনদ লাভ করেন। তিনি যুগ শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে এবং শরিয়ত ও তরিকতের অনন্য সাধারণ ইমাম হিসেবে এবং ইসলামের পূর্ণজীবনদানকারী হিসেবে সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন ছিলেন।
হযরত গাওসুল আজমের ওফাত দিবস ‘ফাতেহা-ইয়াজদহম’ বা ‘গিয়ারভী শরীফের’ প্রথমোক্ত নামটি অধিক পরিচিত এবং সূচনা কাল থেকেই এখানে প্রচলিত। দিবসটির উদ্ভব ও প্রচলন সম্পর্কে কিছু চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়, যার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকলেও দিবসটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা সর্বজন স্বীকৃত। মুসলিম বিশ্বের আওলিয়ায়ে কেরামের ইতিহাসে গাওসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জীলানী (র.)-এর স্থান নিঃসন্দেহে সকলের ঊর্ধ্বে। এখানে তার ওফাত দিবস নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক।
হযরত গাওসুল আজম হিজরী ৫৬১ সালের রবিউস সানী মাসে ওফাত পান। খ্রিস্ট সাল অনুযায়ী যা ছিল ১১৬৬ সাল, তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ৮, ৯, ১১, ১৩ এবং ১৭ পর্যন্ত এ পাঁচটি তারিখের উল্লেখ পাওয়া গেলেও সর্বসম্মত মত হচ্ছে ১১ রবিউস সানী। ফারসি ভাষায় ১১ কে ইয়াজদহম এবং উর্দুতে ‘গিয়াবা’ বলা হয়। এবং গিয়াবা থেকে ‘গিয়ারভী’ শরীফের উৎপত্তি। দুটি নামের প্রচলন করে থেকে এবং কীভাবে শুরু হয় সে সম্বন্ধে কিছুটা মতভেদ দেখা যায়। কেউ কেউ বলেন, হযরত বড় পীর সাহেব নিজেই এটা পালন করতেন। আবার কেউ কেউ বলেন, এটা তার ওরস দিবস যা তার ইন্তেকালের পর মাসায়েখ ও ভক্ত-অনুসারীগণ পালন করতে আরম্ভ করেন। প্রথম মতের সমর্থন পাওয়া যায় আল্লামা ইমাম ইয়াফেযী কাদেরী (র.)-এর বক্তব্য হতে। আল্লামা ইয়াফেযী (র.) বলেন, ‘ফাতেহা ইয়াজদহম’ হযরত রাসূলে করীম (স.)-এর ওফাত দিবস, যা বড় পীর সাহেব তার জীবনে পালন করতে থাকেন। এ সম্বন্ধে আল্লামা ইয়াফেযী তার বিখ্যাত পুস্তক ‘কোরবাতুন নাজেরা’-তে বলেছেন, একদা বড় পীর সাহেবের ‘গিয়ারভী’ শরীফের আলোচনা হতে থাকলে তিনি (পুস্তক রচয়িতা) বলেন, এর নিয়ম এই যে, বড় পীর সাহেব রবিউস সানী মাসের ১৩ তারিখে হুজুর (স.)-এর ‘খতম শরীফ’ নির্ধারিত করে দেয়া হয়। তারপর অন্যরাও তার অনুকরণে একাদশ তারিখে হযরত রাসূলে করীম (স.)-এর নামে খতম পড়াতে আরম্ভ করেন। ক্রমশ এটা হযরত বড় পীর সাহেবের ‘গিয়ারভী শরীফ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এখন তার ওরসও একাদশ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ তার ওফাত সর্বসম্মতভাবে ১১ রবিউস সানী দিবসে।
উল্লেখিত বিবরণে একটা খটকা থেকে যাচ্ছে যে, প্রচলিত প্রথা অনুসারে কারো মৃত্যুর পর চল্লিশতম দিবসকে ফারসিতে ‘চেহলাম’ বলা হয়। বর্ণিত বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ‘চেহলাম’ ১১ রবিউস সানী কিভাবে সঠিক হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ওফাত দিবস ১২ রবিউল আউয়াল হতে হিসাব করা হলে চেহলাম বা চল্লিশ পূর্ণ হতে গোটা রবিউস সানী শেষ করে পরবর্তী জমাদিউল আউয়াল মাসেরও তিন দিন হিসাব করতে হয়। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত ৯ রবিউল আউয়াল ধরা হলে রবিউস সানী মাসের ১১ তারিখ পর্যন্ত ৪০ দিন হয় যদি রবিউল আউয়ালকে ৩০ দিন ধরা হয়। তা হলে প্রশ্ন আসে বড় পীর সাহেব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই কথিত চেহলাম কোন তারিখ হতে হিসাব করতেন? নির্ভরযোগ্য ইতিহাস সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হওয়া আবশ্যক। আর বড় পীর সাহেবের ওফাত দিবসকে ‘গিয়ারভী’ শরীফ বা ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম যাই বলা হোক না কেন তাতে কোনো বিতর্কের সুযোগ থাকে না এবং রাসূলুল্লাহ (স.)-এর চেহলাম হিসাব করার প্রশ্নও আসে না, যা এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে।
স¤্রাট আওরঙ্গজেবের ওস্তাদ এবং নূরুল আনোয়ার নামক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা মোল্লা জুযুনের ছেলে মোল্লা মোহাম্মদ তার পুস্তকে লিখেছেন যে, অন্যান্য মাসায়েখের ওরশ বছর শেষে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হযরত বড় পীর সাহেবের এটা এমন একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শান যে, বুজুর্গানে দ্বীন কর্তৃক তার ওরস গিয়ারভী শরীফ প্রতি মাসে নির্ধারিত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে (সরকারিভাবেও) বছরে একবার রবিউস সানী ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম বহুকাল থেকেই উদযাপিত হয়ে থাকে।
হযরত শেখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী (র.) যার যুগ হিজরী ৯৫৮ থেকে ১০৫২ সাল পর্যন্ত তিনি ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন তা উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘মা সাবাতা বিস সুনাহ’ নামক বিখ্যাত পুস্তকে হযরত মোহাদ্দেস দেহলবী ‘রবিউস সানী’ মাসের আলোচনা করতে গিয়ে গাওসুল আজমের ওরস সম্পর্কে লিখেছেন : ‘জানা নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে গাওসুল আজমের ওরস ৯ রবিউস সানী তারিখে হওয়া উচিত এবং পীর-মুর্শিদ শেখ আবদুল ওহাব কাদেরী মোত্তাকী মক্কী (র.) এই তারিখকে তার ওরস বলে গণ্য করতেন। ওরসের এই তারিখটাই নির্ভরযোগ্য এ কারণে যে, আমাদের পীর-মুর্শিদ শেখ আজম আলী মোত্তাকী (র.) এবং মাসায়েখের নিকট এই তারিখই নির্ভরযোগ্য। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে ১১ রবিউস সানী তারিখই অধিক প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত এবং ভারতে (পাকিস্তানে) অবস্থানরত গাওসুল আজমের বংশধর ও মাসায়েখে কেরাম একাদশ তারিখে ওরস করে থাকেন।’
হযরত মোহাদ্দেস সাহেব শেখ হামেদ হাসানী জালানীর বরাত দিয়ে আরও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি তার পিতৃ পুরুষদের মুখে শোনা কথা অনুযায়ী গওসুল আজমের ওরস একাদশ তারিখ লিখেছেন। মোহাদ্দেস সাহেব ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম বা ‘গিয়ারভী শরীফ’ অর্থাৎ এই তারিখে ওরস অনুষ্ঠান করার স্বপক্ষে তার পীর-মুর্শিদের যুক্তির কথা উল্লেখ করেন। এই দিবসের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি দরূদ শরীফ ও সালাম, অধিক পরিমাণে কালেমা পাঠ, জিকির-আজকার ও খানাপিনা এবং মিষ্টি বিতরণ ও ইসালে সওয়াব ইত্যাদি অনুষ্ঠান পালন।
হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর চারিত্রিক গুণাবলী, ধর্মীয় আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তার অবিস্মরণীয় অবদান ইসলামের প্রচার-প্রসার সমাজের উন্নয়ন-সংস্কার, বেদাত-কুসংস্কার উচ্ছেদে তার বৈপ্লবিক ভূমিকা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য দিক। তার কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতার অসংখ্য কাহিনীর কথা জানা যায়। তার অসংখ্য মূল্যবান ভাষণ-বাণী, গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী, ফতোয়া প্রভৃতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী হলেও মাজহাব চতুষ্টয় অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করতেন, যা তার নিরপেক্ষ উদার নীতিরই পরিচয় বহন করে।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে বিস্ময়ের সাথে একটি কথা বলতে হচ্ছে যে, মহান সাধক গাওসুল আজম হযরত আবদুল কাদের জীলানী (র.) সম্পর্কে কোনো কোনো ভক্ত লেখক এমন সব আজগুবী উদ্ভট তথ্য পরিবেশন করেছেন যা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণ করা কঠিন। উদাহরণ স্বরূপ এখানে আমরা এমন একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই যা তার ব্যক্তি, পারিবারিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। বাংলা ভাষায় রচিত তার জীবন চরিত্র সংক্রান্ত কোনো কোনো পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চার স্ত্রী হতে তার পুত্র কন্যার সংখ্যা এত অধিক ছিল যা উল্লেখ করতে লজ্জিত হতে হয়। তবে বাগদাদ হতে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য আরবী পুস্তকে পুত্র সংখ্যা ১২ এবং কন্যা সংখ্যা ১ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সঠিকভাবে যাচাই অনুসন্ধান না করে অলীক-অবিশ্বাস সংখ্যা প্রদান করে বস্তুত এই মহান সাধকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়, অবমাননা করারই শামিল। আমরা যে আরবী পুস্তকটির কথা উল্লেখ করেছি তার নাম জামেউল ইমাম আল আজম। এটি হযরত ইমাম আজম আবু হানিফা (র.)-এর নামে প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদ পরিচিত। লেখক শেখ হাসেম আল আজমী একই মসজিদের প্রথম ইমাম এবং জামে শেখ আবদুল কাদের জীলানী (র.)-এর সাবেক খতীব। পুস্তকটি ইরাকে ওয়াকফ ও ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৮০ সালে প্রকাশিত। এতে ইমাম আজম ও গাওসুল আজমসহ অনেক ইমাম-মাশায়েখ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় নিদর্শন, কীর্তি ও মসজিদের নিদর্শন স্থান পেয়েছে। গাওসুল আজমের সন্তানাদির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এইভাবে ‘ওয়াল্লাহ ইসনা আশারা ওলাদান ওয়া বিনতুন ওয়াহেদাহ’ অর্থাৎ তার ১২ পুত্র ও এক কন্যা (পৃ. ১১৭)। আর আমাদের দেশের অনির্ভরযোগ্য কোনো কোনো বই-পুস্তকে পুত্র-কন্যার সমষ্টিগত ৪৯ থেকে ৮২ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে, কি বিস্ময়কর অলীক?
এই পুস্তকে এমন একটি নতুন তথ্য পরিবেশিত হয়েছে, যা সঠিক হলে হযরত গাওসুল আজমের মহান বাবার আপেলের ঘটনাটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে। আপেল বাগানের মালিক হযরত সৈয়দ আবদুল্লাহ সাওমায়ী এবং গাওসুল আজমের মহান বাবা শেখ আবু সালেহ মুসার মধ্যে বিনা অনুমতিতে আপেল খাওয়া সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনাটি অবিকল হযরত ইমাম আজম আবু হানিফা (র.)-এর মহান বাবা সাবেত আবু নোমান সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখিত জামে ইমাম আজম পুস্তকে ‘কিচ্ছাতুন লিল ওয়ালেদ’ (বাবার কাহিনী)-শিরোনামে একই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তবে এখানে বাগানের মালিক আবদুল্লাহ সাওমায়ীর নাম উল্লেখ করার পরিবর্তে ‘শাহবুশ শাহারা’কে গাছের মালিক বলা হয়েছে এবং শাবেত আবু নোমানের সাথে আবদুল্লাহ সাওমায়ীর কন্যার বিবাহ পর্যন্ত এর বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ গাওসুল আজম ও ইমাম আজমের দু’মহান বাবার একই ঘটনার একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ইমাম আজমের বাবার এ কাহিনী আলোচ্য পুস্তকের ১৯ ও ২৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত, আপেলের ঘটনার বিবরণ এক ও অভিন্ন মনে হলেও মনে হয় লেখক শেখ হাশেম আজমী গাওসুল আজমের বাবাকে ইমাম আজমের বাবা মনে করার ভ্রমে পতিত হয়েছেন অথবা দুটি ঘটনাই ভিন্ন ভিন্ন। অথচ ইমাম আজমের যুগ ৮০-১৫০ হিজরী পর্যন্ত। দুই ইমাম বাবার সাথে একই ঘটনা ঘটতেই পারে না যুগের এ কয়েক শতকের বিশাল ব্যবধান তারই অস্পষ্ট প্রমাণ। এতদ্ব্যতীত হযরত ইমাম আজমের জীবন চরিত্রের ওপর রচিত বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য গ্রন্থ-পুস্তকে আপেলের উল্লেখিত ঘটনাটির উল্লেখ আছে বলে মনে হয় না। আল্লামা শিবলী নোমানীর মতো সূক্ষ্মবিদ গবেষক লেখকও ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই বলেননি। তার ভাষ্যনুযায়ী, সাবেতের জীবনবৃত্তান্ত অজ্ঞাত। বিভিন্ন উপায়ে এতটুকু অবগত হওয়া যায় যে, তিনি বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবনযাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সে আল্লাহ তাকে সন্তান দান করেন। বাবা-মা তার নাম রাখেন নোমান। পরবর্তীকালে তিনি ইমাম আজম উপাধি লাভ করেন। (সীরাতুন নোমান)
গওসুল আযম হযরত আবদুল কাদের জীলানী (রহ.) একই সঙ্গে শরীয়ত ও তরীকতের মহান সাধক ছিলেন। তাঁর আরবী ভাষায় রচিত কাসীদা-ই-গওসিয়া তাঁর রুহানী ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পবিত্র কোরআন ও মহানবী (স.)-এর সুন্নাহ ছিল তাঁর মহান আদর্শ। তাঁর মূল্যবান বাণী চিরন্তন পাঠে প্রমাণিত, শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত তরীকত লাভ করা যায় না। তাঁর হাতে হাজার হাজার ইহুদী-খ্রিস্টান, মোশরেক তথা বিধর্মী মুসলমান হয়ে যায়।

