আলো ও আধাঁর

মাওলানা মুহাম্মদ শফিউল আলম

 

“নব দিগন্তে নব জাগরণ

আলোকিত হলো আধাঁর ভুবন

আলোক যাত্রির হলো আগমন

মহীয়ান প্রভুর অপার দান”।

বিশ্ব জগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তায়ালা আসমান, গ্রহ, নক্ষত্র ,জমিন ও অন্যান্য সৃষ্টির সাথে আলো ও আধাঁর সৃজন করেছেন আর এই পৃথিবী  আলোকিত হওয়ার উৎস হলো সূর্য ও চন্দ্র। এই  আলো প্রতি সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ হাজার মাইল অতিক্রম করে পৃথিবীতে আসে।এই আলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আলো বা নূরে হিসসি।নূরে হিসসি  সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন الحمد لله الذى خلق السموت و الارض وجعل الظلمات و النور – অর্থঃ সমস্ত প্রশংসা  আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি আসমান ও জমিন এবং দিবসের আলো ও রাতের আধাঁর সৃজন করেছেন।(১)

অন্যটি হলো নূরে গাইরে হিসসি তথা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয় এমন আলো, এই নূরে গাইরে হিস্সি দুই ধরনের; একটি হলো হিদায়াতের নুর অপরটি হলো সৃষ্টিগত নূর যেমনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম , ফেরেশতা  প্রমুখ।আর আধারও দুই ধরনের- একটি ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য। যেমনঃ রাতের আধাঁর ; অন্যটি হলো ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয় এমন ।যেমনঃ পথভ্রষ্টতা; এই সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-الله ولى الذين امنوا يخرجهم من الظلمات الى النور و اللذين كفروا اولياءهم الطاغوت يخرجهم من النور الى الظلمات –  – অর্থঃ আল্লাহ ইমানদারদের বন্ধু, তিনি তাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের পথে পরিচালিত করেন আর কাফেরদের বন্ধু শয়তান, সে তাদেরকে হিদায়াতের পথ থেকে পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত করে।(২)قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين  – অর্থঃ অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ হতে নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সুস্পষ্ট কুরআন মাজীদ এসেছে।(৩)انا انزلنا التوراة  فيها هدى و نور  – অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি তাওরাত কিতাবকে হেদায়াত এবং আলোকবর্তিকা স্বরূপ অবতীর্ন করেছি।(৪)قل هل يستوى الاعمى و البصير ام هل يستوى الظلمات و النور  অর্থঃ হে নবী আপনি বলুন,অন্ধ ও চাক্ষুষ্মান কিংবা পথভ্রষ্টতা ও হিদায়াত একই রূপ কী ?(৫)يريدون ان يطفؤا نور الله بافؤاههم  – অর্থঃ কাফেররা চায় আল্লাহর হিদায়াতকে তাদের মুখ দিয়ে নিভিয়ে দিতে।(৬)الر كتاب انزلناه اليك لتخرج الناس من الظلمات الى النور – অর্থঃ আলিফ,লাম,রা (আল্লাহ ও রাসূল এই হরফগুলোর অর্থ সম্পর্কে ভাল জানেন) আমি মানুষকে পথভ্রষ্টতা হতে হিদায়াতের পথে দিশা প্রদানে আপনার নিকট কুরআন মাজীদ অবতীর্ন করেছি।(৭) الله نور السموات و الارض অর্থঃ আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিনের আলোদানকারী।(৮) من لم يجعل الله له نورا فما له من نور অর্থঃ যার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে হিদায়াত নেই তার হিদায়াতের কোন সুযোগ ন্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্ইে।(৯)هو الذى يصلى عليكم وملائكته ليخرجكم من الظلمات الى النور অর্থঃ তিনি এমন সত্তা যিনি তোমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে সঠিক পথের দিশার লক্ষ্যে তোমাদের এবং ফেরেশতাদের উপর  রহমত  নাযিল করেছেন।(১০)

আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৃষ্টিগত নূর ও হেদায়াতের নূর স্বরূপ ম্ানবরূপে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত মানবজাতিকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার কল্পে এই ধরনীতে আগমন করেছেন । কতেক লোক সৃষ্টিগত নুর নবী কে হিদায়াতের নুর নবী বলে যে অপপ্রয়াস চালাচ্ছে তা ভ্রান্ত বলে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে – হযরত জাবের (রা) বর্ণিত হাদীস;روى عبد الرزّاق بسنده عن جابر  ابن عبد الله الانصارى قال قلت يا رسول الله بابي انت وامى اخبرنى عن اول شئ خلقه الله تعالى قبل الاشياء قال يا جابر ان الله تعالى  خلق قبل الاشياء نور نبيك من نوره ¬- – অর্থঃ ইমাম আব্দুর রাজ্জাক তার সুত্রে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত হাদীসখানা বর্ননা করেন, জাবের রাদিয়াল্লহু ওয়া আনহু বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল,আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ; আমাকে সব কিছু সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তায়ালা সর্বাগ্রে যা সৃজন করেছেন সে সম্পর্কে অবহিত করুন।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন হে জাবের, নিশ্চযই আল্লাহ তায়ালা সকল সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহর নুর হতে তোমার নবীর নূর সৃজন করেছেন।(১১)

উল্লেখ্য যে, نوره তথা আল্লাহর নুর বলে যে নিসবত বা সম্পর্ক জুড়ে দেয়া হয়েছে তা হলো সম্মানসূচক নিসবত কিন্তু এতে আল্লাহকে নুরের তৈরী বলার কোন সুযোগ নেই কারন আল্লাহর কোন আকার নেই; উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বাইতুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘর, তাই বলে কি আল্লাহ কাবা ঘরে বসবাস করেন? কখনো না বরং এটা  সম্মানসূচক নিসবত।

তবে বুঝা গেলে; রাসূল রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামনূর নবী হিসাবে পৃথিবীতে আগমন করার পূর্বেও ছিলেন ,এই ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-كنت نورا بين يدى ربي قبل خلق ادم اربعة عشر الف – অর্থঃ আমি আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্টির চেীদ্দশত বছর পূর্বে আমার প্রভুর সম্মুখে নূর অবস্থায় ছিলাম।(১২)

তাই নুর নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই  বসুধায় মানবরূপে মানুষের হিদায়তের জন্য হিদায়াতের বানী নিয়ে ৫৭০ খৃস্টাব্দে কিংবা  ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখায় আগমন করেন। তবে কোন দিন আগমন করেছেন এই নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে কিন্তু প্রসিদ্ধ মতে তিনি সোমবারে পৃথিবীতে আগমন করেন; এই সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে -عن ابى فتادة الانصارى انه صلى الله عليه و سلم سئل عن صيام يوم الاثنين فقال: ذاك يوم ولدت فيه’وانزلت على فيه النبوة  – অর্থঃ হযরত আবু কাতাদাহ আল আনসারী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,নিশ্চয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সোমবার রোজা রাখা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,ঐ দিনে আমার পৃথিবীতে আগমন এবং নবুয়তের প্রকাশ।(১৩)

আরো হাদীস শরীফে এসেছে,عن ابن عباس قال ولد صلى الله عليه و سلم يوم الاثنين ’ استنبى يوم الاثنين ’ و دخل المدينة يوم الاثنين ورفع الحجر يوم الاثنين – অর্থঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে  সোমবার আগমন করেন এবং সোমবরে মদিনায় প্রবেশ ও হাজরে আসওয়াদ স্থাপন।(১৪)

