পবিত্র শবে বরাত ও এর শরীয়ত ভিত্তিক দলিল প্রমাণ

১৪ই শা’বান দিবাগত রাতটি হচ্ছে পবিত্র শবে বরাত বা বরাতের রাত্র।কিন্তু অনেকে বলে থাকে কুরআন-হাদীছের কোথাও শবে বরাত শব্দ নেই। শবে বরাত বিরোধীদের এরূপ জিহালতপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয় যে, শবে বরাতশব্দ দু’টি যেরূপ কুরআন ও হাদীছ শরীফের কোথাও নেই তদ্রূপ নামায, রোযা , খোদা , ফেরেশতা, পীর ইত্যাদি শব্দ কুরআন ও হাদীছ শরীফের কোথাও নেই। এখন শবে বরাত বিরোধী লোকেরা কি নামায, রোযা ইত্যাদি শব্দ কুরআন ও হাদীছ শরীফে না থাকার কারনে ছেড়ে দিবে? মূলত শবে বরাত, নামায, রোযা , খোদা ,ফেরেশতা , পীর ইত্যাদি ফার্সী ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত। ফার্সী শব অর্থ রাত্রি এবং বরাত অর্থ ভাগ্য বা মুক্তি। সুতরাং শবে বরাত মানে হল ভাগ্য রজনী বামুক্তির রাত

মূলতঃ শবে বরাত এবং এর ফযীলত কুরআন শরীফে আয়াত শরীফ এবং অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন শরীফে শবে বরাতকে লাইলাতুম মুবারাকাহ বা বরকতময় রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হাদীস শরীফে শবে বরাতকে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শা’বান মাসের মধ্য রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,

وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ

অর্থঃ
শপথ প্রকাশ্য কিতাবের! নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমিই সতর্ককারী। আমারই নির্দেশক্রমে উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলো ফায়সালা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।”

(সূরা দু’খানঃ ২-৫)

কেউ কেউ বলে থাকে যে, “সূরা দু’খানের উল্লেখিত আয়াত শরীফ দ্বারা শবে ক্বদর-কে বুঝানো হয়েছে। কেননা উক্ত আয়াত শরীফে সুস্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন নাযিল করেছি……..। আর কুরআন শরীফ যে ক্বদরের রাতে নাযিল করা হয়েছে তা সূরা ক্বদরেও উল্লেখ আছে ।

এ প্রসঙ্গে মুফাসসির কুল শিরোমণি রঈসুল মুফাসসিরীন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেন,

” মহান আল্লাহ পাক লাইলাতুম মুবারাকাহ বলতে শা’বান মাসের মধ্য রাত বা শবে বরাতকে বুঝিয়েছেন। আল্লাহ পাক এ রাতে প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলোর ফায়সালা করে থাকেন।”

(ছফওয়াতুত তাফাসীর, তাফসীরে খাযীন ৪র্থ খন্ডঃ ১১২ পৃষ্ঠা, তাফসীরে ইবনে আব্বাস,তাফসীরে মাযহারী ৮ম খন্ডঃ ৩৬৮ পৃষ্ঠা, তাফসীরে মাযহারী ১০ম খন্ড, তাফসীরে ইবনে কাছীর, তাফসীরে খাযিন, বাগবী, কুরতুবী, কবীর, রুহুল বয়ান, আবী সাউদ, বাইযাবী, দূররে মানছূর, জালালাইন, কামলালাইন, তাবারী, লুবাব, নাযমুদ দুরার, মাদারিক)

লাইলাতুম মুবারাকাহ দ্বারা শবে বরাতকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ সূরা দু’খানের ৪ নম্বর আয়াত শরীফ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ। এই আয়াত শরীফের يُفْرَقُ শব্দের অর্থ ফায়সালা করা।প্রায় সমস্ত তাফসীরে সকল মুফাসসিরীনে কিরামগণيُفْرَقُ (ইয়ুফরাকু) শব্দের তাফসীর করেছেন ইয়ুকতাবু অর্থাৎ লেখা হয়, ইয়ুফাছছিলু অর্থাৎ ফায়সালা করা হয়, ইয়ুতাজাও ওয়াযূ অর্থাৎ বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়, ইয়ুবাররেমু অর্থাৎ বাজেট করা হয়, ইয়ুকদ্বিয়ু অর্থাৎ নির্দেশনা দেওয়া হয়

কাজেই ইয়ুফরাকু -র অর্থ ও তার ব্যাখার মাধ্যমে আরো স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, লাইলাতুম মুবারাকাহ দ্বারা শবে বরাত বা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে। যেই রাত্রিতে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক বছরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্যলিপি অনুসারে রমাদ্বান মাসের লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদরে তা চালু হয়। এজন্য শবে বরাতকেলাইলাতুত্ তাজবীজ অর্থাৎ ফায়সালার রাত্র এবং শবে ক্বদরকে লাইলাতুল তানফীয অর্থাৎ নির্ধারিত ফায়সালার কার্যকরী করার রাত্র বলা হয়।

(তাফসীরে মাযহারী,তাফসীরে খাযীন,তাফসীরে ইবনে কাছীর,বাগবী, কুরতুবী,রুহুল বয়ান,লুবাব)

সুতরাং মহান আল্লাহ পাক যে সুরা দু’খান-এ বলেছেন, “ আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি ” এর ব্যাখ্যামুলক অর্থ হল “ আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিলের ফায়সালা করেছি “। আর সুরা ক্বদর-এ ” আমি ক্বদরের রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি ” এর ব্যাখ্যামুলক অর্থ হল ” আমি ক্বদরের রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি “।

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক শবে বরাতে কুরআন শরীফ নাযিলের সিদ্ধান্ত নেন এবং শবে ক্বদরে তা নাযিল করেন।

হাদীছ শরীফেও শবে বরাতে সমর্থন পাওয়া যায়। হাদীছে শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

“হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে। একদা আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ! আপনি কি জানেন, লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শবে বরাতে কি সংঘটিত হয়? তিনি বললেন, হে আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম !এ রাত্রিতে কি কি সংঘটিত হয়? আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ রাতে আগামী এক বছরে কতজন সন্তান জম্মগ্রহণ করবে এবং কতজন লোক মৃত্যূবরণ করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে বান্দার (এক বছরের) আমলসমূহ আল্লাহ পাকের নিকট পেশ করা হয় এবং এ রাতে বান্দার (এক বছরের) রিযিকের ফায়সালা হয়”।

(বাইহাক্বী, ইবনে মাজাহ্, মিশকাত শরীফ)
হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

“হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একদা আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কোন এক রাত্রিতে রাতযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়ত অন্য কোন আহলিয়া রদ্বিয়ালাহু তায়ালা আনহা-এর হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য আল্লাহ পাকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফে ফিরে এলে তিনিও ফিরে এলেন এবং বললেনঃ আপনি কি মনে করেন আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন? আমি বললামঃ ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারনা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন আহলিয়ার হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বণী কালবের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন”।
(বুখারী শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাযাহ, রযীন, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

” হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ঘোষনা করেন যে, উনার সমস্ত মাখলুকাতকে ক্ষমা করে দিবেন। শুধু মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত।”

(ইবনে মাযাহ্, আহমদ, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাত উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাতে সজাগ থেকে ইবাদত-বন্দেগী করবে এবং দিনের বেলায় রোযা রাখবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক উক্ত রাতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষাণা করতে থাকেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি ক্ষমা করে দিব। কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করব। কোন মুছিবগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিব। এভাবে সুবহে ছাদিক পর্যন্ত ঘোষাণা করতে থাকেন

(ইবনে মাযাহ্,মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ)
হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

“আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি শা’বানের মধ্য রাতে (শবে বরাত) ইবাদত করবে তারই জন্য সুসংবাদ এবং তার জন্য সমস্ত কল্যাণ

হাদীছ শরীফে আরও ইরশাদ হয়েছে,

আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে এবং অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাতের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করবে, সে ব্যক্তির অন্তর ঐদিন মরবে না বা পেরেশান হবে না যে দিন সকলের অন্তর পেরেশান থাকবে“।

(মুকাশাফাতুল কুলুব)

শবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পাঁচটি রাত এমন রয়েছে যেগুলোতে দোয়া করলে তা রদ বা বাতিল হয়না । (১) পহেলা রজবের রাত (২) শা’বানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত (৩) জুমুয়ার রাত (৪) পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাত (৫) পবিত্র ঈদুল আযহার রাত“।

(দায়লামী শরীফ)

শবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল প্রসঙ্গে অন্য হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই দোয়া বা মুনাজাত পাঁচটি রাতে কবুল হয়ে থাকে । (১) পহেলা রজবের রাত (২) শা’বানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত (৩) ক্বদরের রাত (৪) পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাত (৫) পবিত্র ঈদুল আযহার রাত

(মা ছাবাত বিস্ সুন্নাহ, গুনইয়াতুত্ ত্বালিবীন, মুকাশাফাতুল কুলুব)

সুতরাং কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফের উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত যে, শবে বরাত কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

অনেকে উপরে উল্লেখিত শবে বরাত সম্পর্কিত কিছু হাদীসকে দ্বয়ীফ বলে শবে বরাতকে বিদায়ত বলে থাকেন। দ্বয়ীফ হাদীছের ব্যাপারে নিচে আলোচনা করা হলঃ

দ্বয়ীফ হাদীছঃ
যে হাদীছের রাবী হাসান হাদীছের রাবীর গুণ সম্পন্ন নন তাকে দ্বয়ীফ হাদীস বলা হয়।
হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কথাই দ্বয়ীফ নয় বরং রাবীর দুর্বলতার কারণে হাদীছকে দ্বয়ীফ বলা হয়।
দ্বয়ীফ হাদীসের দুর্বলতার কম বা বেশী হতে পারে। কম দুর্বলতা হাসানের নিকটবর্ত্তী আর বেশি হতে হতে মওজুতে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের হাদীছ আমলে উৎসাহিত করার জন্য বর্ণনা করা যেতে পররে বা করা উচিৎ। তবে আইন প্রণয়নে গ্রহনযোগ্য নয়।
এ প্রসঙ্গে হযরত ইমাম ইবনে হুমাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

“দ্বয়ীফ হাদীছ যা মওজু নয় তা ফজিলতের আমল সমূহে গ্রহণযোগ্য

(ফতহুল ক্বাদীর)

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফক্বিহ হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

সকলেই একমত যে দ্বয়ীফ হাদীছ ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে।”
(আল মওজুআতুল কবীর, ১০৮ পৃষ্ঠা)

উপরোক্ত বর্ণনার দ্বারা প্রমাণিত হল যে, দ্বয়ীফ হাদীছ ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে। তবে দ্বয়ীফ হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত সকল আমল মুস্তাহাব

যেমনঃ আল্লামা ইব্রাহিম হালবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গুলিয়াতুল মুস্তামালী ফি শরহে মুনিয়াতুল মুছাল্লি কিতাবে উল্লেখ করেছেন,

গোসলের পরে রূমাল (কাপড়) দিয়ে শরীর মোছা মুস্তাহাব। হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে – আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটুকরা কাপড় (রূমাল) ছিল যা দিয়ে তিনি অযুর পরে শরীর মুবারক মুছতেন(তিরমিযি শরীফ)

এটা দ্বয়ীফ হাদীছ। কিন্তু ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা যাবে।

হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর আল মওজুআতুল কবীরের ১০৮ পৃষ্ঠায় বলেন,

সকলে একমত যে দ্বয়ীফ হাদীছ ফজিলত হাসিল করার জন্য আমল করা জায়েজ আছে। এজন্য আমাদের আইম্মায়ি কিরামগণ বলেছেন, অযুর মধ্যে গর্দান মসেহ্ করা মুস্তাহাব।”
তার মানে অযুর মধ্যে গর্দান মসেহ্ করা -এটি দ্বয়ীফ হাদীছ।

