জসিম উদ্দিন আজহারীর পবিত্র শবে বরাত সম্পর্কে দলীল ভিত্তিক খুবই চমৎকার ‍আলোচনা

প্রতারকদের কবলে শবে বরাত | দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ও আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ এর আসল চেহারা দেখুন

শবে বরাত উপলক্ষ্যে অত্যান্ত চমৎকারভাবে কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে আলোচনা করেছের ড. মাহবুবুর রহমান

পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে কুরআন এবং হাদিস ভিত্তিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা | যারা মানে না তাদের জন্য

শবে বরাত সম্পর্কে ড. সাইফুল্লাহ ধরা খেলেন ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর এর কাছে | জসিম উদ্দিন আজহারী

বরকতময় ও মহিমাময় রজনী শবে বরাত

হিজরি চান্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস হলো ‘শাবান’। এই মাসটি বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ। হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এ মাসেই কিবলা পরিবর্তন হয়; অর্থাৎ পূর্ব কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা শরিফ কিবলা হিসেবে ঘোষিত ও নির্ধারিত হয়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনা-সংবলিত অসাধারণ আয়াতটি (সুরা-৩৩ আহজাব, আয়াত: ৫৬) এই মাসেই অবতীর্ণ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে সবচেয়ে বেশি নফল ইবাদত, নফল রোজা পালন ও নফল নামাজ আদায় করতেন।
এই শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত ১৫ তারিখের রাতকে ‘শবে বরাত’ বলা হয়। শবে বরাত কথাটি ফারসি থেকে এসেছে। শব মানে রাত বা রজনী আর বরাত মানে মুক্তি। সুতরাং শবে বরাত অর্থ হলো মুক্তির রাত। ‘শবে বরাত’-এর আরবি হলো ‘লাইলাতুল বারাত’, তথা মুক্তির রজনী। হাদিস শরিফে যাকে ‘নিসফ শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী বলা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরানসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দিসহ নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এটি ‘শবে বরাত’ নামেই সমধিক পরিচিত।
এ প্রসঙ্গে কোরআনে এসেছে—উজ্জ্বল কিতাবের শপথ! নিশ্চয় আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি ছিলাম সতর্ককারী, যাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। এ নির্দেশ আমার তরফ থেকে, নিশ্চয় আমিই দূত পাঠিয়ে থাকি। এ হলো আপনার প্রভুর দয়া, নিশ্চয় তিনি সব শোনেন এবং সব জানেন। তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং উভয়ের মাঝে যা আছে, সেসবের রব।
যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করো তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, তিনিই তোমাদের পরওয়ারদিগার আর তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও। তবু তারা সংশয়ে রঙ্গ করে। তবে অপেক্ষা করো সেদিনের, যেদিন আকাশ সুস্পষ্টভাবে ধোঁয়াচ্ছন্ন হবে। (সুরা-৪৪ দুখান, আয়াত: ২-১০)। মুফাসসিরিনগণ বলেন, এখানে ‘লাইলাতুল মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে শাবান মাসের পূর্ণিমা রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাজহারি, রুহুল মাআনি ও রুহুল বায়ান)।
প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.) বলেন, হজরত ইকরিমাহ (রহ.) প্রমুখ কয়েকজন তফসিরবিদ থেকে বর্ণিত আছে, সুরা দুখানের দ্বিতীয় আয়াতে বরকতের রাত্রি বলে শবে বরাত অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত্রিকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন)।
শবে বরাতের ফজিলত
শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস শরিফে আছে, হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫)। ইবনে খুজাইমা হজরত আবু বকর (রা.), হজরত আওফ ইবনে মালেক (রা.) এবং আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০, রাজিনন, হাদিস: ২০৪৮; সহিহ ইবনে খুজাইমা, কিতাবুত তাওহিদ, পৃষ্ঠা: ১৩৬)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা এ রাতে বিদ্বেষ পোষণকারী ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যাকারী ছাড়া বাকি সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬)। হজরত আবু সালাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে, তখন আল্লাহ তাআলা মাখলুকাতের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান; মুমিনদের ক্ষমা করে দেন, কাফিরদের ফিরে আসার সুযোগ দেন এবং হিংসুকদের হিংসা পরিত্যাগ ছাড়া ক্ষমা করেন না। (কিতাবুস সুন্নাহ, শুআবুল ইমান, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮২)। হজরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমার উদ্দেশে বললেন, হে আয়িশা! তোমার কী আশঙ্কা হয়েছে? আমি উত্তরে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি

কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি? আমি ক্ষমা করব; কোনো রিজিকপ্রার্থী আছো কি? আমি রিজিক দেব; আছো কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহ্বান করতে থাকেন

মৃত্যুবরণ করেছেন কি না? নবীজি বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই
ভালো জানেন। তখন নবীজি (সা.) ইরশাদ করলেন, এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত; এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ইমান, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮২)।
হাদিস শরিফে বর্ণিত শবে বরাতের বিখ্যাত আরও একটি ঘটনা বিভিন্ন কিতাবে বহু সূত্রে হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবীজি (সা.) এ রাতে জান্নাতুল বাকিতে এসে মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন। হজরত আয়িশা (রা.) থেকে আরও বর্ণিত, নবীজি (সা.) তাঁকে বলেছেন, এ রাতে বনি কালবের ভেড়া-বকরির পশমের (সংখ্যার পরিমাণের) চেয়েও বেশিসংখ্যক গোনাহগারকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস: ৭৩৯)।
শবে বরাতের করণীয় আমল সম্পর্কে হাদিস শরিফে আছে, হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ১৪ শাবান দিবাগত রাত যখন আসে, তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো। কেননা, এ দিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং আহ্বান করেন: কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি? আমি ক্ষমা করব; কোনো রিজিকপ্রার্থী আছো কি? আমি রিজিক দেব; আছো কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহ্বান করতে থাকেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৪)। বিখ্যাত মুহাদ্দিস ফকিহ হাফিজ ইবনে রজব (র.) বলেন, এ দিনের রোজা আইয়ামে বিজ অর্থাৎ চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজার অন্তর্ভুক্ত। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ১৫১)।

শবে বরাতে করণীয় আমলসমূহ
(১) নফল রোজা রাখা; (২) নফল নামাজ [ক] আউওয়াবিন [খ] তাহাজ্জুদ [গ] সালাতুত তাসবিহ [ঘ] অন্যান্য নফল ও (ঙ) তাওবার নামাজ ইত্যাদি পড়া; (৩) কোরআন শরিফ [ক] সুরা দুখান ও [খ] অন্যান্য ফজিলতের সুরাসমূহ তিলাওয়াত করা; (৪) দরুদ
শরিফ বেশি বেশি পড়া; (৫) ইস্তিগফার বেশি পরিমাণে করা; (৬) দোয়া-কালাম, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার ইত্যাদি করা; (৭) কবর জিয়ারত করা; (৮) নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সব মুমিন মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করা।

শবে বরাতে বর্জনীয় বিষয়সমূহ
(১) আতশবাজি, পটকা ফোটানো, (২) ইবাদত-বন্দেগি বাদ দিয়ে খামোখা ঘোরাঘুরি করা, (৩) অযাচিত আনন্দ-উল্লাস করা, (৪) বেহুদা কথাবার্তা ও বেপরোয়া আচরণ করা, (৫) অন্য কারও ইবাদতের বা ঘুমের বিঘ্ন ঘটানো, (৭) হালুয়া, রুটি বা খানাদানার পেছনে বেশি সময় নষ্ট করে ইবাদত থেকে বিরত থাকা।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে শবে বরাতের গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু তার বিস্তারিত তথ্য

আসসালামু আলাইকুম।
আমাদের সামনে এসে গেছে অতি ফজিলতের একটি মাস মাহে শা’বান। প্রিয় নবীজী(সাঃ) এমাসেও দু’আ করতেন যেভাবে রজব মাসেও দু’আ করতেনঃ “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজব ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রামাযান।” অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শা’বান মাসকে বরকতময় করে দিন এবং আমাদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌছেঁ দিন। আমীন।” শা’বান মাসে তিনি অকনকগুলো নফল রোজা রাখতেন।

আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ “আমি প্রিয় নবী (সাঃ) কে রমজান ছাড়া আর কোন পূর্ণ মাসের রোজা রাখতে দেখিনি। আর শা’বান মাস ছাড়া আর কোন মাসে এত অধিক পরিমাণ নফল রোজা রাখতে দেখিনি।” (বোখারি ও মুসলিম)।
গাহাবী উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) বর্ণন করেনঃ আমি প্রিয় নবীজী (সাঃ) কে বললামঃ “ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ)! শা’বান মাসে আপনি যত নফল রোজা রাখেন অন্য কোন মাসে আপনাকে এত নফল রোযা রাখতে দেখিনা।” প্রিয় নবী (সাঃ) এরশাদ করলেনঃ “রজব ও রমজান – এ দুটো মাসের মঝখানের এ মাসটি সম্পর্কে অনেকেই আসলে গাফেল হয়ে থাকে। এ মাসে মানুষের আমল (-এর বার্ষিক রিপোর্ট) আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমল যখন পেশ করা হয়, আমি যেন তখন রোযা অবস্থায় থকি।” (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে খোযাইমা)।

তবে শা’বান মাসের ১৫ তারিখে শুধু একটি রোযা রাখার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদিস পাওয়া যায় না। আর আমাদের সামনে আসছে মধ্য শা’বানের রাতটি যা অনেক দেশে শবে বরাত নামে পরিচিত। এ রাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে অন্যান্য বৎসরের মত এবারও আপনাদের খেদমতে কিছু বিস্তারিত আলোচনা পেশ করতে চাই। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দিন। আমীন।

প্রত্যেক মুসলমানই অবগত আছেন, ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস দু’টি – কুরআন ও হাদিস। কুরআন ও হাদিসে যে ইবাদতের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে একটু বেশী বা কম গুরুত্ব দেয়ার অধিকার কেন মুসলিমের নেই। শবে বরাত নামক বিষয়টি কুরআন-হাদিসে আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। এটাই হচ্ছে উম্মতের মুহাক্বিক আলিম ও ইমামদের মতামত।

কেউ কেউ দাবী করে থাকেন সুরা আদ-দুখানে “লাইলাতুম মুবারাকাহ” অর্থাৎ বরকতময় রাত বলতে শবে বরাতকেই বোঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফসীরে ইবনে কাসীর, কুরতুবী, ইত্যাদি রেফারেন্স দেয়া হয়। আসুন আমরা চেক করে দেখি নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থসমূহে এ ব্যাপারে কি বলা হয়েছে। লিখার কলেবর যাতে বৃদ্ধি না হয়ে যায়, সেজন্য যথাসম্ভব তাফসীরের সার-সংক্ষেপ পেশ করা হচ্ছে।

ইমাম ইবনে কাসীর (রাহঃ)বলেনঃ বরকতময় রাত বলতে সুরা আদ-দুখানে শবে ক্বদর-কে বোঝানো হয়েছে। কারণ, এখানে কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে। আর সেটাতো সূরা ক্বদর-এ স্পস্ট করেই বলা আছে। আর কুরআন যে রমজান মাসেই নাযিল হয়েছে সেটাও সুস্পস্ট করে বলা হয়েছে সূরা বাক্বারায়।

তিনি আরও বলেনঃ কেউ যদি বলে যে বরকতময় রাত বলতে মধ্য শা’বানের রাত-কে বোঝানে হয়েছে – যেমনটি ইকরামা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে – তাহলে সে প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করল।
শবে বরাতে মনুষের হায়াত, মউত ও রিযকের বার্ষিক ফয়সালা হওয়া সংক্রান্ত যে হাদিসটি উসমান বিন মোহাম্মদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, হাদিসটি মুরসাল। অর্থাৎ, হাদিসের প্রথম বর্ণনাকারী হিসাবে যে সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে হাদিসটি শুনেছেন, তার কোন উল্লেখ নেই। ফলে এমন দূর্বল হাদিস দিয়ে কুরআন ও সহীহ হাদিসের অকাট্য বক্তব্যকে খণ্ডন করা যায়না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ তাফসীর ইবনে কাসীর, খণ্ডঃ ৭, পৃষ্ঠা ৩১৬১)।

ইমাম কুরতুবী বলেনঃ “বরকতময় রাত্রি বলতে ক্বুদরতের রাতকে বোঝানো হয়েছে, যদিও কেউবা বলেছেন সেটা মধ্য শা’বানের রাত। ইকরামাও বলেছেন সেটি হচ্ছে মধ্য শা’বানের রাত। তবে প্রথম মতটি অধিকতর শুদ্ধ। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ ‘আমি এই কুরআনকে লাইলাতুল ক্বদর-এ নাযিল করেছি।’” এ প্রসঙ্গে মানুষের হায়াত, মউত, রিযক, ইত্যাদির ফয়সালা শবে বরাতে সম্পন্ন হয় বলে যে রেওয়ায়েত এসেছে, সেটাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি পূণরায় উল্লেখ করেনঃ “সহীহ-শুদ্ধ কথা হচ্ছে, এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর।”

অতঃপর তিনি প্রখ্যাত ফকীহ কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবীর উদ্ধৃতি পেশ করেনঃ জমহুর আলীমদের মতামত হচ্ছে, এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর। কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটা মধ্য শা’বানের রাত। এ কথাটি একেবারেই বাতিল। কারণ, আল্লাহ স্বয়ং তাঁর অকাট্য বাণী কুরআনে বলেছেনঃ “রমজান হচ্ছে ঐ মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে।” এখানে তিনি মাস উল্লেখ করে দিয়েছেন। আর বরকতময় রাত বলে লাইলাতুল ক্বদরকে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ মাসটিকে রমজান থেকে সরিয়ে অন্য মাসে নিয়ে যায়, সে মূলতঃ আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে বসে। মধ্য শা’বানের রাতটির ফজিলত এবং এ রাতে হায়াত-মউতের ফয়সালা সংক্রান্ত কোন একটি হাদিসও সহীহ এবং নির্ভরযোগ্য নয়। কাজেই কেউ যেন সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ তাফসীরে কুরতুবী, খণ্ডঃ ১৬, পৃষ্ঠাঃ ১২৬-১২৮)।

ইমাম তাবারী তাফসীরে তাবারীতে বরকতময় রাতের ব্যাখায় উল্লেখ করেনঃ কাতাদাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত এ রাতাট লাইলাতুল ক্বদর-এর রাত। প্রতি বৎসরের যাবতীয় কিছুর ফায়সালা এ রাতেই সম্পন্ন করা হয়। অতঃপর ইকরামা কর্তৃক বর্ণিত মধ্য শা’বানের মতামতটিও উল্লেখ করেন। পরিশেষে তিনি মন্তব্য করেনঃ লাইলাতুল ক্বদর-এর মতটাই সহীহ। কারণ, এখানে কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে।(বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ তাফসীরে তাবারী, খণ্ডঃ ১১, পৃষ্ঠা ২১২-২২৩)।

আল্লামা মুহাম্মদ আল আমীন আশ-শিনকীতী (রাহঃ) সূরা আদ-দুখানের বরকতময় রাতের তাফসীরে বলেনঃ এটি হচ্ছে রমজান মাসের ক্বদরের রাত। মধ্য শা’বানের রাত হিসাবে সেটিকে বুঝানো হয়েছে মনে করা – যেমনটি ইকরামা কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে – মিথ্যা দাবী ছাড়া আর কিছু নয়। এ দাবীটি কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী । নিঃসন্দেহে হকের বিপরীত যে কোন কথাই বাতিল।

কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী যে হাদিসগুলো কেউ কেউ বর্ণনা করে থাকেন, যাতে বলা হয় এ রাতটি হচ্ছে মধ্য শা’বানের রাত, সেই হাদিসগুলোর কোন ভিত্তি নেই। সেগুলোর কোনটার সনদই সহীহ নয়। ইবনুল আরাবী সহ মুহাক্বীক আ’ইম্মায়ে কেরাম এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলেছেন, বরই আফসোস ঐসব মুসলমানদের জন্য যারা কুরআনের সুস্পষ্ট বিরোধিতা করে কুরআন ও সহীহ হাদিসের দলীল ছাড়াই।(বিস্তারিত দেখুনঃ আদওয়াউল বায়ান, খণ্ডঃ ৭, পৃষ্ঠাঃ ৩১৯)।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতী শফী (রাহঃ) এ বিষয়ে মা’আরেফুল কুরআনে বলেনঃ বরকতময় রাত বলতে অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে এখানে শবে ক্বদর বুঝানো হয়েছে যা রমজান মাসের শেষ দশকে হয়। কেউ কেউ আলোচ্য আয়াতে বরকতের রাত্রির অর্থ নিয়েছেন শবে বরাত। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কেননা, এখানে সর্বাগ্রে কুরআন অবতরনের কথা বলা হয়েছে। আর কুরআন যে রমজান মাসে নাযিল হয়েছে, তা কুরআন দ্বারাই প্রমাণিত। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ মা’আরেফুল কুরআন, পৃষ্ঠা ১২৩৫)।

প্রিয় পাঠক, লক্ষ্য করুন, প্রতিটি তাফসীরেই ইকরামা কর্তৃক বর্ণিত শবে বরাতের বর্ণনাটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আর কুরআনের অন্যান্য আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এটি হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর। কুরআন দিয়েই কুরআনের তাফসীর গ্রহণ করার সুযোগ থাকলে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এটাই উলামায়ে উম্মতের ইজমাহ। তারপর কি আর এ বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ থাকে?

