ইলমে দ্বীনের মর্যাদা

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম

 

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُون

অর্থাৎ- হে লোক সকল! তোমাদের যদি জ্ঞান না থাকে তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর। (নাহল-৪৩)

মানুষের জানার কোন শেষ নেই, তবে সেই সর্বোত্তম, যে না জানা বিষয়টি জ্ঞানী কোন ব্যক্তির কাছ থেকে জেনে নেয়, আর ভবিষ্যতে যে গুলোর প্রতি মুখাপেক্ষী হবে, পর্যায়ক্রমে সেইগুলো অর্জন করে। সুতরাং যার কাছ থেকে জানেন তিনি হলেন শিক্ষক আর যিনি জেনে নেন বা জিজ্ঞাসা করেন তিনি হলেন ছাত্র। একটু পরেই ছাত্র শিক্ষকের সর্ম্পকে আলোচনা আসবে ইনশা-আল্লাহ। তার আগে ইলমের পরিচয় ও গুরুত্ব সর্ম্পকে বর্ণনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।

ইলমের পরিচয়: পরিভাষায়- العلم هو صفة يتجلى بها لمن قامت هي به المذكور- অর্থাৎঃ এমন একটি গুণকে ইলম বলা হয়, যা কারো মধ্যে পাওয়া গেলে তার নিকট উল্লেখযোগ্য যাবতীয় বিষয় স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠে।

রাসূল (সঃ) বলেছেন-  طلب العلم فريضة على كل مسلم ” – অর্থ: জ্ঞানার্জন করা সকল মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।  এখানে মনে রাখা দরকার, সকল জ্ঞানার্জন করা কোন মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ নয়। কেবল উপস্থিত জ্ঞান যা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন হয় তা অর্জন করাই ফরজ। কারণ হলো “সর্বশ্রেষ্ট জ্ঞান উপস্থিত জ্ঞান আর সর্বশ্রেষ্ট আমল উপস্থিত রক্ষা, যা দৈনন্দিন জীবনে শরীয়ত অসম্মত যাবতীয় খারাপ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।

যেমন নামায পড়া তার জন্য অবশ্যক। অতএব, নামায পড়তে গিয়ে যে সকল কাজ তার করতে হয়, সে সকর বিষয়ের এতটুকু জ্ঞানার্জন তার জন্য ফরজ, যতটুকু দ্বারা নামাযের ফরজ বিষয়গুলোর সঠিকভাবে আদায় করা যায়। অনুরূপ ওয়াজিবের ক্ষেত্রেও। কারণ যে সকল বিষয় ফরজ আদায় করার উপায় বলে সাব্যস্ত হয়, সে সকল বিষয় অর্জন করা ফরজ। আর যে সকল বিষয় ওয়াজিব আদায়ের মাধ্যম হিসেবে সাব্যস্ত হয় সে, বিষয় অর্জন করা ওয়াজিব।

অনুরূপ রোজা, যাকাত এবং হজ্বের ক্ষেত্রেও একই বিধান যদি সেগুলো তার উপর ওয়াজিব হয়। এভাবে লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই বিধান যদি সে ব্যবসা করে, চাকুরীর ক্ষেত্রেও একই বিধান যদি সে চাকুরি করে আর শিক্ষকের ক্ষেত্রেও একই বিধান যদি তিনি শিক্ষকতা করেন আর ছাত্রের ক্ষেত্রেও একই বিধান জারী থাকবে যদি সে লেখাপড়া করেন।

আর যে সব বিষয়ের কোন কোন সময় সম্মুখীন হতে হয় সেসব বিষয় শিক্ষা করা ফরজে কেফায়া। তাই বলা যায়, যে সকল বিষয়ের সর্বক্ষণ সম্মুখীন হতে হয়, সে সকল বিষয়ের জ্ঞানার্জন খাবারের সমতুল্য। যা ভক্ষন ছাড়া কোন উপায় নেই। আর যে সব বিষয়ের কোন কোন সময় সম্মুখীন হতে হয় তা ঔষধের ন্যায়, যার দিকে মানুষ কোন কোন সময মুখপেক্ষী হয়ে পড়ে।

তাই সকলের উচিৎ ইলমের স্বাদ অর্জন করা, যা মানুষকে সম্মনিত করে ও উচ্চ মর্যাদায় পৌছায়।

ইলমের ফযিলত সম্পর্কে কবি বলেন,

تعلّم فان العلم زين لاهله  * وفضل وعنوان لكل المحامد

অর্থাৎ- ইমল অর্জন কর। কারণ ইলম তার অধিকারীর জন্য সৌর্ন্দয্য স্বরূপ। আর তা সম্মানের বিষয় এবং যাবতীয় উত্তম গুণাবলীর প্রতীক।