আরাফাহ দিবস : গুরুত্ব ও ফযীলত

আরাফাহ দিবস : গুরুত্ব ও ফযীলত

যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাহ ময়দানে চিহ্নিত সীমানার মধ্যে অবস্থান করা হজ্জের প্রধান রুকন। এই দিনকেই আরাফার দিন বলা হয়। এ দিনটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও মর্যাদাপূর্ণ। এ দিনের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে নিম্নে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হ’ল।-আরাফাহ দিবসের মর্যাদা :এ দিবসটি অনেক ফযীলত সম্পন্ন দিবসের চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী। যে সকল কারণে এ দিবসটির এত মর্যাদা তার কয়েকটিনিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।-(১) এ দিন ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা লাভ ও বিশ্ব মুসলিমের প্রতি আল্লাহর নে‘মতের পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির দিন। হাদীছে এসেছে-عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ قَالَ لَهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، آيَةٌ فِى كِتَابِكُمْ تَقْرَءُونَهَا لَوْ عَلَيْنَا مَعْشَرَ الْيَهُودِ نَزَلَتْ لاَتَّخَذْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ عِيدًا. قَالَ أَىُّ آيَةٍ قَالَ (الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا). قَالَ عُمَرُ قَدْ عَرَفْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ وَالْمَكَانَ الَّذِى نَزَلَتْ فِيهِ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ قَائِمٌ بِعَرَفَةَ يَوْمَ جُمُعَةٍ.‘তারিক বিন শিহাব (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, এক ইহুদী লোক ওমর (রাঃ)-কে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে আপনারা এমন একটিআয়াত তেলাওয়াত করে থাকেন যদি সে আয়াতটি আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হ’ত তাহ’লে আমরা সে দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন, সে আয়াত কোনটি? লোকটি বলল, আয়াতটি হ’ল-اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلاَمَ دِيْنًا ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসাবে মনোনীত করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)। ওমর (রাঃ) এ কথা শুনে বললেন, আমি অবশ্যই জানি কখন তা অবতীর্ণ হয়েছে ও কোথায় অবতীর্ণ হয়েছেএবং অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোথায় ছিলেন। সে দিনটি হ’ল জুম‘আর দিন। তিনি সে দিন আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন’।[1](২) এ দিন হ’ল ঈদের দিন সমূহের একটি দিন। আবু উমামাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,يَوْمُ عَرَفَةَ وَيَوْمُ النَّحْرِ وَأَيَّامُ التَّشْرِيْقِ عِيْدُنَا أَهْلَ الإِسْلاَمِ وَهِىَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ-‘আরাফাহ দিবস, কুরবানীর দিন ও আইয়ামে তাশরীক (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) আমাদের ইসলামের অনুসারীদের ঈদের দিন। আর এ দিনগুলো খাওয়া-দাওয়ার দিন’।[2]ওমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, সূরা মায়েদার এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে দু’টো ঈদের দিনে। তা হ’ল জুম‘আর দিন ও আরাফাহর দিন।[3]আরাফাহ দিবসের ফযীলত : আরাফাহ দিবসের বিভিন্ন ফযীলত রয়েছে। যেমন-১. আরাফাহ দিবসের ছিয়াম দু’বছরের গোনাহের কাফফারা :আরাফার দিন ছিয়াম পালন করলে এক বছর পূর্বের এবং এক বছর পরের গুনাহ মাফ হয়। আবু কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে আরাফাহ দিবসের ছিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন,صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّى أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ-‘আরাফার দিনের ছিয়াম, আমি মনে করি বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে’।[4] উল্লেখ্য যে, আরাফার দিনে ছিয়াম পালন করবেন তারাই যারা হজ্জব্রত পালন করেন না। অর্থাৎ আরাফাহ ময়দানের বাইরে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের মুসলিম এই ছিয়াম পালন করবেন।২. আরাফার দিন গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের দিন :এ দিনে আল্লাহ স্বীয় বান্দাদেরমধ্য থেকে অধিক সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দিয়ে জাহান্নাম থেকেমুক্তি দান করেন। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُوْلُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ‘আরাফার দিন আল্লাহ রাববুল আলামীন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়’?[5] ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, এ হাদীছটি আরাফাহ দিবসের ফযীলতের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।ইবনে আব্দুল বার্র (রহঃ) বলেন, এ দিনে মুমিন বান্দারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হন। কেননা আল্লাহ রাববুল আলামীন গুনাহগারদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন না। তবে তওবা করার মাধ্যমে ক্ষমা-প্রাপ্তির পরই তা সম্ভব। হাদীছে এসেছে-আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলে কারীম (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا كَانَ يَوْمُ عَرَفَةَ، إِنَّ اللهَ يَنْزِلُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيُبَاهِيْ بِهِمُ الْمَلائِكَةَ، فَيَقُوْلُ : انْظُرُوْا إِلَى عِبَادِيْ أَتَوْنِيْ شُعْثًا غُبْرًا- ‘যখন আরাফার দিন হয়, তখন আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন। অতঃপর তিনি আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের নিকটে গর্ব করেন। আল্ল­াহ বলেন, আমার এ সকল বান্দাদের দিকে চেয়ে দেখ। তারাএলোমেলো কেশ ও ধূলায় ধূসরিত হয়ে আমার কাছে এসেছে’।[6]৩. অধিক পরিমাণে যিকর ও দো‘আ করার উপযুক্ত সময় :নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّوْنَ مِنْ قَبْلِى لاَ إِلَهَإِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُوَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيْرٌ-‘সবচেয়ে উত্তম দো‘আ হ’ল আরাফাহ দিবসের দো‘আ। আর সর্বশ্রেষ্ঠ কথা যা আমি বলি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বলেছেন তা হ’ল-আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই, রাজত্ব তাঁরই, সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য এবং তিনিসকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান’।[7]এ হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্দুল বার্র (রহঃ) বলেন, এ হাদীছদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আরাফাহ দিবসের দো‘আ নিশ্চিতভাবে কবুল হবে। আর সর্বোত্তম যিকর হ’ল ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।[8]ইমাম খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, দো‘আ করার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও তাঁর মহত্বের ঘোষণা করা উচিত।[9] অতএব, আরাফাহ দিবসের গুরুত্ব ও ফযীলত অনুধাবনকরতঃ এ দিবসে ছিয়াম পালনে সবাইকে সচেষ্ট হ’তে হবে। তাছাড়া যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে ইবাদতের ফযীলতও অত্যধিক। সে ব্যাপারেও আমাদেরকে যত্নবান হ’তে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!