প্রবাদ আছে, সড়ৎহরহম ংযড়ংি ঃযব ফধু অর্থাৎ প্রত্যুষ দিবসের পরিচায়ক; তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে আগমন প্রাক্কালে নূরানীয়তের বহিপ্রকাশ এবং অলৌকিক ঘটনা সংঘটন হলো ভবিষ্যৎে সুন্দর সমাজ গঠন ও নূর নবীর নবুয়তের সূচনা। এই সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-روى عن عثمان بن ابى العاص عن امه ام عثمان الثقفية و  اسمها فطمة بنت عبد الله قالت لما حضرت ولادة رسول الله صلى الله عليه و سلم رايت البيت حين وقع قد امتلاء نورا و رايت النجوم تدنو حتى ظننت  انها ستقع علىّ- البيهقى فى دلائل النبوة ১।১১১  – অর্থঃ হযরত উছমান ইবনে আবীল আছ হতে বর্ণিত ,যিনি তার মা উম্মে উছমান আছ্ছকফীয়্যাহ হতে বর্ননা করেন যার নাম ফাতেমা বিনতে আব্দুল্লাহ তিনি বলেন,যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুনিয়ায় আগমনের সময় ঘনীভুত হলো তখনই আমি রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাড়ির দিকে লক্ষ্য করলাম যে উনার আগমনে পুরো ঘর নুরে নুরানিত হলো এবং তারকা এমনভাবে নিকটবর্তী  হলো যেন তা আমার উপর পতিত হবে।(১৫)

আরো ইরশাদ হয়েছে -اخرج احمد و البزاز و الطبرانى و الحاكم و البيهقى عن العرباض بن سارية ان رسول الله رسول الله صلى الله عليه و سلم قال انى عبد الله و خاتم النبيين و ان ادم لمنجدل فى طينته سأخبركم عن ذلك : انى دعوة ابى ابراهيم وبشارة عيسى’ ورويا امى التى رات و كذالك امهات الانبياء يرين’ ان ام رسول الله صلى الله عليه و سلم رأت حين وضعته نورا اضاء له قصور الشام ’ قال ابن حجر : صححه ابن حبان و الحاكم  – অর্থঃ ইমাম আহমদ,বাজ্জাজ, তাবরানী,হাকেম, বায়হাকী, ইরবাদ ইবনে ছারীয়্যাহ হতে বর্ণিত হাদীসখানা উল্লেখ করেন,নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা এবং শেষ নবী আর আদম আলাইহিস সালাম এর মাটির খামির থাকা অবস্থা সর্ম্পকে অচিরেই সংবাদ প্রদান করবো এয়াড়াও আমি আমার পিতা ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর দোয়ার ফসল এবং ঈসা আলাইহিস সালাম এর সু-সংবাদ, আমার মায়ের স্বপ্ন অনুরূপভাবে অন্যান্য নবীর মাতাগনও দেখেছেন আর নিশ্চয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাতা অবলোকন করেছেন যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূর অবস্থায় পৃথিবীতে আগমন করেছেন, সেই নূরে সিরিয়ার প্রসাদসমূহ আলোকিত হয়েছে। (ইবনে হাজর আসকালানী রহঃ বলেন : ইমাম ইবনে হিব্বান ও ইমাম হাকেম এই হাদীসে বিশুদ্ধ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন)

আরো এসেছে- عن حسان بن ثابت قال انى لغلام ابن سبع سنين او ثمان ’ أعقل ما رأيت و سمعت اذا يهودي يصرخ ذات غداة : يا معشر يهود’ فاجتمعوا اليه ’ و انا اسمع’ قالوا : ويلك مالك ؟ قال طلع نجم احمد الذى ولد به هذه الليلة- اخرجه ابن هشام فى السيرة১৭॥১ – অর্থঃ হযরত হাস্সান বিন ছাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি সাত  কিংবা আট বছরের ছোট বালক ছিলাম তবে আমি যা দেখতাম তা বুঝতাম আর হঠাৎ আমি প্রভাতে এক ইহুদীকে চিৎকার করে এরূপ বলতে শুনেছি, হে ইহুদী সমপ্রদায়, অতপর তারা ঐ ব্যক্তির নিকট একত্রিত হলো আর আমি তাদের বলতে শুনেছি : তোমার সম্পদ কি ধ্বংস হয়েছে? সে বলল, এরূপ নয় বরং এই রাতে আহমদী তারকার এই ধরাধামে আগমন হয়েছে।(১৬)

