বছরে যে পাঁচটি রাত বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ এর অন্যতম লাইলাতুল মেরাজ বা শবে মেরাজ। এই রাতে রাসুলের (সা.) জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি মেরাজ সংঘটিত হয়। ২৬ রজব দিবাগত রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। ঐতিহাসিক সেই সফরকেই মেরাজ বলা হয়। মেরাজ আরবি শব্দ, শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আকাশপথে ভ্রমণ করা, সোপান ইত্যাদি। রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে উম্মে হানির ঘর থেকে জাগ্রত অবস্থায় বোরাকে করে মসজিদে হারাম থেকে আরশে আজিমে পৌঁছে আল্লাহর দিদার লাভ করার নামই মেরাজ। কোরআনে কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি বান্দাকে তার নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ পবিত্র, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (বনি ইসরাইল-১)।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মেরাজের রাতে রাসুল (সা.) উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। হঠাৎ হজরত জিবরাইল (আ.) এসে রাসুলকে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। যেখানে তার বুক বিদীর্ণ করে জমজম কূপের পানি দিয়ে সিনা ধুয়ে পরিষ্কার ও শক্তিশালী করা হয়। এ ঘটনাকে ‘শাক্কুস সদর’ বলে। নবীজির (সা.) জীবনে অন্তত তিনবার এমনটা হয়েছে। তারপর সেখান থেকে তিনি ‘বোরাক’ নামক এক ঐশী বাহনে চড়ে বায়তুল মোকাদ্দাসে এসে সব নবীর ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। তারপর তিনি বোরাকে চড়ে ঊর্ধ্বে গমন করতে থাকেন। একের পর এক আসমান অতিক্রম করেন। রাস্তায় হজরত মুসা (আ.)-সহ বেশ কয়েকজন নবী-রাসুলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সপ্তম আসমানের পর হজরত রাসুলুল্লাহকে (সা.) বায়তুল মামুর পরিদর্শন করানো হয়। সেখানে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেন।

বায়তুল মামুরে হজরত জিবরাইলকে (আ.) রেখে তিনি ‘রফরফ’ নামক আরেকটি আসমানি বাহনে চড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, মেরাজের রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহ তায়ালার এতটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যে, দুজনের মধ্যখানে মাত্র এক ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল। এখানে হজরত রাসুলল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বারবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতে মোহাম্মদির ওপর ফরজ করেন, যা ইসলামের পাঁচটি রোকনের অন্যতম রোকন বা ভিত্তি। যেহেতু মেরাজের রাতে নামাজের নির্দেশ হয়েছে, এজন্য নামাজকে ‘মেরাজুল মুমিনিন’ বা মুমিনের মেরাজ বলা হয়।

রাসুলের (সা.) মেরাজ সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণাদি রয়েছে। এজন্য কোনো মুসলমানের পক্ষে তা অস্বীকার করা কিংবা এ ব্যাপারে সংশয় দেখানো উচিত নয়। এমনকি একজন খাঁটি মুসলমানের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেরাজের সত্যতা প্রমাণের অপেক্ষা না করে এ বিষয়ে মনেপ্রাণে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানি কর্তব্য। রাসুল (সা.)-এর মেরাজে যাওয়ার কথা একজন অবিশ্বাসীর মুখে শুনে হজরত আবু বকর (রা.) তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসুল তাকে ‘সিদ্দিক’ উপাধি দিয়েছিলেন।

মেরাজ নবীজীবনের নিছক একটি ঘটনাই নয়, এর তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক বিস্তৃত। যখন নবী করিম (সা.) জাগতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থার মুখোমুখি হন, তার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের আকস্মিক ইন্তেকাল হয়, অন্যদিকে কাফেরদের অত্যাচার তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার বন্ধুকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে এনে সান্ত¦না দিয়ে সমাজ সংস্কারের একটি পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। ইসলামের প্রধানতম স্তম্ভ নামাজ ফরজ করা হয় ওই রাতে। তাছাড়া ওই রাতে রাসুলকে (সা.) স্বচক্ষে এমন কিছু বিষয় দেখানো হয়, যা একটি আদর্শিক সমাজ গঠনে পরবর্তী জীবনে কাজে লাগে। ওই রাতে নবীদের ইমাম বানিয়ে আল্লাহ তায়ালা মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেন। শুধু নবীকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়নি, এই নবীর উম্মতদেরও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয় শবে মেরাজে। এজন্য মেরাজের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।

 

Advertisements

About sunniaaqida

sunniaaqida

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s