সুতরাং যারা শবে বরাতের হাদীস সংক্রান্ত কিছু দলিলকে দ্বয়ীফ হাদীছ বলে শবে বরাত পালন করা বিদায়াত বলে তাদের এধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভূল।

Advertisements

পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আলোকে শবে বরাত এর গুরত্বপূর্ণ আলোচনা

শবে বরাত
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। লেকচারার, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
بسم الله الرحمن الرحيم
যে সমস্ত বরকতময় রজনীতে আল্লাহ্পাক তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে থাকেন, শবে বরাত তারই অন্যতম। তাফসীর-হাদিস ও বিজ্ঞ আলিমদের পরিভাষায় যাকে “লাইরাতুন নিছ্ফি মিন শাবান” বা শাবানের মধ্য রজনী নামে অভিহিত করা হয়। যে রাতটি হলো শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সলফে সালেহীনগণ এবং বিজ্ঞ মনীষীগণ এ রাতটিকে অত্যন্ত গুরুত ¡সহকারে পালন করেছেন। অনুরূপভাবে যুগে যুগে মুসলমানগণ এরই ধারাবাহিকতায় এ রাতটি পালন করে আসছেন।
নামকরণ: “শবে বরাত” ফার্সী শব্দ, ’শব’ মানে রাত আর ’বরাত’ মানে ভাগ্য, অর্থাৎ ভাগ্যরজনী। আর এ পবিত্র রাতের বিভিণœ নাম পাওয়া যায়। ১. লাইয়লাতুল বরাত বা বণ্টনের রাত, ২. লাইলাতুল মুবারাকা বা বরকতময় রজনী ৩. লাইলাতুর রহমা বা করুনার রজনী ও ৪. লাইলাতুছ্ ছাক বা সনদপ্রাপ্তির রাত।
হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি রচিত গুনিয়াতুত্ ত্বালেবীন এ উল্লেখ করেন: ‘এ রাতকে লাইলাতুল বরাত বলা হয় এ জন্য যে, কেননা এ রাতে দু’ধরনের বরাত হাছিল হয়। একটি হলোঃ হতভাগাদের আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া, অপরটি হলোঃ আল্লাহর প্রিয়জনদের অপমান থেকে মুক্ত ও নিরাপদ থাকা।’’ (গুনইয়াতুত তালেবীন: হযরত আবদুল কাদের জিলানী)
আল কোরআনে শবে বরাত: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: “হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা দুখান, আয়াত: ০১-০৬) আল্লামা জমখ্শরী তাঁর ‘কাশ্শাফ’ নামক তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেন- ‘‘নিশ্চয় শাবানের মধ্য রজনী’র চারটি উল্লেখযোগ্য নাম রয়েছে, আর তা হলো- লাইলাতুল মুবারাকা (বরকতময় রজনী) লাইলাতুল বরায়া (ভাগ্য রজনী) লাইলার্তু রহমাহ্ (করুনার রজনী) ও লাইলাতুছ্ ছাক (সনদপ্রাপ্তির রজনী) এ রাতকে বরাত ও ছাক রাত নামে নামকরণের কারণ হিসেবে বলেন- যখন কোন ব্যক্তি তার উপর ধার্যকৃত কর পরিশোধ করেন তখন তাকে কর আদায়কারী ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি দায়মুক্তির সনদ দেয়া হয়, অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ রাত্রিতে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ প্রদান করে থাকেন।’’ [তাফসীর-ই কাশ্শাফ: আল্লামা জমখ্শরী]
তাছাড়া, ইমাম কুরতবী তাঁর তাফসীরের প্রসিদ্ধ গ্রন্থে পবিত্র ক্বোরআনের ‘সূরা দুখান’ এর আয়াত ০৩ এর ব্যাখ্যায় বলেন: ”এ রাতটির চারটি নাম উল্লেখ রয়েছে। আর তাহলো- লাইলাতুল মুবারাকাহ্ ও লাইলাতুছ্ ছাক। আর এ রাতকে ‘বরকতময় রজনী’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা এ রাতে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের উপর অগণিত বরকত, কল্যাণ ও পূণ্য অবতীর্ণ করে থাকেন।
হযরত ক্বাতাদাহ্ (র.) ওয়াছিলাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন: ক্বোরআন অবতীর্ণ হওয়া আরম্ভ হয় শবে বরাতের রাতে। ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, লাইলাতুল মুবারাকাহ্ মানে এখানে ‘শবে বরাত’কে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন: হযরত ইকরামা বলেন, এটি হলো শাবানের মধ্য রজনী (শবে বরাত) আগত বছরের বিষয়াদি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কারা জীবিত থাকবে এবং কারা মারা যাবে, কারা এ বছর হজ্ব করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। ফলে এতে কেউ কোনরূপ পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে না। হযরত ওসমান ইবনে মুগিরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, শাবান থেকে শাবানের জন্য মানুষের আয়ু নির্ধারণ করা হয়, এমনি মানুষ বিবাহ্ করছে এবং তার সন্তান জন্ম লাভ করছে অথচ তার নাম মৃতদের কাতারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
‘আল্ আ’রুস’ নামক কিতাবের লেখক এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, যে রাতে সবকিছু বণ্টন করা হয় তা হলো শাবানের মধ্য রজনী বা শবে বরাত। এজন্য এটাকে বরাত রজনী বলা হয়। আল্লামা জমখ্শরী বলেন- ‘লওহে মাহ্ফুজ’ এ লিপিবদ্ধকরণ শুরু হয় শবে বরাতে এবং তার পরিসমাপ্তি ঘটে শবে ক্বদরে। অতঃপর রিজিকের কপি দেয়া হয় হযরত মিকাঈল আলাইহিস্ সালামকে, যুদ্ধের কপি হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে, অনুরূপভাবে ভূমিকম্প, বজ্রপাত ও ভূমিধ্বস বিষয়ক কপিও। আমলনামার কপি প্রথম আসমানের মহান ফিরিশতা হযরত ইসমাঈলকে এবং বিপদাপদের কপি হযরত আজরাঈল তথা মালাকুল মাওতকে সোপর্দ করা হয়।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বর্ণনা করেন, আল্লাহ্ তা‘আলা নানা বিষয়ে ফয়সালা প্রদান করেন শাবানের মধ্য রজনীতে এবং তা এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতাদের নিকট সোপর্দ করেন ক্বদরের রাতে।
হাদীস শরীফের আলোকে শবে বরাত: পবিত্র শাবান মাস এবং এ মাসে রোজা পালনের উপর বোখারী, মুসলিম ও তিরমিযীসহ অনেক বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থের বর্ণনা আমরা লক্ষ্য করেছি। অনুরূপভাবে এ মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত তথা শবে বরাত সম্পর্কে ছেহাহ্ ছিত্তাহর উল্লেখযোগ্য কিতাবাদিসহ নানা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে প্রমাণ মেলে। ১। ছহীহ্ ইবনুল হিব্বান-এ হযরত মুয়ায রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত: , ‘যখন শাবানের মধ্য রজনী (শবে বরাত) উপস্থিত হয় তখন এক আহ্বানকারী এ আহবান করতে থাকে, ‘‘কোনও ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো কোন প্রার্থী বা ফরিয়াদী আছো কি? আমি তার প্রার্থনা ও ফরিয়াদ কবুল করব? ফলে যে যা প্রার্থনা করবে তাকে তা দেয়া হবে। একমাত্র যেনাকারী ও মুশরিককে নয়। (ছহীহ্ ইবনুল হিব্বান) ২। সুনানে ইবনে মাযা শরীফে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন- ”যখন শাবানের মধ্য রজনী উপস্থিত হবে, তখন তোমরা এ রাতটিকে (ইবাদতের মাধ্যমে) উদ্যাপন কর এবং আগত দিনটিকে রোজার মাধ্যমে। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা ওই রাতের সূর্যাস্তের পরক্ষণ থেকেই পৃথিবীবাসীর প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি প্রদান করেন এবং এ ঘোষণা দেন- আছ কি কেউ ক্ষমা চাওয়ার? তাকে ক্ষমা করবো। আছ কি কেউ রিযিক প্রার্থনা করার? রিযিক দ্বারা ধন্য করবো। আছ কি কেউ অসুস্থ ? তাকে আরোগ্য দান করবো। আছ কি এমন কেউ? আছে কি এমন কেউ? সুবহে সাদেক উদিত হওয়া পর্যন্ত এভাবে বলা হবে। (সুনানে ইবনে মাযা) ৩। তিরমিযী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- ‘এক রজনীতে আমি প্রিয়নবীকে বিছানায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ফলে তাঁকে খোজার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেখি তিনি জান্নাতুল বক্বীতে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দিয়ে দোয়ারত আছেন। আমাকে দেখে হুযূর করীম বললেন, তুমি কি এ ভয় করছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অন্যায় করবেন? আমি বললাম, এয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন স্ত্রীর গৃহে প্রবেশ করেছেন। তখন হুযূর করীম বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে প্রথমাকাশের দিকে বিশেষ কৃপাদৃষ্টি দান করেন এবং ’কলব’ গোত্রের ছাগলের পশমেরও অধিক পরিমাণ গুনাহগারকে ক্ষমা করেন।( তিরমিযী শরীফ) ৪। ‘সুনানে ইবনে মাযাতে হযরত আবু মুসা আশয়ারী থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে রহমত ভরা দৃষ্টিতে গুনাহগারদের দিকে তাকান, ফলে সকল সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন, একমাত্র মুশরিক ও অন্য মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিরেকে। (‘সুনানে ইবনে মাযাত) ৫। ‘মুসনাদে আহমদ’এ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আছ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত- প্রিয় নবী এরশাদ করেন, সাবানের মধ্য রজনীতে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি প্রদান করেন এবং সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন; কিন্তু দুই শ্রেণীর মানুষকে নয়, বিদ্বেষ পোষণকারী ও আত্মহত্যাকারীকে।( ‘মুসনাদে আহমদ) ৬। হযরত আবু বকর সিদ্দিক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন- আল্লাহ্ তা‘আলা যখন শাবানের মধ্য রজনী উপস্থিত হয় তখন পৃথিবীর আকাশে রহমতের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং সকল শ্রেণীর বান্দাদের ক্ষমা করেন, একমাত্র মুশরিক ও মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপোষণকারীকে ছাড়া। (‘মুসনাদে বাজ্জাজ’) ৭। ‘লাতায়েফুল মা’রেফ’ এ কা’ব থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন- আল্লাহ্ তা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে জিব্রাঈল (আ.) কে বেহেশতের প্রতি এ নির্দেশ দিয়ে পাঠান যে, বেহেশত যেন নিজেকে নানা সাজে সজ্জিত করে এবং জিব্রাঈল যেন বেহেশতকে উদ্দেশ্য করে এ সুসংবাদ শুনায়: নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমার এ রাত্রিতে মুক্ত করে দিয়েছেন আকাশের তারকারাজির সমপরিমাণ, পৃথিবীর রাত-দিনের সংখ্যা পরিমাণ, বৃক্ষের পত্র-পল্লবের সমপরিমাণ, পাহাড় সমূহের ওজনের সমপরিমাণ এবং বালুরাশির সমপরিমাণ অসংখ্য অগণিত মানুষকে।