অন্যান্য ঘটনারও বহিঃপ্রকাশ হয়েছে তা হলো-ما روى احمد عن العرباض بن سريةان ارهصات بالبعثة  وقعت عند الميلاد  من ارتجاج ايوان كسرى و سقوط اربع عشرة شرفة من شرفاته و غيض بحيرة طبرية و خمود نار فارس وكان لها الف عام ثم تخمد  – অর্থঃ ইমাম আহমদ হযরত ইরবাদ ইবনে স্যারিয়্যাহ হতে বর্ননা করেন, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমন প্রাক্কালে অনেক অলৌকিক ঘটনা সংগঠিত হয় তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পারস্যের বাদশার রাজসিংহাসন কম্পন, সৌধচূড়াসমূহ  হতে চৌদ্দটি সৌধ খসে পড়ে এবং বাহীরা পাদ্রীর গীর্জাগুলো নিস্তেজ হয়েছে আর যাজক সমপ্রদায়দের হাজার বছরের জ্বালানো অগ্নিকুন্ড নিভে গিয়েছে।(১৭)

ঊল্লেখিত ঘটনাবলীতে স্পষ্ট হলো রাসূলের আগমনে নূতন বসন্তের ধোলা লেগেছে আর ধোলাতে আকাশ, বাতাস , তরুলতা , হুররা আনন্দে মেতে উঠেছে এবং আবু জাহেলও খুশি হয়েছে তবে কি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনে খুশি উদযাপন করবনা ? অবশ্যই করব। এটা কি নিজের অভিপ্রায়ে বলা, তা নয় বরং আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন, قل بفضل الله وبرحمته فبذالك فليفرحوا هو خير مما يجمعون  – অর্থঃ হে নবী আপনি বলুন, আল্লাহর দয়া ও রহমতের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ খুশি উদযাপন কর।(১৮)

উল্লেখিত আয়াতটিতে আল্লাহর দয়া এবং রহমত বলতে কি বুঝায়? এরূপ প্রশ্ন মনে উত্থাপন হতেই পারে; কারন আল্লাহর রহমত ও দয়া অসীম, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই আমাদের প্রতি বড় অনুগ্রহ; কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কারনে আমরা সকল অনুগ্রহ লাভ করেছি। এই মহান অনুগ্রহ সম্পর্কে  মহান রাব্বুল আলামীন নিজেই কুরআনুল কারীমে ঘোষনা দিয়েছেন-ولقد منّ الله على المؤمنين اذ بعث فيهم رسولا من انفسهم يتلوا عليهم اياتهويزكهم و يعلمهم الكتاب و الحكمة – অর্থঃ অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তার আয়াতগুলো তিলওয়াত এবং কুরআন শরীফ ও প্রজ্ঞা শিক্ষা প্রদান এবং আতœা পরিশুদ্ধ করতে মুমিনদের মধ্যে হতে তাদের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রেরন করে বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন।(১৯)

আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে আরো ইরশাদ করেন-وما ارسلنك الا رحمة للعلمين  – অর্থঃ আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ নাযিল করেছি।(২০)

অত্র আয়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বুঝানো হয়েছে ; সুতরাং কুরআনের এক আয়াতের ব্যাখ্যা অপর আয়াতদ্বয় দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনে খুশি উদযাপন করা আল্লাহ তায়ালার আদেশ।

আর মীলাদুন্নবী উপলক্ষে খুশি উদযাপন করে আবু লাহাবের শাস্তি লাঘব এই সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে ছহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে- আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- فلما مات ابو لهب أريه بعض اهله بشر حيبة قال له ماذا لقيت قال ابو لهب لم الق بعدكم غير انى سقيت فى هذه بعتاقتى ثويبة -অর্থঃ আবু লাহাব মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের একজন তাকে স্বপ্ন দেখল,সে  ভীষন কষ্টে আছে; তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তোমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হচ্ছে? আবু লাহাব বলল, যখন থেকে তোমাদের থেকে দূরে চলে এসেছি, তখন থেকেই ভীষণ কষ্টে আছি। কিন্তু দাসী সুআইবাকে (মুহাম্মদের জন্মের সুসংবাদ দেওয়ায়) আযাদ করার কারনে কিছু পানি পান করতে পারছি।(২১)

