আল্লাহ বিনা কারণে কিছু সৃষ্টি করেন নি
ড. এম. শমশের আলী

আমাদের চারপাশে যেসব জড় ও জীব পদার্থ দেখি সেগুলোর বৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হতে হয়। জড় পদার্থের কথাই ধরা যাক। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ৯২টি মৌলিক পদার্থ খুঁজে পেয়েছেন। যা দিয়ে অন্য যৌগিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। এসবের পরও কিছু উপাদান তৈরি করা হয়েছে। তবে সেগুলোর স্থায়িত্ব বেশি নয়। এই উপাদানগুলোর এক একটির আণবিক ও পারমাণবিক গঠন এক এক রকম। এদের মধ্যে কোনটি বায়বীয়, কোনটি তরল, আবার কোনটি কঠিন অবস্থায় বিরাজ করে। কোনটি আবার একাধিক অবস্থাতে বিরাজ করতে পারে। এদের কোনটিকে বাদ দিয়ে জড় ও জীব জগতের কথা চিন্তা করা যায় না। কৃষির কথাই ধরা যাক; মাটিতে ম্যাগনেশিয়াম, সালফার, ক্যালসিয়াম, লৌহ ইত্যাদি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে। এর কম-বেশি হয়ে গেলে বিপদ। এদের কোন কোনটি থাকে অত্যন্ত অল্প মাত্রায় যেগুলোকে বলা হয় ট্রেস এলিমেন্টস। এসব ট্রেস এলিমেন্টসের হেরফের হয়ে গেলে শরীরে নানা রকম রোগ-ব্যাধি দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে জীবজগতের সব প্রাণীর কোষে যে উঘঅ নামক অণু থাকে যাকে বলা হয় বংশগতি নীলনকশা, তাতে হাউড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, সালফার এবং ফসফরাস থাকতেই হবে। তা সে মশার উঘঅ-ই হোক বা মানুষের উঘঅ-ই হোক। এই উঘঅ মোলিকুলের অংশবিশেষকেই বলা হয় জিন (এবহব)। একেক প্রাণীর দেহের কোষের মধ্যে উঘঅ থাকে। আবার একই সংখ্যক জিন (এবহব) বিশিষ্ট প্রাণীর উঘঅ-এর মধ্যে কতকগুলো রাসায়ণিক যৌগ যেমন- অফহিরহব (অ), ঞযুসরহব (ঞ), এঁধহরহব (এ), ঈুঃড়ংরহব (ঈ), থাকে। তার ওপর একই প্রাণীর চারিত্রিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য একই রকম। এজন্য কোন দু’জন মানুষ বা দুই প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য একই হতে পারে না। এই জিনের সংখ্যার হেরফের এবং উঘঅ মোলিকুলের বিন্যাসের হেরফের জীব বৈচিত্র্যের জন্য দায়ী। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে এতরকম জড় পদার্থ, এত রকম জীব পদার্থ কেন সৃষ্ট করা হল? এই প্রশ্নটির উত্তর মহান আল্লাহ্ তা’আলা সুরা আল্ ইমরানের ৩:১৯০-১৯১ আয়াতে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন:
৩:১৯০ ইন্না ফি খালকিস সামা ওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়াখতিলাফিল লাইলী ওয়ান নাহারী লা আয়াতিল্লি উলিল আল বাব।
বাংলা অনুবাদ: আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নির্দেশনাবলী রহিয়াছে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকের জন্য।
৩:১৯১- আল্লাজিনা ইয়াজকুরুনাল্লাহা কিয়ামাও ওয়া কুউদাও ওয়া আলা জুনুবিহীম ওয়া ইয়া তাফাকারুন্না ফি খালকিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, রাব্বানা মা খালাকাতা হা যা বাতিলা ছুবহানাকা ফাকিনা আজাবান্নার।
বাংলা অনুবাদ- যাহারা দাঁড়াইয়া, বসিয়া ও শুইয়া আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল এবং পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে ও বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি ইহা নিরর্থক সৃষ্টি করো নাই, তুমি পবিত্র, তুমি আমাদিকে অগ্নি শাস্তি হইতে রা কর।’