কুরআনে শবে বরাতের কোন উল্লেখ নেই, এ বক্তব্যটি সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবার আমরা দেখি হাদিস শরীফে কী আছে।
শবে বরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো দু প্রকারঃ

প্রথমত, শবে বরাতে কতো রাকাত নামায পড়তে হবে, সূরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসী প্রতি রাকাতে কতবার করে পড়তে হবে, ইত্যাদি এবং সে আমলগুলোর বিস্তারিত সওয়াবের ফিরিস্তি সংক্রান্ত হাদিসগুলো একেবারেই জাল এবং বানোয়াট।

আর দ্বিতীয় প্রকার হাদিসগুলো, এ রাতের ফযীলত, ইবাদতের গুরুত্ব, ইত্যাদি বিষয়ক। এ সব হাদিসের কোনটাই সহীহ হিসাবে প্রমাণিত হয়নি। বরং সবগুলোই যইফ (দুর্বল)। তবে, মউজু (জাল বা বানোয়াট)নয়। এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার। সিহাহ সিত্তার (ছয়টি গ্রন্থের)সবগুলো হাদিসই কি সহীহ? হাদিস বিশারদগণ প্রায় একমত যে, বুখারী ও মসলিম – এ দুটো গ্রন্হের সবগুলো হাদিসই সহীহ পর্যায়ের। কোন যইফ (দুর্বল) হাদিসের অবকাশ নেই এ দুটো গ্রন্থে।

আর বাকী ৪টি গ্রন্থের অধিকাংশ হাদিস সহীহ। তবে, বেশ কিছু সংখ্যক যইফ (দুর্বল) হাদিসও রয়েছে সেগুলোর মধ্যে।শবে বরাত সংক্রান্ত কোন একটি হাদিসও বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে আসেনি। আর বাকি ৪টি গ্রন্থে বা অন্যান্য আরও কিছু গ্রন্থে এ সংক্রান্ত যে হাদিসগুলো এসেছে, তার একটিও সহীহ হাদিসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শবে বরাত সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস, হাদিস বিশারদগণের মন্তব্য সহকারে উল্লেখ করা হলঃ

১. আলী (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ “১৫ শা’বানের রাতে তোমরা বেশী বেশী করে ইবাদত কর, এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। এ রাতে আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেনঃ ‘কে আছ আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে? আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছ রিযক চাইতে? আমি তাকে রিযক দিতে প্রস্তুত। কে আছ বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছ …’ এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত”। (ইবনে মাজাহ কর্তৃক হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে)।

এ হাদিসটি যে আদৌ সহীহ নয়, সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম হাফেজ শিহাব উদ্দিন তাঁর যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হাদিসটির সনদ যইফ (দুর্বল), কারণ হাদিসটির সনদের মাঝখানে আবু বকর বিন আবু সাবরা নামে একজন রাবী (বর্ণনাকারী) অনির্ভরযোগ্য। এমনকি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনু মাইন তার ব্যাপারে মন্তব্য করেছেনঃ “লোকটি মিথ্যা হাদিস রচনা করে থাকে।” (দেখুনঃ সুনান ইবনে মাজাহ, মন্তব্য ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বারী, পৃষ্ঠা ৪৪৪)।

২. আয়েশা (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেনঃ “আমি এক রাতে দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার পাশে নেই। আমি উনার সন্ধানে বের হলাম। দেখি যে তিনি জান্নাতুল বাকী (কবর স্থানে)অবস্থান করছেন। ঊর্ধ্বাকাশপানে তাঁর মস্তক ফেরানো। আমাকে দেখে বললেন, ‘আয়েশা, তুমি কি আশঙ্কা করেছিলে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) তোমার প্রতি অবিচার করেছেন?’ আমি বললাম, ‘এমন ধারণা করিনি, তবে মনে করেছিলাম, আপনার অন্য কোন বিবির সান্নিধ্যে গিয়েছেন কিনা।’

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ তা’আলা ১৫ই শা’বানের রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের সমুদয় বকরীর সকল পশমের পরিমাণ মানুষকে মাফ করে দেন।’” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)। ইমাম তিরমিজি হাদিসটি বর্ণনা করে নিজেই মন্তব্য করেছেনঃ আয়েশা (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত এই হাদিসটি হাজ্জাজ বিন আয়তাআহ্ ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে জানা নেই।

ইমাম বোখারী বলেছেনঃ এ হাদিসটি যইফ (দুর্বল)। হাজ্জাজ বিন আয়তাআহ্ বর্ণনা করেছেন ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাসির থেকে। অথচ হাজ্জাজ ইয়াহ্তইয়া থেকে আদৌ কোন হাদিস শুনেননি। ইমাম বোখারী আরও বলেছেনঃ এমনকি ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাসিরও রাবী ওরওয়া থেকে আদৌ কোন হাদিস শুনেননি। (দেখুনঃ জামে’ তিরমিজী, সাওম অধ্যায়, মধ্য শা’বানের রাত, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৮)।

৩. আবু মুসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, “১৫-ই শা’বানের রাতে আল্লাহ তা’আলা নিচে নেমে আসেন এবং সকল মানুষকেই মাফ করে দেন। তবে মুশরিককে এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না” (ইবনে মাজাহ)। এ হাদিসটির ব্যাপারে হাফেজ শিহাব উদ্দিন তাঁর যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেনঃ এর সনদ যইফ (দুর্বল)। একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আব্দুল্লাহ বিন লাহইয়াহ্ নির্ভরযোগ্য নন। আরেকজন রাবী ওয়ালিদ বিন মুসলিম তাফলীসকারী (সনদের মাধ্যে হেরফের করেতে অভ্যস্ত) হিসেবে পরিচিত।

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আসসিন্দী বলেছেনঃ আরেকজন রাবী আদদাহহাক কখনও আবু মুসা থেকে হাদিস শুনেননি। শবে বরাত সংক্রান্ত বর্ণিত সবগুলো হাদিসের সনদের মধ্যেই এ জাতীয় দুর্বলতা বিদ্যমান থাকার কারণে একটি হাদিসও সহীহ’র মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
লিখার কলেবর বৃদ্ধি হওয়ার আশংকায় আমরা বাকী হাদিসগুলো বা তদসংক্রান্ত মন্তব্য উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি। এবার প্রশ্ন আসে যইফ (দুর্বল) হাদিসের ভিত্তিতে কোন আমল করা যায় কি-না।
অধিকাংশ মুহাদ্দেসীনের মতে যইফ হাদিসের উপর কোন আমল করা শরীয়তে জায়েয নেই।

অধিকাংশ ফুকাহা আইম্মায়ে কেরাম যইফ (দুর্বল) হাদিস দ্বারা শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন। শর্তগুলো নিম্নরূপঃ
• ১।খুব বেশী যইফ (দুর্বল) পর্যায়ের না হওয়া।
•২। শুধুমাত্র ফাযায়েল অধ্যায়ের হওয়া। অর্থাৎ ফাজায়েল অধ্যায় ব্যতীত অন্য কোন অধ্যায়ের যইফ হাদিসের ভিত্তিতে কোন প্রকার আমল করা যাবে না।
•৩। আমল করার সময় সহীহভাবে প্রমাণীত হওয়ার ধারনা না রাখা। অর্থাৎ, এ ধারণা রাখতে হবে যে হাদিসটি সহীহভাবে প্রমাণীত নয়।
• ৪। কুরআন ও সহীহ হাদিসের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট যইফ হাদিসটি কুরআন বা সহীহ হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
উক্ত মূলনীতিগুলোর আলোকে শবে বরাতের আমল করা যেতে পারে বলে অনেক ওলামায়ে কেরাম মতামত দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন আসে আমল করতে হলে কিভাবে করা যাবে।

প্রথমতঃ ব্যক্তিগতভাবে বিছু ইবাদত বন্দেগী করা যেতে পারে। সে জন্যে মসজিদে সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করার জন্য ওয়াজ নসীহত, যিকির ইত্যাদির আয়োজন করা যাবেনা। (দেখুনঃ ফাতাওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন, পৃষ্ঠা ৬৪২)। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কিরামগণ এমনটি করেননি। তাই সে ত্বরিকার বাইরে ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা আবিষ্কার করলে সেটা হয়ে যাবে বিদ’আত।