[1]. বুখারী হা/৪৫, ৪৬০৬।[2]. আবুদাঊদ হা/২৪১৯।[3]. ছহীহ জামি‘ তিরমিযী, হা/২৪৩৮।[4]. মুসলিম হা/১১৬৩।[5]. মুসলিম হা/১৩৪৮।[6]. আহমাদ, ইবনু মাজাহ হা/৮১; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৬৬১; মিশকাত হা/২৬০১।[7]. তিরমিযী হা/২৮৩৭; মিশকাত হা/২৫৯৮, সনদ ছহীহ।[8]. ইবনে আব্দুল বার্র, আত-তামহীদ।[9]. ইমাম খাত্ত্বাবী, শান আদ-দো‘আ,পৃঃ ২০৬

হযরত বেলাল (রাঃ)

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) ইসলামের বীজ বীশ্বে রপন করে সেই
বীজ থেকে প্রচুর চাড়া বানিয়ে দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন । যে কোন
চাড়া গাছের যেমন পানির প্রয়জোন হয় , প্রয়োজন হয় সেবা যত্নের এমন কি
ভালবাসার পর্যন্ত এবং তা দেখাশুনা করবার জন্য প্রয়োজন হয় ট্রেনিংপ্রাপ্ত
শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের অর্থাত উদ্ভীদবিদের ,তেমনি ইসলামের সেই
চাড়াগুলোকে যত্ন করে প্রচুর পরিশ্রম করে ঝড় , বৃষ্টি, টর্নেডো ,সাইক্লোন
(তুলনা করা হয়েছে ইসলামের শত্রুদের ) থেকে রক্ষা করে তাকে মহিবৃক্ষ রূপে
বেড়ে উঠতে যারা সাহায্য করেছেন ।

অতঃপর সেই বৃক্ষের বীজ নিয়ে
তার বংশ বিস্তার করে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেন । এক অর্থে সেই
অমূল্য বার্তাবাহকদেরকেই বলা হয় “সাহাবী ” ।

একমাত্র সাহাবীদের মাধ্যমেই কোরান মজীদ এবং আল্লাহর রাসুল (সাঃ)
এর পরিচয় আর জীবনাদর্শ বিশ্বের একমাথা থেকে আর এক মাথায় পৌঁছে দেয়া
যায় । সাহাবী হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত আছে । যার মধ্যে এই তিনটি শর্ত থাকবে
সেই কেবল সাহাবী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে ।
(১) নবী (সাঃ) কে
স্বচক্ষে দেখতে হবে অথবা অন্ধ হলে নবী (সাঃ) এর মজলিশে বসতে হবে ।(২)
নবীজীর উপর ঈমান আনতে হবে । (৩) ঈমান অবস্থায় ইন্তেকাল করতে হবে ।

আল্লাহপাক তার সৃষ্টির সেরা হযরত মুহম্মদ (সাঃ) কে অসংখ্য অলৌকিক
গুনে আলোকিত করেছেন । তাঁর মধ্যে একটি ছিলো তার পরশ পাথর দৃষ্টি ? যে
সৃষ্টিকর্তার বদৌলতে ধুলিকনা খনন করে তার নীচে থেকে বের করা হয় হিড়ার
মত অমূল্য ধন , সোনা রূপার মত চমকপ্রদ বস্তু ।আবার সেই ধূলিকনাতে রোপনের
মাধ্যমে জন্ম নেয় প্রতিটি প্রানীর খাদ্য এবং সব চাইতে আশ্চর্য বিষয় এই যে এই
ধূলিকনা থেকেই সৃষ্টি করেছেন প্রতিটি মানব সন্তানকে । একদিন আমাদেরকে
ফিরে যেতে হবে আবার সেই একমুঠো ধূলাতেই ।এরমত বাস্তব আর কি হতে
পারে ? উত্তাপে পানি হয়ে যায় বাস্প , আবার সেই বাস্প ঘনিভূত হয়ে নেমে
আসে বৃষ্টির মাধ্যমে । সমস্ত প্রানী জগতের জীবন-ধারনের রসদ হিসাবে ।
বিন্দুর চাইতেও ছোট্ট শুক্রকনা থেকে সৃষ্টি করেন তিনি একজন পরিপূর্ন মানব
সন্তান । বিশ্বের চারপাশে ছড়িয়ে আছে তার লীলাখেলা । আমরা
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানব সন্তানরা তার কত টুকু উদ্ধার করতে পেরেছি? সেই
সৃজনকর্তার কুদরতেই সৃষ্টির সেরা

মানব হযরত মুহ্মমদ (সাঃ) লাভ করেন পরশ
দৃষ্টির মত অমূল্য ক্ষমতা , যার ছোঁয়ায় ক্ষনিকের মধ্যে মাটির মানুষ হয়ে যেত
সোনার মানুষ ।তার মনের সমস্ত কালিমা , হিংসা ,হিংস্রতা দূর হয়ে সে হয়ে
যেত সত্যিকারের মানবীয় চরিত্রের অধিকারী ।

হিজরী দশম সনে মদীনায় প্রচন্ড রকমের দূর্ভিক্ষ দেখা দেয় । বহু লোক
অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছিলো । তির্থের কাকের মত তারা বসে
ছিলো যদি কোন দিক থেকে কোন সাহায্য আসে? এমনি পরিস্থিতিতে রাসূল
(সঃ) মসজীদে খোতবা দিচ্ছিলেন ।

এমন সমায় এক লোক এসে খবর দিলো , ” শাম
দেশ থেকে প্রচুর খাবার নিয়ে একদল বনিকের আগমন হয়েছে । এ খাবার কিনতে
কি এখানে কেউ ইচ্ছুক ?

এ খবর শুনে অধিকাংশ খোতবা শ্রবনকারী ছুটে যায় সেই বনিকের কাছে
খাবার কিনবার জন্য । এরমধ্যে শুধূমাত্র দশজন (মতান্তরে বারোজন ) বিশিষ্ট

সাহাবী (রাঃ) প্রচন্ড ক্ষুধার্ত থাকা সত্তেও পার্থিব প্রয়োজন এবং
পারিপার্শিক দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মুখনিশ্রিত অমুল্য
বানী শ্রবনেই মনোযোগী থাকেন ।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহতায়ালা
বলেনঃ
” আর যখন তাহারা কোথাও ব্যবসায়-বানিজ্যে কিংবা কোন তামাশা দেখে
তখন তাহারা আপনাকে খোতবায় দন্ডায়মান অবস্থায় ছাড়িয়া দিয়া
বিক্ষিপ্তভাবে চলিয়া যায় । আপনি বলিয়া দিন যে , (আমাদের জন্য ) আল্লাহর
নিকট যাহাকিছু রহিয়াছে উহা বানিজ্য এবং তামাশার চাইতে বহুগুন উত্তম !
আর আল্লাহ উত্তম রিজিকদাতা । ”
যারা খতবা থেকে উঠে যান তাদেরকে সাধারন মুসলমান বলে গন্য করা হয় ।
আর যারা খোতবা থেকে উঠে যান নাই তাদের প্রতি রাসূল (সঃ) এত সন্তুষ্ট হন
যে , তাদেরকে বেহেশতী বলে ঘোষনা করা হয় । এই দশজন বিশিষ্ট সাহাবীর
নাম হলোঃ
(১) হযরত আবুবকর (রাঃ)
(২) হযরত ওমর (রাঃ)
(৩) হযরত ওসমান ইবনে
আফফান (রাঃ)
(৪) হযরত আলী ইবনে আবীতালেব (রাঃ)
(৫) হযরত তালহা (রাঃ)
(৬) হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়ান (রাঃ)
(৭) হযরত সা ‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস
(রাঃ)
(৮) হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ)
(৯) হযরত সাইদ ইবনে যাইদ
(রাঃ)
(১০) হযরত আবু ওবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)