وكن مستفيدا كل يوم زيادة  –  من العلم واسبح في بحور الفوائد

সব সময় ইলম থেকে বেশি করে উপকার অর্জন কর এবং উপকারিতার সাগরে সাঁতার কাট।

হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে,  قليل العمل ينفع مع العلم وكثير العمل لا ينفع مع الجهل

ইলমের সাথে অল্প আমল উপকারী এবং মূর্খতার সাথে অধিক আমল উপকারে আসে না।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত

العلم والمال يستران كل عيب والفقر والجهل يكشفان كل عيب

অর্থাৎ- ইলম এবং সম্পদ প্রত্যেক দোষকে ঢেকে রাখে। আর মূর্খতা ও দারিদ্রতা প্রত্যেক দোষকে প্রকাশ করে দেয়।

অন্য হাদিসে এসেছে,- ‘ইলম সম্পদের চেয়ে উত্তম’।

হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ

ইলম সম্পদের চেয়ে উত্তম সাত কারণে

১। ইলম নবীগণের উত্তরাধীকার আর সম্পদ ফেরআউনের উত্তরাধিকার।

২। ইলম ব্যয় করলে কমে না, আর সম্পদ ব্যয় করলে কমে যায়।

৩। সম্পদকে পাহাড়া দিতে হয় আর ইলম আলেমকে পাহাড়া দেয়।

৪। যখন মানুষ মরে যায় তার সম্পদ দুনিয়ার রয়ে যায় কিন্তু ইলম ব্যক্তির সাথে কবরে চলে যায়।

৫। সম্পদ ঈমানদার ও কাফের উভয়ের অর্জিত হয় আর দ্বীনের ইলম শুধুমাত্র ঈমানদারেরই অর্জিত হয়।

৬। সকল মানুষ নিজেদের ধর্মীয় ব্যাপারে আলেমের মুখাপেক্ষী কিন্তু সবাই সম্পদশালীর দিকে মুখাপেক্ষী নয়।

৭। ইলম দ্বারা পুলসিরাত অতিক্রম করার শক্তি অর্জিত হয় অন্যদিকে সম্পদ তা পার হতে বাধা সৃষ্টি করবে।

সুতরাং প্রত্যেকেরই উচিত দ্বীনি ইলম দ্বারা মৃত কলবকে জিন্দা করা। আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রঃ) বলেন,

فكما أن الغيث يحي البلد الميت فكذا علوم الدين تحي القلب الميت

যেমনিভাবে বৃষ্টি মৃত শহরে জীবনী শক্তি সৃষ্টি করে দেয় তেমনিভাবে দ্বীনের ইলম মৃত অন্তরে জীবনের স্পন্দন সৃষ্টি করে দেয়।

তালেবে ইলমের ফযিলত: রাসূল (দঃ) ইরশাদ করেন-

من سلك طريقا يبتغي فيه علما سلك الله به طريقا إلى الجنة ،وان الملائكة لتضع أجنحتها رضاء لطالب العلم

যে ব্যক্তি দ্বীনের ইলম হাসিল করার জন্য সফর করে আল্লাহ তাকে জান্নাতের রাস্তা সমূহের একটি রাস্তায় পরিচালিত করে। আর ইলম অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ফেরেস্তারা তাদের ডানা বিছিয়ে দেয়।

আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) উক্ত হাদিস শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন, জান্নাতের রাস্তাসমূহ ইলমের রাস্তাসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ কেননা নেক আমল ইলম ব্যতিত কল্পনা করা যায় না।

তিনি আরো বলেন আমি বসরা শহরে উক্ত হাদিসটি একজন মুহাদ্দিসের সামনে বর্ণনা করলাম, এমতাবস্থায় ঐ মজলিসে ধর্মহারা এক মুতাজিলা ফেরকার লোক ছিল। যে ইলম হাসিল করার জন্য এসেছিল। সে উক্ত হাদিস শরীফের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ করে বলল, আগামীকাল আমি জুতা পরিধান করে চলব আর তা দ্বারা ফেরেস্তাদের ডানাসমূহকে পদদলিত করব। যখন এ ব্যক্তি নিজের কথা অনুসারে দ্বিতীয় দিন জুতা পরে চলা শুরু করল হঠাৎ করে পড়ে গেল এবং তার পায়ে ক্যান্সার রোগ সৃষ্টি হয়ে গেল যার কারণে দুই পা পচে গেল।

রাসূল (দঃ) ইরশাদ করেন, من خرج في طلب العلم كان في سبيل الله حتى يرجع

যে ব্যক্তি ইলমের অন্বেষণে বের হয়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় গণ্য হবে।