দ্বিতীয়তঃ হায়াত, মউত, রিযক ইত্যাদির ফয়সালা এ রাতে হয়, এটা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এসব ফয়সালা যে লাইলাতুল ক্বদরে হয়, তা সুস্পষ্টভাবে কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণীত।

তৃতীয়তঃ আমাদের দেশে (বাংলাদেশে) আলোকসজ্জা ও আতশবজির যে তামাশা করা হয়, তা প্রকাশ্যে বিদ’আত। সে ধারণা থেকে কোন এলাকায় এ রাতের নাম হচ্ছে বাতির রাত। এ সব ধারণা ইসলামী শরীয়তে হিন্দুদের দিওয়ালী অনুষ্ঠান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রাহঃ)। হালুয়া-রুটি বিলি-বণ্টনের কার্যক্রমও বিদ’আত। (দেখুনঃ ফাতাওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন, পৃষ্ঠা ৬৪২)। ইবাদতের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এসব অনেক আমল শিয়াদের কাছ থেকে উপ-মহাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছেন বলে মুফতী রশীদ আহমদ লুদিয়ানী উল্লেখ করেছেন। (দেখুনঃ সাত মাসায়েলঃ শবে বরাতে শিয়াদের ভ্রষ্টতা, পৃষ্ঠা ৩৯-৪২)।

চতুর্থতঃ নফল ইবাদতের জন্য সারা রাত মসজিদে এসে জেগে থাকা রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নত বিরোধী। তিনি নফল ইবাদত ঘরে করতে এবং ফরয ইবাদত জামা’আতের সাথে মসজিদে আদায় করতে তাগিদ করেছেন। আর সারা রাত জেগে থেকে ইবাদত করাটাও সুন্নত বিরোধী। প্রিয় নবীজী (সাঃ) সব রাতেরই কিছু অংশ ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমাতেন। উনার জীবনে এমন কোন রাতের খবর পাওয়া যায়না, যাতে তিনি একদম না ঘুমিয়ে সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন।

পঞ্চমতঃ শবে বরাতের দিনের বেলায় রোযা রাখার হাদিস একেবারেই দুর্বল। এর ভিত্তিতে আমল করা যায়না বলে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহ মুফতী মাওলানা তাকী উসমানী সাহেবের সুস্টষ্ট ফাতাওয়া রয়েছে। শবে বরাত, কবর যিয়ারত, ইত্যাদি অনেক আমলেরই কোন সহীহ দলিল না থাকার কারণে উপমহাদেশর প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়নবী, হাক্বীকুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রাহঃ)-এর সাথে বহু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রাহঃ) শেষের দিকে কিছু কিছু বিষয় অবশ্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

ষষ্ঠতঃ শবে বরাতের রোযার পক্ষে যেহেতু কোন মজবুত দলিল নেই, তাই যারা নফল রোযা রাখতে চান, তারা আইয়ামে বীজের তিনটি রোযা – ১৩, ১৪, ১৫ – রাখতে পারেন। এর পক্ষে সহীহ হাদিসের দলিল রয়েছে। শুধু একটি না রেখে এ তিনটি বা তার চেয়েও বেশী রোযা রাখতে পারলে আরও ভাল। কারণ, শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সবচেয়ে বেশী পরিমাণ নফল রোযা রেখেছেন।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের উপর আমল করার তাওফীক দান করুণ। আমীন।

নোট: লেখাটি ইউরোপের সবচেয়ে বড় মসজিদ, ইষ্ট লন্ডন মসজিদের সম্মানিত খতিব, মাওলানা আব্দুল কাইউম লিখেছিলেন ২০০৮ সালে।

পবিত্র শবে বরাত ও এর শরীয়ত ভিত্তিক দলিল প্রমাণ

১৪ই শা’বান দিবাগত রাতটি হচ্ছে পবিত্র শবে বরাত বা বরাতের রাত্র।কিন্তু অনেকে বলে থাকে কুরআন-হাদীছের কোথাও শবে বরাত শব্দ নেই। শবে বরাত বিরোধীদের এরূপ জিহালতপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয় যে, শবে বরাতশব্দ দু’টি যেরূপ কুরআন ও হাদীছ শরীফের কোথাও নেই তদ্রূপ নামায, রোযা , খোদা , ফেরেশতা, পীর ইত্যাদি শব্দ কুরআন ও হাদীছ শরীফের কোথাও নেই। এখন শবে বরাত বিরোধী লোকেরা কি নামায, রোযা ইত্যাদি শব্দ কুরআন ও হাদীছ শরীফে না থাকার কারনে ছেড়ে দিবে? মূলত শবে বরাত, নামায, রোযা , খোদা ,ফেরেশতা , পীর ইত্যাদি ফার্সী ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত। ফার্সী শব অর্থ রাত্রি এবং বরাত অর্থ ভাগ্য বা মুক্তি। সুতরাং শবে বরাত মানে হল ভাগ্য রজনী বামুক্তির রাত

মূলতঃ শবে বরাত এবং এর ফযীলত কুরআন শরীফে আয়াত শরীফ এবং অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন শরীফে শবে বরাতকে লাইলাতুম মুবারাকাহ বা বরকতময় রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হাদীস শরীফে শবে বরাতকে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শা’বান মাসের মধ্য রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,

وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ

অর্থঃ
শপথ প্রকাশ্য কিতাবের! নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমিই সতর্ককারী। আমারই নির্দেশক্রমে উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলো ফায়সালা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।”

(সূরা দু’খানঃ ২-৫)

কেউ কেউ বলে থাকে যে, “সূরা দু’খানের উল্লেখিত আয়াত শরীফ দ্বারা শবে ক্বদর-কে বুঝানো হয়েছে। কেননা উক্ত আয়াত শরীফে সুস্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন নাযিল করেছি……..। আর কুরআন শরীফ যে ক্বদরের রাতে নাযিল করা হয়েছে তা সূরা ক্বদরেও উল্লেখ আছে ।

এ প্রসঙ্গে মুফাসসির কুল শিরোমণি রঈসুল মুফাসসিরীন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেন,

” মহান আল্লাহ পাক লাইলাতুম মুবারাকাহ বলতে শা’বান মাসের মধ্য রাত বা শবে বরাতকে বুঝিয়েছেন। আল্লাহ পাক এ রাতে প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলোর ফায়সালা করে থাকেন।”

(ছফওয়াতুত তাফাসীর, তাফসীরে খাযীন ৪র্থ খন্ডঃ ১১২ পৃষ্ঠা, তাফসীরে ইবনে আব্বাস,তাফসীরে মাযহারী ৮ম খন্ডঃ ৩৬৮ পৃষ্ঠা, তাফসীরে মাযহারী ১০ম খন্ড, তাফসীরে ইবনে কাছীর, তাফসীরে খাযিন, বাগবী, কুরতুবী, কবীর, রুহুল বয়ান, আবী সাউদ, বাইযাবী, দূররে মানছূর, জালালাইন, কামলালাইন, তাবারী, লুবাব, নাযমুদ দুরার, মাদারিক)

লাইলাতুম মুবারাকাহ দ্বারা শবে বরাতকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ সূরা দু’খানের ৪ নম্বর আয়াত শরীফ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ। এই আয়াত শরীফের يُفْرَقُ শব্দের অর্থ ফায়সালা করা।প্রায় সমস্ত তাফসীরে সকল মুফাসসিরীনে কিরামগণيُفْرَقُ (ইয়ুফরাকু) শব্দের তাফসীর করেছেন ইয়ুকতাবু অর্থাৎ লেখা হয়, ইয়ুফাছছিলু অর্থাৎ ফায়সালা করা হয়, ইয়ুতাজাও ওয়াযূ অর্থাৎ বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়, ইয়ুবাররেমু অর্থাৎ বাজেট করা হয়, ইয়ুকদ্বিয়ু অর্থাৎ নির্দেশনা দেওয়া হয়

কাজেই ইয়ুফরাকু -র অর্থ ও তার ব্যাখার মাধ্যমে আরো স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, লাইলাতুম মুবারাকাহ দ্বারা শবে বরাত বা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে। যেই রাত্রিতে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক বছরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্যলিপি অনুসারে রমাদ্বান মাসের লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদরে তা চালু হয়। এজন্য শবে বরাতকেলাইলাতুত্ তাজবীজ অর্থাৎ ফায়সালার রাত্র এবং শবে ক্বদরকে লাইলাতুল তানফীয অর্থাৎ নির্ধারিত ফায়সালার কার্যকরী করার রাত্র বলা হয়।

(তাফসীরে মাযহারী,তাফসীরে খাযীন,তাফসীরে ইবনে কাছীর,বাগবী, কুরতুবী,রুহুল বয়ান,লুবাব)