একটি হাদিসে এই দশজন সাহাবীকে তাদের নাম উল্লেখ করে
বেহেশতী বলে রাসূল (সাঃ) ঘোষনা করেছেন । ইসলামের পরিভাষায় তাদেরকে
“আশরা-মোবাশশরা” নাম দেয়া হয় ।

খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবন প্রায়
সবারই জানা । সেখানে চারজন সাহাবীর কথা বলা হয়েছে কিন্তু
বাকী ছয়জনের ইতিহাস খুব কম জায়গায় পাওয়া যায় ।অবশিষ্ট বাকী ছয়জনেকে
বলা হয় “সিত্তাতুল বাকিয়াহ ” ।
পক্ষান্তরে রাসূল (সঃ) এর কতগুলি হাদীসের মাধ্যমেও বহুসংখ্যক
সাহাবী বেহেশতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হন । অর্থাত তারা জীবদ্দশায়ই
বেহেশতবাসী হবার আগাম খবর জেনে যান । আবার কোন কোন হাদীস দ্বারা
রাসূল পরিবারের সদস্যবর্গেরও বেহেশতী হওয়ার ঘোষনা প্রমানিত হয় । এমন কি
কোরানের বিভিন্ন আয়াত এবং রাসূলের অমূল্য কোন হাদীসে সমস্ত
সাহাবীকেই বেহেশতী বলে পরোক্ষভাবে ঘোষনা করা হয়েছে । যেমনঃ
হাদীসঃ- ” আমার সাহাবীগন নক্ষত্রতুল্য । তাহাদের মধ্যে তোমরা যাহারই
অনুসরন করিবে, সতপথ প্রাপ্ত হইবে ।” no-2

তাদের প্রসংসা শুধু রাসূল (সাঃ) করেন নাই , বরং আল্লাহ পাকও তাঁদের ভুয়সী
প্রসংসা করেন । যেমন পাক কোরানের এক স্থানে তিনি এরশাদ করেছেনঃ-
” মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল । আর তাহার সঙ্গে যাহারা আছেন,
তাহারা কাফেরদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ! কিন্তু নিজেদের বেলায় অত্যন্ত
দয়াবান । তুমি তাহাদিগকে দেখিবে তাঁহারা রুকু-সেজদায় (তথা নামাযের)
মাধ্যমে আল্লাহর দান ও সন্তুষ্টি অন্বেষন করেন । তাঁহাদের (বন্দেগীর) চিহ্ন
তাঁহাদের চেহারায় ,সেজদার কারনে প্রস্ফুটিত হইয়া আছে । ” “সূরা আল
ফাতাহ”।
ইসলামে সাহাবীগনের গুরুত্ব এবং তাদের দোষ চর্চ্চা থেকে বিরত থাকতে
বলা হয়েছে ।স্বয়ং রাসূল (সাঃ) সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ
হাদীসঃ- সাবধান ! সাবধান !! আল্লাহকে ভয় করিও ! আমার সাহাবীদের
সম্পর্কে ! খবরদার ! খবরদার !! আমার পরে আমার সাহাবীদের ভালবাসিবে ! যে
কেহ আমার সাহাবীদিগকে

ভালবাসিবে বস্তুতঃ সেই ভালবাসা আমার প্রতিই
ভালবাসা হইবে । আর যে কেহ তাহাদের প্রতি খারাপ ধারনা পোষন করিবে
বস্তুতঃ সেই খারাপ ধারনা আমার প্রতি পোষন করা গন্য হইবে । যে কেহ
তাহাদিগকে ব্যথা দিবে এ যেন আল্লাহকেই ব্যথা দিল ।এবং আল্লাহকে যে
ব্যথা দিল অনতিবিলম্বে আল্লাহ তাকে পাকড়াও করিবেন ।(তিরমিযী শরীফ )

হাদীসঃ- রাসুল (সাঃ) বলেছেন ,”আল্লাহতায়ালা আমাকে বাছাই
করিয়াছেন নবীগনের শ্রেষ্ঠরূপে। আমার সাহাবীগনকে বাছাই করিয়াছেন
নবীর পরে মানবশ্রেষ্ঠ রূপে । তাহাদিগকে আমার এত ঘনিষ্ঠ বানাইয়াছেন যে,
আমার শ্বশুর ,জামাতা সব তাহাদের মধ্য হইতে আসিয়াছেন । আর তাহাদিগকে
আমার সাহায্যকারী হিসাবে পাশে দার করাইয়াছেন ।
কোন কাজই হীনস্বার্থের বশে না করা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ
উদ্দেশ্যে করাকে “এখলাস” বলে । এই এখলাস একটি মহত গুন । এই “এখলাস “গুনের
তারতম্যে মানুষ অসাধারন বৈশিষ্ট গৌরব লাভে ধন্য হয় ।

হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর সাহায্যেই সাহাবীগন ঐ অমুল্য নুর লাভ করেছিলেন ।
সেই নূর বা আলোই সাহাবীগনের অসাধারন বৈশিষ্টের উতস ।ঐ বৈশিষ্ট্যের
মধ্যে যেটি ছিলো অন্যতম তার নাম “এখলাস”।

হাদিসঃ- হযরত ওমর (রাঃ) বর্ননা করেছেন , ‘আমি নিজ কানে রাসূল (সাঃ)
কে এই কথা বলিতে শুনিয়াছি তিনি বলিয়াছেন ,” আমি আল্লাহতায়ালার
নিকট আমার পরে আমার সাহাবীদের বিরোধ সম্পর্কে আবেদন করিলাম ।
তদুত্তরে আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট ওহী পাঠাইয়া দিলেন ,’ হে মুহহ্মদ ,
আপনার সাহাবীগন আমার নিকট আকাশে নক্ষত্ররাজি তুল্য ! কম বেশী
প্রত্যেকের মধ্যেই আলো আছে । অবশ্য কাহারও আলো কাহারও অপেক্ষা
অধিক শক্তিশালী ( কিন্তু অন্ধকার কাহারও মধ্যে নাই )। অতএব কোনক্ষেত্রে
তাহাদের বিরোধ হইলে যে কেহ তাহাদের যে কোন একজনের মত ও পথ অবলম্বন
করিবে ।সে আমার নিকট সতপথের পথিক বলেই সব্যস্ত হইবে । ( মেশকাত ৫৫৪
পৃষ্ঠা )

সাহাবীদের মর্যাদাপূর্ন বৈশিষ্টের কথা আসমানী কিতাবেও লেখা
আছে । যথা – তাওরাত শরীফে নবীজী (সাঃ) এর আবির্ভাব আলোচনায় মক্কা
বিজয় ঘটনার ভবিষ্যদ্বানীতে বলা হয় ,”তিনি দশ সহস্র পবিত্রাত্নাসহ এমন
অবস্থায় আসিলেন যে, তাহার দক্ষিন হস্তে এক অগ্নিশিখাতুল্য (জ্যেতির্ময়)
ব্যবস্থা রহিয়াছে । মক্কা বিজয় অভিযানে নবীজ়ীর (সাঃ) সঙ্গে দশ সহস্র
সাহাবী ছিলেন । তাওরাত কিতাবে ঐ সাহাবীগনকে “কুদ্দুসী’ বা “পবিত্রাত্না
” বলা হয় ।
নবীগনের পরে কোন একজন সাহাবীর সমপর্যায়ে যাওয়া তো দূরের কথা ,
কাছা-কাছিও যাওয়া সম্ভব না । ইসলামকে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখতে এই
সাহাবীগনের দান অপরিসীম ! সাহাবীগনের ত্যাগ-তিতিক্ষার কাহিনী বলে
শেষ করা যাবেনা । তাঁরা শত্রুর হাতে অমানুষিক অত্যাচার সহ্ন করেছেন ,
মৃত্যুবরন করেছেন তবু তাঁদের ঈমান থেকে কেউ তাঁদেরকে একচুল সরাতে পারেনি ।