ক্বোরআনের এই আয়াত দুটি ক্বোরআনে বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গ উপস্থাপন করা এক অনবদ্য পন্থারই নির্দেশক। ক্বোরআন বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়, এখানে পদার্থের বলবিদ্যা বা পদার্থের ভর তুল্যের কোন সমীকরণ তুলে ধরা হয়নি। অথচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ইঙ্গিতমূলক প্রায় সাড়ে সাতশ আয়াত রয়েছে ক্বোরআনে। প্রশ্ন জাগতে পারে কথাগুলো কিভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এর উত্তরে বলা যায় যে, ক্বোরআন কতগুলো এৎধহফ চৎরহপরঢ়ষবং বা প্রধান সূত্রাবলীর মাধ্যমে অনেক বেশি কথা চুম্বক আকারে প্রকাশ করেছে। ওপরের আয়াত দুটি এমনই এক ধরনের প্রধান সূত্রের নির্দেশক। এই সূত্রটিকে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতে গেলে একটি বিরাট গ্রন্থ সৃষ্টি হবে। যা হবে ইকোলজি বা পরিবেশ বিজ্ঞান সংবলিত। অর্থাৎ এ ধরনের একেকটি সূত্র একেকটি শাস্ত্রের জন্ম নেয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আজকের ঊপড়ষড়মরংঃ বা পরিবেশ বিজ্ঞানীর মূল কথাই হচ্ছে: ঘড়ঃযরহম যধং নববহ পৎবধঃবং ভড়ৎ হড়ঃযরহম অর্থাৎ বিনা কারণে কোন কিছুই সৃষ্টি করা হয়নি। বিদেশী পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ক্বোরআন পড়েছেন তা নয়। কিন্তু তাদের পর্যবেণে ও পরীা-নিরীার মাধ্যমে তারা যা পেয়েছেন তা উপরোক্ত দুটি আয়াতেরই প্রকাশ মাত্র। আজকে আমরা জানি যে, পৃথিবীতে প্রাণী ও উদ্ভিদ মিলিয়ে
তিন কোটি জাতের প্রাণ আছে (খরভব ভড়ৎসং)। মানুষ এই তিন কোটি প্রাণের একটি। একটা ফড়িং, কাঁকড়া, সাপ, মশা, মাছি, শিয়ালকাটা, সজনে গাছ, পুঁইশাক, গান্ধা ফুল ইত্যাদি এই তিন কোটি প্রাণীরই অন্তর্ভুক্ত। বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীর মধ্যে মাত্র ত্রিশ লাখ প্রাণের কার্যক্রম জানতে পেরেছে। বাকি প্রাণগুলোর ঋঁহপঃরড়হং বা কাজ এখনও বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারেনি। অথচ এই প্রাণগুলো প্রকৃতিরই অংশ এবং কোন রকমভাবে এরা প্রকৃতির পরিবেশের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রশ্ন জাগতে পারে স্রষ্টা মশা সৃষ্টি করতে গেলেন কেন? এর উত্তরে বলা যায় মশা যে কামড়ায়, মশা যে শুধু দংশন করে এবং ম্যালেরিয়ার বাহক হিসেবে কাজ করে তা নয়, মশা অনেক ছোট ছোট মাছের খাদ্যও বটে! প্রকৃতিতে দেখা যায় যে একটি ছোট প্রাণীকে একটি বড় প্রাণী খাচ্ছে, সেই প্রাণীকে তার চেয়ে বড় প্রাণী খাচ্ছে এবং আরও বেশি বড় প্রাণী এই বড় প্রাণীকে খাচ্ছে। একে বলা হয় ইংরেজিতে চৎবফধঃরহম প্রকৃতিতে এই প্রক্রিয়া সর্বত্র বিরাজমান এবং এই প্রক্রিয়া ভারসাম্য রায় একটি শক্তিশালী সূত্র। প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এই তিন কোটি প্রাণীর মধ্যে যদি কোন একটি প্রাণীর মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তাকে কি আমরা সমূলে ধ্বংস করে ফেলব! এর উত্তর হচ্ছে ‘না।’ কারণ এই প্রাণের নিশ্চয়ই এমন কিছু কার্যক্রম আছে যা প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর। আমরা যা করতে পারি তা হলো এই প্রাণীর সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারি বিশেষ পর্যায়ে। কিন্তু এদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেললে আমাদেরকে হয়তো চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ব্যাকটেরিয়ার কথা যা শুনলে আমরা আঁতকে উঠি। মনে রাখতে হবে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরে রোগ ঘটায় বটে! কিন্তু