সুতরাং মহান আল্লাহ পাক যে সুরা দু’খান-এ বলেছেন, “ আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি ” এর ব্যাখ্যামুলক অর্থ হল “ আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিলের ফায়সালা করেছি “। আর সুরা ক্বদর-এ ” আমি ক্বদরের রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি ” এর ব্যাখ্যামুলক অর্থ হল ” আমি ক্বদরের রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি “।

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক শবে বরাতে কুরআন শরীফ নাযিলের সিদ্ধান্ত নেন এবং শবে ক্বদরে তা নাযিল করেন।

হাদীছ শরীফেও শবে বরাতে সমর্থন পাওয়া যায়। হাদীছে শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

“হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে। একদা আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ! আপনি কি জানেন, লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শবে বরাতে কি সংঘটিত হয়? তিনি বললেন, হে আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম !এ রাত্রিতে কি কি সংঘটিত হয়? আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ রাতে আগামী এক বছরে কতজন সন্তান জম্মগ্রহণ করবে এবং কতজন লোক মৃত্যূবরণ করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে বান্দার (এক বছরের) আমলসমূহ আল্লাহ পাকের নিকট পেশ করা হয় এবং এ রাতে বান্দার (এক বছরের) রিযিকের ফায়সালা হয়”।

(বাইহাক্বী, ইবনে মাজাহ্, মিশকাত শরীফ)
হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

“হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একদা আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কোন এক রাত্রিতে রাতযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়ত অন্য কোন আহলিয়া রদ্বিয়ালাহু তায়ালা আনহা-এর হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য আল্লাহ পাকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফে ফিরে এলে তিনিও ফিরে এলেন এবং বললেনঃ আপনি কি মনে করেন আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন? আমি বললামঃ ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারনা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন আহলিয়ার হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বণী কালবের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন”।
(বুখারী শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাযাহ, রযীন, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

” হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ঘোষনা করেন যে, উনার সমস্ত মাখলুকাতকে ক্ষমা করে দিবেন। শুধু মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত।”

(ইবনে মাযাহ্, আহমদ, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাত উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাতে সজাগ থেকে ইবাদত-বন্দেগী করবে এবং দিনের বেলায় রোযা রাখবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক উক্ত রাতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষাণা করতে থাকেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি ক্ষমা করে দিব। কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করব। কোন মুছিবগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিব। এভাবে সুবহে ছাদিক পর্যন্ত ঘোষাণা করতে থাকেন

(ইবনে মাযাহ্,মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ)
হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

“আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি শা’বানের মধ্য রাতে (শবে বরাত) ইবাদত করবে তারই জন্য সুসংবাদ এবং তার জন্য সমস্ত কল্যাণ

হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে এবং অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাতের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করবে, সে ব্যক্তির অন্তর ঐদিন মরবে না বা পেরেশান হবে না যে দিন সকলের অন্তর পেরেশান থাকবে“।

(মুকাশাফাতুল কুলুব)

শবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পাঁচটি রাত এমন রয়েছে যেগুলোতে দোয়া করলে তা রদ বা বাতিল হয়না । (১) পহেলা রজবের রাত (২) শা’বানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত (৩) জুমুয়ার রাত (৪) পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাত (৫) পবিত্র ঈদুল আযহার রাত“।

(দায়লামী শরীফ)

শবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল প্রসঙ্গে অন্য হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই দোয়া বা মুনাজাত পাঁচটি রাতে কবুল হয়ে থাকে । (১) পহেলা রজবের রাত (২) শা’বানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত (৩) ক্বদরের রাত (৪) পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাত (৫) পবিত্র ঈদুল আযহার রাত

(মা ছাবাত বিস্ সুন্নাহ, গুনইয়াতুত্ ত্বালিবীন, মুকাশাফাতুল কুলুব)

সুতরাং কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফের উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত যে, শবে বরাত কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

অনেকে উপরে উল্লেখিত শবে বরাত সম্পর্কিত কিছু হাদীসকে দ্বয়ীফ বলে শবে বরাতকে বিদায়ত বলে থাকেন। দ্বয়ীফ হাদীছের ব্যাপারে নিচে আলোচনা করা হলঃ

দ্বয়ীফ হাদীছঃ
যে হাদীছের রাবী হাসান হাদীছের রাবীর গুণ সম্পন্ন নন তাকে দ্বয়ীফ হাদীস বলা হয়।
হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কথাই দ্বয়ীফ নয় বরং রাবীর দুর্বলতার কারণে হাদীছকে দ্বয়ীফ বলা হয়।
দ্বয়ীফ হাদীসের দুর্বলতার কম বা বেশী হতে পারে। কম দুর্বলতা হাসানের নিকটবর্ত্তী আর বেশি হতে হতে মওজুতে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের হাদীছ আমলে উৎসাহিত করার জন্য বর্ণনা করা যেতে পররে বা করা উচিৎ। তবে আইন প্রণয়নে গ্রহনযোগ্য নয়।
এ প্রসঙ্গে হযরত ইমাম ইবনে হুমাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

“দ্বয়ীফ হাদীছ যা মওজু নয় তা ফজিলতের আমল সমূহে গ্রহণযোগ্য

(ফতহুল ক্বাদীর)

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফক্বিহ হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

সকলেই একমত যে দ্বয়ীফ হাদীছ ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে।”
(আল মওজুআতুল কবীর, ১০৮ পৃষ্ঠা)

উপরোক্ত বর্ণনার দ্বারা প্রমাণিত হল যে, দ্বয়ীফ হাদীছ ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে। তবে দ্বয়ীফ হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত সকল আমল মুস্তাহাব

যেমনঃ আল্লামা ইব্রাহিম হালবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গুলিয়াতুল মুস্তামালী ফি শরহে মুনিয়াতুল মুছাল্লি কিতাবে উল্লেখ করেছেন,

গোসলের পরে রূমাল (কাপড়) দিয়ে শরীর মোছা মুস্তাহাব। হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে – আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটুকরা কাপড় (রূমাল) ছিল যা দিয়ে তিনি অযুর পরে শরীর মুবারক মুছতেন(তিরমিযি শরীফ)

এটা দ্বয়ীফ হাদীছ। কিন্তু ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা যাবে।

হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর আল মওজুআতুল কবীরের ১০৮ পৃষ্ঠায় বলেন,

সকলে একমত যে দ্বয়ীফ হাদীছ ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে। এজন্য আমাদের আইম্মায়ি কিরামগণ বলেছেন, অযুর মধ্যে গর্দান মসেহ্ করা মুস্তাহাব।”
তার মানে অযুর মধ্যে গর্দান মসেহ্ করা -এটি দ্বয়ীফ হাদীছ।

সুতরাং যারা শবে বরাতের হাদীস সংক্রান্ত কিছু দলিলকে দ্বয়ীফ হাদীছ বলে শবে বরাত পালন করা বিদায়াত বলে তাদের এধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভূল।

পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আলোকে শবে বরাত এর গুরত্বপূর্ণ আলোচনা