একবার ক্কাবা শরিফে শত্রুরা রাসূল (সাঃ) কে ঘেরাও করে এবং তাকে
মাটিতে ফেলে প্রচন্ড রকমের প্রহার করছিলো , সে খবর হযরত আবুবকর (রাঃ) এর
কানে গেলে তিনি পাগলের মত ছুটে আসেন এবং বলেন ,” তোমরা কি সে
ব্যক্তিকে হত্যা করিতে চাও যিনি তোমাদের এ কথা বলেন ,” তোমার লালন
কর্তা আল্লাহ এবং যিনি তোমাদের নিকট আল্লাহর নিশান হইয়া আসিয়াছেন?

” একথা শুনে শত্রুরা রাসূল (সাঃ) কে ছেড়ে আবু বকর (রাঃ) এর উপর ঝপিয়ে পড়ে
এবং বেদম প্রহার করে যাতে তিনি তিনদিন পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে ছিলেন । জ্ঞান
ফিরবার পরই তিনি নবী করীম (সাঃ) এর কাছে যেতে চাইলে অনেকে বাঁধা দেন
, কিন্তু তিনি তা কিছুতেই শুনতে চান না । এমতঅবস্থায় হযরত আবুবকর (রাঃ) এর
মা নিজে তাকে হুজুর (সাঃ) এর কাছে নিয়ে যান । নবী করীম (সাঃ) আবুবকর
(রাঃ) কে আলিংগন করেন এবং সেই দিনই আবুবকর (রাঃ) এর মা রাসূল (সাঃ) এর
কাছে ইসলামের দিক্ষায় দিক্ষিত হন ।

মক্কায় ইসলাম গ্রহনকালে বহু সাহাবীকে অমানুষিক অত্যাচার সহ্ন করতে হয়
। এরমধ্যে কিছু গোলামও ছিলেন । ইসলামের শত্রুগন এই গরীব ও গোলাম
মুসলমানগনের উপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন চালাত । তারা এই
অমানূষিক অত্যাচার নীরবে সহ্ন করতেন , কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করতেন না ।
………….✔✔✔✘✘✘✘✘✘✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔✔

তাদের মধ্যে হযরত বেলাল (রাঃ) , হযরত জাবিরা (রাঃ) হযরত আম্মার ও তার
পরিবার খব্বার (রাঃ) ও হযরত বিনতে জারিয়া (রাঃ) নাম বিশেষ
উল্লেখযোগ্য !

✔✔✔✔♬♬♬
হযরত বেলাল (রাঃ) মক্কাবাসী উমাইয়া ইবনে খালফ নামক ধনী ব্যক্তির
গোলাম ছিলেন । উমাইয়া যখন জানতে পারলো হযরত বেলাল (রাঃ) ইসলাম ধর্ম
গ্রহন করেছেন তখন সে উন্মাদ প্রায় হয়ে বেলাল (রাঃ) এর উপর অমানুষিক
অত্যাচার শুরু করেন । উত্তপ্ত বালুর উপর ফেলে গড়ম লোহার শেক দিলো ।

গলায়
রশি বেঁধে মক্কার অলিতে গলিতে হেঁচরে নিয়ে যায় । কিন্তু এত অত্যাচারের
পরও হযরত বেলাল (রাঃ) এর একটি কথাই তার মুখ থেকে নিশ্রিত হচ্ছিলো আর
তা হলো “আহাদ” “আহাদ” অর্থাত “আল্লাহ এক” ” আল্লাহ এক” ।

হযরত আবুবকর
(রাঃ) উমাইয়াকে নম্র ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করেন , কিন্তু উমাইয়া আবুবকর
(রাঃ) কে অত্যন্ত রূক্ষভাবে বলেন ,” তোমার যদি এত দয়া হয় তবে তাকে ক্রয়
করে আযাদ করে দাও না কেনো ? এর পর দিন আবুবকর(রাঃ) উপযুক্ত দাম দিয়ে

বেলাল (রাঃ) কে খরিদ করে নেন এবং রাসূল (সাঃ) এর কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন
,”আমি আল্লার ওয়াস্তে বেলালকে আযাদ করে দিলাম ।” রাসূলুল্লাহ এ সংবাদে
অত্যন্ত খুশী হন ।
পরবর্তীকালে ক্রীতদাস হযরত বেলাল (রাঃ) মহানবী (সাঃ) এর অন্যতম
সাহাবীর সম্মান লাভকরেন। ইসলামের প্রথম সমর বদর যুদ্ধে তাঁর অতীত দিনের
মহা অত্যাচারী প্রভূ উমাইয়া বিন খালফের সাথে সম্মুখ সমরে অবতীর্ন হলে
উমাইয়ার দেহ তাঁর দূর অতীতের ক্রীতদাস হযরত বেলালের হাতে খন্ড খন্ড হয়ে
গেল! ইতিহাসের কি নিষ্ঠুর উত্তর !! উমাইয়ার পুত্র আলিও একই যুদ্ধে একই জনের
হাতে প্রান হারান । হযরত বেলাল (রাঃ) এর নাম -যশ-খ্যাতি ইসলাম জগতের
যে স্থানটিতে অতুলনীয় , সেখানে তিনি মহানবী (সাঃ) অনুমদিত ইসলামের
প্রথম ঐতিহাসিক “মোয়াজ্জীন।”
নবী করীম (সাঃ) তাঁহার সাহাবীগনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ট ছিলেন । সব
ব্যপারেই তিনি তাঁহাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন । তাঁদের পারিবারিক সুখ-
শান্তি পর্যন্ত তিনি নিজে ভাগ করে নিতেন । সাহায্য করতেন তার সাধ্যমত ।

কিছুদিন অসুস্থ থাকবার পর যখন রাসূল (সাঃ) ইহধাম ত্যাগ করলেন
(ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলাইহে রাজিউন ) তখন মসজীদে নববী এবং তার
আশে-পাশে লোকে লোকারন্ন হয়ে উঠে । হযরত ওমর (রাঃ) ছিলেন নবী
করীম (সাঃ) এর অত্যন্ত কাছের মানুষদের একজন । এ সংবাদ শুনে তিনি তা
কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না ।তিনি পাগলপ্রায় হয়ে উঠেন ।তিনি
নিজেও তখন বুঝতে পারছিলেন না কি করছেন ? হযরত আবুবকর (রাঃ) বাইরে এসে