(পৃষ্ঠা-১৩৮) ৮। ‘মুসনদে বাযযায’ এ হযরত আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন- ‘শাবানের মধ্য রজনীতে আয়ূ নির্ধারণ করা হয়। ফলে দেখা যায় কেউ সফরে বের হয়েছে অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, আবার কেউ বিয়ে করছে অথচ তার নাম জীবিতের খাতা থেকে মৃতের খাতায় লিখা হয়ে গেছে।(হাদিস নং: ৭৯২৫) ৯। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আরা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- পাঁচটি রজনীতে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় নাঃ জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবানের মধ্য রজনী এবং দুই ঈদের রাত। (‘মুসনদে বাযযায’: ৭৯২৭ ১০। ‘মু’জাম আল কাবীর’ এ হযরত মুয়ায ইবনে জবল থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- ‘আল্লাহতা‘আলা শাবানের মধ্য রজনীতে স্বীয় সৃষ্টির প্রতি বিশেষ করূণার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং সকল সৃষ্টিকেও ক্ষমা করে দেন এবং শুধু মাত্র মুশরিক ও বিদ্বেষীকে ছাড়া।(হা-৬৭৭২) ১১। অনুরূপভাবে ‘মুজাম আল কাবীর’ এ আবু ছা’লাবাহ্ থেকে বর্ণিত: প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন, আল্লাহস্বীয় বান্দাদের প্রতি শাবানের মধ্য রজনীতে করুণা ভরা হৃদয়ে ক্ষমার দৃষ্টিতে তাকান, ফলে মুমিনদের ক্ষমা করে দেন এবং কাফিরদেরকে ইমান আনার সুযোগ দেন আর হিংসুকদেরকে তাদের হিংসার মাঝে ছেড়ে দেন, যতক্ষণ না তারা তাদের হিংসা বিদ্বেষ ত্যাগ করে। (হা- ২২৩) ১২। হযরত আবু বকর সিদ্দিক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন- নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা শবে বরাতের মধ্য রজনীতে পৃথিবীর আকাশে রহমত অবতারণ করেন এবং পৃথিবীর সকল মানুষকে ক্ষমা করে দেন। একমাত্র কাফির এবং যার অন্তরে বিদ্বেষ বিদ্যমান।(ঊসুলু ্ ইতিকাদি আহলিস্ সুন্নাহ.হা :৭৫০)
ক্স সালফে ছালেহীনের দৃষ্টিতে শবে বরাত:
মোল্লা আলী আলক্বারী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, মিশকাত শরীফ এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘মিরকাত’ এ বলেন- ‘সালফে ছালেহীনদের বড় একটি অংশ বলেন, ‘আয়াত (সূরা দুখান-১-৪) দ্বারা শাবানের মধ্য রাতকে বুঝানো হয়েছে। এতে কোন বিরোধ নেই যে, শবে বরাতের রাত্রিতে বণ্টন কাজ সম্পন্ন হয়। বিরোধ হলো- এ আয়াত দ্বারা এ রাতকে বুঝানো হয়েছে কিনা। যদি তা দ্বারা শবে ক্বদর বুঝানো হয়, তাহলে হাদিস ও আয়াত উভয়ের সমন্বয়ে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, এ বণ্টনটি উভয় রাতে (শবে বরাত ও শবে ক্বদর) সম্পন্ন হয়েছে। যাতে এর গুরূত্ব আরও অধিকভাবে প্রমাণিত হয়। আবার এটাও হতে পারে যে, বণ্টন কাজটি এক রাতে সংক্ষেপে এবং অন্য রাতে বিস্তারিতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অথবা এক রাতে পার্থিব বিষয়াদি এবং অন্য রাতে পরকালীন বিষয়াদির বণ্টন সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও নানা সম্ভাবনাও থাকতে পারে।
ইবনে নুজাইম মিসরী ‘আল আশ্বাহ্ ওয়ান নাজায়ের’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন- কিছু সংখ্যক ওলামা বলেছেন, যদি জুমার রাত ও শাবানের মধ্য রাত একত্রিত হয়ে যায় তাহলে এ রাতটি উদ্যাপন করা মুসতাহাব। হ্যাঁ, তবে যদি এটিকে শুধু শবে বরাতের রাত ধরা হয়, তাহলে উদ্যাপন করা মুসতাহাব হবে, নাকি জুমার রাত হওয়াতে তা মাকরূহ হবে? তা নিয়ে কিছু সন্দেহ পোষণ করা হয়েছে। আর যারা মাকরূহ বলেছেন তারা হারামে লিপ্ত হওয়ার ভয়ে। কিন্তু তা হারাম হবে না, কেননা ইবাদতকারীর নিয়ত হলো- শবে বরাত।
মনসুর আল বাহুতী ‘কাশ্শাফুল কান্না’ নামক কিতাবে লিখেন- ‘নিশ্চয় শাবানের মধ্য রাতের অনেক ফজিলত বিদ্যমান। সালফে সালেহীনদের মাঝে অনেকেই এ রাতে নফল নামায আদায় করতেন। প্রিয় নবীর এ হাদিস তাদের সমর্থন করে। প্রিয়নবী এরশাদ করেন: যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাত ও শাবানের মধ্য রাত ইবাদতের মাধ্যমে উদ্যাপন করবে, আল্লাহ্ তা‘আলা তার ক্বলবকে জীবিত রাখবেন ওই দিনও, যে দিন অনেক ক্বলব মৃত্যুবরণ করবে। (তারীখে মুনজেরীতে তা বর্ণিত হয়েছে)। আরেক দল ওলামা বলেছেন- অনুরূপভাবে আশুরা (মহররম মাসের নয় তারিখ দিবাগত রাত)’র রাতে, রজব মাসের প্রথম রাতে ও শবে বরাতও।
ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ‘আল্ উম্ম’ নামক কিতাবে বলেন- ‘আমাদের নিকট এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, বলা হয়ে থাকে, পাঁচটি রহমতময় রজনীতে দো‘আ কবুল হয়। জুমার রাতে, ঈদুল আযহার রাতে, ঈদুল ফিতরের রাতে, রজব মাসের প্রথম রাতে এবং শাবানের মধ্যরাতে। তিনি (শাফে‘ঈ) আরও বলেন, ‘আমি উপরোক্ত রাতগুলোকে উদ্যাপন করা মুসতাহাব মনে করি, যদি ফরজ মনে করা না হয়, তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিকট প্রমাণিত যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর জুমার রাত উদ্যাপন করতেন।(সুনান আল কুবরা) উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, শবে বরাতের বিষয়ে বর্ণিত হাদিসসমূহ খুবই নির্ভুল এবং গ্রহণযোগ্য। এমনকি সালাফী (ওয়াহাবী) দাবীদারদের গুরু আলবানী সাহেবও এ হাদিসগুলো সহীহ ও নির্ভুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। (সিলসিলা: (৫১২,৫১১,৫১০,৫০৯)
ইবনে তাইমিয়াহ্: সালাফী ও ওহাবী মতবাদের অনুসারীদের ইমামে আজম! জনাব ইবনে তাইমিয়াহর মতে- ‘‘ইবনে তাইমিয়াহকে শবে বরাতের রাতে নফল নামায আদায় বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, যদি মানুষ শবে বরাত রাতে একাকী অথবা বিশেষ জামাত সহকারে নফল নামাজ আদায় করে, যেমনিভাবে সালফে ছালেহীনগণের অনেকেই করতেন, তাহলে তা খুবই ভাল কাজ’’। তিনি অন্যত্র বলেন, শবে বরাতের ফজিলতে অনেক হাদিস ও রিওয়ায়েত বিদ্যমান এবং এটাও প্রমাণিত যে, সালফে সালেহীনগণ এ রাতে বিশেষ নফল নামায আদায় করতেন। সুতরাং একাকীভাবে এ রাতে ইবাদতের ক্ষেত্রে সালফে ছালেহীনগণ অগ্রগামী এবং এতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণও মিলে। সুতরাং এ ধরনের বিষয়ে অস্বীকার করা যায় না। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া: ৩/ ১৩১-১৩২)
আল্লামা মুবারকপুরী: তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তোহফাতুল আহ্ওয়াজী’তে বলেন- জেনে রেখো, শাবানের মধ্যরাতের (শবে বরাতের) ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সব হাদিস একত্রিত করলে প্রমাণিত হয় যে, এ রাতের ফজিলতের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। অনুরূপভাবে এ হাদিসগুলো সম্মিলিতভাবে তাদের বিপক্ষে প্রমাণ বহন করে যারা ধারণা করে যে, শবে বরাতের ফজিলতের ক্ষেত্রে কোন প্রমাণ মেলে না।’’
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ’লাতায়েফুল মা’রেফ’ নামক কিতাবে বর্ণনা করেন- শাবানের মধ্যরাতকে শামবাসী তাবেয়ীগণ অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকতেন। খালেদ বিন মা’দান, লোকমান বিন আহমরসহ শামদেশীয় তাবেয়ীগণও মসজিদে গিয়ে শবে বরাত পালন করতেন। এবং ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাভীয়াও এতে ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং সমর্থন দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন ‘‘মসজিদে সমবেত হয়ে জামাতসহকারে এ রাত উদ্যাপন করা বিদ‘আত নয়। (বরং সুন্নাত) তিনি আরো বলেন: “সিরিয়াবাসী তাবেয়ীনদের কাছ থেকে মানুষ এ রাতের ফজিলত এবং মর্যাদার বিষয়টি গুরূত্বসহকারে গ্রহণ করেছেন। তিনি আরো বলেন: এ রাত জামাত সহকারে মসজিদে উদ্যাপন করা মুস্তাহাব। হযরত খালিদ ইবনে মা’দান এবং লোকমান ইবনে আমেরসহ অন্যান্য তাবেয়ীগণ এ রাতে উন্নতমানের পোশাক পরিধান করতেন, খুশবু লাগাতেন, সুরমা দিতেন এবং এ রাতটি সম্পূর্ণরূপে মসজিদে কাটাতেন। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাভিয়াও এটার সমর্থনে বলেছেন- ‘জমাত সহকারে এ রাতটি মসজিদে উদ্যাপন করা বিদ‘আত নয় (হারব আল কেরমানী তাঁর ‘আল্ মাসায়েল’ নামক কিতাবে তা বর্ণনা করেছেন) তিনি আরও বলেন: ‘‘বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীয বসরায় নিযুক্ত গভর্ণরের কাছে এ মর্মে চিঠি লিখলেন যে, বছরের চারটি রাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেবে। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা এ রাতগুলোতে রহমতের অঢেল প্রবাহ দান করেন। এগুলো হলো- রজবের প্রথম রাত, শাবানের মধ্য রাত এবং উভয় ঈদের দুই রাত।’’ (ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী:’লাতায়েফুল মা’রেফ’ ২৬৩)
হযরত আত্বা ইবনে ইয়াসার বলেন: ক্বদরের রাতের পর বরাতের রাতের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ রাত আর কোনটি হতে পারে না। এ রাতে আল্লাহ্ সর্বশ্রেণীর লোকদের ক্ষমা করে দেন। একমাত্র মুশরিক, ঝগড়াটে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে ব্যতিরেকে। তিনি আরও বলেন: ‘‘যখন শাবানের মধ্য রাত উপস্থিত হয়, তখন মালাকুল মাওত এর কাছে একটি রেকর্ডবুক অর্পণ করে এ নির্দেশ দেয়া হয় যে, এ বইয়ে যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে তাদের প্রাণ কবজ কর। দেখা যায় মানুষ গাছ লাগাচ্ছে, বিবাহ করছে, ঘর নির্মাণ করছে, অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। আর মালাকুল মাওত একমাত্র নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই জান কবজ করে নেয়।’’ দেখনু: ’লাতায়েফুল মা’রেফ’ লিখক: ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (৭৩৬-৭৯০) প্রকাশ: কায়রো, পৃ. ১৭৭-২০৩)
উপরিউক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম শবে বরাত উদ্যাপন করেন এবং তাঁরই অনুসরণে যুগে যুগে মুসলমানগণ এ রাতকে বরকতময় রজনী হিসেবে পালন করে আসছেন। বিশেষ করে তাবেয়ীনদের যুগে এ রাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদে সমবেত হয়ে জামাত সহকারে আদায়ের প্রচলন শুরু হয়। আর তাঁরা হলেন সর্বশ্রেষ্ট যুগের মানুষ এর দলভুক্ত। তাই প্রিয়নবী প্রবর্তিত এ ইবাদতকে বিদ‘আত বলা প্রিয়নবীর বিরোধীতারই শামিল।