যুগে যুগে বিভিন্ন সাহাবী, তাবেয়ী, মুহাদ্দিসে কেরাম, ফুকাহায়ে কিরাম, মুফাস্সিরীনগন ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেছে কিন্তু প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করার লক্ষ্যে কয়েকজনের অভিমত পেশ করার প্রয়াস পেলাম-

**প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা জালালুদ্দিন সূয়তি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর স্বগ্রন্থ আল হাভী লিল ফাতওয়ায়ে হুসনুল মাকসুদ ফিল মাওলাদ নামক অধ্যায়ে বলেন -عندى ان اصل عمل المولد الذى هو اجتماع الناس و قرأة ما تيسر من القران رواية الاخبار الواردة فى مبدأ امر النبى صلى الله عليه  وسلم وما وقع فى مولده من الايات ثم يمد لهم سماط يأكلونه و ينصرفون من غير زيادة على ذالك هو من البدع الحسنة التى يثاب عليها صاحبها لما فيه من تعظيم قدر النبى  صلى الله عليه وسلم و اظهار الفرح و الاستبشار بمولده الشريف و اول من احدث فعل ذالك صاحب اربل الملك المظفرابو سعيد  كوكبرى بن زين الدين على بن بكتكين احد الملوك الامجاد و الكبراء الاجود و كان له اثار حسنة هو الذى عمر الجامع المظفرى بسفح قاسيون قال ابن كثير فى تاريخه : كان يعمل المولد الشريف فى ربيع الاول ويحتفل به احتفالا هائلا وكان شهما شجاعا بطلا عاقلا عالما عادلا رحمه الله واكرم مثواه. – অর্থঃ আমার অভিমত,নিশ্চয়ই মিলাদুন্নবী এর মৌলিক কর্ম হলো: মানুষ একত্রিত হওয়া এবং কুরআন হতে যা সহজ এমন আয়াত তিলাওয়াত করা ও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনের পূর্বের আগমনীয় বার্তা সম্পর্কিত সুসংবাদ আর আগমন প্রাক্কালে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনা  আলোচনা করা অতঃপর সমাবেত লোকদের জন্য খানার আয়োজন করা এবং অপচয় না করা তাই এ্টাই উত্তম বিদয়াত ;এই উত্তম কাজের আয়োজনকারী সাওয়াবের অধিকারী হবে কারন এতে রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও উনার আগমনে আনন্দ প্রকাশ এবং আগমন দিবসের সুসংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া আার প্রথম যে ঐ রাজকীয় খাবারের আয়োজন করেছেন তিনি হলেন একজন সম্ভ্রান্ত্র দানশীলদের মধ্যে অন্যতম বাদশা মুজাফফর আবু সাঈদ কাউকাবারী বিন যাইনুদ্দিন আলী বিন বক্তকীন, এটা ছিল তার উত্তম নিদর্শন।আল্লামা ইবনে কাছীর তার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেন: তিনি রবিউল আউয়াল মাসে মিলাদুন্নবী উদযাপন করতেন আর এই উদযাপন ছিল বিশাল; বাদশা ছিলেন সাহসী. জ্ঞানী. ভীরপুরুষ ও ন্যায়পরায়ন শাসক।(২২)

আরো এসেছে-قال سبط ابن الجوزى فى مرأة الزمان حكى بعض من حضر سماط المظفر فى الموالد انه عدّ فى ذالك السماط خمسة الاف رأس غنم مشوى و عشرة الاف دجاجة ومأة فرس ماة الف زبدية ثلاثين الف صحن حلوى : قال و كان ينصرف على المولد فى كل سنة ثلثمأة الف دينار  – অর্থঃ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে জওযীর পৌত্র মিরাতুজ জামান গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বাদশা মুজাফফর মিলাদুন্নবী উপলক্ষে যে খানা-পিনা আয়োজন করেছেন তাতে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি বলেন, নিশ্চয়ই ঐ খানা-পিনায় পাচঁ হাজার ভূনা ছাগলের মাথা, দশ হাজার ভুনা মুরগী, একশত ঘোড়ার গোস্ত, এশহাজার মাখনের বাটি, ত্রিশ হাজার হালওয়ার বাটি ছিল। তিনি আরো বলেন, বাদশা প্রতি বছর মিলাদুন্নবী উপলক্ষে তিন লক্ষ দিনার ব্যয় করতেন।(২৩)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও হাদিস সমালোচক হযরত ইমাম ইবনে জওযী (র) বলেন,