উল্লেখ্য, যে ব্যক্তি ইলমে দ্বীন হাসিলের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় কিংবা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যায় এবং নিয়তও সহিহ হয় তাহলে আলিম, ফাযিল, কামিল কিংবা অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে নিজ জায়গায় ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় সময় ব্যয় হিসেবে পরিগণিত হবে। আল্লাহ কবুল করুন আমিন।

রাসূল (দঃ) ইরশাদ করেন, من طلب العلم كان كفارة لما مضى

অর্থ- যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করল, তা অতীতের গুনাহ সমূহের কাফ্ফারা হয়ে গেল।

নবী করিম (দঃ) ইরশাদ করেন,-منهومان لا يشبعان منهوم في العلم لا يشبع منه ومنهوم في الدنيا لا يشبع منها

দুইজন ক্ষুধার্থ কখনই পরিতৃপ্ত হয় না

১। ইলমের ক্ষুধার্ত ইলম দ্বারা পরিতৃপ্ত হয় না।

২। দুনিয়ার ক্ষুধার্ত দুনিয়া দ্বারা পরিতৃপ্ত হয় না।

রাসূল (দঃ) ইরশাদ করেনঃمن طلب العلم تكفل الله له برزقه

অর্থ: যে ব্যক্তি দ্বীনের ইলম হাসিল করল আল্লাহ তায়ালা নিজ দয়ায় তার রিজিকের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন।

আলিমের ফযিলত: আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ অর্থ: হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহর আনুগত কর ও রাসূল (দঃ) এর অনুগত কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। [সুরা নিসা – ৫৯]

মুফতি আহমাদ ইয়ার খান নাঈমী (রঃ) বলেন, উলুল আমর দ্বারা আলেম, মুর্শিদে কামেল, ফকীহ ও মুজতাহিদ ইমাম, তারা হলেন এক এক জন এক এক স্থানের শিক্ষক।

অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

অর্থ: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করেন। [ফাতির-২৮]  কুরআনে এসেছে,

هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থ: যারা ইলমের অধিকারী এবং যারা ইলমের অধিকারী নয় উভয় কী সমান। (যুমার -৯)

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,  يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

আল্লাহ তোমাদের ঈমানদার ও যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে বিশেষভাবে তাদের পদমর্যাদাকে উন্নত করেছেন।  (সুরা-মুজাদালা-১১)

দুনিয়ার সংবিধানে পদমর্যাদার স্তরের সীমাবদ্ধতা আছে, যেমন যেমন মনে করেন বাংলাদেশে পদমর্যাদার স্তর হল ২০টা সর্বোচ্চ হলো রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে دَرَجَاتٍ   শব্দ ব্যবহার করেছেন, যে শব্দটা درجة  এর বহুবচন। যা তিন থেকে শুরু করে উপরে যতটুকু উঠতে পারে। হাদিস শরীফে এসেছে আলেমের সর্বনি¤œ স্তর হলো সাতশটি, সুবহানাল্লাহ।

হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত-

فضل العلم على العابد بسبعين درجة بين كل درجة عدوالفرس سبعين عاما

আলোমের মর্যাদা আবিদের তুলনায় ৭০ স্তর বেশি। প্রত্যেক স্তরের মধ্যেকার দুরত্ব ৭০ বছর ঘোড়া দৌড়ানোর সমপরিমাণ।

হাদিস শরীফে তাদেরকে দুনিয়া ও পরকালের প্রদীপ তথা চলার পাথেয় বলেছেন।

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত-

اتعوا العلماء فانهم سرح الدنيا ومصابيح الاخرة

তোমরা আলেমদের অনুসরণ কর কেননা তারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানের প্রদীপ।

আর সেই কারণে কাল কিয়ামতের কঠিন সময়ে তারা সুপারিশকারী হবেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। যখন আলিম ও আবিদ পুলসিরাতে একত্রিত হবেন তখন আবিদকে বলা হবে তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর এবং নিজ ইবাদত বন্দেগীর কারণে সুখ-স্বাচ্ছন্দে বসবাস কর। আর আলিমকে বলা হবেÑ   قف هنا واشفع لمن احببت فانك لا تشفع لاحد الا شفعت فقام مقام الانبياء – অর্থ: এখানে দাড়াও, যার জন্য ইচ্ছা সুপারিশ কর কেননা তুমি যে কারো জন্য সুপারিশ করবে, তা গ্রহন করা হবে। অতএব তিনি নবীদের স্থানে দন্ডয়মান হবেন।

উপসংহার: দ্বীনী ইলম আর্জন করা ফরয। প্রত্যেক মুসলমানের উপর আবশ্যক যে, তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দেয়া যাতে নিজে ও তার পরিবার ইহ-পরকালীন অশেষ কল্যাণ লাভ করতে পারে। আল্লাহ সবাইকে বুঝে আমল করার তাওফকি দান করুন। আমীন!

Advertisements

About sunniaaqida

sunniaaqida

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s