শবে মেরাজ: মহিমান্বিত রজনী

বছরে যে পাঁচটি রাত বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ এর অন্যতম লাইলাতুল মেরাজ বা শবে মেরাজ। এই রাতে রাসুলের (সা.) জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি মেরাজ সংঘটিত হয়। ২৬ রজব দিবাগত রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। ঐতিহাসিক সেই সফরকেই মেরাজ বলা হয়। মেরাজ আরবি শব্দ, শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আকাশপথে ভ্রমণ করা, সোপান ইত্যাদি। রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে উম্মে হানির ঘর থেকে জাগ্রত অবস্থায় বোরাকে করে মসজিদে হারাম থেকে আরশে আজিমে পৌঁছে আল্লাহর দিদার লাভ করার নামই মেরাজ। কোরআনে কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি বান্দাকে তার নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ পবিত্র, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (বনি ইসরাইল-১)।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মেরাজের রাতে রাসুল (সা.) উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। হঠাৎ হজরত জিবরাইল (আ.) এসে রাসুলকে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। যেখানে তার বুক বিদীর্ণ করে জমজম কূপের পানি দিয়ে সিনা ধুয়ে পরিষ্কার ও শক্তিশালী করা হয়। এ ঘটনাকে ‘শাক্কুস সদর’ বলে। নবীজির (সা.) জীবনে অন্তত তিনবার এমনটা হয়েছে। তারপর সেখান থেকে তিনি ‘বোরাক’ নামক এক ঐশী বাহনে চড়ে বায়তুল মোকাদ্দাসে এসে সব নবীর ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। তারপর তিনি বোরাকে চড়ে ঊর্ধ্বে গমন করতে থাকেন। একের পর এক আসমান অতিক্রম করেন। রাস্তায় হজরত মুসা (আ.)-সহ বেশ কয়েকজন নবী-রাসুলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সপ্তম আসমানের পর হজরত রাসুলুল্লাহকে (সা.) বায়তুল মামুর পরিদর্শন করানো হয়। সেখানে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেন।

বায়তুল মামুরে হজরত জিবরাইলকে (আ.) রেখে তিনি ‘রফরফ’ নামক আরেকটি আসমানি বাহনে চড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, মেরাজের রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহ তায়ালার এতটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যে, দুজনের মধ্যখানে মাত্র এক ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল। এখানে হজরত রাসুলল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বারবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতে মোহাম্মদির ওপর ফরজ করেন, যা ইসলামের পাঁচটি রোকনের অন্যতম রোকন বা ভিত্তি। যেহেতু মেরাজের রাতে নামাজের নির্দেশ হয়েছে, এজন্য নামাজকে ‘মেরাজুল মুমিনিন’ বা মুমিনের মেরাজ বলা হয়।

রাসুলের (সা.) মেরাজ সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণাদি রয়েছে। এজন্য কোনো মুসলমানের পক্ষে তা অস্বীকার করা কিংবা এ ব্যাপারে সংশয় দেখানো উচিত নয়। এমনকি একজন খাঁটি মুসলমানের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেরাজের সত্যতা প্রমাণের অপেক্ষা না করে এ বিষয়ে মনেপ্রাণে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানি কর্তব্য। রাসুল (সা.)-এর মেরাজে যাওয়ার কথা একজন অবিশ্বাসীর মুখে শুনে হজরত আবু বকর (রা.) তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসুল তাকে ‘সিদ্দিক’ উপাধি দিয়েছিলেন।

মেরাজ নবীজীবনের নিছক একটি ঘটনাই নয়, এর তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক বিস্তৃত। যখন নবী করিম (সা.) জাগতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থার মুখোমুখি হন, তার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের আকস্মিক ইন্তেকাল হয়, অন্যদিকে কাফেরদের অত্যাচার তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার বন্ধুকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে এনে সান্ত¦না দিয়ে সমাজ সংস্কারের একটি পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। ইসলামের প্রধানতম স্তম্ভ নামাজ ফরজ করা হয় ওই রাতে। তাছাড়া ওই রাতে রাসুলকে (সা.) স্বচক্ষে এমন কিছু বিষয় দেখানো হয়, যা একটি আদর্শিক সমাজ গঠনে পরবর্তী জীবনে কাজে লাগে। ওই রাতে নবীদের ইমাম বানিয়ে আল্লাহ তায়ালা মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেন। শুধু নবীকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়নি, এই নবীর উম্মতদেরও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয় শবে মেরাজে। এজন্য মেরাজের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।

 

ফজিলতে ভরা মহিমান্বিত রজনী শবে মেরাজ

আজ বুধবার সারা দেশে পবিত্র শবে মেরাজ উদ্যাপিত হবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন মসজিদ ও অন্যান্য স্থানে আল্লাহর রহমত কামনায় বিশেষ মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে। যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দেশের সমৃদ্ধি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে মুসলমানরা সারা রাত মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ দোয়া করবে। মুসলমানরা প্রতিবছর আরবি মাস রজবের ২৭ তারিখে শবেমেরাজ উদ্যাপন করে থাকে। এই রাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন। মুসলমানদের কেউ কেউ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এ দিনে নফল নামাজ আদায় করে ও রোজা রাখে।

আজ সূর্যাস্তের পর থেকে ভোর পর্যন্ত পবিত্র মেরাজের রাত। চান্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী রাত আগে আসে বিধায় আজকের এ রাত হিজরি সালের ২৭ রজব। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় গত শুক্রবার এ তথ্য  জানানো হয়। ৬২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ রজব দিবাগত রাতে মহানবী (সা.) আল্লাহর সান্নিধ্যে মেরাজে গমন করেন। এ সময় হজরত আদম (আ.) ও উল্লেখযোগ্য নবীদের সঙ্গে মহানবীর (সা.) সালাম ও কুশলাদি বিনিময় হয়। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হন। এ পর্যন্ত হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। সেখান থেকে তিনি একা রফরফ নামক বিশেষ বাহনে ৭০ হাজার নূরের পর্দা পেরিয়ে আরশে আজিমে মহান আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন। একই সময়ে মহানবী (সা.) সৃষ্টি জগতের সব কিছুর রহস্য অবলোকন করেন।

আরবি ভাষায় মেরাজ অর্থ হচ্ছে সিঁড়ি। আর ফার্সি ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে ঊর্ধ্ব জগতে আরোহণ বা গমন। মেরাজ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলের এক নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময়, যিনি রাত্রিযোগে স্বীয় বান্দাকে মসজিদুল হারাম (সম্মানিত মসজিদ) থেকে মসজিদুল আকসা (দূরবর্তী মসজিদ) পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। যার চারদিকে আমি বরকতমণ্ডিত করেছি।

পবিত্র শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশ্বের মুসলমানরা নফল নামাজ, জিকির-আসকার, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ পাঠ, বিশেষ মোনাজাত ও শিরনি বিতরণ করে থাকে। বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা পবিত্র শবে মেরাজ পালনের জন্য সারা রাত মসজিদে মসজিদে ইবাদত বন্দেগি করে কাটায়। পবিত্র শবে মেরাজ উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বাদ মাগরিব ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

 

শবে মেরাজ : এক বিস্ময়কর ঘটনা

তাজেদারে মদিনা রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিরাজ বা নবমণ্ডলের ভ্রমণ একটি বিস্ময়কর ঘটনা। এই ঘটনা পবিত্র কোরআন ও হাদিস দ্বারা সত্য প্রমাণিত। পরিত্র কোরআনে ‘ইসরা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ইসরা’ শব্দের অভিধানিক অর্থ রাতে ভ্রমণ। রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে ভ্রমণ করেছিলেন বলেই তাকে ‘ইসরা’ বলা হয়েছে। নবমণ্ডলের ভ্রমণকে ‘মেরাজ’ বলে রাসুলে পাক হাদিস শরীফে বর্ণনা করেছেন। মেরাজ উরুজ ধাতু হতে নির্গত। অর্থ উন্নতি বা উর্ধ্বে উঠা। আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় হাবীবকে উর্ধ্বেজাহানে আরোহণ করিয়েছেন বলেই এই ভ্রমণকে মিরাজ বলা হয়।