সর্বদা মক্কা, মদিনায়, মিশর, সিরিয়া, ইয়ামেন, এমনকি পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত সমস্ত আরববাসীরা মিলাদুন্নবী মাহফিল উদযাপন করে আসছেন। যখন রবিউল আ্উয়াল মাসের চাদঁ দেখা যায়,  তখন তাদের খুশির সীমা থাকে না। তখন যিকরে মিলাদ পাঠ করা ও শ্রবনের বিশেষ ব্যবস্থা করেন এবং অসীম সওয়াব ও মহা সফলতা অর্জন করেন।(২৪)

পরিশেষে এ কথায় আমরা উপনীত হলাম, নুর নবী আলো দিয়ে পুরো জাহান আলোকিত করেছেন আর সেই আলোর রশ্মিতে পুরো জাহান আজ আনন্দে পুলোকিত। তবে এ্রূপ হওয়ায় আবশ্যক । আর কবির ভায়ায় –

عید میلاد النبی ہے دل بڑا مسرور ہیں

عید دیوان کی طوبی ماہ ربیع النورہیں

তথ্যসুত্র:

১. সুরা আনআম, আয়াত – ১

২.  সুরা বাক্বারা, আয়াত- ২৫৭৩, সুরা মায়িদাহ, আয়াত- ১৫

৪. সুরা মায়িদাহ, আয়াত- ৪৪৫, সুরা রাআদ, আয়াত- ১৬

৬. সুরা তাওবাহ, আয়াত- ৩২

৭. সুরা ইবরাহীম, আয়াত-১৪

৮. সুরা নূর, আয়াত -৩৫

৯. সুরা নূর, আয়াত -৪০

১০. সুরা আহযাব, আয়াত- ৪৩

১১. আল মাফকুদ মিনাল মুছান্নিফে আবদুর রাজ্জাক কৃত ইমাম আবদুর রাজ্জাক

১২. কাশফুল খিফা কৃত আল্লামা আযুলানী, মাওয়াহিবুল্লাদুনী কৃত আল্লামা ক¦াস্তুলানী

১৩. মুসলিম শরীফ, কিতাবুছ্ ছিয়াম – হাদীস নং-১১৬২, পৃষ্ঠা- ৩৬৮

১৪. মুসনাদে আহমদ, ১ম খন্ড – ২৭৭ পৃষ্ঠা, আত্ তাবরানী ফিল কবীর:১১ খন্ড-৮৫ পৃষ্ঠা

১৫. দালায়েলুন নবুয়্যাত কৃত- ইমাম বায়হাকী, ১ম খন্ড- ১১১ পৃষ্ঠা

১৬. সীরাতে ইবনে হিশাম – ১ম খন্ড – ১৭ পৃষ্ঠা

১৭. র্আ রাহিকুল মাখতুম কৃত আল্লামা ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, সীরাতে ইবনে হিশাম কৃত আল্লামা ইবনে হিশাম

১৮. সুরা ইউনুস, আয়াত- ৫৮

১৯. সুরা আল ইমরান, আয়াত- ১৬৪

২০. সুরা আম্বিয়া, আয়াত- ১০৭

২১. বুখারী শরীফ কৃত মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল, কিতাবুন্ নিকাহ, হাদীস নং- ৪৭৩৪

২২. আল হাভী লিল ফাতওয়া কৃত আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি

২৩. মিরাআতুজ জামান, প্রাগুপ্ত

২৪. আল মিলাদুন্নবী কৃত আল্লামা ইবনে জওযী সূত্র : ড. তাহেরুল কাদেরী, মিলাদুন্নবী (দ), উর্দূ-৬১৩ পৃষ্ঠা

Advertisements

About sunniaaqida

sunniaaqida

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s