শবে বরাত
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। লেকচারার, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
بسم الله الرحمن الرحيم
যে সমস্ত বরকতময় রজনীতে আল্লাহ্পাক তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে থাকেন, শবে বরাত তারই অন্যতম। তাফসীর-হাদিস ও বিজ্ঞ আলিমদের পরিভাষায় যাকে “লাইরাতুন নিছ্ফি মিন শাবান” বা শাবানের মধ্য রজনী নামে অভিহিত করা হয়। যে রাতটি হলো শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সলফে সালেহীনগণ এবং বিজ্ঞ মনীষীগণ এ রাতটিকে অত্যন্ত গুরুত ¡সহকারে পালন করেছেন। অনুরূপভাবে যুগে যুগে মুসলমানগণ এরই ধারাবাহিকতায় এ রাতটি পালন করে আসছেন।
নামকরণ: “শবে বরাত” ফার্সী শব্দ, ’শব’ মানে রাত আর ’বরাত’ মানে ভাগ্য, অর্থাৎ ভাগ্যরজনী। আর এ পবিত্র রাতের বিভিণœ নাম পাওয়া যায়। ১. লাইয়লাতুল বরাত বা বণ্টনের রাত, ২. লাইলাতুল মুবারাকা বা বরকতময় রজনী ৩. লাইলাতুর রহমা বা করুনার রজনী ও ৪. লাইলাতুছ্ ছাক বা সনদপ্রাপ্তির রাত।
হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি রচিত গুনিয়াতুত্ ত্বালেবীন এ উল্লেখ করেন: ‘এ রাতকে লাইলাতুল বরাত বলা হয় এ জন্য যে, কেননা এ রাতে দু’ধরনের বরাত হাছিল হয়। একটি হলোঃ হতভাগাদের আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া, অপরটি হলোঃ আল্লাহর প্রিয়জনদের অপমান থেকে মুক্ত ও নিরাপদ থাকা।’’ (গুনইয়াতুত তালেবীন: হযরত আবদুল কাদের জিলানী)
আল কোরআনে শবে বরাত: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: “হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা দুখান, আয়াত: ০১-০৬) আল্লামা জমখ্শরী তাঁর ‘কাশ্শাফ’ নামক তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেন- ‘‘নিশ্চয় শাবানের মধ্য রজনী’র চারটি উল্লেখযোগ্য নাম রয়েছে, আর তা হলো- লাইলাতুল মুবারাকা (বরকতময় রজনী) লাইলাতুল বরায়া (ভাগ্য রজনী) লাইলার্তু রহমাহ্ (করুনার রজনী) ও লাইলাতুছ্ ছাক (সনদপ্রাপ্তির রজনী) এ রাতকে বরাত ও ছাক রাত নামে নামকরণের কারণ হিসেবে বলেন- যখন কোন ব্যক্তি তার উপর ধার্যকৃত কর পরিশোধ করেন তখন তাকে কর আদায়কারী ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি দায়মুক্তির সনদ দেয়া হয়, অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ রাত্রিতে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ প্রদান করে থাকেন।’’ [তাফসীর-ই কাশ্শাফ: আল্লামা জমখ্শরী]
তাছাড়া, ইমাম কুরতবী তাঁর তাফসীরের প্রসিদ্ধ গ্রন্থে পবিত্র ক্বোরআনের ‘সূরা দুখান’ এর আয়াত ০৩ এর ব্যাখ্যায় বলেন: ”এ রাতটির চারটি নাম উল্লেখ রয়েছে। আর তাহলো- লাইলাতুল মুবারাকাহ্ ও লাইলাতুছ্ ছাক। আর এ রাতকে ‘বরকতময় রজনী’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা এ রাতে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের উপর অগণিত বরকত, কল্যাণ ও পূণ্য অবতীর্ণ করে থাকেন।
হযরত ক্বাতাদাহ্ (র.) ওয়াছিলাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন: ক্বোরআন অবতীর্ণ হওয়া আরম্ভ হয় শবে বরাতের রাতে। ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, লাইলাতুল মুবারাকাহ্ মানে এখানে ‘শবে বরাত’কে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন: হযরত ইকরামা বলেন, এটি হলো শাবানের মধ্য রজনী (শবে বরাত) আগত বছরের বিষয়াদি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কারা জীবিত থাকবে এবং কারা মারা যাবে, কারা এ বছর হজ্ব করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। ফলে এতে কেউ কোনরূপ পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে না। হযরত ওসমান ইবনে মুগিরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, শাবান থেকে শাবানের জন্য মানুষের আয়ু নির্ধারণ করা হয়, এমনি মানুষ বিবাহ্ করছে এবং তার সন্তান জন্ম লাভ করছে অথচ তার নাম মৃতদের কাতারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
‘আল্ আ’রুস’ নামক কিতাবের লেখক এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, যে রাতে সবকিছু বণ্টন করা হয় তা হলো শাবানের মধ্য রজনী বা শবে বরাত। এজন্য এটাকে বরাত রজনী বলা হয়। আল্লামা জমখ্শরী বলেন- ‘লওহে মাহ্ফুজ’ এ লিপিবদ্ধকরণ শুরু হয় শবে বরাতে এবং তার পরিসমাপ্তি ঘটে শবে ক্বদরে। অতঃপর রিজিকের কপি দেয়া হয় হযরত মিকাঈল আলাইহিস্ সালামকে, যুদ্ধের কপি হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে, অনুরূপভাবে ভূমিকম্প, বজ্রপাত ও ভূমিধ্বস বিষয়ক কপিও। আমলনামার কপি প্রথম আসমানের মহান ফিরিশতা হযরত ইসমাঈলকে এবং বিপদাপদের কপি হযরত আজরাঈল তথা মালাকুল মাওতকে সোপর্দ করা হয়।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বর্ণনা করেন, আল্লাহ্ তা‘আলা নানা বিষয়ে ফয়সালা প্রদান করেন শাবানের মধ্য রজনীতে এবং তা এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতাদের নিকট সোপর্দ করেন ক্বদরের রাতে।
হাদীস শরীফের আলোকে শবে বরাত: পবিত্র শাবান মাস এবং এ মাসে রোজা পালনের উপর বোখারী, মুসলিম ও তিরমিযীসহ অনেক বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থের বর্ণনা আমরা লক্ষ্য করেছি। অনুরূপভাবে এ মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত তথা শবে বরাত সম্পর্কে ছেহাহ্ ছিত্তাহর উল্লেখযোগ্য কিতাবাদিসহ নানা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে প্রমাণ মেলে। ১। ছহীহ্ ইবনুল হিব্বান-এ হযরত মুয়ায রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত: , ‘যখন শাবানের মধ্য রজনী (শবে বরাত) উপস্থিত হয় তখন এক আহ্বানকারী এ আহবান করতে থাকে, ‘‘কোনও ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো কোন প্রার্থী বা ফরিয়াদী আছো কি? আমি তার প্রার্থনা ও ফরিয়াদ কবুল করব? ফলে যে যা প্রার্থনা করবে তাকে তা দেয়া হবে। একমাত্র যেনাকারী ও মুশরিককে নয়। (ছহীহ্ ইবনুল হিব্বান) ২। সুনানে ইবনে মাযা শরীফে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন- ”যখন শাবানের মধ্য রজনী উপস্থিত হবে, তখন তোমরা এ রাতটিকে (ইবাদতের মাধ্যমে) উদ্যাপন কর এবং আগত দিনটিকে রোজার মাধ্যমে। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা ওই রাতের সূর্যাস্তের পরক্ষণ থেকেই পৃথিবীবাসীর প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি প্রদান করেন এবং এ ঘোষণা দেন- আছ কি কেউ ক্ষমা চাওয়ার? তাকে ক্ষমা করবো। আছ কি কেউ রিযিক প্রার্থনা করার? রিযিক দ্বারা ধন্য করবো। আছ কি কেউ অসুস্থ ? তাকে আরোগ্য দান করবো। আছ কি এমন কেউ? আছে কি এমন কেউ? সুবহে সাদেক উদিত হওয়া পর্যন্ত এভাবে বলা হবে। (সুনানে ইবনে মাযা) ৩। তিরমিযী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- ‘এক রজনীতে আমি প্রিয়নবীকে বিছানায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ফলে তাঁকে খোজার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেখি তিনি জান্নাতুল বক্বীতে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দিয়ে দোয়ারত আছেন। আমাকে দেখে হুযূর করীম বললেন, তুমি কি এ ভয় করছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অন্যায় করবেন? আমি বললাম, এয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন স্ত্রীর গৃহে প্রবেশ করেছেন। তখন হুযূর করীম বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে প্রথমাকাশের দিকে বিশেষ কৃপাদৃষ্টি দান করেন এবং ’কলব’ গোত্রের ছাগলের পশমেরও অধিক পরিমাণ গুনাহগারকে ক্ষমা করেন।( তিরমিযী শরীফ) ৪। ‘সুনানে ইবনে মাযাতে হযরত আবু মুসা আশয়ারী থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে রহমত ভরা দৃষ্টিতে গুনাহগারদের দিকে তাকান, ফলে সকল সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন, একমাত্র মুশরিক ও অন্য মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিরেকে। (‘সুনানে ইবনে মাযাত) ৫। ‘মুসনাদে আহমদ’এ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আছ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত- প্রিয় নবী এরশাদ করেন, সাবানের মধ্য রজনীতে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি প্রদান করেন এবং সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন; কিন্তু দুই শ্রেণীর মানুষকে নয়, বিদ্বেষ পোষণকারী ও আত্মহত্যাকারীকে।( ‘মুসনাদে আহমদ) ৬। হযরত আবু বকর সিদ্দিক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন- আল্লাহ্ তা‘আলা যখন শাবানের মধ্য রজনী উপস্থিত হয় তখন পৃথিবীর আকাশে রহমতের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং সকল শ্রেণীর বান্দাদের ক্ষমা করেন, একমাত্র মুশরিক ও মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপোষণকারীকে ছাড়া। (‘মুসনাদে বাজ্জাজ’) ৭। ‘লাতায়েফুল মা’রেফ’ এ কা’ব থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন- আল্লাহ্ তা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে জিব্রাঈল (আ.) কে বেহেশতের প্রতি এ নির্দেশ দিয়ে পাঠান যে, বেহেশত যেন নিজেকে নানা সাজে সজ্জিত করে এবং জিব্রাঈল যেন বেহেশতকে উদ্দেশ্য করে এ সুসংবাদ শুনায়: নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমার এ রাত্রিতে মুক্ত করে দিয়েছেন আকাশের তারকারাজির সমপরিমাণ, পৃথিবীর রাত-দিনের সংখ্যা পরিমাণ, বৃক্ষের পত্র-পল্লবের সমপরিমাণ, পাহাড় সমূহের ওজনের সমপরিমাণ এবং বালুরাশির সমপরিমাণ অসংখ্য অগণিত মানুষকে।(পৃষ্ঠা-১৩৮) ৮। ‘মুসনদে বাযযায’ এ হযরত আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন- ‘শাবানের মধ্য রজনীতে আয়ূ নির্ধারণ করা হয়। ফলে দেখা যায় কেউ সফরে বের হয়েছে অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, আবার কেউ বিয়ে করছে অথচ তার নাম জীবিতের খাতা থেকে মৃতের খাতায় লিখা হয়ে গেছে।