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরকে ‘ইসরা’ এবং মসজিদুল আকসা হতে আরশে আজিমে সফরকে মিরাজ বলা হয়। (সূত্রঃ নাদরাতুন না’ঈম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে রাসুল সাল্লাল্লাহহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিরাজ স্বপ্নে বা আধ্যাত্মিকভাবে সংঘটিত হয়নি, সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে। দলিল হিসেবে পবিত্র কোরআনের বর্ণিত আয়াত, “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুলু হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত” (সূরাঃ ১৭ আয়াতঃ ১)। উল্লেখিত আয়াতে পাকে ‘সোবহান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আরবী ভাষায় বিস্ময়কর সংবাদে ‘সোবহান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মিরাজ সংঘটিত হয়েছে বলেই বিস্ময়কর ঘটনা বলতে হবে। অন্যথায় নয়। আয়াতে করিমায় উল্লেখিত ‘আবদ’ (বান্দা) শব্দটি দ্বারাও আত্মা ও দেহ বুঝিয়েছেন, শুধু আত্মাকে নয়। মিরাজের ঘটনা : মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তায়েফ সফরের পর কাফিরদের সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতনে মুসলমানরা যখন অসহায় হয়ে পড়ে তখনই আল্লাহ তা’লা তাঁকে মিরাজের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন হযরত উম্মে হানি (রা.)’র ঘরে শায়িত হয়ে কিছুটা তন্দ্রাভিভূত হলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন, ঘরের ছাদ ফাঁক হয়ে হযরত জিব্রাঈল (আ.) ও কয়েক ফেরেস্তা শুভ আগমণ করলেন। জিব্রাঈল (আ.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বান জানিয়ে মসজিদে হারামে নিয়ে গেলেন। সেখানে গমণের পর তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। হযরত জিব্রাঈল ও মিকাঈল (আ.) তাঁকে জাগ্রত করে যমযম কূপের নিকট নিয়ে বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে ধৌত করেন। অতঃপর ঈমান ও হিকমত তাঁর সীনা মোবারকে অর্পণ করলেন এবং দুই স্কন্ধের মাঝে মহরে নবুওয়াত লাগিয়ে দিলেন। এই মহরে নবুওয়াত ছিল শেষ নবী হওয়ার একটি বাহ্যিক নিদর্শন। এই উর্ধ্বেলোকে মুবারক আরোহণ উপলক্ষে আল্লাহ পাক বেহেস্তের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেস্তা রিদওয়ানকে নির্দেশ করলেন, অদৃশ্য জগতের মেহমানকে নতুন সাজে সজ্জিত করতে। হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে আদেশ করলেন, বিদ্যুৎ ও আলোর চেয়ে দ্রুতগামী বাহন বোরাক নিয়ে মাকামে ইব্রাহীমে হাজির হতে। জড় জগতের ফেরেস্তাদের নির্দেশ দিলেন, পানি ও মাটির দেশের কাজ বন্ধ করে স্থান ও সময়কে গতিশূন্য ও স্তবির করতে। আসমানের ফেরেস্তাদের বলা হলো সকল কাজ বন্ধ করে সম্মানিত অতিথির আগমনে জুলুস বের করতে। প্রিয় নবী তাজেদারে মদিনা হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকের উপর করে বায়তুল মোক্কাদ্দিসের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) হতে বর্ণিত প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাগহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বাইতুল মোক্বাদ্দিস যাত্রাকালে বোরাক থেকে নেমে দুরাকাত নামাজ আদায় করতে অনুরোধ করলে আমি দুরাকাত নফল নামাজ আদায় করি। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, আপনি ইয়াসরিব তথা মদিনা মুনাওয়ারায় নামাজ আদায় করেছেন, যেখানে হিজরত করে আপনি আশ্রয় গ্রহণ করবেন। মদিনা হতে আবার যাত্রা আরম্ভ করলেন। কিছুদূর অতিক্রম করার পর হযরত জিব্রাঈল (আ.) প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বোরাক থেকে অবতরণ করে নামাজ আদায় করতে আরজ করলে তিনি নামাজ আদায় করেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন, এটা সিনাই পাহাড়, এখানে যে গাছ দেখছেন তার নিকট হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর সাথে কথা বলতেন। আবার ভ্রমণ শুরু হলো। কিছুদূর পর জিব্রাঈল (আ.) বললেন, বোরাক থেকে নেমে সালাত আদায় করুন। নবীজি তাই করলেন। জিব্রাঈল (আ.) বললেন, আপনি হযরত শুয়ায়ব (আ.) এর আবাস মাঠে সালাত আদায় করলেন। আবার যাত্রা শুরু করে কিছুদূর যাওয়ার পর জিব্রাঈল (আর.) মাটিতে নেমে নামাজ পড়তে বললেন তিনি নামাজ আদায় করেন। অতঃপর জিব্রাইল (আ.) বললেন, এই জায়গার নাম বাইতুলাহম (বেথেলহাম), হযরত ঈসা (আ.) এখানেই জন্মগ্রহণ করেন। এই সফরে প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল মোকাদ্দিস পৌঁছে মহাকাশ যাত্রা আরম্ভ করেন। যাত্রাকালে ইহকাল, পরকাল, বেহেস্ত ও দোজখের বহু বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। শবহে মাওয়াহিব গ্রন্থে বর্ণনা আছে যে, সিদরাতুল মুনতাহায় গমন এবং জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করার পর তিনি যাত্রা বিরতি করেন সেখানে লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এই জায়গার নাম ‘সরীফুল আকলাম’। ভাগ্য লিপিবদ্ধকারী ফেরেস্তাগণ এই স্থানে লিখার কাজে নিয়োজিত আছেন এবং এখানেই লওহে মাহফুজ হতে প্রাপ্ত আল্লাহর আদেশ নিষেধ তারা লিপিবদ্ধ করেন। প্রিয়নবী আক্কায়ে মাওলা তাজেদারে মদিনা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীফুল আকলাম হতে আরো উপরে অগ্রসর হয়ে এক নুরানী পর্দার নিকট গিয়ে পৌঁছেন। তখন এক ফেরেস্তা পর্দার অন্তরাল হতে বের হয়ে আসলে জিব্রাইল (আ.) বললেন, আমার সৃষ্টির পর এই ফেরেস্তাকে আমি কখনও দেখিনি। অথচ সৃষ্টির মধ্যে মর্যাদার দিক হতে আমি আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য। অতঃপর জিব্রাইল (আ.) থেমে গেলেন। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে জিব্রাইল! এমন স্থানে এসে কোন বন্ধু কি বন্ধুকে পরিত্যাগ করে? জিব্রাঈল (আ.) বললেন, যদি আমি আর একটু অগ্রসর হই তবে আমার ডানাগুলি জ্বলে ছাই হয়ে যাবে। শিফাউস সুদূর গ্রন্থে বর্ণনা আছে, প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইগি ওয়াসালাম বলেছেন, পর্দা উঠে যাওয়ার পর সবুজ রং-এর একটি রফরফ নামক আসনে উঠিয়ে আরও উপরে আল্লাহর আরশে তাঁকে নিয়ে যায়। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দর্শন লাভ করেন। পবিত্র কোরআনে নিকটবর্তী হলেন, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাঁদের মধ্যে দুই ধনুকের অথবা তার চেয়ে কম ব্যবধান থাকলো। তখন আল্লাহ তার বান্দার প্রতি যা অহি করার তা করলেন” (৫৩:৮,৯,১০)। হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “মেরাজের রাতে আমি এক বিশাল জ্যোতি অর্থাৎ আল্লাহর নুর প্রত্যক্ষ করেছি। অতঃপর আল্লাহ পাক আমার প্রতি অহি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কোন মাধ্যম ছাড়া আমার সাথে কথপোকথন করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যিক চোখ ও অন্তর্চোখ দ্বারা আল্লাহর দর্শন লাভ করেছেন। আল্লাহ পাক তাঁর বাহ্যিক ও অন্তর্চোখের মধ্যে এমন যোগসূত্র সৃষ্টি করে দিয়েছেন যে, তাতে কোন পার্থক্য বিদ্যমান ছিল না। মেরাজ শেষে প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা করে প্রথম বাইতুল মোক্কাদ্দিসে অবতরণ করেন। সেখান থেকে বোরাকে করে প্রভাতের পূর্বেই মক্কা মুকার্রমায় পৌঁছেন। সকালে তিনি এই বিস্ময়কর ঘটনা কুরাইশদের নিকট বর্ণনা করতে চাইলে হযরত উম্মে হানি (রা.) বললেন, এই ঘটনা বর্ণনা করলে লোকে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং বেআদবী করবে। আল্লাহর হাবীব কোন বাধা না মেনে মেরাজের ঘটনা কুরাইশদের নিকট বর্ণনা করলেন। কেউ বিস্মিত হলেন। কেউ নিন্দা করলেন। কয়েকজন পৌত্তলিক এই ঘটনা শুনে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর নিকট গিয়ে বর্ণনা করলেন। সিদ্দিকে আকবর (রা.) বললেন, তিনি যদি বলে থাকেন, তাহলে এই ঘটনা সত্য আমি তো এই ঘটনার চেয়েও কঠিন ও বিস্ময়কর বিষয়ে তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করি। এই জন্যেই তাঁকে সিদ্দিক (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেছেন প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যারা বাইতুল মুকাদ্দিস সম্পর্কে অবগত ছিল তারা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বায়তুল মোকাদ্দিসের বিভিন্ন নিদর্শন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি নিখুঁত ভাবে প্রশ্নের জবাব দেন। হযরত আবদুল্লাহ (রা.) হাতে বর্ণিত হাদিসে আছে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মেরাজের রাতে আল্লাহর সানি্নধ্যে যাওয়ার পর আল্লাহ পাক আমাকে তিনটি বিশেষ উপহার প্রদান করেছেন ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ২. সূরা বাকারার শেষ দুই আরাফাত, ৩. যে মুসলিম আল্লাহর সাথে শরীক করবেনা তার সকল কবিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে (সহীহ মুসলিম)

পবিত্র শবে মেরাজ : আল্লাহর রহমতময় দিন

পবিত্র শবে মেরাজ : আল্লাহর রহমতময় দিন
আজ সূর্যাস্তের পর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত পবিত্র মেরাজের রাত। মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এ রাত। এ রাতে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) স্বর্গীয় বাহন বোরাকে চেপে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। দৈনিক পাঁচ
ওয়াক্ত নামাজ ফরজের বিধানও করা হয় এ মহিমান্বিত রাতে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে রাতটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
শবে মেরাজের রাতে যা ঘটেছিল তা মুসলমানদের বিশ্বাস করা ইমানি দায়িত্ব। এ রাতেই সপ্তম আসমান পেরিয়ে আরশে আজিমে পেঁৗছে আল্লাহতায়ালার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসেন হজরত মোহাম্মদ (সাঃ)।
মেরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল আরবি রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে। মহানবী (সাঃ) তখন শুয়েছিলেন উম্মে হানির ঘরে। সেখান থেকে জিব্রাইল (আঃ) তাকে নিয়ে কাবার হাতিমে যান। জমজমের পানিতে অজু করে বোরাকে আরোহণ করেন মহানবী। মক্কা শরিফ থেকে জেরুজালেমের বাইতুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে রাসূল (সাঃ) নামাজ আদায় করেন।
সপ্তম আকাশে সিদরাতুল মুনতাহায় গমন করেন মহানবী (সাঃ)। এর আগে আকাশের সাত স্তরে মহানবীকে স্বাগত জানান হজরত আদম (আঃ), হজরত ঈসা (আঃ), হজরত ইয়াহইয়া (আঃ), হজরত ইদ্রিস (আঃ), হজরত হারুন (আঃ), হজরত মুসা (আঃ) এবং হজরত ইব্রাহিম (আঃ)। সপ্তম আকাশে পেঁৗছে জিব্রাইল (আঃ) মহানবীকে জানান, এরপর আর যাওয়ার অনুমতি নেই। বাকি পথ একাই গমন করেন মহানবী। সেখান থেকে নবীজি রফরফ নামে একটি যানে করে আরশে আজিম অভিমুখে রওনা দেন। সত্তর হাজার নূরের পর্দা ভেদ করে তিনি পেঁৗছান আরশে আজিমে। সেখানে এক ধনুক দূরত্ব থেকে আল্লাহর সঙ্গে তার কথোপকথন হয়।
পরিশেষে দান করা হয় মহানবীর (সাঃ) উম্মতদের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ, যা হজরত মুসার (আঃ) সুপারিশে আল্লাহর দরবারে বারবার যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নির্ণয় করা হয়; কিন্তু দয়াময় আল্লাহতায়ালা বলে দেন, তোমার উম্মতদের মধ্যে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, তারা পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সওয়াব পাবে।

নবী ওলীর দুশমনেরা হুশিয়ার সাবধান | maulana mufti gias uddin at-tahery | bangla waz 2016

ওলী আল্লাহ যেখানে আমরা আছি সেখানে | maulana mufti gias uddin at-tahery | bangla waz 2016