দেখেন হযরত ওমর (রাঃ) খোলা তরবারী হাতে চিৎকার করে বলছেন ,” যে এ কথা
বলিবে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইন্তেকাল করিয়াছেন , এই তরবারী দিয়া আমি
তার মস্তক ছিন্ন করিব । ” হযরত ওমর (রাঃ) এর এই ভয়ংকর মূর্তী দেখে অনেকেই
ভয় পেয়ে যায় । তখন আবু বকর (রাঃ) তার সেই যুগান্তকারী বক্তৃতা এবং
কোরানের আয়াতের মাধ্যমে পরিস্থিতি আয়ত্বে আনেন । এরপর তিনি বলেন,”
হে মানব সমাজ, তোমাদের মধ্যে যেই ব্যক্তি মোহাম্মদ (সাঃ) এর পূজা করিত
,তাহারা জানিয়া রখুক যে , আল্লাহ পাক আছেন এবং চিরদিন থাকবেন ।”
উপরোক্ত আলোচনায় প্রমানিত হয় যে, সাহাবীগনের সম্পর্কে উচ্চ ধারনা ও
বিশ্বাস ইসলামের বিশেষ কর্তব্য । এই কারনে অধিকাংশ হাদীস গ্রন্থে
সাহাবীগনের বৈশিষ্ট্যের বিশেষ বর্ননা দেয়া হয় ।এমন কি বোখারী শরীফ ,
মুসলীম শরীফ ও তিরমিজী শরীফ যে শ্রেনীর গ্রন্থ এই শ্রেনীর হাদীস গ্রন্থের
পরিভাষায় “জামে” বলা হয় । যেই গ্রন্থে সাহাবীগনের বৈশিষ্ট্যের অধ্যায় না
থাকবে , সেই গ্রন্থ “জামে” পরিগনিত হবে না ।
“জামে” অর্থ “পরিপুর্ন “। যে গ্রন্থে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর গুনাবলী ও
কার্যকলাপের সঙ্গে তার সাহাবীগনের কার্যকলাপ ও গুনাবলীর বিষদ বর্ননা
দেয়া হয়েছে সে সমস্ত গ্রন্থকে “জামে” বলা হয় ।
এমরান ইবনে হোসাইন (রাঃ) বর্ননা করেছেন , ” রাসূলুল্লাহ (সাঃ)

ফরমাইয়াছেন ,” আমার (গঠিত) যুগ ও জামাত ( তথা আমার সাহাবীগনের যুগ)
তারপর এই যুগ সংলগ্ন যুগ অর্থাত সাহাবিদের হাতে গঠিত ( তাবেয়ীনের যুগ ও
জামাত) । তারপর এই দ্বিতীয় যুগ সংলগ্ন তৃতীয় যুগ (অর্থাত তাবেয়ীনের দ্বারা
গঠিত তাবয়ে তাবেয়ীনের যুগ ও জামাত ) । এই যুগটির উল্লেখ হযরত মুহ্মমদ (সাঃ)
করিয়াছেন কি না সেই সম্পর্কে বর্ননাকারী সন্দিহান রহিয়াছেন ।”
(হাদীস ১৮১৩)

আবু সায়ীদ খুদয়ী (রাঃ) এর বর্ননায় পাওয়া যায় ” রাসূল (সাঃ) বলিয়াছেন
,” তোমরা আমার কোন সাহাবীকে মন্দ বলিও না , ( তাঁহাদের মর্তবা তোমাদের
অনেক উর্ধেব ) । তোমাদের কেহ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমান স্বর্ন আল্লাহর
রাস্তায় ব্যয় করে , (তাহার এত বড় দানও ) সাহাবীদের কোন একজনের এক মুদ্দা
(প্রায় চৌদ্দ ছটাক ) বা অর্ধ মুদ্দা (গম বা যব ) ব্যয় করার সমান হইতে পারিবেনা

১৮১৫ হাদীস (পৃষ্ঠা ৫১৮)

ব্যাখ্যাঃ- এক এক জিনিসের মূল্য এক এক গুনের উপর নির্ভর করে থাকে , এবং
সেই গুনের অনুপাতেই তাঁর মূল্যমান নির্ধারিত হয়ে থাকে । নেক আমলের মুল্য
‘এখলাস” ও “লিল্লাহিয়াতের ” মাপ কাঠিতে পরিমাকৃত হয়। এই দিক দিয়া
সাহাবীগন হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর সোহবতের অসিলায় এত উর্ধেব পৌঁছেছিলেন
যে, অন্য কোন মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছা সম্ভবই না, বরং এটাই সত্যি ,
সাহাবীদের জীবন ইতিহাসই এর প্রকৃত প্রমান !!!