(হাদিস নং: ৭৯২৫) ৯। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আরা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- পাঁচটি রজনীতে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় নাঃ জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবানের মধ্য রজনী এবং দুই ঈদের রাত। (‘মুসনদে বাযযায’: ৭৯২৭ ১০। ‘মু’জাম আল কাবীর’ এ হযরত মুয়ায ইবনে জবল থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- ‘আল্লাহতা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে স্বীয় সৃষ্টির প্রতি বিশেষ করূণার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং সকল সৃষ্টিকেও ক্ষমা করে দেন এবং শুধু মাত্র মুশরিক ও বিদ্বেষীকে ছাড়া।(হা-৬৭৭২) ১১। অনুরূপভাবে ‘মুজাম আল কাবীর’ এ আবু ছা’লাবাহ্ থেকে বর্ণিত: প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন, আল্লাহস্বীয় বান্দাদের প্রতি শাবানের মধ্য রজনীতে করুণা ভরা হৃদয়ে ক্ষমার দৃষ্টিতে তাকান, ফলে মুমিনদের ক্ষমা করে দেন এবং কাফিরদেরকে ইমান আনার সুযোগ দেন আর হিংসুকদেরকে তাদের হিংসার মাঝে ছেড়ে দেন, যতক্ষণ না তারা তাদের হিংসা বিদ্বেষ ত্যাগ করে। (হা- ২২৩) ১২। হযরত আবু বকর সিদ্দিক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন- নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা শবে বরাতের মধ্য রজনীতে পৃথিবীর আকাশে রহমত অবতারণ করেন এবং পৃথিবীর সকল মানুষকে ক্ষমা করে দেন। একমাত্র কাফির এবং যার অন্তরে বিদ্বেষ বিদ্যমান।(ঊসুলু ্ ইতিকাদি আহলিস্ সুন্নাহ.হা :৭৫০)
ক্স সালফে ছালেহীনের দৃষ্টিতে শবে বরাত:
মোল্লা আলী আলক্বারী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, মিশকাত শরীফ এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘মিরকাত’ এ বলেন- ‘সালফে ছালেহীনদের বড় একটি অংশ বলেন, ‘আয়াত (সূরা দুখান-১-৪) দ্বারা শাবানের মধ্য রাতকে বুঝানো হয়েছে। এতে কোন বিরোধ নেই যে, শবে বরাতের রাত্রিতে বণ্টন কাজ সম্পন্ন হয়। বিরোধ হলো- এ আয়াত দ্বারা এ রাতকে বুঝানো হয়েছে কিনা। যদি তা দ্বারা শবে ক্বদর বুঝানো হয়, তাহলে হাদিস ও আয়াত উভয়ের সমন্বয়ে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, এ বণ্টনটি উভয় রাতে (শবে বরাত ও শবে ক্বদর) সম্পন্ন হয়েছে। যাতে এর গুরূত্ব আরও অধিকভাবে প্রমাণিত হয়। আবার এটাও হতে পারে যে, বণ্টন কাজটি এক রাতে সংক্ষেপে এবং অন্য রাতে বিস্তারিতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অথবা এক রাতে পার্থিব বিষয়াদি এবং অন্য রাতে পরকালীন বিষয়াদির বণ্টন সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও নানা সম্ভাবনাও থাকতে পারে।
ইবনে নুজাইম মিসরী ‘আল আশ্বাহ্ ওয়ান নাজায়ের’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন- কিছু সংখ্যক ওলামা বলেছেন, যদি জুমার রাত ও শাবানের মধ্য রাত একত্রিত হয়ে যায় তাহলে এ রাতটি উদ্যাপন করা মুসতাহাব। হ্যাঁ, তবে যদি এটিকে শুধু শবে বরাতের রাত ধরা হয়, তাহলে উদ্যাপন করা মুসতাহাব হবে, নাকি জুমার রাত হওয়াতে তা মাকরূহ হবে? তা নিয়ে কিছু সন্দেহ পোষণ করা হয়েছে। আর যারা মাকরূহ বলেছেন তারা হারামে লিপ্ত হওয়ার ভয়ে। কিন্তু তা হারাম হবে না, কেননা ইবাদতকারীর নিয়ত হলো- শবে বরাত।
মনসুর আল বাহুতী ‘কাশ্শাফুল কান্না’ নামক কিতাবে লিখেন- ‘নিশ্চয় শাবানের মধ্য রাতের অনেক ফজিলত বিদ্যমান। সালফে সালেহীনদের মাঝে অনেকেই এ রাতে নফল নামায আদায় করতেন। প্রিয় নবীর এ হাদিস তাদের সমর্থন করে। প্রিয়নবী এরশাদ করেন: যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাত ও শাবানের মধ্য রাত ইবাদতের মাধ্যমে উদ্যাপন করবে, আল্লাহ্ তা‘আলা তার ক্বলবকে জীবিত রাখবেন ওই দিনও, যে দিন অনেক ক্বলব মৃত্যুবরণ করবে। (তারীখে মুনজেরীতে তা বর্ণিত হয়েছে)। আরেক দল ওলামা বলেছেন- অনুরূপভাবে আশুরা (মহররম মাসের নয় তারিখ দিবাগত রাত)’র রাতে, রজব মাসের প্রথম রাতে ও শবে বরাতও।
ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ‘আল্ উম্ম’ নামক কিতাবে বলেন- ‘আমাদের নিকট এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, বলা হয়ে থাকে, পাঁচটি রহমতময় রজনীতে দো‘আ কবুল হয়। জুমার রাতে, ঈদুল আযহার রাতে, ঈদুল ফিতরের রাতে, রজব মাসের প্রথম রাতে এবং শাবানের মধ্যরাতে। তিনি (শাফে‘ঈ) আরও বলেন, ‘আমি উপরোক্ত রাতগুলোকে উদ্যাপন করা মুসতাহাব মনে করি, যদি ফরজ মনে করা না হয়, তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিকট প্রমাণিত যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর জুমার রাত উদ্যাপন করতেন।(সুনান আল কুবরা) উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, শবে বরাতের বিষয়ে বর্ণিত হাদিসসমূহ খুবই নির্ভুল এবং গ্রহণযোগ্য। এমনকি সালাফী (ওয়াহাবী) দাবীদারদের গুরু আলবানী সাহেবও এ হাদিসগুলো সহীহ ও নির্ভুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। (সিলসিলা: (৫১২,৫১১,৫১০,৫০৯)
ইবনে তাইমিয়াহ্: সালাফী ও ওহাবী মতবাদের অনুসারীদের ইমামে আজম! জনাব ইবনে তাইমিয়াহর মতে- ‘‘ইবনে তাইমিয়াহকে শবে বরাতের রাতে নফল নামায আদায় বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, যদি মানুষ শবে বরাত রাতে একাকী অথবা বিশেষ জামাত সহকারে নফল নামাজ আদায় করে, যেমনিভাবে সালফে ছালেহীনগণের অনেকেই করতেন, তাহলে তা খুবই ভাল কাজ’’। তিনি অন্যত্র বলেন, শবে বরাতের ফজিলতে অনেক হাদিস ও রিওয়ায়েত বিদ্যমান এবং এটাও প্রমাণিত যে, সালফে সালেহীনগণ এ রাতে বিশেষ নফল নামায আদায় করতেন। সুতরাং একাকীভাবে এ রাতে ইবাদতের ক্ষেত্রে সালফে ছালেহীনগণ অগ্রগামী এবং এতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণও মিলে। সুতরাং এ ধরনের বিষয়ে অস্বীকার করা যায় না। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া: ৩/ ১৩১-১৩২)
আল্লামা মুবারকপুরী: তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তোহফাতুল আহ্ওয়াজী’তে বলেন- জেনে রেখো, শাবানের মধ্যরাতের (শবে বরাতের) ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সব হাদিস একত্রিত করলে প্রমাণিত হয় যে, এ রাতের ফজিলতের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। অনুরূপভাবে এ হাদিসগুলো সম্মিলিতভাবে তাদের বিপক্ষে প্রমাণ বহন করে যারা ধারণা করে যে, শবে বরাতের ফজিলতের ক্ষেত্রে কোন প্রমাণ মেলে না।’’
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ’লাতায়েফুল মা’রেফ’ নামক কিতাবে বর্ণনা করেন- শাবানের মধ্যরাতকে শামবাসী তাবেয়ীগণ অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকতেন। খালেদ বিন মা’দান, লোকমান বিন আহমরসহ শামদেশীয় তাবেয়ীগণও মসজিদে গিয়ে শবে বরাত পালন করতেন। এবং ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাভীয়াও এতে ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং সমর্থন দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন ‘‘মসজিদে সমবেত হয়ে জামাতসহকারে এ রাত উদ্যাপন করা বিদ‘আত নয়। (বরং সুন্নাত) তিনি আরো বলেন: “সিরিয়াবাসী তাবেয়ীনদের কাছ থেকে মানুষ এ রাতের ফজিলত এবং মর্যাদার বিষয়টি গুরূত্বসহকারে গ্রহণ করেছেন। তিনি আরো বলেন: এ রাত জামাত সহকারে মসজিদে উদ্যাপন করা মুস্তাহাব। হযরত খালিদ ইবনে মা’দান এবং লোকমান ইবনে আমেরসহ অন্যান্য তাবেয়ীগণ এ রাতে উন্নতমানের পোশাক পরিধান করতেন, খুশবু লাগাতেন, সুরমা দিতেন এবং এ রাতটি সম্পূর্ণরূপে মসজিদে কাটাতেন। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাভিয়াও এটার সমর্থনে বলেছেন- ‘জমাত সহকারে এ রাতটি মসজিদে উদ্যাপন করা বিদ‘আত নয় (হারব আল কেরমানী তাঁর ‘আল্ মাসায়েল’ নামক কিতাবে তা বর্ণনা করেছেন) তিনি আরও বলেন: ‘‘বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীয বসরায় নিযুক্ত গভর্ণরের কাছে এ মর্মে চিঠি লিখলেন যে, বছরের চারটি রাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেবে। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা এ রাতগুলোতে রহমতের অঢেল প্রবাহ দান করেন। এগুলো হলো- রজবের প্রথম রাত, শাবানের মধ্য রাত এবং উভয় ঈদের দুই রাত।’’ (ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী:’লাতায়েফুল মা’রেফ’ ২৬৩)
হযরত আত্বা ইবনে ইয়াসার বলেন: ক্বদরের রাতের পর বরাতের রাতের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ রাত আর কোনটি হতে পারে না। এ রাতে আল্লাহ্ সর্বশ্রেণীর লোকদের ক্ষমা করে দেন। একমাত্র মুশরিক, ঝগড়াটে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে ব্যতিরেকে। তিনি আরও বলেন: ‘‘যখন শাবানের মধ্য রাত উপস্থিত হয়, তখন মালাকুল মাওত এর কাছে একটি রেকর্ডবুক অর্পণ করে এ নির্দেশ দেয়া হয় যে, এ বইয়ে যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে তাদের প্রাণ কবজ কর। দেখা যায় মানুষ গাছ লাগাচ্ছে, বিবাহ করছে, ঘর নির্মাণ করছে, অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। আর মালাকুল মাওত একমাত্র নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই জান কবজ করে নেয়।’’ দেখনু: ’লাতায়েফুল মা’রেফ’ লিখক: ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (৭৩৬-৭৯০) প্রকাশ: কায়রো, পৃ. ১৭৭-২০৩)
উপরিউক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম শবে বরাত উদ্যাপন করেন এবং তাঁরই অনুসরণে যুগে যুগে মুসলমানগণ এ রাতকে বরকতময় রজনী হিসেবে পালন করে আসছেন। বিশেষ করে তাবেয়ীনদের যুগে এ রাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদে সমবেত হয়ে জামাত সহকারে আদায়ের প্রচলন শুরু হয়। আর তাঁরা হলেন সর্বশ্রেষ্ট যুগের মানুষ এর দলভুক্ত। তাই প্রিয়নবী প্রবর্তিত এ ইবাদতকে বিদ‘আত বলা প্রিয়নবীর বিরোধীতারই শামিল।