বুযুর্গানে কেরামের হাত-পা চুম্বন

বুযুর্গানে কেরামের হাত-পা চুম্বন
মুহাম্মদ তাওহীদুল ইসলাম কাদেরী

শিষ্টাচার একটি মানবীয় বিশেষগুণ, যার দ্বারা মানুষ নিজেই অন্যের সম্মানের পাত্র হয়। ইসলামে শিষ্টাচার একটি উত্তম আদর্শ বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহর অলীগণের হাত-পা চুমু দেওয়া , তাঁদের পবিত্র বস্তু, চুল, পোশাক-পরিচ্ছেদ ও ব্যবহৃত বস্তু ইত্যাদির সম্মান করা, চুমু দেওয়া এর মধ্যে অন্যতম। নি¤েœ কতিপয় দলীলের ভিত্তিতে তা প্রমাণ করা হল-
১. পবিত্র বস্তুকে চুমু দেয়া জায়েয। পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ ফরমান- وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًاوًّقُوُلُوُاحِطَّةٌ- -অর্থাৎ ওহে বনী ঈসরাইল বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজা দিয়ে নতশিরে প্রবেশ কর এবং বল আমাদের গুনাহ মাফ করা হোক।  এ আয়াত থেকে অবগত হওয়া গেল যে আম্বিয়া কিরাগণের আরামগাহ বায়তুল মুকাদ্দাসকে সম্মান করা হলো অর্থাৎ বনী ইসরাঈলকে ওখানে নতশিরে প্রবেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ আয়াত দ্বারা এটাও বোঝা গেল যে, পবিত্র স্থান সমূহে তাওবা তাড়াতাড়ি কবুল হয়।
২. মিশ্কাত শরীফের- اَلْمُصَافَحَةِ وَالْمُعَانَقَةُ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে-عنْ زَرَاعٍ وَكَانَ فِيْ وَفْدِ عَبْدِ الْقَيْسِ قَالَ لَمَّا قَدمْنَا الْمَدِيْنَةَ فَجَعَلْنَا نَتَبَادَرُ مِنْ رَوَاحِلِنَا فَنُقَبِّلَ يَدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّي الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرِجْلَه- – অর্থাৎ- হযরত যারা‘ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যিনি আব্দুল কায়সের প্রতিনিধিভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, যখন আমরা মদীনায় আসলাম তখন আমরা নিজ নিজ বাহন থেকে তারাতারি অবতরন করতে লাগলাম। অত:পর আমরা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র পবিত্র হাত-পা মোবারক চুমু দিয়েছিলাম। মিশ্কাত শরীফের اَلْكَبَائِرِ وَعَلَامَاْتِ النِّفَاقِ শীর্ষক অধ্যায়ে হযরত ছাফওয়ান ইবনে আস্সাল থেকে বর্ণিত আছে- (অতঃপর হুযুর আলাইহিস সালামের হাত ও পা মুবারকে চুমু দেন) ।
* আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে- عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَبَّلَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُثْمَانَ ابْنُ مَطْعُوْنٍ وَهُوَمَيِّتٌ – অর্থাৎ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উছমান ইবনে মাতউনকে মৃতাবস্থায় চুমু দিয়েছেন।
৩. ইমাম বুখারী (রা:) ‘যিরা ইবনে আমের থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা‘র দরবারে হাজির হই, কিন্তু আমি তাঁকে চিনতাম না। জনৈক ব্যক্তি আমাকে ইশারা করে বললেন, “ইনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অত:পর আমি তাঁর পবিত্র হস্তদ্বয় ও পদদ্বয় ধরে চুম্বন করতে লাগলাম”।
৪. হযরত সাফওয়ান ইবনে আসসাল (রাঃ) হতে বর্ণিত اِنَّ قَوْمًا مِّنَ الْيَهُوْدِىِّ قَبَّلَ اَيْدِىَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَقَبَّلَ يَدَيْهِ وَرِجْلَيْهِ – অর্থাৎ, ইহুদীদের একটি গোত্র নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হস্ত-পদ মুবারক চুম্বন করেছে।
৫.হাদীস শরীফে আরো এসেছে-
حدثنا موسي بن اسماعيل قال حدثنا مطر بن عبد الرحمن الا عنق قال حدثني امرأة من صباح عبد القيس يقال لها ام ابان ابنه الوازع عن جدها ان جدها الوازع ابن العامر قال قدمنا فقبا ذلك رسول الله فاخذنا بيده ورجليه نقبلها- –
অর্থাৎ, আব্দুল কায়স প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হযরত ওয়াযে‘ ইবনে আমের (রাঃ) বলেন, একদা আমি মদীনা শরীফে পদার্পন করলে জনৈক ব্যক্তি বলেন, তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল। অত:পর আমরা হুজুরের পবিত্র হাত ও পদযুগল মোবারক ধরে চুম্বন করলাম।
৬.বুখারী শরীফের আল-আদাবুল মুফরাদে উল্লেখ আছে-
حدثنا عبد الرحمن بن المبارك قال حدثنا سفيان بن حبيب قال حدثنا شعبة قال حدثنا عمر وعن ذكوان عن صهيب قال رأيت عليّا يقبل يد العباس ورجليه-
অর্থাৎ, হযরত সোহাইব (রাঃ) বলেন, আমি হযরত আলী (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি হযরত আব্বাস (রাঃ) কে হাত ও পায়ে চুমু দিচ্ছেন।
ان قبل يد عالم او سلطان عادل بعلمه لا باس به-
যদি আলিম বা ন্যায়পরায়ণ বাদশার হাতে-পায়ে চুমু দেয়া হয় তাঁদের ইলম ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে, তাহলে এতে কোন ক্ষতি নেই ।
৭. প্রসিদ্ধ শিফা শরীফে উল্লেখিত আছে-
كَانَ اِبْنُ عُمَرَ يَضَعُ يَدَهْ عَلَى الْمِنْبَرِ الَّذِىْ يَجْلِسُ عَلَيْهِ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِى الْخُطْبَةِ ثُمّ يَضَعُهَاعَلَى وَجْهِهِ-
যে মিম্বরে দাঁড়িয়ে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা দিতেন, হযরত আব্দুল্লাহ্ইবনে উমর (রাঃ) সেটাতে হাত লাগিয়ে মুখে মাখতেন (চুমু দিতেন)।
৮. আল্লামা ইবনে হাজার রচিত ফাতহুল বারী শরহে বুখারীর ষষ্ঠ পারার ১১৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-
اِسْتَنْبَطَ بَعْضُهُمْ مِنْ مَشْرُوْعِيَّةِ تَقْبِيْلِ الْاَرْكَانِ جَوَازَ تَقْبِيْلِ كُلِّ مَنْ يَّسْتَحِقُّ الْعَظْمَةَ مْن اَدَمِىٍّ وَغَيْرِهِ نُقِلَ عَنِ الاِمَامْ اَحْمَدَ اَنَّه ‘سُئِلَ عَنْ تَقْبِيْلِ مِنْبَرِ النَّبِىِّ عَلَيْهِ السَّلاَمَ وَتَقْبِيْلِ قَبْرِهِ فَلَمْ يَرَ بِهِ بَاسًا وَّنُقِلَ عَن ابْنِ اَبِى الصِّنْفِ اليَمَانِى اَحَدِ عُلَمَاءِ مَكَّةَ مِنَ الشَّافِعِيَّةِ جَوَازَ تَقْبِيْلِ الْمُصْحَفِ وَاَجْزَاءِ الْحَدِيْثِ وَقُبُوْرِ الصَّالِحِيْنَ مُلْخَصًا-
অর্থাৎ, কা‘বা শরীফের স্তম্ভগুলোর চুম্বন থেকে কতেক উলামায়ে কিরাম, বুযুর্গাণে দ্বীন ও অন্যান্যদের পবিত্র বস্তুসমুহ চুম্বনের বৈধতা প্রমাণ করেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁর কাছে কেউ জিজ্ঞাসা করেছিল- হুযূর আলাইহিস সালামের মিম্বর বা পবিত্র কবর মুবারকে চুমু দেয়াটা কেমন? তিনি এর উত্তরে বলেছিলেন, কোন ক্ষতি নেই। মক্কা শরীফের শাফেঈ উলামায়ে কিরামের অন্যতম হযরত ইবনে আবিস সিন্ফ ইয়ামানী থেকে বর্ণিত আছে- কুরআন করীম ও হাদীছ শরীফের পাতাসমূহ এবং বুযুর্গানে দ্বীনের কবরসমূহ চুমু দেয়া জায়েয।  দুররুল মুখতারের পঞ্চম খন্ড কিতাবুল কারাহিয়াতের শেষ অধ্যায় الاستبراء এর মুসাফাহা পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছেÑ
وَلَا بَاسَ بِتَقْبِيْلِ يَدِا الْعَالِمِ وَالسُّلْطَنِ الْعَادِلِ-
অর্থাৎ, আলিম ও ন্যায়পরায়ণ বাদশার হাতে চুমু দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই।  এ জায়গায় ফাত্ওয়ায়ে শামীতে হাকিমের একটি হাদীছ উদ্ধৃত করেছে, যার শেষাংশে বর্ণিত আছে-
قَال ثُمَّ اَذِنَ لَه ‘فَقَبَّلَ رَأْسَه وَرِجْلَيْهِ وقَالَ لَوْ كُنْتُ اَمِرًا اَحَدًا اَنْ تَسْجُدَ لَاحَدٍ لَاَمَرْتُ الْمَرْأَةَ اَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَقَالَ صَحِيْحُ الْاَسْنَادِ-
হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই ব্যক্তিকে অনুমতি দিয়েছেন। তাই সে তাঁর মস্তক ও পা মুবারক চুমু দিলেন। অতঃপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান যদি আমি কাউকে সিজ্দার হুকুম দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে হুকুম দিতাম স্বামীকে সিজ্দা করতে।
প্রখ্যাত ‘তুশেখ’ গ্রন্থে আল্লামা জালাল উদ্দিন সুয়ুতী (রহঃ) বলেছেন-
اِسْتَنْبَطَ بَعْضُ الْعَارِفِيْنَ مِنْ تَقُبِيْلِ الْحَجَرِالْاَسْوَدِ تَقْبِيْلَ قُبُورِالصَّالِحِيْنَ-
হাজরে আসওয়াদের চুম্বন থেকে কতেক আরেফীন বুযুর্গানে কিরামের মাযারে চুমু দেয়ার বৈধতা প্রমাণ করেছেন।
চুম্বন পাঁচ প্রকারঃ
* আশীর্বাদসূচক চুম্বন। যেমন, বাবা ছেলেকে চুমু দেয়।
* সাক্ষাৎকারের চুম্বন। যেমন, কতেক মুসলমান কতেক মুসলমানকে চুমু দেয়।
* স্নেহের চুম্বন। যেমন, ছেলে মা-বাবাকে দেয়।
* বন্ধুত্বের চুম্বন। যেমন, এক বন্ধু অপর বন্ধুকে চুমু দেয়।
* কামভাবের চুম্বন। যেমন, স্বামী স্ত্রীকে দেয়।
কেউ কেউ ধার্মিকতার চুম্বন অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদের চুম্বনকে এর সাথে যোগ করেছেন। আদ-দুররুল মুখতারে আলমগীরীর মত পাঁচ প্রকার চুম্বনের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে নিম্ন লিখিত বক্তব্যটুকু বর্ধিত করেছেন-
قُبْلَةُ الدِّيَانَةِ لِلْحَجْرِ الْاَسْوَدِ وَتَقْبِيْلُ عُتْبَةِ الْكَعْبَةِ وَتَقْبِيْلُ الْمُصْحَفِ قِيْلَ بِدْعَةِ لَكِنْ رُوِىَ عَنْ عُمَرَ اَنَّه‘ كَانَ يَاْخُذُ الْمُصُحَفِ كُلَّ غَدَاةٍ وَّيْقَبِّلُهْ وَاَمَّا تَقْبِيْلُ الْخَبْزِ فَجَوَّزَ الشَّافِعِيَّةُ اَنَّه‘ بِدْعَةٌ مُّبَاحَةٌ وَّقِيْلَ حَسَنَةٌ مُّلَخَّصًا-
অর্থাৎ দ্বীনদারীর এক প্রকার চুম্বন রয়েছে, সেটা হচ্ছে হাজরে আসওয়াদে চুম্বন ও কা‘বা শরীফের চৌকাঠে চুম্বন। কুরআন পাককে চুমু দেয়াটা কতেক লোক বিদ‘্আত বলেছেন। কিন্তু হযরত উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতিদিন সকালে কুরআন পাক হাতে নিয়ে চুমু খেতেন এবং রুটি চুমু দিয়াকে শাফেঈ মাযহাবের লোকেরা জায়েয বলেছেন। কেননা এটা বিদ্আতে জায়েযা। অনেকে এটাকে বিদ্‘আতে হাসানা বলেছেন।
আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ ফরমান-
وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ اِبْرَاهِيْمَ مُصَلَّى-
অর্থাৎ, (তোমরা মক্বামে ইব্রাহীমকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ কর)  মাকামে ইব্রাহীম ওই পাথরকে বলে, যেটার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইব্রাহীম খলীল (আঃ) কা‘বা শরীফ তৈরী করেছেন। তাঁর পবিত্র কদমের বরকতে সেই পাথরের এ মর্যাদা লাভ হলো- সারা দুনিয়ার হাজীরা ওই দিকে মাথানত করে। এ সব ইবারত থেকে প্রতীয়মান হলো- চুম্বন কয়েক প্রকারের আছে এবং পবিত্র বস্তুকে চুমু দেয়াটা দ্বীনদারীর আলামত।
* তারিখে নিশাপুরে বর্ণিত- ‘মহান ব্যাক্তিদের হস্তপদ চুম্বন করা মুস্তাহাব’ ।
* ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ইলমে হাদীসের প্রবক্তা আল্লামা শায়খ শাহ্ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ) বলেছেন- কদমবুচি (পা চুম্বন) করা জায়েজ আছে ।
* হযরত বড়পীর সৈয়্যদ আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) এর বয়স ১৮ বছর, তখন উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে বাগদাদ শরীফে যাওয়ার সময় বিদায়ের প্রাক্কালে তাঁর মাকে কদমবুচি করেন, যা ছিল তাঁর মায়ের সাথে শেষ সাক্ষাত। আর মা তাঁকে বিদায়লগ্নে নসিহত করেন, সদা সত্যকথা বলবে কোন দিন মিথ্যা কথা বলবে না ।
ক্রান্তিতে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের পবিত্র বাণী-
مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَلَمْ يُوَقِّرْ كَبِيْرَنَا فَلَيْسَ مِنَّا-
অর্থাৎ, যে বড়কে সম্মান করে না এবং ছোটকে ¯েœহ করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নয়।  সুতরাং বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই শিক্ষা।
উপর্যুক্ত আলোচনার দ্বারা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হলো যে, আদব, ভক্তি, সম্মান প্রদর্শণার্থে বুযুর্গানে দ্বীন,পিতা-মাতা, শিক্ষকমন্ডলী, পীর-মাশায়েখগণের হস্ত-পদ চুম্বন অনুরূপ কাবা শরীফ, কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের পাতা সমূহের উপর চুম্বন জায়েয ও বরকতময়। এমনকি বুযুর্গানে দ্বীনের চুল, পোশাক ও অন্যান্য পবিত্র বস্তুর সম্মান করা এবং যুদ্ধকালীন ও অন্যান্য মুসিবতের সময় এগুলো থেকে সাহায্য লাভ করা কুরআন কারীম থেকে প্রমাণিত আছে। কুরআন কারীমে ইরশাদ ফরমান-
وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ اِنَّ اَيَةَ مُلْكِهِ اَنْ يَّاْتِيَكُمُ التَّابُوْتُ فِيْهِ سَكِيْنَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِّمَّا تَرَكَ اَلُ مُوْسَى وَاَلُ هَرُوْنَ تَحْمِلُهُ اَلْمَلَئِكَةُ-
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,তোমরা আমার ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আকড়ে ধর এবং এটা তোমাদের জন্য অবশ্যই কর্তব্য  অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, أصحابي كالنجوم بأيّهم اقتديتم اهتديتم -আমার সাহাবীগণ তারকারাজির ন্যায়, তোমরা যাকেই অনুসরন করবে সৎ পথ পাবে।
সুতরাং বুঝা গেল যে, যারা কদমবুচি করাকে বিদ‘আত, শিরক, হিন্দুদের নিয়ম ইত্যাদি বলে থাকে, তারা মূলতঃ পবিত্র কুরআন হাদীসের অপব্যাখ্যাকারী, সমাজে ফেতনা সৃষ্টিকারী, ভ্রান্ত আকী¡দায় বিশ^াসী এবং তারাই ওহাবী নামে আখ্যায়িত। আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদের ঈমান ও আমল হেফাজত করুন। আমিন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ।