অনেক ব্যাকটেরিয়া আমাদের প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর। এই যে আমরা দই খাই তাতেও তো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। উদ্ভিদ যে নাইট্রোজেন ব্যবহার করে সেই নাইট্রোজেন ফিক্সেশনে ব্যাকটেরিয়া বিশেষ অবদান রাখে। মাটির উপরিভাগে যে স্তর সেখানেও অনেক উপযোগী ব্যাকটেরিয়া আছে। সেজন্য মাটির উপরিভাগ কেটে নিয়ে খালি ইট বানানো আমাদের জন্য এক অর্থে তিকরও বটে। যে প্রধান সূত্রটির কথা উল্লেখ করা হলো তার আরও অনেক তাৎপর্য আছে- তার একটি হলো আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে যে নৈসর্গ বা পরিবেশ রেখেছেন সেই পরিবেশই মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ্
তা’আলা লালনকর্তা ও পালনকর্তা হিসেবে এই পরিবেশের মধ্যে তার জীবন ধারণের মধ্যে উপযোগী উপাদান রেখেছেন। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক, বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডের যে আম, জাম, লিচু, আনারস, কাঠাল, আমলকি, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, কুল, ডাব, কমলা, বেল, তাল, নারকেল ইত্যাদি রয়েছে এগুলো বাদ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে আপেল আনার কোন দরকার পড়ে না। মনে রাখতে হবে আমাদের পরিবেশে যা কিছু ফলে তার প্রতিটি আমাদের জন্য উপযোগী। গ্রীষ্মকালের সজনে ডাটা অল্প করে হলেও তা খাওয়া ভালো। কারণ দেখা গেছে এই সজনে ডাটার একটি অহঃর-ারৎধষ গুণ রয়েছে। ঈযরপশবহ চড়ী-এর প্রতিরোধে এর একটা সহায়ক ভূমিকা আছে। এ ধরনের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেসব উদ্ভিদের কথা বলে শেষ করা যায় না। গাঁদা ফুলের পাতার রস রক্তরণ বন্ধ করে এটা অনেক লোকই জানে। তেমনি শিয়াল কাটারও গুণাগুণ রয়েছে। আবার ওইদিকে গুঁইসাপের একটা ভূমিকা রয়েছে সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। এসব কথা চিন্তা করলে এই কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের মধ্যে যা কিছু আমরা দেখি না কেন, তা বিনা কারণে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেননি।
আজকে আমরা ইরড়ফরাবৎংরঃু বা জীববৈচিত্র্যের কথা বলি। কিন্তু ক্বোরআনের উপরিউক্ত আয়াতে এই জীববৈচিত্র্যের কথা যেভাবে বলা হয়েছে তা এর চেয়ে আরও সুন্দরভাবে বলা সম্ভব নয়।
পরিশেষে একথা বলতে হয়, মানুষকে টিকে থাকতে হলে এই তিন কোটি জাতের প্রত্যেকটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এটাই হওয়া উচিত মানুষের মৌলিক বিশ্বাস। আমরা যখন বলি নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও। তখন শুধু আমরা মানুষের কথাই চিন্তা করি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ আজ বুঝতে পেরেছে মানুষ ছাড়া প্রতিটি প্রাণী যা আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এটাই ঊপড়-চযরষড়ংড়ঢ়যুএর মূল কথা। মোট কথা হচ্ছে এই যে, আমরা যদি আল্লাহর সৃষ্টি সব জীবের সঙ্গে একটি ঐকতান সৃষ্টি করে বসবাস করতে পারি তবে সেটিই হবে আমাদের ও প্রাণীর জন্য পরম মঙ্গলের কথা। আমরা আল্লাহ্ তা’আলার প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টিকে সৃষ্টির প্রতি সঠিক মনোভাব পোষণ করাই আমাদের কর্তব্য। একটি মুহূর্তের জন্যও আমরা ভুলে না যাই আমাদের প্রভু কোনকিছুই বিনা কারণে সৃষ্টি করেননি।

Advertisements

About sunniaaqida

sunniaaqida

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s