শবে মেরাজ: মহিমান্বিত রজনী

বছরে যে পাঁচটি রাত বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ এর অন্যতম লাইলাতুল মেরাজ বা শবে মেরাজ। এই রাতে রাসুলের (সা.) জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি মেরাজ সংঘটিত হয়। ২৬ রজব দিবাগত রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। ঐতিহাসিক সেই সফরকেই মেরাজ বলা হয়। মেরাজ আরবি শব্দ, শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আকাশপথে ভ্রমণ করা, সোপান ইত্যাদি। রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে উম্মে হানির ঘর থেকে জাগ্রত অবস্থায় বোরাকে করে মসজিদে হারাম থেকে আরশে আজিমে পৌঁছে আল্লাহর দিদার লাভ করার নামই মেরাজ। কোরআনে কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি বান্দাকে তার নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ পবিত্র, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (বনি ইসরাইল-১)।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মেরাজের রাতে রাসুল (সা.) উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। হঠাৎ হজরত জিবরাইল (আ.) এসে রাসুলকে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। যেখানে তার বুক বিদীর্ণ করে জমজম কূপের পানি দিয়ে সিনা ধুয়ে পরিষ্কার ও শক্তিশালী করা হয়। এ ঘটনাকে ‘শাক্কুস সদর’ বলে। নবীজির (সা.) জীবনে অন্তত তিনবার এমনটা হয়েছে। তারপর সেখান থেকে তিনি ‘বোরাক’ নামক এক ঐশী বাহনে চড়ে বায়তুল মোকাদ্দাসে এসে সব নবীর ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। তারপর তিনি বোরাকে চড়ে ঊর্ধ্বে গমন করতে থাকেন। একের পর এক আসমান অতিক্রম করেন। রাস্তায় হজরত মুসা (আ.)-সহ বেশ কয়েকজন নবী-রাসুলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সপ্তম আসমানের পর হজরত রাসুলুল্লাহকে (সা.) বায়তুল মামুর পরিদর্শন করানো হয়। সেখানে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেন।

বায়তুল মামুরে হজরত জিবরাইলকে (আ.) রেখে তিনি ‘রফরফ’ নামক আরেকটি আসমানি বাহনে চড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, মেরাজের রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহ তায়ালার এতটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যে, দুজনের মধ্যখানে মাত্র এক ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল। এখানে হজরত রাসুলল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বারবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতে মোহাম্মদির ওপর ফরজ করেন, যা ইসলামের পাঁচটি রোকনের অন্যতম রোকন বা ভিত্তি। যেহেতু মেরাজের রাতে নামাজের নির্দেশ হয়েছে, এজন্য নামাজকে ‘মেরাজুল মুমিনিন’ বা মুমিনের মেরাজ বলা হয়।

রাসুলের (সা.) মেরাজ সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণাদি রয়েছে। এজন্য কোনো মুসলমানের পক্ষে তা অস্বীকার করা কিংবা এ ব্যাপারে সংশয় দেখানো উচিত নয়। এমনকি একজন খাঁটি মুসলমানের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেরাজের সত্যতা প্রমাণের অপেক্ষা না করে এ বিষয়ে মনেপ্রাণে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানি কর্তব্য। রাসুল (সা.)-এর মেরাজে যাওয়ার কথা একজন অবিশ্বাসীর মুখে শুনে হজরত আবু বকর (রা.) তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসুল তাকে ‘সিদ্দিক’ উপাধি দিয়েছিলেন।

মেরাজ নবীজীবনের নিছক একটি ঘটনাই নয়, এর তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক বিস্তৃত। যখন নবী করিম (সা.) জাগতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থার মুখোমুখি হন, তার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের আকস্মিক ইন্তেকাল হয়, অন্যদিকে কাফেরদের অত্যাচার তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার বন্ধুকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে এনে সান্ত¦না দিয়ে সমাজ সংস্কারের একটি পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। ইসলামের প্রধানতম স্তম্ভ নামাজ ফরজ করা হয় ওই রাতে। তাছাড়া ওই রাতে রাসুলকে (সা.) স্বচক্ষে এমন কিছু বিষয় দেখানো হয়, যা একটি আদর্শিক সমাজ গঠনে পরবর্তী জীবনে কাজে লাগে। ওই রাতে নবীদের ইমাম বানিয়ে আল্লাহ তায়ালা মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেন। শুধু নবীকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়নি, এই নবীর উম্মতদেরও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয় শবে মেরাজে। এজন্য মেরাজের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।