কবি নজরুলের লিখনিতে নবী প্রেমের উন্মেষ – একটি বিশ্লেষণ

কবি নজরুলের লিখনিতে নবী প্রেমের উন্মেষ ঃ একটি বিশ্লেষণ
মাও. আ.ম.ম. মাছুম বাকী বিল্লাহ

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙ্গালী জাতির ও বাংলা সাহিত্যের এক মহা সম্পদ। নজরুলের জন্ম বাঙালী মুসলিম সমাজে। সব মহৎ শিল্পী-সাহিত্যিকদের মত তিনি স্ব-জাতি মুসলমানদের জন্য তাঁর জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভেবেছেন। বিশেষ করে বাঙালী মুসলিম সমাজের জন্য তাঁর কলম ছিল ক্ষুরধার। আর এ জন্যই তিনি নিজের বিণীত পরিচয়ে “খাদেমুল ইসলাম নজরুল ইসলাম” লিখতেও এতটুকুন কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি তাঁর লিখনীতে মুসলমানদের নবী বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত, স্বাধীনতার মুক্তির সনদ ও করুণার মূর্ত প্রতীক হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মোজতবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি যে বর্ণনাতীত  ভালোবাসা, প্রেম ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তা হয়ত আর কোন বাঙালী সাহিত্যিক দেখিয়ে যাননি। কি তাঁর গান, কি কবিতা সব জায়গায় তিনি রাসূল প্রেমের এক দ্যূতি ছড়িয়েছেন। যা আজো কোটি মুসলমানদের মুখের কথা, প্রাণের কথা। আমার গবেষণায় আমি তাঁকে রাসূল প্রেমে এমন এক মহান সাধক ও চিরবিভোর অবস্থা পেয়েছি যেন তিনি তাঁর সবকিছু নবী প্রেমে সপে দিয়েছেন আর নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একজন বাধ্য শিষ্য রুপে আত্মপ্রকাশ করাতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন।
কবিতায় দরুদ ঃ
কবি নজরুল লিখেন-
উরজ্ য়্যামেন্ নজ্দ হেজাজ্ তাহামা ইরাক শাম
মেসের ওমান্ তিহারান-স্মরি’ কাহার বিরাট নাম,
পড়ে- “সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম”
কবি এখানে ইয়ামেন, নজদ, হিজাজ, ইরাক, ইরান, মিসর, ওমান ও তেহরান সহ বিশ্বব্যাপী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম মোবারক নিয়ে মানুষ কিরুপ শ্রদ্ধা ও পূর্ণভক্তি সহকারে উনার প্রতি দরুদ পড়েন তার উল্লেখ করেন।
কবি আরো বলেন- “আমার সালাম পৌছে দিও নবীজীর রওজায়”
সৃষ্টির প্রাণ ঃ
নজরুল তাঁর কবিতায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সৃষ্টিজগতের দম বা প্রাণ বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁর ইনতিকালের পর মক্কা ও মদিনার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
মক্কা ও মদিনায় আজ শোকের অবধি নাই।
যেন রোজ-হাশরের ময়দান, সব উন্মাদ সম ছুটে !
কাঁপে ঘন ঘন কাবা, গেল গেল বুঝি সৃষ্টির দম টুটে !
আর মিরাজের রজনীতে সৃষ্টিজগতের সেই প্রাণ আল্লাহর কাছে সৃষ্টি জগতের উর্ধ্বে লা মাকামে  যাওয়ার কারণেই পৃথিবীর সবকিছু ছিল অচল। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এসে দেখেন, তাঁর যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তে সম্পন্ন করা অযুর পানি এখনো গড়িয়ে যাচ্ছে, বিছানাটা এখনো উষ্ণ। অথচ ঘুরে এসেছেন অগণিত মাইলের দূরপথ।
আয়াতের অনুবাদ ঃ
আমপারার দুটি আয়াতে আল্লাহ পাক বিশেষভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন। আর নজরুল তার কাব্যিক অনুবাদ করেছেন এইভাবে-
আয়াত-“(হে নবী) আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি”  (অনুবাদ- “করিনি কি মহীয়ান মহিমা-বিথার?”  আয়াত-“(হে নবী) আপনার পালনকর্তা অতিসত্বর আপনাকে এমন দান করবেন, অতপর আপনি তাতে সন্তুষ্ট হবেন।’   অনুবাদ- “অচিরাৎ তব প্রভু দানিবেন, (সম্পদ) খুশী হইবে যাতে।”
বায়রনের যেমন গ্রীসের প্রতি হৃদয়ের একটা টান ছিল নজরুলের ছিল তেমনি “জাজিরাতুল আরব” এর প্রতি। এই আকর্ষণের কারণ যে ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মভুমি তাতে সন্দেহ নেই। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি নজরুলের সীমাহীন অনুরাগ প্রদর্শন। ‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতায় নজরুল এই মহামানবের প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রথম প্রদর্শন করেন। এ কবিতায় তিনি বললেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদক্ষতম কান্ডারী, সুতরাং যাঁরা ইসলাম-তরণীর আরোহী, তাদের শত ঝড়-ঝঞ্ঝায় কোন বিপদের আশঙ্কা নেই। সমস্যা-সঙ্কুল এই পৃথিবীর তমসাকীর্ণ সময় ততক্ষণ নির্ভয়ে পাড়ি দিতে পারবে যতক্ষণ তারা হযরতের নির্দেশিত পথে চলবে।
মরুভাস্কর কাব্যগ্রন্থ ঃ
১৯৩০ খ্রীস্টাব্দের দিকে নজরুল যখন ইসলামী গান লিখতে শুরু করেন, তখন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর প্রশস্তিমূলক নাত (হযরত মুহাম্মদ দ. এর শানে রচিত কবিতা বা পদ) রচনার সময় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে নজরুল একটি কাব্যগ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় নজরুল এই কাব্যটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি। নবীর জীবনী বর্ণনামূলক এই দীর্ঘ প্রবন্ধ কাব্যের ১৭টি পরিচ্ছেদ কবি সম্পন্ন করেন, কিন্তু ১৮তম পরিচ্ছেদটি তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেন নি। “সাম্যবাদী” নামে এই পরিচ্ছেদের মাত্র ষোলটি পংক্তি রচিত হয়েছিল। নজরুলের আকস্মিক রোগাক্রান্ত এবং নিশ্চল হওয়ার দরুণ “মরু-ভাস্কর” অসমাপ্ত থেকে যায়। মরুভাস্কর গ্রন্থের ভুমিকায় কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমীলা বলেন ঃ
“বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর জীবনী নিয়ে একখানী বৃহৎ কাব্যগ্রন্থ রচনার  কথা তিনি প্রায়ই বলতেন।”
কবি এ কাব্যগ্রন্থে নবীজী (দ.)’র বাল্যকালের প্রায় পুরো সময়টাকেই সুচারুরুপে এক কাব্যিক অলংকার দিয়ে বর্ণনা করেছেন। বিশ্বনবী (দ.) কে শিশু অবস্থায় যখন মা ‘আমিনা’ বাবা আব্দুল্লাহর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যান। ফিরে আসার সময় পথিমধ্যে মা ‘আমিনার’ ইন্তিকালের হৃদয় বিদারক কাহিনী তুলে ধরেন এভাবে-
“কিছু দূর আসি’ পথ-মঞ্জিলে আমিনা কয়-
বুকে বড় ব্যথা, আহমদ, বুঝি হ’ল সময়
তোরে একলাটি ফেলিয়া যাবার! চাঁদ আমার,
কাদিসনে তুই, রহিল যে রহমত খোদার!”
আমরা দেখি যে, কবি নজরুল রাসূল (দ.) এর শিশুবেলার দুঃখে দুঃখিত ও ব্যথিত হয়েছেন এবং কবি তার বিভিন্ন কবিতায় এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কবির হৃদয়ে ছিল শিশু এতিম নবীর প্রতি এক অকৃত্তিম আবেগ আর ভালোবাসা। কবি উক্ত কবিতায় লিখেন-
“সব শোকে দিবে শান্তি যে- শৈশব তাহার
কেন এত শোক-দুঃখময়?”
অর্থাৎ যিনি এসেছেন পুরো বিশ্বজাহানের সকলের দুঃখ ঘুচাবার তরে আর তিনিই কিনা এত দুঃখ, ব্যাথা নিয়ে শৈশব পার করেছেন। এ সৃষ্টিকর্তার এক অপার মহিমার লীলাখেলা, যেন এক প্রেম খেলা। বন্ধুর সাথে বন্ধুর, হাবিবের সাথে মাহবুবের, প্রেমাস্পদের সাথে প্রেমিকের। যা বুঝবার ক্ষমতা হয়তো কেবল চক্ষুস্মান প্রিয় প্রেমিক বান্দারাই রাখেন।
আরব সূর্য ঃ
কাজী নজরুল দয়াল নবীজী (দ.) কে আরবের উদিত সূর্য বলে উল্লেখ করে তাঁর গুণগান গেয়েছেন। সূর্য যেমনি করে সমস্ত জগতকে আলো দেয় তেমনি রাসূল (দ.) সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে কল্যাণ ও রহমতের এক ঐশী আলো নিয়ে এসেছেন। কবির রচনায় এসেছে ঃ
জেগে ওঠ তুই রে ভোরের পাখী, নিশি প্রভাতের কবি !
লোহিত সাগরে সিনান করিয়া উদিল আরব-রবি।
তিনি আরো বলেন ঃ
নহে আরবের, নহে এশিয়ার, বিশ্বে সে একদিন,
ধূলির ধরার জ্যোতিতে হ’ল গো বেহেশত জ্যোতিহীন !
কবি তাঁর অন্য কাব্যগ্রন্থে লিখেন ঃ
“উঠেছিল রবি আমাদের নবী, সে মহা-সৌরলোকে,
উমর, একাকী তুমি পেয়েছিলে সে আলো তোমার চোখে!”
দয়াল নবীর আগমনী সংবাদ ঃ
আরবী ভাষায় একটি প্রবাদ আছে যে, “মান আহাব্বা সায়আন আকছারা জিকরুহু” অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন কিছু ভালবাসে সে সব সময় শুধু ঐ বিষয় নিয়েই কথা বলে। আমরা দেখতে পাই যে কবি নজরুল তাঁর অসংখ্য লিখনীতে দয়াল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বিভিন্নভাবে প্রশংসায় মেতে উঠেছেন। তাঁর আগমনের কথা বলেছেন, কখনো আবার এতিম বালক নবীজীর করূণ কাহিনী বর্ণনা করেছেন, আবার কখনো তাঁর অনুপম চরিত্রের জয়গান গেয়েছেন। কবি যেন নবীজীর আগমনে সারা দুনিয়ায় খুশির পয়গাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কবির ভাষায়-