হযরত বেলাল (রাঃ)’র সুমধুর আযানের কথা

হযরত বেলাল (রাঃ)’র সুমধুর আযানের কথা ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র জীবদ্দশায়তিনি প্রতিদিন মদীনার মসজিদের মিনার বা ছাদ থেকে আযান দিতেন৷ তাঁর সুরেলা কন্ঠের আযান আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) মনে একদিকে যোগাতো হৃদয় জুড়ানো অনাবিল প্রশান্তির কোমলপরশ, অন্যদিকে যোগাতো আধ্যাত্মিক আনন্দের অব্যক্ত ও স্বর্গীয় প্রাণস্পর্শ৷ বিশেষকরে আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ-এ তাকবীর ধবনি যখন আকাশে বাতাসেপ্রতিধবনিত হতো তখন বিশ্বনবীর মনে বেহেশতি আনন্দের এমন এক শিহরণ জেগে উঠতো যা ভাষায়প্রকাশ করা সম্ভব নয়৷ আযান শুনে বিশ্বনবী (সাঃ) মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্যেনিজেকে প্রস্তুত করতেন৷ মুসলমানদের নামাজের জামাতে ইমামতি করার মাধ্যমেসর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে প্রেমময় এ সাক্ষাতে মিলিত হবার জন্যে তিনি সব সময়ই অধীরআগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুণতেন৷ নামাজের সময় হলেই বিশ্বনবী (সাঃ) আবিসিনীয় বেলাল(রাঃ)কে বলতেন, আযান দিয়ে আমার হৃদয়কে প্রশান্ত বা পরিতৃপ্ত কর৷ বিশ্বনবী হযরতমুহাম্মাদ (সাঃ) নামাজকে আধ্যাত্মিক মেরাজ বা উধর্বারোহণ বলে মন্তব্য করেছেন৷ তিনিসমস্ত মন প্রাণ সঁপে দিয়ে নামাজ বা আল্লাহর এবাদতে মশগুল হতেন৷ আল্লাহর রাসূল(সাঃ)সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের ব্যাপারে খুবই সুশৃঙখল বা নিয়মানুবর্তিছিলেন৷ তিনি নফল নামাজ আদায়ের জন্যে মধ্যরাতে জেগে উঠতেন৷ মহান আল্লাহর সাথে তাঁর এযোগাযোগ ছিল এত নিবিড় ও গভীর যে তিনি মাঝেমধ্যে পুরো রাতই দোয়া ও এবাদতে কাটিয়েদিতেন৷ বিশ্বনবীর পবিত্র বংশধারায় জন্ম-নেয়া ইমাম হযরত জা’ফর সাদিক (আঃ) তাঁরমাতামহ তথা মানবজাতির জন্যে সর্বোত্তম আদর্শ বিশ্বনবী (সাঃ)’র এবাদতের অভ্যাসসম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহর রাসূল মধ্যরাতে জেগে উঠতেন৷ এ সময় তিনি আকাশের দিকেতাকাতেন এবং সূরা আলে ইমরানের সেই আয়াতগুলো পড়তেন যাতে মহান আল্লাহ বিশ্বের সৃষ্টিনিয়ে চিন্তা করতে মানব জাতির প্রতি আহবান জানিয়েছেন৷ এরপর তিনি তাঁর দাঁতমোবারকমাজতেন, ওজু করতেন এবং নামাজের স্থানে গিয়ে তাহাজ্জদ নামাজ আদায় করতেন৷ নামাজ আদায়েমহান আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কতোটা আনন্দিত হন তা তাঁর একান্ত অনুগত সাহাবী হযরত আবুযার (রাঃ)’র কাছে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, হে আবু যার! সর্বশক্তিমান আল্লাহনামাজের মধ্যে আমার আনন্দের ব্যবস্থা করেছেন এবং নামাজকে আমার জন্যে চিত্তাকর্ষককরে দিয়েছেন, যেমনটি তিনি ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্তদের জন্যে খাদ্য ও পানিকেচিত্তাকর্ষক করেছেন; তবে পার্থক্য হলো খাদ্য গ্রহণের পর ক্ষুধার্ত ব্যক্তি পরিতৃপ্তহয় এবং পানি পানের পর তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির তৃষ্ণা মিটে যায়, কিন্তু নামাজ পড়ার পরকখনও নামাজের প্রতি আমার আকর্ষণ কমে না৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আরো বলেছেন, আল্লাহর নবীগণ যখনই কোনো ব্যাপারে উদ্বিগড়ব ) হতেন তখনই তাঁরা নামাজে মশগুল হতেন৷মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের জীবন সুখ বা প্রাচুর্যের পাশাপাশি দ্বন্দ্ব,সংঘাত, ঝঞ্ঝা ও দূর্যোগের উত্তাল তরঙ্গমালায় ভরপুর৷ তাই সব সময়ই নিরাপদ আশ্রয় তার জন্যেজরুরী৷ এবাদত তথা নামাজ এবং দোয়ার মাধ্যমে মানুষ এই নিরাপদ আশ্রয়ই খুঁজে পায়৷ কারণ, দোয়া ও নামাজ মানুষের ক্লান্ত হৃদয়ে প্রশান্তি যোগায় এবং তা মানুষকে সজীব ও সতেজকরে৷ সবচেয়ে বড় কথা দোয়া ও নামাজসব প্রাণের স্রষ্টা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথেমানুষের যোগাযোগের মাধ্যম৷ নামাজেরসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো আত্মিকপ্রশান্তি৷ মহান আল্লাহর প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ রেখে নামাজ আদায় করা হলে সৃষ্টিররহস্যগুলো স্পষ্ট ও বোধগম্য হবে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি পুরোপুরি মন সঁপে দিয়ে নামাজ আদায় করবে, নামাজ শেষ হবারপর সে ব্যক্তি নতুন জন্ম নেয়া মানুষের মতো নিষপাপ ব্যক্তিতে পরিণত হবে ৷ অর্থাৎতাঁর সমস্ত গোনাহ ও ভুলগুলো মার্জনা করা হবে৷ বিশ্বনবী (সাঃ) ১৪০০ বছর আগে যাশিখিয়ে গেছেন আজকের যুগের মনোবিজ্ঞানীরা তা সত্য বলে স্বীকার করছেন৷ নামাজ ও দোয়ারমাধ্যমে মহান আল্লাহর সাথে সৃষ্ট দৃঢ় বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানুষের মন থেকে উদ্বেগ ওউৎকন্ঠা দূর করে৷ এটা এখন আধুনিক যুগের মনোবিজ্ঞানীরাও উপলব্ধি করছেন৷ প্রকৃত নামাজমানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে এক অতলান্ত প্রভাব বা ছাপ সৃষ্টি করে৷ নামাজ ও দোয়ারমাধ্যমে মনের সমস্ত কদর্যতা, অহংকার ও গর্ব দূরীভূত হয়ে যায়৷ নামাজ মানুষের মধ্যেসৎ গুণাবলী সৃষ্টি করে এবং সৎকাজের প্রেরণায় মন ভরে দেয়৷ এবাদত বা প্রার্থণারগুরুত্ব প্রসঙ্গে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদ ডক্টর অ্যালেক্সিস কার্ল বলেছেন, কেউ যদিআন্তরিকতা নিয়ে স্রষ্টার এবাদত করে, তাহলে তিনি তাঁর জীবনে বাস্তব পরিবর্তন দেখতেপাবেন৷ প্রার্থণা মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভন বা কুমন্ত্রণা প্রতিরোধের শক্তি যোগায়৷বিশ্বনবী (সাঃ) সব সময় জামায়াতে নামাজ আদায় করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতেন৷ তিনিবলতেন,একদল মানুষ যখন সমবেত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করেন মহান আল্লাহর ফেরেশতারাতাদেরকে পরিবেষ্টিত করে রাখে এবং তাঁদের ওপর প্রশান্তি ও আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিতহতে থাকে৷ যে আল্লাহকে স্মরণ করে, আল্লাহও তাঁকে স্মরণ করে৷ কতো তাৎপর্যপূর্ণবিশ্বনবী(সাঃ)’র এই বাণী! নামাজ আদায়ের জন্যে, বিশেষ করে সামষ্টিক এবাদত বন্দেগীরজন্যে মসজিদইসর্বোত্তম স্থান! আর এ জন্যেই মসজিদে যেতে বা মসজিদে নামাজ আদায়ের ওপরএতো গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছেন, মহান আল্লাহ মসজিদকে পৃথিবীর বুকেতাঁর প্রতিকী বাড়ী বা ঘর বলে বলে অভিহিত করেছেন৷ পৃথিবীর অধিবাসীদের চোখে তারকাযেরকম উজ্জ্বল, বেহেশতের অধিবাসী বা আকাশের অধিবাসীদের কাছেও মসজিদ সেরকম উজ্জ্বল ওপ্রবর্ধমান দীপ্তির উৎস৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছেন, যাঁরা মসজিদে প্রবেশ করে, তাঁদেরপ্রতিটি পদক্ষেপের জন্যে দশটি করে সওয়াব লেখা হয় এবং দশটি করে গোনাহ মাফ করা হয়৷বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবী হযরত আবু যার (রাঃ)কে বলেছেন, হে আবু যার! যখনতুমি নামাজে দাঁড়াবে, মনে করবে তুমি এক অসীম দয়ালু সত্ত্বার দরজায় করাঘাত করছো৷যাঁরাই অসীম দয়ালু সত্ত্বা বা পরম করুণাময় আল্লাহর দরজায় করাঘাত করে তারা সেদরজাটিকে তাঁর জন্যে খোলা দেখতে পাবে৷ হে আবু যার! এমন কোনো মুমিন বা বিশ্বাসী নেইযে নামাজে দাঁড়িয়ে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) বিপুল কল্যাণ ও অনুগ্রহের অধিকারী হয় না৷কারণ, আল্লাহর একজন ফেরেশতা এ ঘোষণা দিয়ে যাচেছন যে,” হে আদম সন্তান! যদি তোমরাজানতে তোমরা নামাজের মাধ্যমে কি অর্জন করছো, কার সাথে কথা বলছো ও কার কাছে দোয়াকরছো তাহলে তোমরা কখনও ক্লান্ত হতে না এবং অন্য কোনো কিছুর প্রতিই মনোযোগী হতে না৷