১.    “ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।
২.    “আসিছেন হাবিব-এ খোদা আরশ্-পাকে তাই উঠেছে শোর।”
৩.    “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
এধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙা-রবি দোলে।
‘মুহাম্মদ’ মোবারক নামের প্রশংসা ঃ
কবি নজরুল বিশ্বনবী (দ.) এর নামকরণের ইতিহাসও মরু-ভাস্কর কবিতায় তুলে ধরেছেন। রাসূল পাক (দ.) এর নাম রেখেছেন তাঁর দাদা তৎকালীন মক্কার কুরাইশ দলপতি আব্দুল মুত্তালিব। তিনি তা এভাবে বর্ণনা করেন যে-
“কহিল মুত্তালিব বুকে চাপি’ নিখিলের সম্পদ-
‘নয়নাভিরাম! এ শিশুর নাম রাখিনু ‘মোহাম্মদ’।”
নজরুল তাঁর কবিতায় রাসূল (দ.) এর নাম মুবারকের প্রশংসায় মেতে উঠেছেন। এ যেন এক সত্য প্রেমিক, যে প্রমিক তার প্রেমাস্পদের সবকিছু নিয়েই বলতে চাই। প্রেমাস্পদের সবকিছুই নিয়েই যেন তার বলতে হবে, নতুবা প্রেমিক মনের পরিপূর্ণ তৃপ্তি হয় না। কবি বলেন ঃ
গুঞ্জরি ওঠে বিশ্ব-মধুপ- “আসিল মোহাম্মদ!”
অভিনব নাম শুনিল রে- ধরা সেদিন- “মোহাম্মদ!”
এতদিন পরে এল ধরার- “প্রশংসিত ও প্রেমাস্পদ!”
কবি যেন এই ‘মুহাম্মদ’ নামটির প্রেমি পড়ে গেছেন। এখন শুধু এই নামটি জপাই কবি হৃদয়ের প্রশান্তি। তিনি বলেন-
“নাম মোহম্মদ বোল রে মন নাম আহমদ বোল
যে নাম নিয়ে চাঁদ-সেতারা আসমানে খায় দোল।”
(নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, সম্পাদনা- রশিদুন নবী, প্রকাশনা- নজরুল ইন্সটিটিউট, পৃষ্ঠা-১৭১)
“মোহাম্মদ নাম যত জপি, তত মধুর লাগে
নামে এত মধু থাকে, কে জানিত আগে।”
(নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, রশিদুন নবী কর্তৃক সম্পাদিত, নজরুল ইন্সটিটিউট, ২০১৪ খ্রি., পৃষ্ঠা-১৭৩)
কবি তাঁর “অনাগত” কবিতায় আরো বলেন ঃ
“মোহাম্মদ এ, সুন্দর এ, নিখিল- প্রশংসিত,
ইহার কন্ঠে আমার বাণী ও আদেশ হইবে গীত।”
বিশ্বনবী মুহাম্মদ (দ.) এর আগমনে ধন্য হয়েছিল মক্কা, মদিনা, আরব, এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্ব। কেননা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন মাজীদে ইরশাদ ফরমান-
“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত সরুপ প্রেরণ করেছি”  কবি বলেন ঃ
“ধন্য মক্কা, ধন্য আরব, ধন্য এশিয়া পুণ্য দেশ,
তোমাতে আসিল প্রথম নবী গো, তোমাতে আসিল নবীর শেষ।”
নবীজী (দ.) কে আল্লাহ পাক দুনিয়ার বুকে পাঠিয়েছেন সকল প্রকার ভেদাভেদ, হানাহানি-মারামারি ভুলিয়ে মানুষের মাঝে প্রেম-প্রীতি আর ভালোবাসা কায়েম করার জন্য। তিনি এই ধরায় এসে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের এক বর্বর যুগের মানুষদের তৈরি করলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সোনার মানুষ। কবি তাই সেই তরুণ নবীর জয়গান গেয়ে বলেন-
“দেখিতে দেখিতে তরুণ নবীর সাধনা-সেবায়
শত্রু মিত্র সকলে গলিল অজানা মায়ায়।”
“মোহাম্মদের প্রভাবে সকলে হইল রাজী,
সত্যের নামে চলিবে না আর ফেরেব-বাজী !”
মক্কার অধিবাসীরা মহনবী (দ.) কে অসম্ভব রকমের সত্যবাদী বালক হিসেবে জানতো। তারা মনে করতো মুহাম্মদের নিকট যা রাখা হবে তাই আমানত এবং নিরাপদ। সে কখনো মিথ্যা বলেনা। তাই তারা উনার নাম দিয়েছিল “আল-আমিন” অর্থাৎ বিশ্বাসী। কবি নজরুলও এ বিষয়টি এড়িয়ে যাননি। তিনি বলেন-
“ক্রমে ক্রমে সব কোরেশ জানিল- মোহাম্মদ আমীন
করে না কো পূজা কা’বার ভূতেরে ভাবিয়া তাদেরে হীন।”
আল্লাহর সাথে নবীজীর উল্লেখ ঃ
কবি নজরুল তাঁর লেখার অনেক জায়গায় যেখানে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রশংসা করেছেন সেখানে নবীজী (দ.) এর গুণগাণ গেয়েছেন। যেমনিকরে কুরআন মাজীদের অসংখ্য আয়াতের মাঝে আমরা এটা লক্ষ্য করি যে, আল্লাহর নামের সাথে তাঁর প্রিয় হাবিব নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র নাম উল্লেখ আছে। কুরআনের ভাষায়-
১.    “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর অনুসরণ কর ও (তাঁর) রাসূলের অনুসরণ কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা নেতৃত্ব দিবেন।
২.    “(হে রাসূল) আপনি বলুন যে, তোমরা যদি আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও তাহলে আমার আনুগত্য কর, এতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন”
কবি এই সমস্ত আয়াতের অনুকুলে কাব্যিক আকারে তাঁর ভাব প্রকাশ করেন।
১.    “খোদারে আমরা করি গো সেজদা, রুসূলে করি সালাম,
ওরাঁ ঊর্ধ্বের, পবিত্র হয়ে নিই তাঁহাদের নাম,
২.    আল্লাহ রসূল বোল্ রে মন আল্লাহ রসূল বোল।
দিনে দিনে দিন গেল তোর দুনিয়াদারি ভোল॥
রোজ কেয়ামতের নিয়ামত এই আল্লাহ-রসূল বাণী
তোর দিল দরিয়ায় আল্লাহ-রসূল জপের লহর তোল ॥
৩.    মোহাম্মদ মোস্তফা নামের (ও ভাই) গুণের রশি ধরি
খোদার রাহে সপে দেওয়া ডুববে না মোর তরী ॥
আল্লাকে যে পাইতে চায় হজরতকে ভালবেসে
আরশ কুরসি লওহ কালাম, না চাহিতেই পেয়েছে সে।
রসূল নামের রশি ধ’রে যেতে হবে খোদার ঘরে,
৪.    বক্ষে আমার কা’বার ছবি চক্ষে মোহাম্মদ রসুল।
নবী (দ.) এর প্রতি কবির আকুতি ঃ
কবি তার কবিতায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কখনো তার নয়ন-মণি, কখনো গলার মালা, আবার কখনো চোখের অশ্রুর সাথে তুলনা করে কবি মনের আকুল কাকুতি-মিনতি প্রকাশ করেছেন। কবি মনে করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ই তার সবকিছু। এমনকি কবি মানবজাতির বহুল আকাক্সিক্ষত বেহেশতের আশাও ছেড়ে দিয়েছেন যদি পান সেই মহান প্রেমাস্পদ নবী (দ.)কে। যেমন কবির ভাষায়-
মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি মোহাম্মদ নাম জপমালা।
মোহাম্মদ নাম শিরে ধরি, মোহাম্মদ নাম গলায় পরি,
মোহাম্মদ মোর অশ্রু-চোখের ব্যথার সাথি শান্তি শোকের,
চাইনে বেহেশত্ যদি ও নাম জপ্তে সদা পাই নিরালা॥
একত্মবাদের দিশারী ঃ
কবি তাঁর জীবনে একত্মবাদের দিশারী হিসেবেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে একমাত্র কান্ডারী বলে স্বীকার করেছেন। আমরা তাঁর কবিতায় ও গানে এই বিষয়টির স্পষ্ট উল্লেখ দেখতে পায়। যেমন- “তৌহিদেরি মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম।”  কবি পরম সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত ও দয়া প্রাপ্তির মাধ্যমও মনে করেছেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। কবি বলেন- “খোদার রহম চাহ যদি নবীজীরে ধর।”
পথ-প্রদর্শক কান্ডারী ঃ
কবি মনে করেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কেউ বেহেশতের সঠিক পথ দেখাতে পারবে না। একমাত্র সহজ-সরল ও সত্যের পথ মানবজাতিকে দেখানোর জন্যই যেন তিনি পরম সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে এ ধরাধামে আগমন করেছেন। তিনি বলেন- “ইয়া মোহাম্মদ, বেহেশত হতে খোদায় পাওয়ার পথ দেখাও।”   পৃথিবীতে মহান আল্লাহর ঘর বলতে মক্কা নগরীর পবিত্র কাবা শরীফকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর হজ্জ ও হজ্জের মৌসুম ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়েও সমগ্র পৃথিবী থেকে দলে দলে মুসলমানরা এই ঘর তাওয়াফসহ পবিত্র জায়গাটি কেন্দ্র করে পূণ্য হাসিলের নিমিত্তে ছুটে আসে। জীবনের একটি পরম আকাক্সক্ষা থাকে কাবার পথে যাওয়ার। কবির মনেও ছিল এইরকম এক সুপ্ত বাসনা। আর তিনি প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছেই প্রকাশ করলেন তাঁর এই গহীন ইচ্ছা। তিনি বলেন-“ইয়া রাসুলুল্লাহ! মোরে রাহ্ দেখাও সেই কাবার।”
শ্রেষ্ঠ নবীর জয়গান ঃ
কবি সমগ্র সৃষ্টিজগতে প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তিনি মনে করেন তাঁর মতো বিশ্বে দ্বিতীয় মর্যাদাবান ব্যাক্তিত্বের অধিকারী আর কেউ নেই। তিনি বলেন আকাশে সবগুলি তারার মাঝে সূর্য যেমন, সমস্ত নবীর মাঝে আমার নবী তেমন। কবির কাব্যিক ভাষায়-
১.    “নবীর মাঝে রবির সম আমার মোহাম্মদ রসুল,
খোদার হাবিব দীনের নকিব বিশ্বে নাই যার সমতুল।”
২.    “বাদশারও বাদশাহ্ নবীদের রাজা তিনি।”